শিবের সময় উত্তর-পশ্চিম কোণ দিয়ে ভারতে আর্যদের আগমন শুরু হয়ে গেছল৷ অনেকেই এসেছিলেন, অনেকে আসছিলেন, অনেকে আবার আসবার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন৷ যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের সেই বৈদিক ভাষার প্রভাব তৎকালীন ভারতের ভূমিসন্তান ‘কশ, ‘সিথিয়ান’, ‘ইউ-চি’, ‘দক্ষিণ কুষাণ’’ প্রভৃতিদের কথ্য ভাষার ওপর ব্যাপকভাবে পড়েছিল৷ ভারতের তৎকালীন জনভাষা সংস্কৃতের ওপর বৈদিক ভাষার প্রভাবও অবশ্যই পড়েছিল৷ তবে সে প্রভাবটা একতরফা নয় অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষার প্রভাবও বৈদিকে পড়েছিল৷
তন্ত্রের জন্ম ভারতে৷ তাকে বিধিবদ্ধ রূপ শিব দিয়েছিলেন কিন্তু শিবের পূর্বেও বিক্ষিপ্ত ও অমার্জিত রূপে তন্ত্র (কাশ্মীর তন্ত্র ও গৌড়ীয় তন্ত্র) ভারতে ছিল৷ তাই স্বাভাবিক নিয়মেই মন্তব্য করতে হচ্ছে যে শিব ছিলেন তান্ত্রিক পরিবেশে লালিত পালিত, তবে সে তন্ত্র ধ্রুপদী তন্ত্র নয়৷
বৈদিক ভাষা ও বৈদিক ধর্মের সঙ্গেও শিবের সম্যকপরিচয় ছিল৷ তন্ত্রে বেদে দু’য়েতেই শিবকে
পাচ্ছি, কিন্তু খুব প্রাচীন গ্রন্থে পাচ্ছি না কারণ খুৰ সুপ্রাচীন কালে গ্রন্থ লেখা সম্ভব ছিল না৷ অক্ষরজ্ঞান ছিল না৷ তন্ত্রে ৰলা হ’ত, এইটা করবে, ওইটা করবে এই সব শিক্ষা গুরু প্রমুখাৎ শুণে ৰুঝে নিও, গুরুর মুখ থেকে শুণে ৰুঝে নিও, কারণ বই লেখা সম্ভব ছিল না, অক্ষর ছিল না৷ আর বেদেতেও ৰলা হয়েছে যে গুরুর কাছ থেকে কাণে শুণে নিতে হয়৷ তাই বেদকে ৰলা হয় ‘শ্রুতি’৷ ‘শ্রুতি’ মানে কাণ৷ যা কাণে শুণে শেখা হয় তা হ’ল ‘শ্রুতি’৷
শিবের সময়টা ছিল ভারতের একটা দ্বন্দ্বাত্মক সময়৷ বাইরে থেকে আর্যরা আসছে, ভারতেও নিজের তন্ত্রধর্ম রয়েছে৷ সেই একটা সংঘাতময় পরিবেশে শিবের আবির্ভাব৷
‘শিব’ শব্দের মানে কী? তন্ত্র, বেদ আর যা কিছু মৌখিক লৈখিক প্রমাণ পাওয়া যায় তা থেকে ‘শিব’ শব্দের তিনটি মানে পাচ্ছি৷ প্রথম ও প্রধান মানে হচ্ছে, ‘শিব’ মানে কল্যাণ বা মঙ্গল৷
‘‘অনাদ্যনন্তমখিলস্য মধ্যে বিশ্বস্য স্রষ্টারমনেকরূপম৷
বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারং জ্ঞাত্বা শিবং শান্তিমত্যন্তমেতি৷৷’’
এখানে ‘শিব’ শব্দের অর্থ কল্যাণ৷ ‘শিবমস্তু’ মানে কল্যাণমস্তু৷ এই কল্যাণাত্মক শিবের প্রতিভূ হচ্ছে ‘কল্যাণসুন্দরম৷ ৰলা হয়, শিব পঞ্চমুখে জগতের কল্যাণ করে যাচ্ছেন, সেবা করে যাচ্ছেন৷ তিনি পঞ্চমুখ৷ বামদেব, কালাগ্ণি বাঁ দিকে দুটো ডান দিকে দক্ষিণেশ্বর, ঈশান, আর মাঝখানে রয়েছেন যে মহানিয়ন্ত্রক সেই সকল কর্মৈষণার পরিভূ তথা প্রতিভূ হচ্ছেন ‘কল্যাণসুন্দরম৷ অর্থাৎ শিবের ডান দিকে যে দক্ষিণেশ্বর রূপদক্ষিণা মানে লোককে করুণা করছেন সেই রূপ, সেই ভূমিকা, ও ঈশান অর্থাৎ যিনি নিষ্ঠার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন দু’টো ভূমিকাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন কে---না, তার মধ্যবর্তী ভূমিকা কল্যাণসুন্দরম৷ তিনি এই দু’টো ভূমিকায় কেন অবতীর্ণ হয়েছেন! না, জীবের কল্যাণের জন্যে৷ কল্যাণ ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য তাঁর নেই৷ আবার তাঁর বাঁ দিকে দু’টো মুখএকটা বামদেব, আর অপরটা কালাগ্ণি৷ বামদেব অতি ভীষণ...