পরিচয় ও প্রজাতি ঃ তোমরা হয়ত জান ফুলকপি–ৰাঁধাকপি, লেটুস [Letuca sativa], ৰ্রকোলি এরা সবাই আদিতে এক প্রজাতির ছিল৷ ওদেরই কিছুটা দূর সম্পর্কের জ্ঞাতি ছিল কুকসিমা, ক্যালেণ্ডুলা ও পপির পূর্বপুরুষেরা৷ কুকসিমা, ক্যালেণ্ডুলা ও গাঁদা বর্গীয় গাছেদের রক্তপাত নিবারণের ক্ষমতা আছে৷ ওদের থেকে তাই এই ধরনের ওষুধও তৈরী হয়৷ কপিতেও এই ধরনের গুণ অল্পমাত্রায় আছে৷ প্রাচীনকালে এক থাকতে থাকতে পরে লেটুস প্রশাখা ও ফুলকপি প্রশাখা পৃথক হয়ে যায়৷ ফুলকপি প্রশাখায় এসে যায় এক সঙ্গে অগুণতি শাদা বা হরিদ্রা বর্ণের ফুল৷ আমরা ভাবি একটি ফুলকপি বুঝি একটি ফুল৷ না, না, তা নয় একটি ফুলকপি অগুণতি ফুলের সমাহার৷ লেটুস ও ৰাঁধাকপিও কতকটা এক৷ তবে লেটুস ৰাঁধে না, ৰাঁধাকপি ৰাধে–এইটুকুই তফাৎ৷ ৰ্রকোলি ফুলকপি জাতীয়ও হয় আবার ৰাঁধাকপি জাতীয়ও হয়৷ একটি ফুলকপি গাছে একাধিক ফুলকপি হলে বা একটি ৰাঁধাকপি গাছে একাধিক ৰাঁধাকপি হলে, তাকে বলে ৰ্রকোলি৷ ফুলকপি পুষ্পশাকের অন্তর্ভুক্ত৷ ৰাঁধাকপির সুরুয়া অস্থিরোগের (হাড়ের রোগ) ঔষধ৷ ফুলকপি–সেদ্ধ নুন ও অল্প মশলার সঙ্গে খেলে তা অস্থি ও চক্ষূরোগের ঔষধ৷ ফুলকপির ফুল একটু গুরুপাক৷
গুণে লেটুস ও ৰাঁধাকপি দুই–ই পত্রশাক বর্গীয় হলেও লেটুস তাড়াতাড়ি হজম হয়৷ তাই তা দিয়ে স্যালাড তৈরী করে কাঁচা খাওয়া হয়৷ ৰাঁধাকপি অত তাড়াতাড়ি হজম হয় না৷ তাই তা দিয়ে স্যালাড করে কাঁচা খাওয়া যায় না৷ পত্রশাক হিসেবে ৰাঁধাকপি ও লেটুসের যে গুণ আছে তা বেশী নুন–ঝাল–তেল দিয়ে বঁাধলে নষ্ট হয়ে যায়৷ তাই তাদের নামমাত্র তেল দিয়ে ভাপে সেদ্ধ করে সড়সড়ি রেঁধে খাওয়াই ভাল৷ সড়সড়ি আর চচ্চড়ি এক জিনিস নয়৷ চচ্চড়ি গরম জলে সেদ্ধ হয়৷ সড়সড়ি হয় ভাপে৷ চচ্চড়িতে যত তেল ঢ়ালবে, তত সোয়াদ ৰাড়বে৷ সড়সড়িতে নামমাত্র তেল ছিটিয়ে দিতে হয়৷ সড়সড়িতে গোড়ার দিকে অল্প পরিমাণে গোটা সরষে সামান্য তাতিয়ে নিয়ে ঢ়েলে দিলে সোয়াদ একটু ৰাড়ে৷
ছাঁচি কুমড়ো বা চাল কুমড়ো
পরিচয় ও প্রজাতি ঃ ছাঁচি কুমড়ো সাধারণতঃ মাটিতে হয় না৷ ঘরের চালাতে বা মাচাতে এই লতানে গাছটাকে তুলে দিতে হয়৷ এর জন্যে ছাঁচি কুমড়োকে গ্রাম–ৰাংলায় অনেকে চালকুমড়োও ৰলেন৷ এরও তিনটি ঋতুগত প্রজাতি রয়েছে৷ বর্ষাতী চালকুমড়োকে অবশ্যই মাচায় অথবা ঘরের চালে তুলে দিতে হয়৷ শীতের প্রজাতির ছাঁচি কুমড়োকে মাটিতেই ৰেড়ে যেতে দেওয়া হয়৷ তবে কেউ ইচ্ছে করলে মাচায় তুলে দিতে পারেন৷ গ্রীষ্মকালীন চালকুমড়ো মাটিতেই ৰেড়ে যেতে থাকে৷ (একেও) কেউ ইচ্ছে করলে মাচায় তুলে দিতে পারেন৷ তবে বর্ষাতী চালকুমড়োকে মাচায় তুলে দিতেই হবে, নইলে পোকার আক্রমণে ফলটি নষ্ট হবেই.....গাছও নষ্ট হবে৷
