গণহনন’ শব্দটির অর্থ হ’ল এক সঙ্গে অনেক মানুষকে হত্যা করা (mass murder or massacre) ৷ যদি একসঙ্গে অনেক অপরাধীকে হত্যা করা হয় তাকেও ‘গণহনন’ বলা হয়৷ কারণ বিশুষ্ক সৈদ্ধান্তিক বিচারে কে অপরাধী, কে নিরপরাধ তা যাচাই করে’ দেখা এক দুরূহ ব্যাপার৷ অনেক সময় কাগজে–কলমে দলিল–দস্তাবেজে ভুল তথ্য থেকে যায় যার ফলে নিরীহ মানুষের ওপর নেবে আসে কঠোর দণ্ডব্যবস্থার খড়গাঘাত৷ অনেক সময় বিচারকের বিচারেও ভ্রান্তি–দোষ থাকতে পারে বা থাকেও, সেক্ষেত্রে নিরপরাধকে হত্যা করা হয়৷ অনেক সময় বিচারের নামে প্রহসন ঘটিয়ে নির্দোষকে বা অল্প দোষীকে হত্যা করা হয়৷ সেগুলো কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়৷ সক্রেটিসকে হত্যা করা সমর্থন করা যায় না, মহারাজ নন্দকুমারের প্রাণদণ্ডও সমর্থন করা যায় না৷ সিরাজ–উদ্–ওলার হত্যাও বিবেক ৰুদ্ধিসম্মত নয়, আবার তার ওপরে সবচেয়ে বড় কথা হ’ল প্রাণদণ্ড জিনিসটাই সমর্থনযোগ্য নয়৷ যে মানুষ অন্যকে হত্যা করেছে সে বিধাতার বিধানের বাইরে গেছে৷ শুধু মানুষকে নয়, নির্দোষ পশুকেও যে হত্যা করেছে সেও বিধাতার বিধানের বাইরে গেছে, ও তাই তার কার্য কোন ক্রমে সমর্থনযোগ্য নয়৷ আর বিচারের নাম করে’ যে অন্যকে হত্যা করছে তার কার্য অধিকতর নিন্দনীয়৷ তাই প্রাণদণ্ড সমর্থন করা যায় না৷ তবে পাপী বুক ফুলিয়ে রাজপথে ঘুরে বেড়াবে আর হত্যালীলা চালিয়ে যাবে এটাও সমর্থন করা যায় না৷ তাই হত্যাকারীদের মানবতাসম্মত এমন কোন বিধানের ভেতর আসতে হবে যাতে তার সেই জিঘাংসা স্থায়ীভাবেই প্রতিহত হয়...চিরতরে সংবারিত হয়৷
সাধারণতঃ দেখা যায়, যে শক্তিশালী, যে রণঞ্জয়ী সেই থাকে বিচারকের ভূমিকায়...... যেন সে গঙ্গাজলে ধোয়া তুলসী পাতা, আর যে পরাভূত সে যদি নিরীহ নিষ্পাপ মানুষও হয়, তাকে বলা হয় সমাজদ্রোহী৷ গত মহাযুদ্ধে মিত্রশক্তি (allied
forces (allied
forces অর্থাৎ আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া) জয়ী হয়েছিল....পরাভূত হয়েছিল অক্ষশক্তি (axis powers অর্থাৎ জার্মানী, ইতালিয়া, জাপান প্রভৃতি)৷ কে কতটা দোষী সে বিচার না করেও বাস্তব ক্ষেত্রে আমরা দেখেছিলুম রণঞ্জয়ী মিত্রশক্তি নেবেছিল বিচারকের ভূমিকায়৷ ইত্যালির সিনর বেনিতো মুসোলিনীকে অস্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল, জার্মানীর হের এ্যাডলফ হিটলারকে পেট্রোলে পুড়ে মরতে হয়েছিল, জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজোর প্রাণদণ্ড