স্বাধীনতার পর থেকে এ যাবৎ যে দলই ভারতবর্ষের ক্ষমতার অলিন্দে আসীন হয়েছে তারা সবাই কেবল সংকীর্ণ দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিতেই দেশ শাসন করেছে৷ ক্ষমতায় আসীন হওয়া বা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কংগ্রেস, বিজেপি, কমিউনিস্ট পাটি, তৃণমূল ও দক্ষিণের অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলো এ যাবৎ শুধুই নিজেদের দলীয় স্বার্থই দেখতে গিয়ে সাধারণ নাগরিককে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও জনগণের প্রতি চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা করেছে৷ স্বাধীনতার কেন্দ্রে কংগ্রেস জমানা থেকে শুরু করে বর্তমান বিজেপি সরকার, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস থেকে শুরু করে বামফ্রন্ট শাসন, এরপর তৃণমূলের পর থেকে বিজেপি শাসন৷ কথায় আছে --- যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ৷
স্বভাবগতভাবে অনেক মানুষই আত্মকেন্দ্রিক বা ব্যষ্টিকেন্দ্রিক৷ পারিবারিক, সামাজিক, দলীয় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রেও এইসব আত্মকেন্দ্রিক ব্যষ্টিদের দাপট দেখা যায়৷ এই শ্রেণীর মানুষেরা অত্যন্ত অহংকারী দাম্ভিক ও কেউ কেউ দুর্বিনীত ও উদ্ধত প্রকৃতির হয়৷ আবার কেউ কেউ হয় হিমশীতল ঠান্ডা মেজাজের, কিন্তু ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণ৷ এই সমস্ত ব্যষ্টিকেন্দ্রিক মানুষেরা পরমতসহিষ্ণু হয় না৷ অন্যের উপদেশ বা পরামর্শ তারা গ্রহণ করতে চায় না৷ যখন ক্ষমতার অলিন্দে এসে ক্রমশঃ শীর্ষস্তরে পৌঁছায় তখন এরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে৷ ভুলে যায় পূর্বসূরীদের মহান ঐতিহ্য৷ আদর্শ নাগরিকদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এরা ক্ষমতায় আসে পরে ভুলে যায় জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার কথা৷ ক্ষমতায় টিকে থাকতে দলীয় ভোট ব্যাংকের জন্য এরা কখনো হাড়হিম করা সন্ত্রাস থেকে, সংখ্যালঘু তোষণ করে৷ আবার ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছাতে কোন পার্টি,বহু ধর্ম-ভাষার দেশ ভারতবর্ষে ধর্মীয় বিভেদের বিদ্বেষের বীজ বপন করে ধর্মীয় মেরুকরণ করে৷ ঈপ্সিত ক্ষমতা হাসিল করতে এস.আই.আর করে লক্ষ লক্ষ ভোটার বাদ দিয়ে দেয়৷ রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগ করে বিরোধীদের প্রতি ইডি সিবিআই লেলিয়ে দিয়ে রাজ্যে গুন্ডা দমন আইন ও কেন্দ্রে কেন্দ্রীয় আইনের অপপ্রয়োগ করে পুলিশকে দলদাস করে বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের দেশদ্রোহী বলে জেলে বন্দী করে৷ দলীয় সমর্থককে বিচার ব্যবস্থার শীর্ষস্থানে বসানোর অপচেষ্টা থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনারকে দলদাস বানিয়ে গোটা নির্বাচন ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে রাজ্যে রাজ্যে বিরোধীদের ক্ষমতা থেকে ছলে বলে কৌশলে উৎখাত করতে হাজার হাজার কোটি কালো টাকা দিয়ে সংসদ বিধায়ক কিনে বিরোধী দলগুলোকে ভেঙে দেয়৷ বিরোধীশূন্য ভারতবর্ষে চীনের মতো এক দলীয় শাসন শ্লোগান এক দেশ এক জাতি এক নির্বাচন ও হিডেন এজেন্ডা হল বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বাতিল