ফলের আকার ৰাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বাইরেকার সবুজ রঙটার ওপর একটা শাদা আস্তরণ পড়তে থাকে৷ তাই ৰাংলার কোন কোন জায়গায় একে চুনো–কুমড়োও ৰলা হয়৷ রাঁচী অঞ্চলে বলা হয় ‘রাখাস কোহড়া’৷ বিহারের কোথাও কোথাও বলা হয় ‘ভুয়া’, কোথাও কোথাও বলা হয় ‘ভতুয়া’–ভাল হিন্দুস্তানীতে বলা হয় ‘পেঠা’৷ ছাঁচি কুমড়ো ভারতের একটি সাবেকী জিনিস.... বাইরে থেকে আসেনি৷ প্রাচীন ৰাংলায় যাঁরা শাক্ত দেবী–দেবতাকে বৈষ্ণবীয় রীতিতে অর্চনা করতেন, তাঁরা বলি দানের উদ্দেশ্যে পশু–পক্ষীর পরিবর্ত্তে আখ, কলা, সুপুরী, ছাঁচি কুমড়ো বলি দিতেন৷ বলি দানের অধিকার ছিল কেবল পুরুষের৷ তাই দীর্ঘকাল ধরে আখ, কলা, সুপুরী, ছাঁচি কুমড়ো মেয়েরা কাটতেন না৷
উদররোগে, অগ্ণিমান্দ্যে ও স্নায়ুতন্তুর রোগে ছাঁচি কুমড়ো ঃ পাকা ছাঁচি কুমড়ো উদর রোগের পক্ষে ভাল৷ দীর্ঘকালীন উদর রোগে ছাঁচি কুমড়ো ভাল ফল দেয়৷ ছাঁচি কুমড়োর ঘণ্ট বা নারকোল–কুমড়ি ৰাঙালীর একটি প্রিয় ভোজ্য৷ স্নায়ুকোষ ও স্নায়ুতন্তুর রোগেও কাঁচা বা পাকা ছাঁচি কুমড়ো ঔষধের কাজ করে৷ ছাঁচি কুমড়োর মধ্যে উদর ও স্নায়ু রোগের ঔষধীয় গুণ নিহিত থাকায় মধ্য যুগে ৰাঙালী মেয়েরা অঘ্রাণ মাসে নারকোল কুরুনিতে ছাঁচি কুমড়ো কুরে ডাল–বাটার সঙ্গে মিশিয়ে বড়ি তৈরী করতেন৷ ছাঁচি কুমড়ো অগ্ণিমান্দ্যের (Loss of apetite) ঔষধ ঙ্মরস বের করে সেই রস বা তরকারী হিসাবেৰ৷ ছাঁচি কুমড়ো যত কচি–কাঁচা অবস্থায় থাকবে ততই সে স্নায়ুকোষ ও স্নায়ুতন্তুর পক্ষে ভাল৷ আর যত বেশী পূর্ণত্বের দিকে যেতে থাকে তত বেশী যকৃত ও পেটের রোগের ভাল ঔষধ৷ শুকনো অবস্থাতেও এ অগ্ণ্যাশয়ের ঔষধ৷
ছাঁচি কুমড়ো ৰীজের
তৈল ও চর্মরোগ
আয়ুর্বেদে ছাঁচি কুমড়ো ৰীজের তেলের ঔষধীয় ব্যবহার আছে৷ ছাঁচি কুমড়ো ৰীজের তেল চর্ম রোগের ঔষধ৷
ছাঁচি কুমড়োর মোরব্বা
উত্তর ভারতের আগ্রার ও পূর্ব ভারতের শিউরীর (বীরভূম জেলা)* পেঠা বা ছাঁচি কুমড়োর মোরব্বা প্রসিদ্ধ৷ কলকাতার কাছাকাছি এলাকায় ছাঁচি কুমড়োর মোরব্বাকে কেউ কেউ ‘কুমড়োর মেঠাই’ ৰলে থাকেন৷ (‘দ্রব্যগুণে রোগারোগ্য’
–শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার)