৷ ৪৷
সমাজের, সভ্যতার অগ্রগতি তথা ব্যষ্টি --- সমষ্টির সার্বিক কল্যাণ করতে গেলে একটা সর্বানুস্যূত দিকনির্দেশনা তথা আদর্শ বা দর্শন থাকা দরকার একথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে৷ তবে এই দিক নির্দেশনার এ্যাপ্রোচ্ বা দৃষ্টিভঙ্গীটা খুবই গুরুত্ব পূর্ণ ৷ এজন্যে মনে রাখা উচিত মানুষ তো ত্রয়ীসত্তা (শরীর, মন ও আত্মা) বিশিষ্ট জীব৷ তাই প্রতিটি মানুষেরই ----
জাগতিক,মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রকৃতিদত্ত সর্বজনীন অধিকার আছে৷ তবে এই অধিকার দিতে গেলে সমাজের বা রাষ্ট্রের বা হিতৈষী ব্যষ্টি বা সস্থার ভাবনা ও কার্যক্রমে উদার-উদাত্ত,আলোকিত,প্রসারিত বিচারশীল দৃষ্টিভঙ্গী থাকা দরকার৷ মানুষের প্রকৃতি বা সত্তাগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এই দৃষ্টিভঙ্গীও হওয়া উচিত তিনধরণের --- ১.সোসিও- ইকো এ্যাপ্রোচ (সামাজিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী),২.সাইকো - ইন্টেলে ক্চ্যুয়্যাল্ এ্যাপ্রোচ্ (মানসিক বৌদ্ধিক দৃষ্টিভঙ্গী) ও ৩.স্পিরিচো- ইন্টেলেক্চ্যুয়্যাল্ এ্যাপ্রোচ্ (আধ্যাত্মিক বৌদ্ধিক দৃষ্টিভঙ্গী)৷ সামাজিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী মাটির পৃথিবীতে কল্পতরু হয়ে ওঠে সামাজিক অর্থনৈতিকতত্বের মাধ্যমে৷ এই তত্ত্ব অস্তিত্ব রক্ষা ও প্রগতির মধ্যে একটা সুষ্ঠ সমন্বয় করবে৷ এ বিষয়ে পূর্বেই আলোকপাত করা হয়েছে৷
সাইকো-ইন্টেলেক্চ্যুয়্যাল্ এ্যাপ্রোচ জগতে মানসিক -বৌদ্ধিক দৃষ্টিভঙ্গীর অভাব হলে সমাজটাই গড়ে ঊঠতে পারে না৷ অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে চলার প্রেরণা -তাগিদও আসেনা৷প্রতিভাসিক জগতের প্রতিটি সত্তাই পরমপুরুষেরই অভিপ্রকাশ৷ জগতের সমস্ত জীবই সেই এক পরমপিতার সন্তান৷ আমাদের হরপিতা,গৌরীমাতা, সমগ্র ত্রিভুবনই আমাদের স্বদেশ৷ আমরা সবাই সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ৷ কাজেই কেবলমাত্র মানুষের কল্যাণ নয়, মানুষ, মনুষ্যেতর প্রাণী, উদ্ভিদজগৎ সবার কল্যাণ চাই৷ সকল মানুষের প্রতি ভালবাসা,কল্যাণ ভাবনার নাম মানবতাবাদ ৷ বিবর্তনের ধারায় আধুনিক মননে এই মানবতাবাদ মানুষের গণ্ডী পেরিয়ে মনুষ্যভাবে সকল প্রাণীন সত্তায় প্রসারিত৷ মানবতাবাদের এই যে প্রসার এরই নাম হল ‘নব্যমানবতাবাদ’৷ মানুষ তার পরিবেশ, পরিবেশের ক্ষুদ্র, ছোট, বড় সদস্যদের বাদ দিয়ে একা বাঁচতে পারে না, মানুষের কল্যাণ-প্রগতি সবার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে৷ এই ভ্রাতৃত্ববোধ, অন্যোন্য ময়তাকে বাদ দিয়ে মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক তত্ত্ব ফলপ্রসু হওয়া কীভাবে সম্ভব?
