আনন্দমার্গের প্রবক্তা ও প্রবর্তক শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী (শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার) কেবল একজন পরম শ্রদ্ধেয় ধর্মগুরুই নন, তিনি একজন মহান দার্শনিক, প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ, সুসাহিত্যিক, অভিজ্ঞ ভাষাতাত্ত্বিক, বিশিষ্ট ইতিহাসবেত্তা ও নব্যমানবতাবাদের মহান উদগাতা৷ সেই সঙ্গে একজন বিশ্ববন্দিত কালজয়ী সঙ্গীতগুরুও৷
তাঁর প্রজ্ঞাপ্রোজ্জ্বল চেতনায়, উৎসর্জনের মমতামধুর স্পর্শে সাহিত্য ও ললিত কলার বহু দিশাই সমুজ্জ্বল৷ দার্শনিক যৌক্তিকতায়, মননের ভাস্বরতায়, ভাবৈশ্বর্যের গরিমায় তাঁর অভিব্যক্তি মাত্রই ছিল অনন্যসাধারণ৷ তা সে লেখার রেখাই হোক বা তাঁর মুখনিঃসৃত অমৃতবাণীই হোক৷ প্রভাত-সঙ্গীত তাঁর বিচিত্র ও বিপুল রচনাসম্ভারের একটা বিশেষ ধারার নন্দনকুপ্ত অভিব্যক্তি৷
বিহারের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যমণ্ডিত দেওঘরে এক স্নিগ্দ সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গীত- রচনার সূত্রপাত৷ দিনটি ছিল ১৯৮২ সালের ১৪ই সেপ্ঢেম্বর৷ তাঁর সেই রচনাধারা অব্যাহত ছিল ১৯৯০ সালের ২০শে অক্টোবর পর্যন্ত৷ তিনি ছিলেন এক মহান কর্মযোগী৷ অবিরাম কর্মব্যস্ততার মধ্যে থেকেও আট বছর এক মাস সাত দিনে রচনা করে গেছেন ৫০১৮টি প্রভাত-সঙ্গীত৷ রচনা করেছেন বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দী, ঊর্দু, ইংরেজী, অঙ্গিকা ও মৈথিলী ভাষায়৷ এই সঙ্গীতসম্ভারই আজ প্রভাত-সঙ্গীত নামে সারা বিশ্বে সমাদৃত৷
প্রভাত-সঙ্গীত মানে কিন্তু প্রভাতকালিক সঙ্গীত নয়৷ তবে কি শ্রী প্রভাতরঞ্জনের রচিত বলেই তা প্রভাত-সঙ্গীত ?না, তাও সম্পূর্ণ সত্য নয়৷ সেই সঙ্গীতসম্ভারের নামকরণ প্রভাত-সঙ্গীত হওয়ার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে রচনারাজির সুগভীর রসমাধুর্যেভাবালোকের্ দীপ্তিতে৷
নীরন্ধ্র অন্ধকারের মসীকৃষ্ণ যবনিকা চিরে প্রভাতের সূচনা হয়৷ অরুণের শুভ্র স্মিতালোকে স্পন্দন জাগে জীবজগতের প্রাণকোরকে৷ প্রভাত তাই প্রাণবন্ত, প্রভাত তাই আনন্দোচ্ছল৷ প্রভাত আলোকের প্রতিভূপ্রভাত আশায় প্রদীপ্ত৷ প্রভাতের প্রতিটি মুহূর্ত তাই সবার কাছে প্রিয়৷
একথা সকলেই স্বীকার করবেন যে আজকের সাংস্কৃতিক জগৎ যেন বেশ কিছুটা কুহেলিকাচ্ছন্ন৷ নন্দন জগতের পরতে পরতে আজ অবক্ষয়ের সুস্পষ্ট জলছবি৷ এই ক্ষয়িষ্ণু অসুস্থ সংস্কৃতির জগতে সুস্থ সংস্কৃতির বৈপ্লবিক চেতনার সুপ্রভাতের সুষ্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রভাত সঙ্গীতের শুভ আবির্ভাব৷ প্রভাত-সঙ্গীত জাগরণের মন্ত্রসঙ্গীত, জ্যোতির্র্লেকের অভিসার-গীতি, পৃথিবী নামক গ্রহের গৃহাঙ্গনে পাঞ্চজন্যের উদাত্ত নির্র্ঘেষ৷ ‘‘বন্ধু হে নিয়ে চলো/আলোর ওই ঝরণা ধারার পানে’’জগদ্বন্ধুর প্রতি এই ঐকান্তিক প্রার্থনা জানিয়ে প্রভাত-সঙ্গীতের শুভ সূচনা৷
ভাব-ভাষা-সুর-ছন্দ এই চারটি মৌলিক উপাদানেই সঙ্গীতের পূর্ণ অবয়ব, এর প্রমাগত সামরস্যেই সঙ্গীতের প্রাণমূর্তি৷ ভাবগত বিচারে প্রভাত-সঙ্গীতের প্রতিটি সঙ্গীতই কালজয়ীসর্বজনীন৷ মানব মনের সহজ সরল সাদামাটা ভাব যেমন প্রভাত-সঙ্গীতে সাবলীল ভাবে অভিব্যক্ত ভাবসমুদ্রের অতল তলে শায়িত শুক্তি থেকে মুক্তোও তুলে এনেছেন দক্ষ গীতিকার৷ বিরহ-মিলন, জন্ম-মৃত্যু, রাগ-অনুরাগ, অভাব-অভিযোগ, প্রীতি-শুভৈষণা সবই রয়েছে প্রভাত-সঙ্গীতে৷ রয়েছে রহস্য-রোমান্স, স্বপ্ণ-সুষুপ্তি, ভক্তি-মুক্তি৷ তবে এক বিশেষ মৌলিক ভাবধারায় প্রভাতসঙ্গীত স্বতন্ত্র ও অনন্য৷ আর তা হ’ল, ভূমা মনের সঙ্গে অণু মনের এক চির-শাশ্বত প্রেমঘন নিবিড় বন্ধন৷ প্রভাত-সঙ্গীতের ভাবভূমি বিন্দু-সিন্ধুর মিলনক্ষেত্র৷
- Log in to post comments