এর পরে আর্যরা চললেন আরও পূর্বে৷ ক্রমশঃ বেড়ে চলল শ্যামলিমা–বাড়তে থাকল সবুজের সমারোহ৷ এত সবুজ তাঁরা ইতোপূর্বে কখনও দেখেন নি৷ বৈদিক ভাষায় ‘ধান্য’ মানে গাছপালা (green vegetation)৷ তাই সপ্তসিন্ধু পেরিয়ে এসে পূর্ব দিকের নোতুন স্থানটির তাঁরা নাম দিলেন ‘হরিৎধান্য’ যা শৌরসেনী প্রাকৃতে হয়ে দাঁড়াল ‘হরিহান্ন’ > অর্ধ্ব শৌরসেনীতে ‘হরিহানা’ > বর্ত্তমান হরিয়ানবী ভাষায় (যা হিন্দীর অতি নিকট জ্ঞাতি) ‘হরিয়াণা’৷
অনুরূপ ভাবে এসেছে ‘লুধিয়ানা’ শব্দটি৷ প্রাচীনকালে আর্যরা লোধ্র নামে এক আরণ্য বৃক্ষের ফুলের রেণু প্রসাধনে ব্যবহার করতেন৷
‘‘ধারাযন্ত্রে স্নানের শেষে ধূপের ধোঁয়া দিত কেশে,
লোধ্র ফুলের শুভ্র রেণু মাখত মুখে বালা,
কালাগুরুর গুরু গন্ধ লেগে থাকত সাজে
কুরুবকের পরত চূড়া কালো কেশের মাঝে৷’’
লোধ্রধান্য > লোধ্ধহান্ন > লোধিহানা = লুধিয়ানা৷
তাঁরা এগিয়ে চললেন আরও পূর্বে–প্রতীচী থেকে প্রাচীর দিকে৷ মরীচিমালীর মুখ চেয়ে তাঁরা এসে পৌঁছলেন এমন একটি জায়গায় যে জায়গাটি হচ্ছে গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্ত্তী ও যেখানে গঙ্গা ও যমুনার সর্বাধিক দূরত্ব ছিল৷ গঙ্গোত্তরী থেকে যমুনোত্তরী৷ তারপর ক্রমশঃ দূরত্ব কমতে কমতে দুই নদী কাছাকাছি হতে হতে সংযুক্ত হ’ল প্রয়াগে৷ এই দুই নদীর মধ্যবর্ত্তী স্থান প্রাচীন ব্রহ্মাবর্ত্ত বা ব্রহ্মর্বিদেশ–পরবর্ত্তীকালে ‘শূরসেন’ ও আরও পরবর্ত্তীকালে ফার্সী ভাষায় যার নাম রাখা হয়েছিল দো–আব, অর্থাৎ দুই জলধারার দেশ৷ এই ব্রহ্মাবর্ত্তের সুপ্রাচীন রাজধানী বৃষ্ণিপুর (বর্ত্তমানে কাণপুরের নিকটবর্ত্তী ‘বিঠুর’)৷ পরবর্ত্তীকালে দেশের নাম পরিবর্ত্তিত হয়ে যখন হ’ল শূরসেন তখন তার রাজধানী হ’ল মথুরা৷ কৃষ্ণের পূর্বে এই শূরসেনের রাজা ছিলেন কংস৷ তাঁরও রাজধানী ছিল মথুরা৷ উত্তর ভারতীয় কায়স্থদের যে অংশ এই ব্রহ্মাবর্ত্ত বা শূরসেনের অধিবাসী তাঁরা আজও নিজেদের ‘মাথুর’ বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন৷ এই ব্রহ্মাবর্ত্তের অন্ত্যবিন্দু যেখানে সেই স্থান বসবাসের, কৃষিকার্যের ও সর্ববিধ উন্নতিমূলক কার্যের অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় আর্যরা তার নাম দিলেন প্রয়াগ (প্র–যজ ঘঞ = প্রয়াগ)৷ এখানে অন্তস্থ ‘য’ শব্দের মধ্যে থাকায় ‘‘পদান্তে পদমধ্যস্তে ‘য’–কার ‘ই’ উচ্যতে’’ বিধি অনুযায়ী ‘প্রযাগ’ হয়ে গেল ‘প্রয়াগ’৷
সংস্কৃতে ও বৈদিকে ‘যজ্’ ধাতুর অর্থ হ’ল কাজ করা৷ ‘যজ্’ ধাতুর উত্তর ‘ন’ প্রত্যয় করে হ’ল ‘যজ্ঞ’৷ যজ্ ঘঞ করে ‘যাগ’৷ উভয়ের অর্থ হ’ল কর্ম৷ তাই যেখানে প্রকৃষ্টভাবে কর্ম করা যায় তাই হ’ল প্রয়াগ৷ আর্যরা এই স্থানটিকে অত্যন্ত পবিত্র স্থান বলে মনে করতেন৷ তাঁদের ধারণা ছিল, এই প্রয়াগসঙ্গমে স্নান করলেই সব পাপ বিধৌত হয়ে যায়৷ তাই এখনও ভারতের কোন কোন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে প্রয়াগে অস্থি বিসর্জনের প্রথা আছে৷ কোন দুষ্ট লোক ধর্মকথা বললে হিন্দীতে বলা হয়–‘‘ন শো চুহা খা কর বিল্লী চলী পরযাগ সিনান৷’’ এই ‘যজ্’ ধাতু থেকে তৈরী হয়েছে ‘যাজক’, ‘যজমান’ প্রভৃতি শব্দ৷