আর্যদের ভারতে আগমণের পর্যায়সমূহ আর্যরা প্রথম উত্তর-পশ্চিম ভারতে বসতি স্থাপন করেছিলেন৷ তারপর তাঁরা ক্রমশঃ পূর্বদিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন৷ প্রথম তাঁরা এলেন সপ্তসিন্ধুতে যাকে বর্তমানে পঞ্চাব (পঞ্চ + আব) বলা হয়৷ যার মানে শতদ্রু (Sutlej), বিপাশা (Bias), ইরাবতী (Ravi), চন্দ্রভাগা (Chenub) বিতস্তা (Jhelum) এই পঞ্চনদীর দেশ৷ তার আগে এই অঞ্চলের নাম ছিল সপ্তসিন্ধু৷ মনে রাখা দরকার, ফার্সী ভাষায় যেমন ‘দরিয়া’ শব্দের মানে সমুদ্রও হয়, আবার বড় নদীও হয়, তেমনি বৈদিক ভাষায় ‘সিন্ধু’ মানে সমুদ্র ও বড় নদী দুই-ই হয়৷ যাইহোক, আর্যরা এদেশে এসে যখন সিন্ধু নদীকে দেখলেন, তখন সেই সুবৃহৎ নদীকে ‘নদ’ আখ্যা দিলেন, আর নাম দিলেন সিন্ধু৷ তার মানে এটি একটি সমুদ্র বিশেষ৷ সিন্ধুর ছ’টি উপনদী (tributary) অর্থাৎ শতদ্রু, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা, বিতস্তা, বিপাশা ও কাবুল৷ এদের নিয়েই ছিল সেকালের সপ্তসিন্ধু যা পরবর্তীকালে হয়ে দাঁড়াল পঞ্চাব (পঞ্জাব)৷
পঞ্চাবে এসে তাঁরা কৃষির উপযুক্ত পরিবেশ দেখে আনন্দিত হলেন, আর সেখানেই বসবাস করতে শুরু করলেন৷ তাঁদের সেকালের সেই বৈদিক ভাষা বিবর্তিত হয়ে এই সপ্তসিন্ধুতে পৈশাচী প্রাকৃত নামে পরিচিত হ’ল৷ এই পৈশাচী প্রাকৃত-জাত বর্তমান ভাষাগুলি হচ্ছে পাঞ্জাবী, পাহাড়ী (আগে বলা হত পাহাড়ী-পাঞ্জাবী) ও ডোগরী৷ মুলতানী ভাষা যা’ সিন্ধী ও পাঞ্জাবীর বিমিশ্রণ তাতে পৈশাচী প্রাকৃত ও পহ্লবী প্রাকৃত উভয়েরই প্রভাব রয়েছে৷ এই ভাষাগুলিতে প্রভূত পরিমাণ বৈদিক শব্দ তদ্ভব রূপে আজও ব্যবহৃত হয়ে চলেছে৷ যেমন‘ইন্দ’, ‘পিণ্ড’, ‘পিণ্ডি’ প্রভৃতি৷ যে গ্রাম দক্ষিণ ভারতীয় রাওয়াল ব্রাহ্মণদের দ্বারা অধ্যুষিত তা’ হল ‘রাওয়ালপিণ্ডি’৷ চীনীকে পাঞ্জাবী ভাষায় ‘খাঁড়’ (যা বৈদিক ‘খণ্ড’ থেকে উদ্ভূত) বললেও বৈদিকে ও সংস্কৃতে মাতার মুখ্যতঃ লাল চীনীকে শর্করা বলা হয়ে থাকে৷ আমরা চীন থেকে চীনী তৈরী করতে শিখেছিলুম বলে কথ্য ভাষায় তার নাম রাখা হয়েছে ‘চীনী’৷ ‘শর্করা’ বেশ একটা প্রাচীন শব্দ যার থেকে খাঁটি হিন্দীতে ‘সক্কর’, মারাঠীতে ‘সাঁকর’, তামিলে ‘সাকর’’, লাতিনে ‘স্যাকর’, ফরাসীতে ‘সুকর’ (sucre)৷ ফরাসী ‘সুকর’’ বিবর্তিত হয়েই ইরেজীতে ‘সুগার’৷ ‘খুই’ শব্দটি বৈদিক ‘খুদিকম থেকে উদ্ভূত যার মানে কুয়ো৷ সংস্কৃত ‘কৃপ’ থেকে মাগধী প্রাকৃতে ‘কু’, যার থেকে বর্তমান বাংলায় এসেছে ‘কুয়ো’৷ সংস্কৃত ‘ইন্দকূপ’ থেকে মাগধী প্রাকৃতে ‘ইন্দ্রউ’, তার থেকে অর্দপ্রাকৃতে ‘ইন্দরু’, তার থেকে ‘ইন্দারা’, তার থেকে অত্যাধুনিক উচ্চারণ ‘ইনারা’৷ সংস্কৃত ভাষায় ‘ইন্দ্র’ মানে শ্রেষ্ঠ৷ তাই বড় কূপকে অর্থাৎ ইনারাকে বলা হয় ‘ইন্দকূপ’৷ সেকালে শালগাছকে শ্রেষ্ঠ বৃক্ষ বলে গণ্য করা হত৷ শালকাঠে যজ্ঞাদিও করা হত৷ এই শালগাছ বা ইন্দ্রবৃক্ষ যেখানে প্রভৃত পরিমাণে আছে সেই স্থানের নাম ইন্দ্রপুর> ইন্দপুর> ইঁদপুর---বাঁকুড়া জেলার একটা গ্রাম৷
সংস্কৃতে ‘পুত্র’ শব্দ থেকে পহ্লবী প্রাকৃতে ‘পুট্টর’, ‘পুটরা’’৷ বর্তমানে সিন্ধীতেও তাই৷ সংস্কৃতে ‘দৌহিত্র’ থেকে এসেছে পাঞ্জাবীতে ‘দোহতর’৷ উত্তর ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে কিন্তু দৌহিত্রকে ‘নাতি’ বলা হয়, যা এসেছে সংস্কৃত ‘নপ্তা’ শব্দ থেকে৷ ‘নপ্তা’ মানে ‘যা’ বিদেহী আত্মার পতন রোধ করে৷ সেকালের সামাজিক বিধিতে অশৌচান্তকালে যার সাহায্য পেয়ে সামাজিক পতনের হাত থেকে বাঁচা যেত তাকেও তাই ‘নপ্তা’, ‘নাপিত’ বা ‘নাতে’ বলা হত৷ বৈদিক ‘নুপ্ত’ থেকে পৈশাচী প্রাকৃতে ‘নুত্ত’ অর্দপ্রাকৃতে ‘নৃত’, বর্তমান পাঞ্জাবীতে ‘নু’ যান মানে ‘পুত্রবধূ’৷ অবশিষ্ট উত্তর ভারতে কিন্তু পুত্রবধূকে বলা হয় ‘পুতোহু’৷ সংস্কৃত পুত্রবধূ> পুত্তবহু> পুতোহু৷৷
আর্যদের হরিয়ানা ও লুধিয়ানায় আগমন
এরপরে আর্যরা চললেন আরও পূর্বে৷ ক্রমশঃ বেড়ে চলল শ্যামলিমা ---বাড়তে থাকল সবুজের সমারোহ৷ এত সবুজ তাঁরা ইতোপূর্বে কখনও দেখেননি৷ বৈদিক ভাষায় ‘ধান্য’ মানে গাছপালা (green vegetation)৷ তাই সপ্তসিন্ধু পেরিয়ে এসে পূর্ব দিকের নোতুন স্থানটির তাঁরা নাম দিলেন ‘হরিধান্য’ যা শৌরসেনী প্রাকৃতে হয়ে দাঁড়াল ‘হরিহান্ন্য> অদ্ধ শৌরসেনীতে ‘হরিহানা’> বর্তমান হরিয়ানবী ভাষায় (যা’ হিন্দীর অতি নিকট জ্ঞাতি) ‘হরিয়ানা’৷ অনুরূপভাবে এসেছে ‘লুধিয়ানা’ শব্দটি ৷ প্রাচীনকালে আর্যরা লোধ নামে এক আরণ্য বৃক্ষের রেণু প্রসাধনে ব্যবহার করতেন৷ ‘ ধারাযন্ত্রে স্নানের শেষে ধুপের ধোঁয়া দিত কেশে লাধ্র ফুলের শুভ্র রেণু মাখত মুখে বালা,
কালাগুরুর গুরুগন্ধ লেগে থাকত সাজে
কুরুবকের পরত চূড়া কালো কেশের মাঝে৷’’
লোধ্রধান্য> লোধ্হান্ন্য> লুধিহানা> লুধিয়ানা৷