হিমালয় পর্বতের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এক জলধারার নাম বিপাশা, একটি জীবন্ত ইতিহাস, একটি প্রাচীন স্মৃতির ভাণ্ডার৷ নদীর শরীরে মিশে আছে সভ্যতার পদচিহ্ণ, মানুষের হাসি-কান্না, আধ্যাত্মিক সাধকের ধ্যান, সাধনা, কবির কল্পনা আর অগণিত অজানা মানুষের জীবনগাথা৷
রাঢ় বাংলার কোপাইয়ের হাঁসুলী বাঁক যেমন এক হারিয়ে যাওয়া উপকথার দেশ, তেমনি হিমালয়ের কোলে বয়ে চলা বিপাশা আমার কাছে এক জীবন্ত মহাকাব্য৷ একটি লালমাটির শান্ত প্রকৃতির মধ্যে সময়ের গল্প বলে, অন্যটি হিমালয়ের কঠিন পাথর ভেঙে নেমে এসে তার অদম্য প্রাণশক্তির পরিচয় দেয়৷ আজ এই দুই নদীর দিকে তাকালে মনে হয়, তাদের নিয়তি কোথাও যেন একই সুতোয় বাঁধা৷ দুজনেই মানুষের সভ্যতার জন্ম দেখেছে, মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে, আবার বিত্তলোভী স্বার্থান্বেষী মানুষের অদূরদর্শিতার আঘাতও সহ্য করে চলেছে৷
বিপাশার তীরে আমার বসবাস খুব দীর্ঘ নয়৷ তবু অল্প সময়েই এই নদী আমাকে বড় আপন করে নিয়েছে৷ ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে দেখেছি তার কত রূপ৷ কখনও সে শান্ত, ধ্যানমগ্ণ তপস্বিনীর মতো পাহাড়ের কোলে নীরবে বয়ে যায়৷ কখনও আবার পাথরের স্তূপ ভেঙে ফেনিল উচ্ছ্বাসে গর্জে ওঠে৷ কোথাও তার দুই তীর ঘন সবুজে ঢাকা, কোথাও আপেল, নাশপাতি, আখরোট ও নানা ফলের গাছ তারই স্নেহে গড়ে তুলেছে অপরূপ বাগিচা৷
বসন্তে পাহাড়ি উপত্যকাগুলি যখন নানা ফুলের রঙে সেজে ওঠে, তখন বিপাশার ধারাতেও যেন নতুন জীবনের গান শোনা যায়৷ শরতে ফলের ভারে নুয়ে পড়া গাছগুলি নদীর কাছে কৃতজ্ঞতার প্রণাম জানায়৷ ভোরের আলোয় বিপাশা এক শান্ত সাধিকার মতো৷ আর গভীর রাতে যখন পৃথিবী নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তখন তার গুরুগম্ভীর স্রোতের শব্দ শুনলে মনে হয় কোনো প্রাচীন ঋষি অনন্তকাল ধরে মন্ত্র উচ্চারণ করে চলেছেন৷
এই নদীর নামের মধ্যেও লুকিয়ে আছে এক অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা৷ বিপাশা শব্দের অর্থ যে বন্ধন ছিন্ন করে, যে মুক্ত করে নানা মানব বৃত্তির পাশ৷ যেন তার নামের মধ্যেই রয়েছে মুক্তির এক চিরন্তন আহ্বান৷ লোককথা বলে, মহর্ষি বশিষ্ঠ গভীর পুত্রশোকে ব্যাকুল হয়ে নিজের জীবন বিসর্জনের উদ্দেশ্যে নানা লতা-গুল্মে নিজেকে বেঁধে এই নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন৷ কিন্তু নদী তাঁর বন্ধন খুলে দিয়ে তাঁকে আবার জীবনের তীরে ফিরিয়ে আনে৷ সেই পাশ বন্ধন মুক্তির স্মৃতি থেকেই নাকি তার নাম হয় বিপাশা৷
ইতিহাসের অন্য ধারায় এই নদী বিয়াস নামেও পরিচিত৷ প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ব্যাসের স্মৃতির সঙ্গে এই নামের যোগ রয়েছে৷ ইতিহাসের বহু ব্যাসের মধ্যে এক ব্যাসদেবের তপস্যা, জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে এই অঞ্চলের কিছু লোককথা জড়িয়ে আছে৷ তাই বিপাশা বা বিয়াস হয়ে উঠেছে সংস্কৃতির এক প্রাচীন স্মৃতিবাহী ধারা৷
