আমরা সকলেই অবহিত আছি যে বর্তমানে সমস্ত সংবাদ মাধ্যম, সমাজ মাধ্যম, মাঠে ময়দানে রাজনৈতিক সভা সমিতি এস আই আর SIR—Special Intensive Revision)বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন সম্পর্কিত আলোচনা, তর্ক বিতর্কে সরগরম৷ সংবিধানের ৩২৬ ধারা অনুসারে ভারতের নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় বিভিন্ন রাজ্যের বোটার (ভোটার ) তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া চলছে৷ ইতোমধ্যেই বিহার রাজ্যে এস আই আর সম্পন্ন হয়েছে ও পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে৷
আমরা আরও অবগত আছি যে স্বাধীনতার পর ভারতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫১--৫২ সালে৷ তারপর প্রতি নির্বাচনের পূর্বে বোটার তালিকার সংশোধন অর্থাৎ মৃতদের নাম বর্জন, নতুন নির্বাচকগণের নাম সংযোজন ও স্থানান্তরিতদের নাম একস্থানে বিয়োগ তথা অন্যস্থানে যোগ--এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া৷ কিন্তু অন্যান্য বারের সংশোধন প্রক্রিয়া থেকে এবারের সংশোধন প্রক্রিয়ার মূল পার্থক্য হচ্ছে ’বিশেষ নিবিড় সংশোধন ’- এই নামকরণের জন্যে৷ তবে কি এই ’এস আই আর ’ এর ক্ষেত্রে কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিহিত আছে?--এই প্রশ্ণটাই বর্তমানে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গবাসী তথা রাজনীতি সচেতন নাগরিকদের মনে ঘোরাফেরা করে চলেছে৷ কারণ এই সংশোধনের জন্যে বিশেষ কয়েকটি তথ্য/নথি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক৷ শুধু তাই নয়, এই তথ্যগুলি না দিতে পারলে বোটার তালিকায় নাম উঠবে না,ভোটাধিকার বাতিল হয়ে যাবে ও নাগরিক অধিকার তথা সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হয়ে বহুবিধ নির্যাতনের শিকার হতে হবে৷ আর এই ভয় থেকেই ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকজন আত্মহত্যা করেছেন ও আত্মহননের চেষ্টাও করেছেন৷ এছাড়াও বিভিন্ন বিভাজন সৃষ্টিকারী ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলগুলি নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্যে এই এস আই আর-এর মাধ্যমেই কয়েক কোটি বিদেশী চিহ্ণিত করে বিতাড়িত কিংবা ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী করার আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন৷ এরফলে বহু সাধারণ মানুষ মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন৷
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মূল কারণ খুঁজতে হলে আমাদের বেশ কিছুটা পিছিয়ে যেতে হবে৷ লক্ষ লক্ষ বাঙালী বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ, মুখোমুখি লড়াই ও দেশমাতৃকার মুক্তির জন্যে হাজার হাজার বাঙালীর জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকের দুরভিসন্ধিতে স্বাধীনতার পরিবর্তে ভারতবর্ষকে দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়৷ দেশভাগের পরিণামে অখণ্ড বাঙলা ও পঞ্জাব বিভাজিত হয়৷ পঞ্জাবী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে দিল্লীর কেন্দ্রীয় সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, বাঙালী উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে তেমন কিছুই করেন নি৷ সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সরকার যেটুকু ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য৷ ফলস্বরূপ লক্ষ লক্ষ বাঙালী উদ্বাস্তুদের কিছু অংশ ঠাঁই পেলেন সরকারী উদ্বাস্তু শিবিরগুলিতে, বাকিরা পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বনে জঙ্গলে, রেললাইনের ধারে নিজেদের অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রাখার চেষ্টাতে দিনাতিপাত