বাংলা ভাষার আন্দোলন মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে৷ একটা দেশ ভাগ হলো ধর্মমতের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক হানাহানি করে৷ নবগঠিত রাষ্ট্রের জন্মলগ্ণেই একই ধর্মমতে বিশ্বাসী একই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত শুরু হলো মাতৃভাষার অধিকার দাবী করে৷ ভারতবর্ষকে খণ্ডিত করে পাকিস্তান গঠিত হলেও দুইপ্রান্তের জনগোষ্ঠীর ভাষাগত ভিন্নতাই নতুন করে সংঘাতের কারণ হলো৷ পাকিস্তানের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী পূর্বপ্রান্তের বাঙালী জনগোষ্ঠী৷ কিন্তু শাসন ক্ষমতায় পশ্চিমপ্রান্তের উর্দুভাষীরা থাকায় তারা উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করে৷ এই সিদ্ধান্ত মানতে পারলো না পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী জনগোষ্ঠী৷ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে সদ্যগঠিত রাষ্ট্রে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন৷ কিন্তু পশ্চিমি উর্দুসাম্রাজ্যবাদ সেই দাবীকে উপেক্ষা করে জোরপূর্বক বাংলাভাষাকে অবদমন করতে যায়৷ তারই প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল বার করে রাজপথে৷ সেই মিছিলে বর্বরোচিতভাবে গুলি চালায় পশ্চিম পাকিস্তানি উর্দুসাম্রাজ্যবাদী সেনা৷ পাঁচজন ছাত্র নিহত হয়৷ পশ্চিম পাকিস্তানি উর্দু সেনা সেদিন দেখিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ চলে গেলেও ভারতীয় উপমহাদেশে রেখে গেছে তার যোগ্য উত্তরসূরী শাসক৷
তবে তাতেও দমানো যায়নে পূর্বপাকিস্তানের বাঙালীর মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলন৷ আরও অনেক প্রাণের বিনিময়ে সেই আন্দোলন সফল হয় স্বাধীন বাংলাদেশ ঘটন করে৷ বিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথম মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনই স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিল৷
বাদ যায়নি এপার বাঙলাও৷ স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতে উন্নত বাংলা ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ধবংস করে বাঙালী জনগোষ্ঠীকে অবদমিত করে রাখার চক্রান্ত চলছে৷ যার শুরু বিহারের অন্তর্গত বাঙলার অঞ্চল মানভূম জেলায়৷ বিহার সরকারের অকথ্য অত্যাচারেও মানভূমের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করার দাবীতে আন্দোলন দমানো যায়নি৷ অবশেষে মানভূম জেলার পুরুলিয়া মহকুমা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়৷
স্বাধীন ভারতে সব থেকে বেশী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় অসমের বরাকভ্যালির বাঙালীদের৷ স্বাধীনতার পরমুহূর্ত্ত থেকেই মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদৌলির নেতৃত্বে অসমে বাঙালী খেদাও আন্দোলন শুরু হয়৷ অসমের প্রকৃত ভৌগোলিক সীমা খুবই ছোট ছিল৷ তার বাৎসরিক রাজস্ব কলিকাতা পৌরসভার রাজস্বের থেকেও কম ছিল৷ তাই অসমের আর্থিক বুনিয়াদ মজবুত করার অজুহাতে বাঙলার গোয়ালপাড়া সহ বৃহৎ অংশ অসমের সঙ্গে যুক্ত করে৷ অজুহাত এই কারণে---ব্রিটিশ সরকার এক ঢিলে অনেক পাখি মেরে ছিল৷ ভারতে ব্রিটিশ শাসকের সব থেকে বড় আপদ ছিল বাঙালী৷ তাই বাঙালী বিনাশের পরিকল্পনা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের৷ তাছাড়া বাঙালীর উদার অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক মানসিকতা ছিল দেশীয় পুঁজিপতিদের আতঙ্ক৷ তাই বাঙালী বিনাশের পরিকল্পনা ছিল দেশীয় পুঁজিপতি ও তাদের অর্থে পুষ্ট রাজনৈতিক দলগুলিরও৷ তাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় পুঁজিপতিদের চক্রান্তেই প্রত্যক্ষভাবে বাঙলা ভাগে ব্যর্থ হয়ে বাঙলার সম্পদশালী বেশ কিছু অঞ্চল অসম ওড়িষ্যা ও সাবেক বিহার বর্তমান ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়৷ তবু ব্রিটিশ ভারতে ওইসব অঞ্চলের ভূমিপুত্র বাঙালীরা মাতৃভাষায় লেখাপড়া কাজকর্ম সবই করতো৷ ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে ওই সব অঞ্চলের বাঙালীর মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়া হয়৷ তারই প্রতিবাদে বিহারে শুরু হয় মানভূমের বঙ্গভূক্তির আন্দোলন৷ অসমের বরাকভ্যালির বাঙালীও মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন শরু করে৷ উভয় আন্দোলন দমন করতে অমানবিক নৃশংস অত্যাচার করে ব্রিটিশ শাসকের যোগ্য উত্তরসূরি স্বদেশী হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ শাসক৷ মানভূমের বঙ্গভূক্তির আন্দোলন আংশিক পূর্ণতা পায় পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করে৷ কিন্তু শিলচরে ভাষা আন্দোলন দমন করতে অসম সরকার ১৯৬১ সালের ১৯শে মে নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে ১১ জন বাঙালীকে হত্যা করে৷ ২১শে ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলন পূর্ণতা পায় স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে৷ কিন্তু ১৯শে মের ভাষা আন্দোলনের শহীদরা আজও উপেক্ষিত অস্বীকৃত৷ কারণ কিছু নয়, দুই পারের মৌলবাদী শাসকের আতঙ্ক ভাষা আন্দোলন৷ কারণ এই ভাষা আন্দোলনই সাম্প্রদায়িক মৌলবাদকে ধূলুন্ঠিত করে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় স্বাধীন রাষ্ট্র ঘটন করে নিয়েছে৷ খণ্ডিত ভারতের স্বাধীনতার মাত্র পাঁচ বছরেই প্রমাণ হয় বাঙালী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক নয়, পশ্চিমী উর্দু ও হিন্দি মৌলবাদী সাম্প্রদায়ীকতার শিকার বাঙালী৷ তাই ২১শের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পরিণতির আতঙ্ক তাড়া করছে ১৯শে মের মৌলবাদী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে৷ তাই ১৯শে মে আজও উপেক্ষিত!
- Log in to post comments