যুগের পর যুগ ধরে এই নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট ছোট গ্রাম৷ নদীর জল, পাথর, মাটি ও বনভূমিকে ঘিরেই স্থানীয় মানুষের জীবন তৈরি হয়েছে৷ কেউ কৃষিকাজ করেছে, কেউ ফলের বাগান করেছে, কেউ পশুপালন ও ছোট ব্যবসার মাধ্যমেও জীবন নির্বাহ করেছে৷ তাদের লোকগানে, লোকনৃত্যশৈলীতে, লোকউৎসবে, লোকসংস্কৃতিতে, সামাজিক রীতিতে, অর্থনৈতিক লেনদেনে, লোকবিশ্বাসে ও গ্রামদেবতার আরাধনার মধ্যে এই বিপাশারই ছায়া জড়িয়ে রয়েছে আষ্টেপৃষ্টে৷
এই নদীর তীরে মানুষ যুগ যুগ ধরে গড়ে তুলেছে তাদের বসতি, গড়ে তুলেছে তাদের ধর্মবিশ্বাস, সাধনা ও চিন্তাবোধেরর অধিক্ষেত্রও৷ বহু আধ্যাত্মিক সাধক, দার্শনিক গবেষক ও জ্ঞানসন্ধানী মানুষ এই অঞ্চলের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মধ্যে বাস করে নিজেদের অন্বেষণের পথ খুঁজে পেয়েছেন৷ তাঁদের স্মৃতিকে ধরে রাখতে কোথাও মন্দির, কোথাও গ্রামের নাম, আবার কোথাও লোককথার ভিতরে আজও বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে তাঁদের পুণ্য উপস্থিতি৷
কিন্তু সময়ের স্রোত সবসময় মঙ্গল বয়ে আনে না৷ গত কয়েক দশকে উন্নয়নের নামে বিপাশার দুই তীরেও শুরু হয়েছে এক অস্থির ও নেতিবাচক পরিবর্তন৷ পাহাড় কেটে, স্থানীয় কিছু মানুষের চরম লোভে মূল্যবান কাঠের বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে নদীর দুপাড়ের প্রাচীন বড় বড় গাছ ও জঙ্গল নির্মমভাবে সাফ করে দেওয়া হয়েছে ও হচ্ছেও৷ ফলে মাটির স্বাভাবিক বাঁধন যাচ্ছে আলগা হয়ে৷ অন্যদিকে, নদীর স্বাভাবিক শ্বাসরোধ করে দুপাড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত কংক্রিটের সারি৷ লোভী ব্যবসায়ী ও স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের তৈরি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও কার পার্কিংয়ের বেনিয়ম বিস্তার নদীর আদিম সৌন্দর্যকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে৷
যে গাছগুলি একসময় পাহাড়ের মাটিআঁকড়ে ধরে রেখে নদীর প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করত, সেগুলি হারিয়ে যাওয়ায় ভূমিধস বাড়ছে৷ চরম অসচেতনতায় সমতলের পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক সহ নানা আবর্জনা ও বর্জ্য, নদীপাড়ের হোটেল, রেস্তোরাঁ গুলির দূষিত অবশেষের বোঝা সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীর নির্মল গর্ভে৷ মনে হয়, যে নদী যুগ যুগ ধরে মানুষকে অমৃতধারায় বাঁচিয়ে রেখেছে, সেই নদীকেই মানুষ আজ নিজের অনিয়ন্ত্রিত লোভের বশে ক্লান্ত ও কলুষিত করে তুলছে?