করতে থাকলেন৷ পরবর্তীকালেও বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সময়ে পূর্ব বঙ্গ/পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে নির্যাতিত নিপীড়িত হয়ে শুধুমাত্র জীবন ও মান-সম্ভ্রম রক্ষার তাগিদে সহায় সম্বলহীন অবস্থাতে বহু মানুষ পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে প্রবেশ করেছেন৷ এইসব অসহায় মানুষের কাছে না ছিল কোন বৈধ কাগজপত্র, না ছিল কোনও সরকারি নথি৷কিছু সংখ্যক সৌভাগ্যবানেরা যদিও সরকারী কাগজপত্র হাতে পেয়েছিলেন----- কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দুর্ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই সেসব হারিয়ে ফেলেছেন বা নষ্ট হয়ে গেছে৷ তাই বর্তমানের এই এস আই আর এর জন্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়ার মত অবস্থায় তাঁরা নেই৷ যদিও সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যেকোন সময়ে তাঁরা এই দেশে এলে তাঁদের সাদরে বরণ করা হবে৷কিন্তু এই মর্মে কোন সরকারী বিজ্ঞপ্তি বা আইনি বৈধতা না থাকার ফলে তাঁরা স্বাভাবিক ভাবেই আতঙ্কগ্রস্ত৷বর্তমান এস আই আর-এর আবহে এই মানুষেরাই হবেন চরম ক্ষতিগ্রস্ত৷
‘আমরা বাঙালী’ দল মনে করে তথাকথিত এস আই আর S I R) যেভাবে ও যে রূপে প্রয়োগ করার ব্যবস্থা হয়েছে তার মূল লক্ষ্য বাঙালী জনগোষ্ঠী৷ কারণ, একমাত্র বাঙালী উদ্বাস্তুরাই দেশভাগের শিকার হয়ে ভারতে বিপুল সংখ্যায প্রবেশ করেছেন৷এইS I Rএর মাধ্যমেই তাদের চিহ্ণিত করে অনুপ্রবেশকারী বিদেশী বা অনাগরিক তকমা দিয়ে দেশ থেকে বিতাড়ন অথবা নাগরিকত্ব হরণের একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হবে৷ এই পদ্ধতিতে ঘুরপথে এন আর সি-র পরোক্ষ প্রয়োগ ত্বরান্বিত করা যাবে৷ বর্তমান এস আই আর ও এন আর সি বস্তুতপক্ষে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ৷ আর এরফলে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বাঙালী জনগোষ্ঠী৷ আরেকবার বাঙালীরা নিজভূমে পরবাসীতে পর্যবসিত হয়ে ছিন্নমূল ভাসমান জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবেন৷ সুতরাং এই ধরনের অমানবিক বাঙালী বিদ্বেষী প্রক্রিয়াকে বাংলা ও বাঙালীর স্বার্থে সমর্পিত রাজনৈতিক দল হিসেবে ’আমরা বাঙালী ’ সমর্থন করে না--- করতে পারে না৷
ভারতের স্বাধীনতার সময় দেশভাগের তথা বাঙলা ভাগের সিদ্ধান্ত বাঙালীদের মতামতের ভিত্তিতে গৃহীত হয় নি ----এটি ছিল সম্পূর্ণতঃ ব্রিটিশ প্রশাসন ও ক্ষমতালোভী অবাঙালী নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্ত,যার বলি হয়েছিলেন কয়েক কোটি বাঙালী৷ সুভাষচন্দ্র বসু ও অন্যান্য বাঙালী নেতৃবৃন্দ সর্বদাই অখণ্ড ভারতের পূর্ণ স্বরাজের পক্ষপাতী ও সমর্থক ছিলেন৷স্বাধীনতার পর বিভিন্ন রাজ্য পুনর্ঘটনের নামে বাঙলার উর্বর কৃষি জমি ও খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ ভূমি কেটে অন্যান্য অবাঙালী পার্শবর্তী রাজ্যগুলিকে ভেট দেওয়া হল আর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জন্য পড়ে থাকল ছিবডেটুকু৷বাঙালী জাতির ঐক্য বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ভাষা-উপভাষা, জনজাতি-উপজাতি,পাহাড়ী-সমতল, ধর্মমত-সম্প্রদায়গত বিভেদ ভাবনা উসকে দেওয়া হয়েছিল৷ সর্র্বেপরি ভারতের অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে অবাঙালী পুঁজিপতি- শিল্পপতি গোষ্ঠী৷ তাদেরই অঙ্গুলিনির্দেশে শিক্ষা দীক্ষা, জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত সচেতন বাঙালী জাতিকে ধবংস করার উদ্দেশ্যে বিবিধ ষড়যন্ত্রের নীলনকসা রচিত হয়েছে৷ এছাড়াও বাঙালীর জাতিসত্তা ও সংস্কৃতিকে নষ্ট করার লক্ষ্যে বাঙালী সংস্কৃতির জগতে অবাঙালী অসংস্কৃতির সূচিকাভরণ করে বাঙালীজাতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেওয়ার ধারাবাহিক চক্রান্ত চলছে৷
