তোমরা যারা ব্যাকরণ ভাল জানো তারা নিশ্চয়ই জানো, যে সমাসে অনেক ভাবের খোরাক রয়েছে তাকে বলে বহুব্রীহি সমাস অর্থাৎ বহুপ্রকারের খাদ্য তাতে মজুদ রয়েছে৷ বহুব্রীহি সমাসের ব্যাসবাক্যে থাকে ‘যাহার’ বা ‘যাহাতে’, সংস্কৃতে ‘যস্য’ বা ‘যস্মিন’৷ আর্যরা দেশটাকে ভালবেসে ফেললেন৷ তোমরা কোন দেশকে ভাসবাস কখন যদি দেখ সেখানকার পরিবেশটা ভাল, আবহাওয়া ভাল, নৈসর্গিক দৃশ্য ভাল, তার সঙ্গে খ্যাটনের ব্যবস্থাটাও ভাল–তাই নয় কি! ঐতিহাসিকেরা বলেন, প্রাচীন রাঢ়ের রাজধানী আস্তিকনগরের নাম বর্দ্ধমান মহাবীরের নাম থেকে রাখা হয়েছিল বর্দ্ধমান কিন্তু খ্যাটনদাস খাসনবীশ বলেন–বর্দ্ধমানে খ্যাটনের ব্যবস্থাটা ছিল ক্রমবর্দ্ধমান, তাই তার নাম বর্দ্ধমান৷ এ নিয়ে তোমরা ধীরে সুস্থে গবেষণা করে দেখতে পার! আমার তাতে কোন আপত্তি নেই৷ এই পারস্য বা ইরাণে তাঁরা ওই তত্ত্বগুলির অনেকগুলিই পেয়ে গেলেন৷ তাই আর্যরা দেশটির নাম দিলেন আর্ষণ্যব্রজ৷ ‘ব্রজ’ ধাতুর অর্থ আনন্দে ঘোরা–ফেরা করা৷এ প্রসঙ্গে ‘ব্রজভূমি’, ‘ব্রজপরিক্রমা’ শব্দগুলি তুলনীয়৷ এইখানেই তাঁরা গমের সংস্পর্শে এলেন৷
তোমরা অনেকেই হয়তো জান, জিবের একটি নাম ‘গো’৷ ‘ধূমধাম’ শব্দের সঙ্গে তোমরা পরিচিত আছ নিশ্চয়ই৷ কোন উৎসব জাঁকজমকের (pomp and grandeur) সঙ্গে করা হলে উত্তর ভারতে বলে ঃ ‘‘বড়ে ধূমধাম সে উৎসব মনায়ে গায়ে’’ ঃ বাংলায় বলি–‘‘খুব ধূমধামের সঙ্গে জমিদারবাবু নাতির বিয়ে দিলেন’’৷
এই গম খাবার সুযোগ প্রথম যখন আর্যরা পেলেন তাঁদের জিবে শুরু হয়ে গেল মহা আনন্দ...মহাধূম৷ তাই তাঁরা গমের নাম দিলেন (গোধুম’৷ তামিল ‘গোধুমাই’ শব্দটি এই ‘গোধুম’ থেকেই এসেছে৷ পাঞ্জাবীতে এর সোণালী রঙের জন্যে কর্ষকরা বলে থাকেন ‘কনক’...উর্দু–ফার্সীতে যে ‘গোন্দুম’ শব্দ সেও এসেছে ‘গোধুম’ শব্দ থেকে৷ একে মাগধী প্রাকৃতে বলা হয় ‘গোহুম’, শৌরসেনী প্রাকৃতে ‘গেহুম’....যার থেকে হিন্দীতে ‘গেহু’৷ মাগধী প্রাকৃত থেকে প্রাচীন বাংলায় ‘গহম’....বর্তমান রাঢ়ী বাংলায় ‘গহম’–ই বলা হয়৷ এই‘গহম’–এর দ্রুত উচ্চারিত সংক্ষিপ্ত অভিপ্রকাশ হ’ল ‘গম’৷
এখানেই কি গমের ইতিকথার পূর্ণচ্ছেদ –না, তা নয়৷ আরো আছে, শোণো৷ গমকে যখন তাঁরা পাথরে চূর্ণ করে (যন্ত্রক বা যাঁতা গোড়ার দিকে তো ছিল না৷ পাথরে ভেঙ্গে গমকে চূর্ণ করতে হত৷ চাকি–বেলুনও ছিল না) হাতে চাপড়ে চাপড়ে চাপাটি বা ‘চপটিকা’ (হিন্দীতে ‘চাপাটি’) তৈরী করতেন৷ তখন এই চাপাটিকে আগুনে সেঁকবার সময় চাপাটির ভেতর থেকে গন্ধ বেরিয়ে আসত৷ তাতে তাঁরা খুব বেশী আকৃষ্ট হতেন–ফুলের গন্ধে যেমন আকৃষ্ট হও তোমরা, মধুর গন্ধে যেমন আকৃষ্ট হয় মউ মাছি৷ সুতরাং সেকালের আর্যরা তৈরী রুটির আশায় উনুনকে ঘিরে বসে থাকতেন৷ আর যখন ওই রুটি বা চাপাটি সেঁকবার সুগন্ধ ভেসে আসত তাঁরা আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠতেন....তাঁদের মন তখন আশায় হেলে দুলে উঠত...হিন্দোলিত হ’ত–এইবার বুঝি আর্যকন্যা (সেকালের স্বামীরা স্ত্রীকে আর্যকন্যা ও স্ত্রীরা স্বামীকে আর্যপুত্র বলে সম্বোধন করতেন) তাঁদের পাতে খর্জূর সহ চাপাটি দিয়ে আপ্যায়ন করবেন (‘খর্জুর’ বানান দীর্ঘ ‘উ’–কার দিয়ে লিখবে, হ্রস্ব–‘উ’ কার দিয়ে ‘খর্জুর লিখলে তার মানে হচ্ছে রূপো৷ তোমরা খর্জূর খাও, খর্জুর খাও না৷) যে বস্তুর গন্ধে সেকালে আর্যদের দেহ–মন আনন্দে হেলে দুলে উঠত সেই বস্তুটির অর্থাৎ গম বা গোধুমের জন্যে তাঁরা আরেকটি নাম রাখলেন ‘গন্ধবিহ্বল’৷