বিভিন্ন ধর্মমতের প্রবক্তা ছিলেন এক একজন মহাপুরুষ বা পয়গম্বর (ঈশ্বর আদেশবাহক দূত ঃ ‘পয়গম্’ মানে বাণী, ‘পয়গম্বর’ মানে যিনি বাণী এনেছেন)৷ কিন্তু যে বৈদিক ধর্ম তার কোন প্রবক্তা বা প্রবর্তক নেই৷ অনেক ঋষিতে মিলে বেদ রচনা করে গেছেন, রচনা করে গেছেন, বৈদিক ধর্মকরে গেছেন বিশ্বমানবের প্রথম ধর্মানুভূতির ভাবাভিব্যক্তি৷ তাই বৈদিক ধর্মকে বিশ্বের পরিচিত অন্য কোন ধর্মের সঙ্গে সমপদবাচ্য করা চলে না৷ কোনো একজন ঋষিকে এজন্যে কোন বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া যায় না৷ এইজন্যে প্রাচীনকাল থেকে বৈদিক ঋষিদের প্রবর্তিত ধর্মের নাম হচ্ছে আর্ষধর্ম (ঋষি + অণ্ = আর্ষ) : ‘হিন্দুধর্ম’ শব্দটি অত্যাধুনিক৷ ভারতে যখন ৰৌদ্ধধর্ম চলছিল তখনও হিন্দুধর্ম নামক শব্দটি প্রচলিত ছিল না৷ মহম্মদ ইব্ন্ কাসেম যখন ভারত আক্রমণ করলেন, তখন দেশটি সামগ্রিকভাবে হিন্দুস্তান নামে পরিচিত ছিল ও কালক্রমে সেখানকার অধিবাসীরা হিন্দু নামে পরিচিত হতে থাকল৷ হিন্দু কোন ধর্মমত বা ধর্মমতগত জনগোষ্ঠীর নাম নয়, ‘হিন্দু’ শব্দের সোজা ইংরেজী হচ্ছে Indian ৷ কিছুকাল আগেও আমেরিকায় হিন্দু অর্থে Indian শব্দ চলত৷ এতে যুক্তিগত কারণে কোন আপত্তি দেখানো যায় না৷ হিন্দু নামক জনগোষ্ঠীর ধর্মমত যাই হোক না কেন খ্রীষ্টান, মুসলমান, ইহুদি, ৰৌদ্ধ যিনিই এদেশের বাসিন্দে......এদেশের অধিবাসী তিনিই হিন্দি বা হিন্দু৷ পঞ্জাব ও হরিয়ানার মধ্যবর্তী স্থানে ভারতের যে উন্নত জলবিভাজক তাকেও ফার্সী ভাষায় বলা হয় শিরহিন্দ৷ আজকে যারা ‘হিন্দু’ শব্দটিতে সাম্প্রদায়িকতা দেখেন তাঁদের এই জিনিসটি ভালভাবে দেখতে হবে৷
হ্যাঁ ব্যবহারের দোষে হিন্দু বলতে যদি একটি বিশেষ ধর্ম-সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই কারো কারো ‘হিন্দু’ শব্দ ব্যবহারে আপত্তি থাকতে পারে৷ রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পুরস্কার পান তখন বিশ্ব জুড়ে বলা হয়েছিল---A Hindu poet of Bengali literature যদিও দেশগত বিচারে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন কিন্তু ধর্মমতগত বিচারে তিনি হিন্দু ছিলেন না-ছিলেন ব্রাহ্ম৷....
একটু আগে আর্ষমতের কথা বলছিলুম৷ আমরা আজকাল ‘হিন্দু’ শব্দটিকে যে অর্থে ব্যবহার করি সেই অর্থে সংস্কৃতে ‘হিন্দু’ বলে কোন শব্দ নেই৷ মধ্য এশিয়ার মানুষেরা সিন্ধু নদোত্তর এলাকাকে হিন্দোস্তান বলত (বস্তুতঃ মোগল যুগে হিন্দোস্তান বলতে বর্তমান উত্তরপ্রদেশকে ৰোঝান হত)৷ এই হিন্দোস্তানের বাসিন্দাদের তাঁরা বলতেন হিন্দু, তাঁদের ধর্মকে বলতেন হিন্দু ধর্ম৷ হিন্দুধর্মের সংস্কৃত নাম আর্ষধর্ম, বা আর্ষমত৷ কেউ কেউ যে মেরুতন্ত্র থেকে ‘হিন্দু’ শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন---হীনা দৃষতে যস্তু সং হিন্দুঃ পরিকীর্তিতঃ৷ তাঁদের জবাবে বলব, মেরুতন্ত্র একটি আধুনিক পুস্তক, তাকে আগমিক প্রমাণ বলে গ্রহণ করা চলে না৷ তা ছাড়া ‘হিন্দু’ শব্দের ব্যুৎপত্তিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷ এটি সম্পূর্ণতই একটি গৃহীত সংস্কৃত শব্দ৷ ‘হিন্দু’ কোন ধাতু নয় যে তার থেকে ‘উন্’ প্রত্যয় যোগ করে ‘হিন্দু’ শব্দ পাব৷