এস আই আর---এস আই আর এর পাশাপাশি আর একটি প্রক্রিয়া চলছে তার নাম সিএএ CAA) বা ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০১৯ Citizenship Amendment Act ,2019 ) যার দ্বারা বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আগত হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, পার্সী ও খ্রীষ্টানদের বিশেষ কতকগুলি শর্তে নাগরিকত্ব প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে৷ কিন্তু এই আইনে আবেদনকারীকে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে তিনি একজন বেআইনী অনুপ্রবেশকারী৷ পরবর্তীকালে যদি ওই আবেদনকারীকে নাগরিকত্ব না দেওয়া হয় তবে তিনি নিজের ঘোষণার দ্বারাই অনুপ্রবেশকারী বেনাগরিক হিসেবে চিহ্ণিত হয়ে যাবেন৷ মজার ব্যাপার এই যে, বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাদের নাম বৈধ বোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে ইতোপূর্বে তাদের দ্বারাই নির্বাচিত বিধায়ক ও সাংসদগণ কিভাবে বৈধ থাকবেন?এই ধরনের দ্বিচারিতাকেও ’আমরা বাঙালী’ দল সমর্থন করে না৷
কেন্দ্রের হিন্দী সাম্রাজ্যবাদী শাসকের পক্ষ থেকে অনুপ্রবেশের জন্য দেশীয় অর্থনীতিতে কুপ্রভাবের বিষয়ে প্রচার করা হচ্ছে৷ বাস্তবিকপক্ষে তথাকথিত অনুপ্রবেশের ফলে দেশের অর্থনীতির যে ক্ষতি হয় তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতিকর পুঁজিপতিদের মুনাফা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে রচিত শোষণ নীতি৷ ‘আমরা বাঙালী’ র মতে প্রাউটের (প্রগতিশীল উপযোগ তত্ত্ব) বিকেন্দ্রিত অর্থনীতির ব্লক ভিত্তিক পরিকল্পনার ’ সার্থক প্রয়োগের দ্বারা এই পুঁজিবাদী শোষণ যন্ত্রকে স্তব্ধ করে দিয়ে ’স্বয়ংসম্পূর্ণ সামাজিক অর্থনৈতিক অঞ্চল ’ ঘটন করে নীতিবাদী নেতৃবৃন্দের পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিজ, খনিজ, বনজ, জলজ, মানব সম্পদের সর্বাধিক উপযোগ করতে পারলে বর্তমান জনসংখ্যার অনেকগুণ বেশী মানুষের জীবন জীবিকার সংস্থান ও ভরণপোষণ করা সম্ভব৷ এতদব্যতীত বাংলা ও বাঙালী জাতির সার্বিক উন্নয়ন ও মঙ্গলের জন্যে ভারতীয় সংবিধানের ৩ নম্বর ধারা অনুসারে সমস্ত বাঙালী অধ্যুষিত অঞ্চল সংযুক্ত করে ‘বাঙালীস্তান’ ঘটনের দাবী ‘আমরা বাঙালী’ সংঘটন দীর্ঘ দিন ধরেই জানিয়ে আসছে৷
‘আমরা বাঙালী’র মতে এই তথাকথিত এস আই আর, সিএএ ইত্যাদি হলো সমাজে বিভাজন সৃষ্টিকারী প্রক্রিয়া,বিশেষতঃ বাঙালী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত চক্রান্তের অঙ্গ৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ, জগদীশ চন্দ্র বসু, মহান দার্শনিক শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার প্রমুখ মনীষীগণের উপস্থিতিধন্য বাঙালী জনগোষ্ঠী পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জনগোষ্ঠী৷আর বাঙালীর মাতৃভাষা বাংলা পৃথিবীর মধুরতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃত৷ এই বাংলা ভাষাতেই রচিত গ্রন্থের জন্য এশিয়া মহাদেশে প্রথম সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি৷ ভারতের জাতীয় সঙ্গীত বাংলা ভাষাতেই রচিত৷ মূলতঃ বাঙালীর রক্তের বিনিময়েই প্রাপ্ত ভারতের স্বাধীনতা৷সেই বাঙালী জাতি ও বাঙালীর মাতৃভাষা বাংলার সম্মান রক্ষায় ’আমরা বাঙালী’ সর্বদাই সমস্ত রকম ত্যাগের জন্যেই প্রস্তুত৷ তাই সমগ্র বাঙালী জনগোষ্ঠীর সকল সদস্য সদস্যার প্রতি আমাদের আবেদন ও আহ্বান---আসুন, আমরা সবাই শুধুমাত্র বাঙালী পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের দ্বারা বাংলা ও বাঙালী বিরোধী অশুভ শক্তিগুলিকে পরাভূত করে বাঙালী জাতির বিজয় সুনিশ্চিত করি৷
- Log in to post comments