করে গণতন্ত্রের বকলমে বা মুখোশ পরে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কায়েম ক’রা৷ অতীতে কংগ্রেস জমানায় ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরতান্ত্রিক কার্যাবলীর ব্যাপারে নাগরিকদের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা রয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বামফ্রন্টের শাসনে সিপিএমের পার্টির স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা ক্ষমতায় টিকে থাকতে তাদের পৈশাচিক সন্ত্রাস বৈজ্ঞানিক রিগিং ভয়াল অভিজ্ঞতা এখনও মানুষের দগদগে ঘায়ের মতো করছে৷ তৃণমূল জমানায় মমতার মমতাময়ী রূপ থেকে দাম্ভিক অহংকারী স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা, সংখ্যালঘু তোষণ, আকণ্ঠ দুর্নীতি শুদ্ধিকরণের পরিবর্তে চুপ করে থাকা, কড়া হাতে দল পরিচালনায় চরম ব্যর্থতা৷ এছাড়া যোগ্যতা অনুসারে দল ও প্রশাসনে যোগ্যদের দায়িত্ব দেওয়ার পরিবর্তে স্তাবকদের প্রতি অন্ধবিশ্বাস করে তাদের গুরুদায়িত্ব দেওয়া৷ দলীয় প্রার্থীদের বঞ্চিত করে সিনেমার তথাকথিত সেলিব্রিটিদের সামনে নিয়ে আসা প্রভৃতি মমতা ও তার দলের নির্বাচন ভরাডুবি হয় ফলে দল টুকরো টুকরো হয়৷ এগুলিই দলের মূল পতনের কারণ৷
তাই বর্তমান রাজনীতির চালচিত্র দেখে একটা কথা বলতে হচ্ছে যে বর্তমান রাজনীতি হল বিনা মূলধনের লাভজনক ব্যবসা৷ নীতিহীন আজকের রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ণ হতে হতে এখন দুর্বৃত্তদের রাজনীতিকরণ হয়েছে৷ তাইতো বর্তমানে ব্যভিচারী বালিশ চাটন ঋতব্রত ও দুর্নীতিগ্রস্ত, তোলাবাজ নেতা, বিধায়ক ও সংসদদের রমরমা৷ এই সমস্ত দুর্নীতিবাদরা জেল যাত্রা থেকে বাঁচতে কোটি কোটি কালো টাকার লোভে দল বদলু হয়েছে৷ কথায় আছে--- ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়৷
কিন্তু আমাদের দেশের জনগণ নির্লজ্জ বেহায়া দুর্নীতিবাজ ক্ষমতালোভী বিভিন্ন রাজনীতির বেওসায়ীদের প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে৷ প্রতিবার বোট দিয়ে তাদের ক্ষমতায় আনছে, আর তারপর বারংবার জনগণ এদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে৷
তাই এখন সময় হয়েছে এইসব ধাপ্পাবাজ নীতিহীন রাজনীতির ব্যবসায়ীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করার৷
জনগণ যখন এই রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজদের কাছে বারংবার ঠকে বিভ্রান্ত হতাশ হয়ে ভাবছেন লঙ্কায় অর্থাৎ ক্ষমতায় যে যাবে তারা কি সব সময় শুধুই রাবণ হবে? রাম হবে না?
তাদের উদ্দেশ্য বলি এর সমাধান একটাই৷ এখন প্রয়োজন আধ্যাত্মিকতা ভিত্তিক সর্বাত্মক জীবনাদর্শের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার করে সমাজের বর্তমান ভোগ সর্বস্ব জীবনযাত্রার পরিবর্তে আধ্যাত্মিক জীবনচর্যার বাস্তবায়ন৷ দ্বিতীয় সর্বাত্মক জীবনাদর্শ আশ্রিত একদল সৎ, খাটি, আদর্শবাদী নেতৃত্বকে শাসন ব্যবস্থায় সর্বস্তরে নিয়ে আসা৷ বলাবাহুল্য শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার প্রণীত প্রাউটের সর্বাত্মক জীবনাদর্শের অনুসারে ও তার ভিত্তিতে তৈরি সদ্বিপ্রদের নিয়ে সদ্বিপ্রতন্ত্রই হল মুশকিল আসান।
- Log in to post comments