অতি প্রাচীন তিমির শরীরেই লুকিয়ে বার্ধক্য জয়ের চাবিকাঠি৷ তারা বো-হেড তিমি৷ স্বাভাবিক নিয়মেই তারা বাঁচে ২৬৮ বছর বা তারও বেশি৷ বাস করে মেরু এলাকায়৷ ২০০৭ সালে এমনই একটি বো-হেড তিমি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, যার বয়স তখনই ছিল ২০০ বছর৷ সেই তিমির চোখের জল পরীক্ষা করে, তার বয়স নির্ধারণ করেন বিজ্ঞানীরা৷ তার পরেই টনক নড়ে৷ কোন জাদুতে শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে রয়েছে এই তিমিরা? উত্তর খুঁজতে গিয়েই রহস্যটা জেনে ফেলেন বিজ্ঞানীরা৷ তিমির জিনই যে জাদুকাঠি, তা জানতে বাকি থাকেনি৷ বর্তমান সময়ে বার্ধক্যকে হারিয়ে যৌবন ধরে রাখার যে চেষ্টা শুরু হয়েছে, তাতে ফের একবার বো-হেড তিমি উঠে এসেছে আলোচনায়৷ আমেরিকার রচেস্টার ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা নতুন করে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন৷ ‘নেচার’ জার্নালে সেই গবেষণার খবর প্রকাশিত হয়েছে৷ জিনের প্রোটিনই সেই সোনার কাঠি তিমিরা আকারে-আয়তনে বিশাল৷ ওজনও বিপুল৷ তাই এদের শরীরে কোষের সংখ্যা অজস্র৷ মানুষের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি৷ এই বিপুল সংখ্যক কোষে এমন কিছু প্রোটিন থাকে, যারা কোষের জন্ম-মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করে৷ বুড়ো হওয়া কোষের মৃত্যু ঘটলেই, নতুন কোষের জন্ম হয়৷ এই প্রক্রিয়া হিসেব মেনেই চলতে থাকে৷ বিজ্ঞানী ভেরা গরবুনোভা ও আন্দ্রে সেলুয়ানভ বো-হেড তিমির শরীর থেকে নেওয়া এমন কোষগুলিকে অণুবীক্ষণের নীচে রেখে দেখেছেন, শুধু কোষ নয়, আসল চাবিকাঠি এক প্রোটিনের হাতে৷ এর নাম সিআইআরবিপি৷ এই প্রোটিনের কাজ হল ডিএনএ-র ক্ষত সারানো৷ প্রোটিনটি এমন করিতকর্মা যে ডিএনএ-তে সামান্য বদল ঘটলেই তা ঝটপট সারিয়ে ফেলতে পারে৷ একমাত্র এই প্রোটিনের কারণেই তিমির জিনে কোনও মিউটেশন বা রাসায়নিক বদল ঘটে না৷ এমনকি বো-হেড তিমিরা ক্যানসার থেকেও শত যোজন দূরে থাকে৷ দীর্ঘ জীবনে কোনও রোগব্যাধি হয়ই না তাদের৷ মানুষের শরীরে প্রতি দশ বছর অন্তর হার্ট, লিভার, কিডনি, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ৫-১০ শতাংশ হারে কমতে থাকে৷ সাধারণত ৩০ বছরের পর থেকেই এই ক্ষয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়৷ তাই দেখা যায়, ৫০ বছরে গিয়ে হয়তো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির ক্ষমতা প্রায় ২০ শতাংশ কমে গিয়েছে৷ ৮০ বছরে গিয়ে তাই ৫০ শতাংশ বা তার বেশি কমে যাবে৷ এর কারণ হল, কোষের ক্ষয় ক্রমাগতই হয়ে চলেছে৷
কোষের মূল জিনগত উপাদান হল ক্রোমোজোম৷ দেখতে ‘এক্স’-অক্ষরের মতো৷ এর দু’’টি বাহু, ছোটটির শেষ প্রান্তকে বলে টেলোমিয়ার৷ ক্ষয়টা হয় এখানেই৷ কোষ কত বার বিভাজিত হবে, তারও হিসেব আছে৷ যখন বিভাজন প্রক্রিয়া একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে, তখনই কোষের মৃত্যু হবে৷ আর যদি কোনও কারণে জিনের বিন্যাসে বদল চলে আসে, তা হলেই বিপদ৷ তখন কোষের অস্বাভাবিক বিভাজন ঘটে হয় তা ক্যানসারের রূপ নেবে, না হলে কোনও জটিল জিনগত রোগের জন্ম হবে৷ এই গোটা প্রক্রিয়াটাই যদি ঘুরিয়ে দেওয়া যাবে, অর্থাৎ, টেলোমিয়ারের ক্ষয় হবে না, কোষের জন্ম-মৃত্যুর প্রক্রিয়াটি থেমে যাবে না৷ নতুন কোষের জন্ম হতেই থাকবে৷ তা হলেই আর বুড়ো হওয়া হবে না৷ মৃত্যুও আসবে না চট করে৷ অনন্ত আয়ু পাবে মানুষ৷ একমাত্র ওই প্রোটিনই এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে বলে দাবি৷ ইতিমধ্যেই প্রোটিনটি সংগ্রহ করে তা বিশেষ উপায়ে কিছু মানুষ ও পতঙ্গের শরীরে ঢোকানো হয়েছে৷ যাদের শরীরে প্রোটিন ঢুকেছে, তাদের রোগব্যাধি সেরেছে বলেই দাবি৷ যে পতঙ্গেরা প্রোটিনটি পেয়েছে, তাদের আয়ুষ্কাল স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়েছে৷ তবে এখানে একটি প্রশ্ণ থেকেই যায়৷ মানুষের শরীরে আদৌ প্রোটিনটি দীর্ঘায়ু হওয়ার বাসনা পূরণ করতে পারবে কি না৷ কারণ জলজ পরিবেশের যে তাপমাত্রায় প্রোটিনটি ক্রিয়াশীল, তা স্থলভাগের তাপমাত্রায় কতটা কার্যকরী হবে, সে নিয়ে সংশয় রয়েছেই৷