হয়েছিল৷ শোণা যায় যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সুভাষচন্দ্র বসুর খোঁজাখুঁজি চলছিল৷ যে আর্ন্তজাতিক আদালত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছিল তাদের অন্যতম ছিলেন বাঙলার বিচারক রাধাবিনোদ পাল৷ তিনি এই ভাবে যুদ্ধবাজ অপবাদ দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করেননি৷ যাই হোক, এক সঙ্গে অনেক মানুষকে যদি হত্যা করা হয়, তা যাকে হত্যা করা হচ্ছে সে যুদ্ধবাজ হোক বা না হোক, তথাকথিত অপরাধী হোক বা না হোক, যে কোন ধরনের লোককেই যদি হত্যা করা হয় আর তা যদি করা হয় এক সঙ্গে অনেককে, তবে তাকে বলা হবে ‘গণহনন’৷
এ্যাটম বোমের দ্বারা মিত্রশক্তি যে হিরোসিমা, নাগাসাকিতে সম্পূর্ণভাবে নিরীহ নির্দোষ লক্ষ লক্ষ বৃদ্ধ, শিশু, নারী, শান্তিপ্রিয় তরুণ–তরুণীকে গণহননের যূপকাষ্ঠে ফেলে দিয়েছিল, অগ্ণির দহনজ্বালায় বিষবাষ্পে ফুসফুসের স্পন্দনকে স্তব্ধ করে’ দিয়েছিল, অঙ্গ–প্রত্যঙ্গকে বিষপ্রবাহে বক্রিল করে’ বিকলাঙ্গ করে’ দিয়েছিল, সেটা কি মানবতাসম্মত কাজ হয়েছিল তবে তারা কোন্ অধিকারে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজোর বিচার করার স্পর্দ্ধা দেখিয়েছিল –– এই প্রশ্ণ বিদগ্ধ ও বিচারবাদী মানুষের মনে চিরকালই উঁকি–ঝুঁকি মারতে থাকবে৷ বড় বড় বুলির আড়ালে শান্তির শাদা পায়রা উড়িয়ে এই মসীলিপ্ত ইতিহাসকে কিছুতেই ঢ়াকা যাবে না৷
আমি একজন প্রধানমন্ত্রীকে জানতুম যিনি মানবতাবাদ ও অহিংসা তত্ত্বকে হুজুগের ঢ়েউয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন৷ এমন বেশ কিছু রাষ্ট্রনায়কের খবরও রাখি, ও আরও অনেকে রাখেন যাঁরা মুখে শান্তির বাণী আউড়ান.....হয়ত বা শাদা পায়রাও ওড়ান কিন্তু তলে তলে সমরাস্ত্রে শান দিয়ে চলেন.....হাতে ফুলের মালা, আস্তিনে লুকোনো ছুরি –– নীতি হ’ল preach the gospels of peace, but keep your powders dry. প্রচার করে’ যাও শান্তির ললিত বাণী কিন্তু কামানে ভরবার জন্যে বারুদ শুকনো রাখো৷ মানবতার দরদে এঁদের প্রাণ বিগলিত, ভাষণের উচ্ছ্বাসে এঁদের দু’চোখ বেয়ে নেবে আসে গঙ্গোত্তরীর জলধারা, কিন্তু উদরে গজগজ করে’ নিরীহ মুর্গীর কাতরোক্তিকে উপেক্ষা করে’, তাকে হত্যা করে’ মশল্লা সহযোগে পাক করা মুর্গ–মশল্লম্৷ তাদের মুখে শান্তির ললিত বাণী শোভা পায় না৷ তাঁরা শ্লোগান দিন ‘‘মুর্গমশল্লম্ কী জয়’’ .... ‘‘বকরে কে পসীন্দে কী জয়’’৷ ১লা মে ১৯৮৮, কলিকাতা
(শব্দচয়নিকা ষোড়শ পর্ব –– প্রবচন ১২৩)