ক্যানসারকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধবংস করার নানা পদ্ধতিই এসেছে এত দিন৷ কিন্তু এতে শত্রুনাশ যেমন হয়, তেমন সুস্থ কোষেরও ক্ষতি হয় বিস্তর৷ একটি কোষকে পোড়াতে গিয়ে, পুড়ে যায় চারপাশের নিরীহ কোষগুলিও৷ দহনজ্বালা সইতে হয় গোটা শরীরকেও৷ তাই জ্বালানো বা পোড়ানোর দিকে আর যেতে চাইছেন না গবেষকেরা৷ বদলে এখন লক্ষ্য হাড়হিম ঠান্ডায় আক্রান্ত কোষগুলিকে জমিয়ে বরফ করে দেওয়া৷ এতে সাপও মরবে, আবার লাঠিও ভাঙবে না৷ টিউমার জমে বরফ হয়ে নিষ্ক্রিয় হবে, তার আশপাশের কোষও শীতল হবে৷
জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটি, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ক্রায়ো্যাবলেশন নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে৷ থেরাপিটি মানুষের শরীরে প্রয়োগও করা হচ্ছে৷ এমন থেরাপি এ দেশেও হয়৷ ক্রায়ো্যাবলেশনের প্রক্রিয়া ক্রায়োথেরাপির মতোই৷ চিকিৎসকেরা একে ফ্রিজ থেরাপিও বলেন৷ কিডনি, লিভার, ফুসফুস, স্তন এবং হাড়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় এর প্রয়োগ করা হচ্ছে৷ প্রথমে আলট্রাসাউন্ড ও সিটি স্ক্যানের সাহায্যে টিউমারের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা হয়৷ তার পর খুব সূক্ষ্ম সুচ ফুটিয়ে তরল নাইট্রোজেন, হিলিয়াম বা আর্গন গ্যাস টিউমারে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে৷ এই তরল গ্যাসের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের চেয়েও ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও কম৷ ফলে টিউমারের চারপাশে বরফের গোলক তৈরি হবে৷ তরল গ্যাস ক্যানসার কোষের যত ভিতরে ঢুকতে শুরু করবে, ততই তা জমতে থাকবে৷ শেষে ক্যানসার কোষের ভিতরে ও বাইরে বরফের ক্রিস্টাল তৈরি হবে৷ এই ক্রিস্টাল এমন প্রাচীর তৈরি করবে, যা ভেদ করে রক্ত ও শরীরের পুষ্টি উপাদান কোষগুলিতে পৌঁছোতে পারবে না৷ ফলে একটা সময়ে গিয়ে কোষগুলি নিস্তেজ হয়ে পড়বে, তাদের বাইরের আবরণী বা কোষের পর্দা ফেটে যাবে ও কোষগুলি বিভাজিত হতে না পেরে নষ্ট হতে থাকবে৷
কেন লাভজনক ক্রায়ো্যাবলেশন? কাটাছেঁড়া নেই বলে অস্ত্রোপচারের পরবর্তী যন্ত্রণা কম হবে৷ ক্যানসার চিকিৎসক শুভদীপ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, এই থেরাপিতে শরীরের ভিতরে কোনও রশ্মি ঢুকবে না, তাই সুস্থ কোষগুলির ক্ষতি হবে না৷ তরল নাইট্রোজেন বা অন্য গ্যাস এত কম মাত্রায় ঢোকানো হবে, যার কোনও ক্ষতিকর প্রভাব শরীরে পড়বে না৷ এই থেরাপির একমাত্র উদ্দেশ্য হল ক্যানসার কোষকে জমিয়ে বরফ করে ধবংস করে দেওয়া৷ শুধু সেই কাজটুকুই করা হবে৷ কিডনির টিউমারের ক্ষেত্রেও এই থেরাপিটি বিশেষ ভাবে উপযোগী বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা৷ রোগীদের উপর পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, ক্রায়ো্যাবলেশনে টিউমারকে জমিয়ে তার অপসারণও সম্ভব হয়েছে৷ শুধু তা-ই নয়, চিরদিনের মতো ক্যানসার ফিরে আসার পথটিকেও বন্ধ করে দেওয়া গিয়েছে৷ এই থেরাপির কারণে রোগীর আর ডায়ালিসিস করার প্রয়োজনও হয়নি৷ গবেষকেরা জানিয়েছেন, স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় থেরাপিটি করলে ফের ক্যানসার ফিরে আসার আশঙ্কা কমবে৷ চিরকালের মতো রোগমুক্তি ঘটবে৷