গল + লা+ ড = গল্প৷ ‘লা’ ধাতুর অর্থ হ’ল ধারণ করা to contain) অথবা ধৃত হওয়া to be contained)৷ ‘লা’ ধাতু + ‘ড’ প্রত্যয় করে ‘ল’ শব্দ পাচ্ছি৷ যে দেশ ‘কের’ অর্থাৎ নারিকেল বা নালিকেরকে ধারণ করে সে হ’ল কের+ ল + ড = কেরল৷ রাজা মিথি যে দেশকে ধারণ করেছিলেন, অথবা যে ভূমি রাজা মিথিকে ধারণ করে রেখেছিল তা মিথিলা৷ তোমরা রাজা মিথির নাম নিশ্চয় শুণেছ৷ প্রাচীনকালে আর্যাবর্তের যে অংশ গঙ্গার উত্তরে অবস্থিত তার পূর্ব-সীমানা ধরা হত গণ্ডকী নদীকে (নারায়ণী গণ্ডকী) আর যে অংশ গঙ্গার দক্ষিণে অবস্থিত তার পূর্ব প্রত্যন্তকে ধরা হত শোণক বা শোণ নদকে৷ নারায়ণী গণ্ডকের পূর্বদিকে গঙ্গার উত্তরে হচ্ছে মিথিলা বা বিদেহ৷ আর গঙ্গার দক্ষিণে শোণের পূর্বে মগধ৷ মগধ একটি আর্যাবর্তের প্রত্যন্ত সীমার পূর্বে৷ তাই মগধকে অনার্য বা মগ বলে অবজ্ঞা করা হয়৷ মগেদের দ্বারা পরিচালিত এই অর্থে দেশটার নাম মগধ৷ আর্যরা দেশটাকে তাচ্ছিল্য করতেন৷ ভাবতেন এই অনার্যভূমি মগধে মৃত্যু হলে পরজন্মে গাধা হয়ে জন্মাতে হবে৷ তাই স্বাভাবিক অবস্থায় কেউ শোণ অতিক্রম করে, তৎপূর্বে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গে আসতে চাইতেন না৷ গঙ্গার উত্তরে তেমনি নারায়ণী গণ্ডক পেরিয়ে বিদেহ অঙ্গ-বঙ্গ-প্রাগজ্যোতিষপুর আসতে চাইতেন না৷ এখনও মগধ, বিদেহ (মিথিলা), বাংলার মানুষের দৃঢ় প্রত্যয় যে কাশীতে মরলে স্বর্গবাস ঘটে৷ সুদীর্ঘকাল ধরে বাংলার বৃদ্ধেরা মৃত্যুর দিন গুনবার জন্যে কাশীবাসকেই শ্রেয় মনে করতেন৷ বিষয়-সম্পত্তি উত্তরপুরুষে সমর্পণ করে তাঁরা কাশীবাসী হতেন৷ আরও কারণ ছিল এই যে কাশী আর্যাবর্তের ঠিক পূর্ব প্রত্যন্ত না হলেও কতকটা প্রত্যন্ত৷ কাশী থেকে আরো কিছুটা পূর্বে গেলেই অনার্যভূমি৷
হ্যাঁ, রাজা মিথিকে বিদেহভূমির এই অগৌরব স্খালন করতে হয়েছিল৷ তিনি নারায়ণী-গণ্ডকের পূর্ব দিকে (শোণপুর প্রাচীন কাশীরাজ্যে কিন্তু হাজীপুর বিদেহে) কৌশিকী (কোশী) নদী পর্যন্ত দখল করলেন ও ভূমির শুদ্ধীকরণের জন্যে ‘ত্রিহোত্রীয়’ যজ্ঞ করলেন৷ তোমরা জান, একটি যজ্ঞ পরিচালনায় যিনি প্রধান পুরুষ হন তাঁকে বলা হয় যজ্ঞের হোতা৷ যিনি তাঁর চেয়েও এগিয়ে এসে যজ্ঞ নিষ্পন্ন করার জন্যে আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা করে সকলকে এ খবর জানিয়ে দেন কিন্তু প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেন না তাঁকে বলে পুরোধা pioneer/vanguard)৷ যজ্ঞের অংশভাক্দের যিনি প্রধান অর্থাৎ হোতা তিনি হতেন চতুর্বেদে পণ্ডিত৷ তাঁকে সাহায্য করতেন আরো চারজন৷ একজন হতেন ঋক্বেদে অভিজ্ঞ তাঁকে বলা হত ঋত্বিক৷ একজন হতেন সামবেদে অভিজ্ঞ তাঁকে বলা হত উদগাতা৷ একজন হতেন যজুর্বেদে অভিজ্ঞ তাঁকে বলা হত অধবর্যূ৷ একজন হতেন অথর্ব বেদে অভিজ্ঞ তাঁকে বলা হত ব্রাহ্মণ৷ হোতা সহ পঞ্চ ব্রাহ্মণকে নিয়ে যজ্ঞ নিষ্পন্ন হত৷ রাজা মিথি কিন্তু যে সুবৃহৎ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন তাতে ছিলেন তিনজন তাগড়া তাগড়া ডাকসাইটে হোতা৷ তাই যজ্ঞের নাম হয়েছিল ত্রিহোত্রীয় যজ্ঞ-ভূমির নাম হয়েছিল ত্রিহোত্রীয় ভূমি, তিরহুত প্রান্ত, ইংরেজীতে ‘ত্রিহুত’৷ দেশের নাম মোঘল যুগ থেকে ত্রিহুত-ই চলছিল৷ মিথিলা নামটা মুখ্যতঃ পুরাণেরই৷ রামায়ণ লিখিত হবার পর থেকে মিথিলা নামের ব্যবহার বেড়ে গেল৷ ‘মিথিলা’ শব্দের মানে রাজা মিথি যে দেশকে ধারণ করেছিলেন অথবা যে দেশ রাজা মিথিকে ধারণ করেছিল৷ রামায়ণের পূর্বে দেশটা বিদেহ নামে অধিক পরিচিত ছিল৷ পুরাণে যেমন সীতার একটি নাম মৈথিলী তেমনি অপর নাম বৈদেহী৷
‘‘পুণ্যশ্লোকঃ ণলরাজা পুণ্যশ্লোকঃ হি যুধিষ্ঠিরঃ
পুণ্যশ্লোকা চ বৈদেহী পুণ্যশ্লোকঃ জনার্দনঃ৷৷’’
মৈথিলী লিপিকেও বলা হয় তিরহুতা লিপি৷*