চৈত্র মাসের শেষ৷ রাতের শহর বড় রুক্ষ৷ রাস্তায় বাতাস তার গরম আর ধুলোর আস্তরণ৷ মাটিরও যেন শ্বাসকষ্ট হচ্ছে৷ এই ‘বিসম্বাদ’ রাস্তার এক কোণে গোরাচাঁদ বাউল বসেছিল৷ লালন সাঁইয়ের ভাবের উত্তরাধিকারী বলেই তাকে চিনত তার গ্রামের লোক৷ এখানে, এই নগরে, সে এক অনাহূত৷
সম্বল বলতে একটি জীর্ণ একতারা, গর্ভ আর ঢাকনি তার বিবর্ণ৷ তার গায়ে কত ‘ পথের ধুলা আর মনের সুর’’ জমা৷ কাঁধে একটি রং-জ্বলা গামছা, যেন অকিঞ্চনতার উত্তরীয়৷ চোখে কোনো ভার ছিল না, ছিল এক নির্ভার শূন্যতা, এই বিশ্ব-সংসারকে সে ‘গুরুধামের লীলা’ হিসেবে দেখেছে৷ এই নগর-খাঁচায় এসেছিল কেবল ‘প্রাণের টানে’ এই নশ্বর দেহে শ্বাসটুকু ধরে রাখার জন্য৷ কিছু মাধুকরী আর ভাব বিলোনোর আশায়৷
এই ‘পাথরের জঙ্গল’ তো সহজ মানুষের ভিড় নয়৷ মেট্রো স্টেশনের গেটে অবিরাম মানুষ ঢুকছে আর বেরোচ্ছে৷ যেন এক ছায়াছবি৷ তাদের কেউকেউ গৌরহরিকে দেখছিল কেবল ‘কৌতূহলের চোখ’ দিয়ে, তারপর আবার নিজস্ব লক্ষ্যের দিকে ছুট৷ কারো বা হাতে কফির কাপ কিন্তু সুস্থে বসে খাওয়ার সময় নেই, বেশির ভাগের কানে ইয়ারফোন বিচ্ছিন্নতার যন্ত্র৷ গোরাচাঁদের কণ্ঠে তখন দেহতত্ত্বের নিগূঢ় সুরঃ ‘মানুষ ভজিলে সোনার মানুষ হবি রে৷’ এ সুরে ছিল অন্তরের আহ্বান, কিন্তু মানুষের কান ছিল বাইরের কোলাহলে মগ্ণ৷ আর গোরাচাঁদের সুরটা ছিল বাতাসে ক্ষীণ৷ বিভিন্ন গাড়ির সমবেত হর্নের ‘বধির করা চিৎকারে’ তা তলিয়ে যাচ্ছিল৷
পরের দিনের বিকেল৷ এক ‘উদাসীন আলো’ পার্কের গাছ গুলিতে, মাটিতে আর রেলিঙে এসে পড়ছে৷ এক টুকরো শুকনো পাউরুটি আর জল খেয়ে গোরাচাঁদ ‘শ্যাওলা-ধরা বেঞ্চে’ বসেছিল৷ পাশের গাছের ডালে পাখিরা ফিরছে যেন ‘আপন ডেরায় ফেরা মুক্ত জীবাত্মা’৷ গোরাচাঁদের মনে পড়ল তার গ্রাম৷ শরতে কাশবনের হাওয়া৷ গ্রীষ্মে নদীর ঘাটে ছেলেদের দাপাদাপি৷ বৎসর জুড়ে শিমুল-ছায়ায় বসে তার গান ছিল প্রকৃতিরই প্রতিধবনি৷ আর আজ, সেই ‘আবেগের সুর’ ও যেন শহরের বিষাক্ত ধোঁয়ায় মরচে ধরেছে৷
সেদিনের গভীর রাত৷ ফুটপাথের ধারে এক চায়ের দোকানে জ্বলছিল আগুন৷ গোরাচাঁদের দেখে লাগছিল ওটাই যেন ‘জীবনের শেষ আশ্রয়’৷ গোরাচাঁদ ‘নিঃশব্দ পায়ে’ দোকানে গিয়ে দাঁড়াল৷
দোকানদার জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, কিছু খাবে?’
সে মাথা নাড়ল৷ উত্তর ছিল তার বৈরাগ্যের ভাষা ‘তুমি নিজের কাজ করো, আমি নেব শুধু তোমার লড়াইয়ের উষ্ণতাটুকু৷’
সেই রাতে সে আর কোনো স্বরলিপি ধরল না৷ একতারাকে কোলে নিল যেন ‘হারিয়ে যাওয়া সন্তান’৷ চোখ বুজল, খুঁজছিল ‘মনের মানুষ’কে৷ হয়তো খুঁজছিল সেই ‘খোলা আকাশ’, যেখানে তার গান ঘুঙুরের মতো বেজে উঠত৷
পরদিন সকালে, শহর ‘কর্ম-সাগরে’ জেগে ওঠার আগেই, গোরাচাঁদ ‘অজ্ঞাতের পথে’ পাড়ি জমাল৷ কেউ জানল না সে কোথায় মিশে গেল৷ সে ছিল রাঢ় মাটির দেশের মানুষ, সে কি আবার তার মা টির কাছেই ফিরে গেল? শুধু সেই মেট্রো স্টেশনের ধারে পড়ে রইল তার সঙ্গীহীন একতারা৷ তারটি ছিল ছিন্ন, যেন প্রতীকী জীবনের সম্পর্ক-ছেদ৷ বিজপট্ট খুলে বেরিয়ে গেছে, একতারার বাকি অংশগুলিতে তখনও লেগে ছিল তার ফকিরি জীবনের ধুলো আর না বলা যন্ত্রণার শুকনো অশ্রুর দাগ৷ লোকেরা সেদিনও ছুটছিল৷ এই ‘নশ্বরতা’ তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেল৷
শুধু গরম আর শুকনো বাতাসের গভীরে তখনও যেন ভেসে বেড়াচ্ছিল সেই চিরন্তন ভাব, এক ক্ষীণ আত্মার স্বর৷ আজও শহরের অলস মধ্যরাতে, যখন কিছু আলো নিভে যায়, তখন এক মায়াবী আলো নেবে আসে আকাশ থেকে, কোথা থেকে যেন শোনা যায় সেই ভাব, ভাষা, সুর ও ছন্দে মেশা অলিক জীবনের ডাক৷ সে এক ও অদ্বিতীয় চৈতন্যলোকের আহ্বান, যে ডাক মৃদু গলায় জানায় জীবন কেবলই দৌড়ানো নয়, জীবন হলো নিজেদের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজে নেওয়া৷ আর সেই খোঁজই হলো বাউলের পথ৷
- Log in to post comments