আন্তরিক ভাব ও অনুভূতি সমূহ প্রকাশ করার যে মাধ্যম, তাকে বলা হয়--- ভাষা৷ সুতরাং ভাষা হচ্ছে--- প্রতিটি মানুষের প্রাণীন সম্পদ বা প্রাণধর্ম৷ কিন্তু এই ভাষা হচ্ছে---মানুষের সত্তাগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত৷ যদিও একজন মানুষ একাধিক ভাষায় কথা বলতে সক্ষম, তবুও বলে রাখি, মাতৃভাষায় ভাব প্রকাশ করা সর্বাধিক সহজ৷ কারণ অন্য যে কোন ভাষায় সহজতর উপায়ে মনোভাব প্রকাশ করা সম্ভব হয় না৷ সুতরাং অন্যান্য ভাষার তুলনায় মাতৃভাষার মহত্ব যে কোন মানুষের জীবনে সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ৷
শৈশবে মাতৃদুগ্দ পান করতে করতে যে ভাষা শিখেছি, তার নাম---মাতৃভাষা৷ অতএব মাতৃভাষার গুরুত্ব অবশ্যই মাতৃদুগ্দ সম৷ এটা অবশ্যই লক্ষণীয় বিষয় যে একটা মানুষ তার মাতৃভাষার মাধ্যমে তার অন্তরের ভাব ও ভাবনা যত সহজ ও সরল ভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম, অন্যান্য ভাষার তা সম্ভব নয়৷ কারণ মাতৃভাষায় কথা বলে মানুষ স্বচ্ছন্দতা অনুভব করে৷ কিন্তু অন্য ভাষায় কথা বলতে গিয়ে তার সেই স্বাভাবিকতা কোথায় যেন হারিয়ে যায়৷
মাতৃভাষা প্রেমিক মানুষেরা প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারী তারিখে বেশ ধূমধামের সাথেই মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে৷ যদিও এই তারিখে বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়, তবুও বলা অসঙ্গত হবে না যে, বাঙালীর জীবনে এই দিনটি সর্বাধিক মহত্বপূর্ণ৷ সুতরাং আজকের আলোচ্য বিষয়---আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রহস্যময় ইতিহাস৷
১৯৪৭ সাল, ১৫ই আগষ্ট৷ প্রায় দুই বৎসর কাল ভারত শাসন করার পর সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হাতে ভারতের শাসনভার হস্তান্তরিত করে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করে৷ কিন্তু বিদায় কালে তারা তাদের বিভাজন নীতি প্রয়োগ করে ভারতকে তিন টুকরো করে চলে যায় -- ভারতবর্ষ, পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান৷
যদিও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান ভারতের দুই আলাদা আলাদা প্রান্তে অবস্থিত তবুও একই শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ছিল৷ যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানের দাপট বেশি ছিল, তাই উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হয়েছিল৷ কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী জনগোষ্ঠী পশ্চিম পাকিস্তানের এই উর্দু নীতি মনে প্রাণে স্বীকার করে নিতে পারে নি৷ তাই স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরক্ষণ থেকে বাঙালী জনগোষ্ঠীর মনে বিক্ষোভের ভাব প্রকাশ পায় -- যা প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর ডিসেম্বর মাসে৷ কিন্তু ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে এই নিয়ে যত্র তত্র সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন শুরু হয়৷ আন্দোলন চাপা দেওয়ার জন্য পাকিস্তান সরকার দমনাত্মক নীতি প্রয়োগ করলেও আন্দোলন থামে নি৷ ১৯৫২ সালে এই পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়৷
দিনটা ছিল ২১শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২ সাল--- ৮ই ফাল্গুন,১৩৫৮ বঙ্গাব্দ৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবৃন্দ ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে নেমে আসে৷ পুলিশ বাধ্য হয়ে গুলি চালায়৷ আর কয়েকজন তরুণ যুবক পুলিশের গুলিতে নিহত হন৷ নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হলো---রফিকুদ্দিন আহমেদ, সফিউর রহমান, আব্দুল জববার, আব্দুস সালাম ও আব্দুল বরকত৷
এই ঘটনার পর প্রতিবাদী ছাত্র ও তরুণের দল ঢাকা মেডিকেল কলেজে সমবেত হন৷ ২২ শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র ও তরুণদল পুনরায় পথে নামে ও ২৩ শে ফেব্রুয়ারি রাতারাতি নিহতদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে৷ কিন্তু ২৬শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান পুলিশ ওই স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙ্গে দেয়৷ আন্দোলন থামে নি৷ বরং উগ্ররূপ ধারণ করে৷
১৯৫৪ সালে প্রাথমিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে৷ এই বছরেই ৭ই মে গণপরিষদ অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা রূপে স্বীকৃতি দেওয়া হয়৷ পরবর্তীকালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে এই নিয়ে একটি বিল পাস করা হয় ও যথাসময়ে কার্যরূপ দেওয়া হয়৷ তদবধি পূর্ব পাকিস্তানে ২১শে ফেব্রুয়ারী দিনটি ‘বাংলা ভাষা শহীদ দিবস’ রূপে পালিত হয়ে আসছিল৷ কিন্তু ১৯৯৯ সালে ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘ ঐ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে ঘোষণা করে আর ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী প্রথমবার বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়৷ কিন্তু এই দিনটিতে পৌছানোর জন্য কিছু সংখ্যক মাতৃভাষা প্রেমিককে সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে৷
কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শহরে থাকতেন দুইজন মাতৃভাষা প্রেমিক--- রফিকুল ইসলাম ও আব্দুল সালাম৷ এঁরাই প্রথমবার প্রাথমিক উদ্যোক্তা হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আন্নানের নিকট আবেদন জানায়৷ পরবর্তীতে দুই জন মিলে একটি সংগঠন তৈরি করে যার নাম দেওয়া হয়--- মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভারস অফ দ্যা ওয়ার্ল৷ এই সংগঠনের প্রধান ভূমিকায় ছিলেন---একজন ইংরেজ, একজন জার্মাণ, একজন ক্যণ্টাইনিজ ও একজন কাচ্চি ভাষী৷ এই সংগঠনের সদস্যগণ সংযুক্ত রূপে এই বিষয়ে আবেদন জানায়৷
যাই বা হোক এদের আবেদনের কথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে আর মাতৃভাষা প্রেমিকদের পথ ক্রমশঃ সুগম হতে থাকে৷ এক সময় জাতিসংঘের ২৯টি সদস্য দেশ এক সঙ্গে আবেদন জানায়৷ ফলস্বরূপ ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাবটি উত্থাপিত হলে এক যোগে ১৮৮ দেশ সমর্থন জানায়৷ জাতিসংঘ ২১শে ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে ও ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী প্রথমবার বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়৷
যদিও ভাষার মূল উদ্দেশ্য---মনের অন্তর্নিহিত ভাবসমূহ জন সমক্ষে প্রকাশ করা৷ আর আমরা নিজের ইচ্ছানুসারে যে কোন ভাষায় তা ব্যক্ত করতে পারি৷ কিন্তু মাতৃভাষার মাধ্যমে মনোভাব ব্যক্ত করা যত সহজ ও স্বাভাবিক তা অন্য ভাষায় সম্ভব নয়৷ এতদর্থে প্রাউট প্রবক্তা ও বিংশ শতাব্দীর মহান ভাষা বিজ্ঞানী শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকারের উক্তি অবশ্যই স্মরণীয়৷ তিনি তাঁর রচিত ‘কণিকায় প্রাউট’ গ্রন্থের ত্রয়োদশ খণ্ডে উল্লেখ করেছেন ---ভাষা যেহেতু ভাব ও চিন্তা প্রকাশের মাধ্যম সেহেতু তা মানুষের প্রাণধর্মের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত৷ নিজস্ব মাতৃভাষায় একজন মানুষ যেমন স্বচ্ছন্দে ও সাবলীলভাবে নিজের ভাষাকে প্রকাশ করতে পারে তেমনটি অন্য কোন ভাষায় পারে না৷ মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় সে কথা বলতে অসুবিধা বোধ করে৷ প্রতিনিয়তই যদি অন্য ভাষায় কথা বলিয়ে এরূপ অস্বচ্ছন্দ বোধ করতে তাকে বাধ্য করানো হয় তবে তার প্রাণশক্তি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে ও ক্রমশঃ প্রাণশক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে৷ এই রকম পরিস্থিতিতে সেই ব্যষ্টি বা ব্যষ্টিসমূহের মধ্যে এক মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কট দেখা দেবে৷ প্রথমেই তার মধ্যে দেখা দেবে এক ধরণের হীনমন্যতাবোধ--- যা মানুষের দুর্বলতার কারণ৷ যাদের ভাষা অবদমিত হবে তাঁদের নৈতিক সাহস, উদ্যম ও প্রতিবাদ করার শক্তি হারিয়ে যাবে৷ শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে একটি পরাজিতের মনোভাব জাগবে--- যা কোন জনগোষ্ঠীর প্রাণস্পন্দনকে অচিরেই স্তব্ধ করে দেবে৷’
সুতরাং মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আজকের দিনটি অবশ্যই স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ৷ অতএব প্রতিটি মাতৃভাষা প্রেমিকদের নিকট একটাই আবেদন -- আমরা সবাই মিলে এই দিনটিতে বাংলা ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে মাতৃভাষাকে অবদমনের হাত থেকে বাঁচাবার শপথ গ্রহণ করি৷ কারণ ভারতবর্ষ সহ বিশ্বের সমস্ত দেশেই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী তাদের পছন্দের ভাষাকে সচল রাখার জন্য অন্যান্য ভাষাসমূহকে অবদমিত করার জন্য সতত প্রয়াসশীল৷
- Log in to post comments