কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়বাড়ন্ত মানবসভ্যতাকে যে বিপদের সম্মুখীন করবে, পরমাণু অস্ত্রের আঘাতের চেয়েও তা হবে ভয়ঙ্কর৷ উন্নত এআই ভুল হাতে পড়লে বা নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করলে তা বিশ্ব জুড়ে বিধবংসী সাইবার আক্রমণ বা স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধের সূচনা করতে পারে৷
এই আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন খোদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ৷ তিনি কৃত্রিম মেধা সংস্থা ওপেনএআইয়ের গভর্ন্যান্স টিমের প্রাক্তন গবেষক ড্যানিয়েল কোকোতাজলো৷ সম্প্রতি আমেরিকার টিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য ডেইলি শো’-তে কথা বলতে গিয়ে হতাশার কথাই শুনিয়েছেন তিনি৷ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই গবেষক৷ তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ঝুঁকিগুলি প্রকট হতে আর বেশি দেরি নেই৷ আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সমস্যা দেখা দিতে পারে৷ এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও খুব একটা আশাবাদী নন কোকোতাজলো৷ বরং একটি হতাশাজনক চিত্রই তুলে ধরেছেন তিনি৷ কী ভাবে দ্রুত উন্নত হওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাগুলি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন এই গবেষক৷ তাঁর এই সতর্কবার্তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বৈশ্বিক উদ্বেগেরই প্রতিফলন৷
কোকোতাজলোর বক্তব্যের মূল সুরটি হল, এআই ব্যবস্থাকে যদি মানুষের নৈতিকতা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা না হয়, তবে তা অচিরেই মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে৷ ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স’-এর (এজিআই) নিরলস সাধনার চেয়ে নিরাপত্তার অগ্রাধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন তিনি৷ কিন্তু এআই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলির উপর আস্থা বজায় রাখতে পারেননি তিনি৷
যদি এআই সিস্টেমের লক্ষ্য এবং মানুষের নৈতিকতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকে, তবে এটি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে৷ যদি এআই-এর নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাত থেকে চলে যায়, এর পরিণাম মানবজাতির বিলুপ্তি৷ আর এর আশঙ্কা ৭০ শতাংশের কাছাকাছি৷ এমনটাই মত কোকোতাজলোর৷ ‘বিলুপ্তি’ শব্দটির উপর জোর দিতেও শোনা গিয়েছে তাঁকে৷
এই ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী মানবজাতিকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুললেও এআই গবেষক জোর দিয়ে বলেছেন যে, এআই-এর গতি শুধু দ্রুতই নয় বরং আগ্রাসী৷ প্রতি বছর তা আরও বাড়ছে৷ তিনি বলেন, ‘‘এআই-এর অগ্রগতি অত্যন্ত দ্রুত হবে এবং এটি নাটকীয় ভাবে ত্বরান্বিত হবে৷’’ শুধু তা-ই নয়, কৃত্রিম মেধার বাড়বাড়ন্তের সময়সীমাই তাঁর সতর্কবার্তাকে আরও বেশি উদ্বেগজনক করে তুলেছে৷ তাঁর উদ্বেগের মূল কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে মানবজাতির ক্ষমতা কমে যাওয়া৷ এই বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে ওপেনএআইয়ের প্রাক্তন গবেষককে৷ বর্তমানে একটি এআই সিস্টেম বন্ধ করতে হলে তা প্লাগ খুলে ফেলার মতোই সহজ মনে হতে পারে৷ কিন্তু কোকোতাজলো সতর্ক করেছেন যে, ভবিষ্যতে এই বিকল্প না-ও থাকতে পারে৷
যেহেতু এআই সিস্টেমগুলো প্রতিরক্ষা ও সামরিক নেটওয়ার্কের মতো পরিকাঠামোর গভীরে আরও বেশি করে গেঁথে যাচ্ছে, তাই সেগুলিকে থামানোর যে কোনও প্রচেষ্টা অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠতে পারে৷ এমন পরিস্থিতিতে, মানুষ হয়তো বিচ্ছিন্ন যন্ত্রের সঙ্গে নয়, বরং এমন সিস্টেমের সঙ্গে মোকাবিলা করবে যা স্বাধীন ভাবে এবং বৃহৎ পরিসরে কাজ করতে সক্ষম৷
উন্নত এআই ভুল হাতে পড়লে বা নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করলে তা বিশ্ব জুড়ে বিধবংসী সাইবার আক্রমণ বা স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধের সূচনা করতে পারে, এই আশঙ্কা বেশি করে ভাবাচ্ছে কোকোতাজলো ও তাঁর সমমনস্ক কৃত্রিম মেধা গবেষকদের৷ একাধিক বিশেষজ্ঞ ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ করছেন যে, ২০২৭ বা ২০২৮ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রে মানুষের সমতুল্য বুদ্ধি বা ক্ষমতায় পৌঁছোবে৷ এর পরবর্তী ‘বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরণের’ মধ্যেই বিপদটি নিহিত৷