তবে বিপাশা সবসময় নীরব ও সহনশীল থাকে না৷ কখনও কখনও তার উন্মত্ত স্রোতে সে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে নিজের আদিম শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়৷ তখন মানুষের তৈরি জাগতিক অহংকার, নদীর পথ আটকে রাখা অবৈধ নির্মাণ ও প্রকৃতির নিয়ম অমান্য করা সমস্ত আধুনিকতা তার সামনে খড়কুটোর মতো অসহায় হয়ে পড়ে৷ মনে হয়, এই ভয়াবহ ধবংসের চপেটাঘাত দিয়েই নদী ও প্রকৃতি তার নিজের হারিয়ে যাওয়া ভারসাম্য পুনরায় ফিরিয়ে নিতে চায়৷
তবু সব আশা শেষ হয়ে যায়নি৷ কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে যখন দেখি কিছু আদর্শবাদী তরুণ-তরুণী নদীর তীর পরিষ্কার করার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছে, যখন দেখি কোনো নবীন হৃদয় বিপাশাকে পর্যটনের বাণিজ্যিক জায়গা না ভেবে, বরং এক জীবন্ত সত্তা হিসেবে ভালোবাসতে শিখছে, তখন মনে হয় মানুষের হৃদয়ের আলো ও মানবিকতা আজও নিভে যায়নি৷ প্রকৃতি প্রেম এখনও বেঁচে আছে৷
কোনো সন্ধ্যায় নদীপাড় থেকে পাহাড়ি পথ ধরে ঘরে ফিরে আসার সময় দেখি চাঁদের আলোয় বিপাশার রুপোলি রেখা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে৷ তখন মনে হয়, নদীকে আমরা দেখতে যাই, অথচ সত্যি বলতে নদীই আমাদের ভেতরটা দেখে নেয়৷ সে আমাদের সভ্যতা, আমাদের লোভ, আমাদের ভালোবাসা ও সমস্ত স্মৃতির নীরব সাক্ষী হয়ে বয়ে চলে৷
বিপাশা এক প্রাচীন স্মৃতি, এক প্রবহমান ইতিহাস, এক পরম সাধিকা৷ তার স্রোতের মধ্যে আছে মুক্তির ডাক, তার পাথরের মধ্যে আছে বহু যুগের ধ্যান, আর তার ঢেউয়ের মধ্যে আছে মানুষের জীবনগাথা৷
ঘরে ফিরে আসার পরও মনে হয়, বিপাশার কাছ থেকে পুরোপুরি ফিরে আসা যায় না৷ সে মনের মণিকোঠায় বারবার ডেকে বলে যায় আবার আসতে৷ এই নদীর সঙ্গে সম্পর্ক শুধু চোখের দেখার নয়, হৃদয়ের অতল বন্ধনে বাঁধা পড়ে৷ আর যে নদী মানুষকে মুক্তির আসল অর্থ শেখায়, তাকে কখনও সত্যিই হারিয়ে ফেলা যায় না৷
তবু এক গভীর প্রশ্ণ মনের ভেতর চাবুক মারে৷ উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বিকাশও সত্য৷ কিন্তু সেই ছদ্মবেশী উন্নয়নের বিনিময়ে যদি চিরতরে হারিয়ে যায় নদীর প্রাচীন আত্মা, পাহাড়ের আদিম রূপ আর প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে চলা মানুষের চিরায়ত জীবনধারা, তবে সেই আত্মঘাতী উন্নয়নের আসল মূল্য কতখানি?
বিপাশা কি আজ সভ্যতার এই ক্রান্তিলগ্ণে দাঁড়িয়ে আমাদের বিবেককে প্রতিনিয়ত সেই প্রশ্ণই করে চলেছে?
- Log in to post comments