স্পিরিচো-ইন্টেলেক্চ্যূয়্যাল এ্যাপ্রোচ্ এই দৃষ্টিভঙ্গী মানুষের অন্তর্র্লেকে পূর্ণতার ভাবাবেশ পুঞ্জীভূত করে৷ পূর্ব গগনে সূর্যোদয়ে বিকচোন্মুখ কমল যেমন করে হয়ে ওঠে শতদল, তেমনি আধ্যাত্মিকতা-পরশমণির ছোঁয়ায় মানুষ উন্নীত হয় দেবত্বে, সমাহিত হয় অনন্ত সুধাসায়রে৷ এই সুধারসের সন্ধান দেয় আধ্যাত্মিক ভাবাদর্শ৷ বলাবাহুল্য, এই ভাবাদর্শের কর্ষক হচ্ছে আধ্যাত্মিক সাধনা বা স্পিরিচ্যূয়্যাল্ কাল্ট ৷ সমাজ জীবনে তথা ব্যষ্টি ও সমষ্টির জীবনে সার্বিককল্যাণ ও প্রগতির দিশাঞ্জন শলাকার নাম হচ্ছে আধ্যাত্মিক ভাবাদর্শ৷ এ বিষয়ে অজ্ঞতার জন্যে মানুষ আপন স্বরূপ ও তার যাত্রা পথের অন্তিম লক্ষ্য বিষয়ে সম্যক দৃষ্টি থেকে দূরে, অন্ধকারেই থেকে যায়৷ পরিনামে অপব্যয় হয় প্রাণশক্তির, উল্টে সভ্যতার ধবংসকেই আবাহন করে৷
কার্যতঃ, আধ্যাত্মিক ভাবাদর্শের ফলিত রূপই হচ্ছে সাধনা৷ আর এই সাধনার যোগ্য আধারই হচ্ছে মানব দেহ৷ মানুষ মাত্রেরই রয়েছে একটি বিশেষ শারীরিক সরচনা৷ এই শরীর সংরচনাটি আসলে একটি জৈব- বৈজ্ঞানিক যন্ত্র, একটি জৈব-মানসিক গবেষণাগার ( মেণ্টাল্ রিসার্চ ল্যাবরেটরি)৷ এই গবেষণাগারে একটা মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ছোট আমিকে বড় আমিতে, বা অণুচৈতন্যকে ভূমাচৈতন্যে বা পাঞ্চভৌতিক তত্ত্বকে চিত্তধাতুতে ও সেই চিত্তধাতুকে চৈতন্যে রূপান্তরিত করা এবং সেই চৈতন্যে ভূমা চৈতন্যে সমাহিত করা৷ অর্থাৎ সাধনা হচ্ছে সেই ক্রিয়া যার দ্বারা আত্মা পরমাত্মায় একীভূত হয়৷ এই যে মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এরই নাম আধ্যাত্মিক সাধনা --- স্পিরিচ্যূয়্যাল্ কাল্ট৷ সাধনার ক্রিয়াত্মিকা শক্তি হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘ বৈজ্ঞানিক মহামতি নিউটনের ‘ তৃতীয় সূত্র ‘ভারতীয় ঋষিদের ভাষায়---‘যাদৃশী ভাবনা যস্য, সিদ্ধির্ভবতি তস্য৷ ‘বলাবাহুল্য,মানুষের উল্লম্ব মেরুদণ্ড, বৈশিষ্ট্য ব্যঞ্জিত শরীর সংরচনাই প্রমাণ করে মানুষের শরীর তথা মানুষের জীবন সাধনার জন্যে, মানুষের জীবনে সাধনা অপরিহার্য৷ এইরকম দেহাধার জগতে আর কোনো প্রাণীর নেই৷ তাই তারা সাধনা করারও উপযুক্ত নয়৷
সাধনা হ’ল মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি৷ সাধনা করে মানুষের মন৷ যে জীব-প্রজাতি মানুষের মন পেয়েছে সেই জীবপ্রজাতিই আধ্যাত্মিক সাধনার উপযুক্ত৷ কিন্তু মানুষ ছাড়া আর কেউ এ ধরণের মন পায়নি৷ কিন্তু ব্যাপারটা কী? আসলে মানুষের মধ্যেই মনের পূর্ণ রূপ অভিব্যক্ত৷ মন হচ্ছে চিত্ত,অহং ও মহৎ ভাবের সামবায়িক অনন্যময় সস্থিতি৷ নিম্নস্তরের প্রাণী চিত্ত প্রধান, অন্য দুই গুণ নেই৷ কিছু প্রাণীর মধ্যে চিত্ত ছাড়াও অহং গুণ বর্তমান৷ এপম্যান, হোমোসেপিয়ান জাতীয় প্রজাতির মধ্যে মহৎ অস্ফুট,তাই তারা সাধনা পায়নি৷ মানুষের মধ্যেই চিত্ত-অহং-মহৎ---এই তিন ভাবের উপস্থিতি ৷ অর্থাৎ মানুষের মধ্যেই মনের পূর্ণপ্রকাশ, সাধনার উপযুক্ত হতে হলে মানুষের শরীর -মনের অধিকারী হতেই হবে৷ জাতি,ধর্ম,বর্ণ, নির্বিশেষে যে মানুষ জন্মেছে সেই সাধনার যোগ্য আধার৷ তার মানে দাঁড়াল মানুষের জীবনে সাধনা অপরিহার্য৷ (চলবে )
- Log in to post comments