উচ্চৈঃস্বরে পরমপুরুষের গুণগান করাকে কীর্তন ৰলা হয়৷ সংস্কৃতে ‘কীর্ত’ ধাতুটার মানে হল জোরে উচ্চারণ করা যাতে ধবনিটা অন্যের কর্ণে প্রবেশ করে৷ এইভাবে পরমপুরুষের গুণগান করাকে কীর্তন ৰলা হয়৷
এখন প্রশ্ণ হচ্ছে পরমপুরুষ তো কারও কীর্তনের অপেক্ষায় বসে থাকেন না৷ পরমপুরুষ তো কাউকে বলেন না কীর্তন কর৷ তাহলে কীর্তন মানুষ করে কেন, করবেই বা কেন? এর পেছনে যে বিজ্ঞানটা রয়েছে সেটা হচ্ছে এই মানুষ স্থূল থেকে সূক্ষ্মের দিকে যেতে চায়৷ জীবনের সর্বক্ষেত্রেই মানুষ স্থূলের মধ্যে সূক্ষ্মকে খোঁজে৷ আবার যে সূক্ষ্মটাকে পায় তার ভেতর থেকে সূক্ষ্মতরকে খোঁজে৷ এইভাবে এগিয়ে যায়৷
সেই আদিমকালের মানুষ, তার কাণেও গান ভাল লাগত৷ তারও নাচতে ইচ্ছে যেত৷ কিন্তু সেকালকার সেই মানুষের গানও ছিল খুব স্থূল, নাচও ছিল খুব স্থূল৷ এই স্কুলের ভেতর দিয়ে সূক্ষ্মকে পাবার এই যে এষণা, এই যে চেষ্টা, এর ভেতর দিয়ে মানুষ কী করলো নৃত্যের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের ছন্দের আবিষ্কার করল৷ ছন্দের মধ্যেও বিভিন্ন ধরণের আঙ্গিকের সন্ধান পেল৷ আবার ঠিক তেমনি গানের ভেতর দিয়েও সূক্ষ্ম রসানুভূতির সন্ধান পেল৷ গানকেও ধারা নিবদ্ধ করে দিল, বিশেষ রাগ-রাগিনীর প্রবর্তন করল৷ এগুলো করেছিলেন সদাশিব৷ তারপরে গানের সঙ্গে নৃত্যের সমাবেশ ঘটানো হ’ল যাকে বলা হয় ‘তাল’৷ শিব বিশেষ নৃত্যের প্রবর্তন করলেন, পার্বতী বিশেষ নৃত্যের প্রবর্তন করলেন,ললিত লাস্য৷ এইভাবে স্থূল থেকে সূক্ষ্মতর লোকের দিকে যাবার যে প্রচেষ্টা একে ৰলা হয় নন্দন-বিজ্ঞান (aesthetic science)৷
সূক্ষ্মতর লোকের সন্ধানে যে এল তার আর স্থূল জিনিসকে ভাল লাগল না৷ ভাজা, পোড়া এসব খেতে শিখেছিল প্রাচীনকালেই মানুষ৷ আসলে তারা সব কিছুই পুড়িয়ে খেত সেকালে রান্না জানত না৷ তারপরে রান্না শিখল নানান মশলা দিয়ে, সুস্বাদু করে রাঁধতে শিখল, ঘণ্ট, শুক্তো এসব কিছু তৈরী করতে শিখল৷ যে ভাল জিনিসটা, সূক্ষ্মতর জিনিসটার স্বাদ পেল, টের পেল, আর সে স্থূল জিনিসটা খেতে তার আর ভাল লাগল না৷ তেমনি সুন্দর জিনিসটা শোণবার সুযোগ এলো৷ স্থূল জিনিসটা তার আর ভাল লাগল না৷ নির্বাক চিত্র দেখছিল মানুষ৷ যেই সবাক চিত্রের সংস্পর্শে এল আর নির্বাক চিত্র দেখবে না৷ এখন যদি কোন শহরে কোন সিনেমা হাউসে বিনা পয়সায়, বিনা দক্ষিণাতেও নির্বাক চিত্র দেখানো হয়, লোক বিশেষ জুটৰে না, ৰলৰে না থাক, আমার অন্য কাজ রয়েছে৷ কিন্তু সবাক চিত্রের জায়গায় দেখৰে, ব্ল্যাক মার্কেটেও টিকিট কিনছে৷ সূক্ষ্মতর লোকের সন্ধান পেলে আর স্থূলটি ভাল লাগে না৷ এই যে স্থূল থেকে সূক্ষ্মে, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর দিকে মানুষের অব্যাহত গতি, এই গতিশীলতাটাই হল নন্দন বিজ্ঞানের রূপরেখা৷ এইভাবে চলতে চলতে এমন একটা স্তরে মানুষ আসে যখন এই সুন্দর টেষ্ট, সুন্দর অনুভূতি, সুন্দর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে চির সুন্দরের অধিকতর নিকটে এসে পৌঁছোয় তখন আর সে সুন্দরতার আস্বাদ নেবার অবস্থা তার থাকে না অর্থাৎ গানটা তো ভারী সুন্দর লাগছে, নাচটা তো ভারী সুন্দর লাগছে---এই স্তরটা আর থাকে না, কারণ সুন্দর যার ভাল লাগে সে তো মানুষ৷ তখন এমন একটা স্তর আসে যে নাচটা তাকে পাগল করে দেয়, সে নিজেকে খুইয়ে বসে, নিজেকে হারিয়ে বসে৷ নন্দন বিজ্ঞানের এই যে ঊর্ধতর অবস্থা এইটাই ৰলা হয় মোহন বিজ্ঞান৷ অর্থাৎ এতে সে নিজেই মোহিত হয়ে যাচ্ছে, তার আর আস্বাদ গ্রহণের অবস্থা থাকছে না, সে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে৷ মানুষ কত রকমের নাচ-গান আবিষ্কার করেছে, ভবিষ্যতেও কত কী করবে, এসবই নন্দন-বিজ্ঞানের মধ্যে নিজে আনন্দ পাবার জন্যে৷ কিন্তু কীর্তন জিনিসটার আবিষ্কার হয়েছিল পরমপুরুষকে আনন্দ দেবার জন্যে, নিজে আনন্দ পাবার জন্যে নয়৷ আর এই আনন্দ দিতে দিতে সে নিজেকে খুইয়ে ফেলে নিজেকে হারিয়ে ফেলে তাই কীর্তন আসছে মোহন বিজ্ঞানের মধ্যে৷
মোহন-বিজ্ঞান জিনিসটা কী! মানুষের জীবভাবকে পরমপুরুষের শাশ্বতভাবের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে দেওয়া৷ তাই সমস্ত সঙ্গীতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হল কীর্তন, আর সঙ্গীত মানেই হল নাচ-গান-বাজনা এই তিন-ই৷ তাই কীর্তন তো কেবল গান নয়৷ তাতে নাচও আছে, বাজনাও আছে৷ তা নাচ-গান-বাজনা মিলিয়ে এমনই একটা অনবদ্য স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরী করে দেয় যা মানুষকে কী করে? --- না, নিজেকে ভুলিয়ে দেয়৷ এইখানেই কীর্ত্তনের মাধুর্য, এইখানেই কীর্ত্তনের শ্রেষ্ঠত্ব৷ তাই পৃথিবীতে যাঁরাই জ্ঞানী-গুণী ও সত্যিকারের বুদ্ধিমান মানুষ তাঁরা অবশ্যই মানুষের সামনে অথবা লজ্জা থাকে তো লুকিয়ে লুকিয়ে কীর্ত্তন করবেন৷