পৌরাণিক যুগে দেবদেবীর মূর্ত্তি রাখা হত দুইভাবে৷ এক ঃ মূর্ত্তি বাড়ীর যে কোন শুচিশুদ্ধ স্থানে বা পূজার ঘরে রাখা চলত কিন্তু তাকে মন্ত্র পাঠ করে বা বিশেষ ব্যবস্থার দ্বারা শুদ্ধীকরণ বা প্রতিষ্ঠা করা হত না৷ তাকে অপ্রতিষ্ঠ বা অপ্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ ৰলা হত (Non-conscrated)৷ পবিত্রজল বা পবিত্র মন্ত্র শুদ্ধিকরণকে (consecration ৰলা হত, সংস্কৃতে ‘শুদ্ধীকরণ’ বা ‘প্রতিষ্ঠাকরণ৷ যেমন যে উপাসনার স্থানকে ইংরেজী বা লাতিন বা হিব্রু মন্ত্রে বা জর্ডনের জলেতে শুদ্ধীকরণ করা হয় সেই শুদ্ধীকৃত উপাসনা স্থানকে ৰলে ‘চার্চ’ কিন্তু যে স্থানে উপাসনা করা হয়, চার্চের মতই ব্যবহার করা হয় কিন্তু ইংরেজী বা লাতিন বা হিব্রু মন্ত্রে শুদ্ধীকরণ করা হয়নি অর্থাৎ তার (consecration হয়নি সেই ধরণের উপাসনার স্থানকে বলে ‘চ্যাপেল’৷ সংস্কৃতে তেমনি যে বিগ্রহকে শুদ্ধীকরণ করা হল না তাকে অপ্রতিষ্ঠ অথবা অপ্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ ৰলা হয়৷ কারো ঘরে হয়তো ৰুদ্ধের বা নারায়ণের একটি মূর্ত্তি সাজানো রয়েছে আলমারিতে বা ঠাকুরঘরে কিন্তু শুদ্ধীকরণ হয়নি, তা অপ্রতিষ্ঠিত বা অপ্রতিষ্ঠ বিগ্রহ৷ আবার কোন বিগ্রহকে সংস্কৃত মন্ত্রের দ্বারা, হয়তো গঙ্গাজলের অভাবে গোদাবলীর জলের দ্বারা অথবা কূপের জলকে মন্ত্রের দ্বারা গঙ্গার জলের মর্যাদা দিয়ে শুদ্ধীকরণ করা হল তাকে ৰলৰ পতিষ্ঠিত বা প্রতিষ্ঠ বিগ্রহ৷ এই বিগ্রহের জন্যে পূজার্চনা, নৈবেদ্য, ভোগ রাগাদির ব্যবস্থা, বৈশাখে বৈকালিকের ব্যবস্থা, মহোৎসবের ব্যবস্থা (মোচ্ছব), দোল-রাসের ব্যবস্থা যদি রাখা হয় তবে তা হল প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ৷ এককালে দেশ যখন কুসংস্কারে জরাজীর্ণ ছিল তখন কেবল ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-বৈদ্যরাই মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন, বাকীরা পারতেন না৷ তাঁদের কোন ব্রাহ্মণ, কায়স্থ বা বৈদ্যের নামে প্রতিষ্ঠা করতে হত যদিও টাকার যোগান দিতেন অব্রাহ্মণ, অকায়স্থ ও অবৈদ্য ভক্ত মানুষেরা৷ কারো কারো হয়তো আজও ক্ষীণ স্মৃতি আছে যে নূতন বাংলার অন্যতম রূপকারিণী রাণী রাসমণির একবার ইচ্ছে হয়েছিল গঙ্গার পশ্চিম তীরে একটা মন্দির প্রতিষ্ঠা করবেন কারণ বাগড়ি বা গঙ্গার পূর্ব তীরের চেয়ে রাঢ় বা গঙ্গার পশ্চিম তীর সুপ্রাচীন কাল থেকে পবিত্রতর স্থান বলে গণ্য হয়ে আসছে৷ সেকালকার মানুষেরা গঙ্গাস্নানে এসে বাগড়ীর দিকে (কলকাতার দিকে) গঙ্গা স্নান না করে অন্য তীরে গিয়ে গঙ্গাস্নান করত কারণ রাঢ় প্রাচীনকাল থেকে ধর্ম ও সভ্যতার পুণ্যভূমি ৰলে গণ্য হত৷ ত্রিবেণী (গঙ্গার তিনটি বেণী) রাঢ়ের ত্রিবেণীতেও রয়েছে, বাগড়ির কল্যাণীর (চাঁদমারী) কাছেও রয়েছে৷ কিন্তু গঙ্গাস্নানটা লোকেরা কলকাতাতে না করে গঙ্গার পশ্চিম তীরেই করত৷ বিহারেও তেমনি গঙ্গার দক্ষিণ তীরে মগধের দিকে গিয়ে গঙ্গাস্নান করত না...... করত গঙ্গার উত্তরদিকে অর্থাৎ মিথিলার দিকে৷
তা সে যাই হোক, রাসমণির ইচ্ছা হল গঙ্গার পশ্চিম তীরে হুগলী জেলাতে মন্দির প্রতিষ্ঠা করবেন৷ কিন্তু গঙ্গার ওপারে তাঁর কোন জমিদারী ছিল না৷ ওপারে প্রধান জমিদার ছিলেন বংশবাটী ও শেওড়াফুলির কায়স্থ রাজারা, শ্রীরামপুরের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণরা ও ওতোপাড়ার রাঢ়ী ব্রাহ্মণরা৷ ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ কোন জমিদারই তাঁকে গঙ্গার ওপারে জমি দিলেন না কারণ তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠার অধিকার নেই৷ তখন তাঁকে বাধ্য হয়েই গঙ্গার পূর্বতীরে মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে হল---কুলদেবতা ভৈরব দক্ষিণেশ্বর ও ভৈরবী ভবতারিণী৷ পরে যখন বিবেকানন্দ একটি মঠ করতে চাইলেন তিনিও চাইলেন গঙ্গার পশ্চিম তীরেই, জমিদাররা তাঁকে জমি দিলেন৷ বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠিত হল৷ এসব কথা বলতে বা ভাবতে গেলেও মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে, তবু ইতিহাসের জিনিস লেখাপড়াতেই থাকুক৷
(শব্দ চয়নিকা, পঞ্চবিংশ খণ্ড, প্রবচন-২১৮)