রুদ্র...রুদ্রাতিরুদ্র...রুদ্রোপি রুদ্রঃ, যিনি কাঁদিয়ে মানুষকে শিক্ষা দেন কিন্তু উদ্দেশ্য হ’ল শিক্ষা দেওয়া, অকল্যাণ করা নয় আর কালাগ্ণি, যিনি মানুষকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে জেরবার করে দিয়ে শিক্ষা দেন কিন্তু উদ্দেশ্য হ’ল শিক্ষা দেওয়া, কল্যাণ করা৷ এই যে বামদেবের ভূমিকা ও কালাগ্ণির ভূমিকা, এ দু’টো ভূমিকাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন তাঁর মধ্যবর্তী ভূমিকা কল্যাণসুন্দরম অর্থাৎ কল্যাণার্থেই তিনি সুন্দর, কল্যাণ করেন বলেই তিনি সুন্দর৷ তিনি ভীষণ ও তিনি অতি শান্ত৷ কিন্তু তাঁর ভীষণতা ও তাঁর শান্ততা দু’’টোর পশ্চাতেই রয়েছে কল্যাণসুন্দরমভাব৷ তাই কঠোর হলেও লোকে তাঁকে ভালবাসে, কোমল ৰলেও লোকে তাঁকে ভালবাসে৷ তা’ এই যে শিবের ভূমিকা, এই ভূমিকা হ’ল কল্যাণের ভূমিকা৷ তাই ‘শিব’ শব্দের প্রথম অর্থই হল কল্যাণ বা মঙ্গল৷
‘শিব’ শব্দের দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে চিতিশক্তি Cognition in its zenith status zenith status of the Cognitive Principle– i.e., he Supreme Non-attributional Entity– Supreme Non-attributional process, the Supreme Non-attributional Entity beyond the faculties of all existential bondages)৷ এইটাই হ’ল ঠিক ব্যাখ্যা৷ এই হ’ল ‘শিব’ শব্দের দ্বিতীয় মানে৷ আমি মানেগুলো পরে সুবিধামত ৰলে যেতে থাকব৷
তৃতীয় অর্থটা হ’ল সদাশিব যিনি অনুমানিক সাত হাজার বৎসর আগে পৃথিবীতে এসে পৃথিবীর প্রতিটি ধূলিকণাকে পবিত্র করে গেছেন, তাঁর সম্পূর্ণ সত্তাকে জীবের কল্যাণে লাগিয়ে দিয়ে গেছেন৷ মনে রেখো, আমি মানবের কল্যাণ বলিনি কারণ সৃষ্ট জগতে মানব ছাড়াও পশু-পক্ষীও আছে, সৃষ্ট জগতে বৃক্ষ-লতাও আছে৷ শিব সবাইকার জন্যে৷ তাই জীবের কল্যাণে তিনি তাঁর সবটাই বিলিয়ে দিয়ে গেছেন৷ তাই তাঁকে ৰলা হত সদাশিব৷ ‘শিব’ মানে কল্যাণ, মঙ্গল যিনি সর্বদাই মঙ্গল রূপ নিয়ে রয়েছেন, সবাইকার মঙ্গল করাই যাঁর আস্তিত্বিক ব্রত তিনিই সদাশিব৷ আমি এঁর সম্বন্ধে ধীরে ধীরে তোমাদের বলব৷
আমি আশা করি, এই বিরাট পুরুষের, এই বিরাট ব্যষ্টিত্বের সম্বন্ধে আলোচনা করে তোমাদের ভালই লাগবে৷ তমসাবৃত নিশীথে আলোর আমেজ কি কেবল মানুষই চায়?...সবাই চায়৷ তিমিরাচ্ছন্ন আস্তিত্বিক বিস্মৃতির ভেতর দিয়ে উত্তরণের উত্তাপ..বেঁচে থাকা...বেড়ে থাকার আকৃতির পরিপূর্তি সবাই চায়৷ সবাইকার এই চাওয়াটার পাওয়ার মাধুর্যে পূর্ণত্বের দিকে এগিয়ে চলবার প্রথম সুযোগ যে মহাসম্ভূতির মাধ্যমে পৃথিবী পেয়েছিল তাঁর সম্বন্ধে যথাযথ ভাবে আলোচনা মানুষ করেনি৷ কেন করেনি সে প্রশ্ণ আজকের দিনে অবান্তর৷ শিবের অবদানকে ঠিক ভাবে জানা বা তার মূল্যায়ন ও মূল্যাঙ্কন করা প্রতিটি জীবেরই অবশ্য করণীয়, ও তা করতে গেলে সেই সত্তাটিকে বাদ দিয়ে করা যায় না৷ সত্তাকে উপেক্ষা করে তার জ্যোতিঃকণা নিয়ে আনন্দ পাওয়া যেতে পারে, তবে সেই আনন্দে পূর্ণতার বৈভব থাকে না৷ (শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তি রচিত নমঃ শিবায় শান্তায় গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত)