দুহ্ ক্ত ঞ্চ দুগ্ধ অর্থাৎ যা দোহন করে’ পাওয়া যায় তাই–ই দুগ্ধ৷ গোরুই হোক আর উট–ছাগল–মোষ–ভেড়া হোক, এদের দুধ দোহন করে পাওয়া যায়৷ প্রাচীনকালে গোরু যখন মানুষের পোষ মানেনি বা মানুষ তাদের বনজ অবস্থা থেকে গৃহপালিত পশু স্তরে টেনে আনতে পারেনি, তখন মানুষ প্রথম পুষেছিল ঘোড়াকে৷ ঘোড়া দ্রুতগামী পশু৷ দ্রুতগামী পশু দুধ দেয় অত্যন্ত কম৷ মানুষ সেকালে ঘোড়া পুষত তার পিঠে চড়ে লড়াই করবার জন্যে৷
মানুষ যখন গোরুর সংস্পর্শে এলো তখন তারা গোরুর সাহায্যে চাষ করতেও শিখল৷ গোরু শ্লথগামী পশু৷ তাই দুধ সে দিতে থাকল বেশী৷ পয়স শব্দের অর্থ তরল ধারা৷ এই কারণে প্রাচীন বৈদিকেরা জলকে পয়স বলত৷ দুধ কতকটা সেই ধরনের জিনিস৷ তাই দুধের জন্যে গোড়ার দিকে বলত গো–পয়স বা গোরস৷ আজকের সংস্কৃতে পয়স মানে দুধ, জল দুই–ই৷ আজকের ৰাংলা পয়স্বিনী ঠিকই, তবে দুধে পয়স্বিনী নন–বন্যার জলে পয়স্বিনী!
গোরস শব্দটি সংস্কৃতে আছে, ভারতের প্রাকৃত ভাষাগুলিতেও আছে৷ ভোজপুরী ভাষাতে ভালো ভাবেই আছে৷ ট্রেনে আরা ইষ্টিশানের (বিহার) ওপর দিয়ে আসার সময় আগে থাকতে মানুষের জানা থাকলে ইষ্টিশানে অনেকে গেলাসে–লোটায় ভরে’ দুধ নিয়ে দেখা করতে আসত৷ তাদের আনা জ্বাল দেওয়া পুরু সর–পরা গোরস একটু খাবার জন্যে আমার ওপর তারা পীড়াপীড়ি করত৷ দীর্ঘ অতীতের সেই কথাগুলো আজও আমার মনে দাগ কেটে রেখেছে৷
কোথাও কোথাও দুধকে গা–ক্ষীরও ৰলা হয়৷ সংস্কৃতে দুধের আর একটি জনপ্রিয় নাম হচ্ছে ক্ষীর৷ ৰাংলা ক্ষীর মানে ঘন করে জ্বাল দেওয়া দুধ৷ উত্তর ভারতে ক্ষীর মানে পায়েস৷ সংস্কৃতে দুধ অর্থে ক্ষীর শব্দের ব্যবহার খুব বেশী৷ পুরানের গল্পে আছে বিষ্ণু ক্ষীর সমুদ্রের ওপর শুয়ে আছেন৷ ৰাংলার মানুষ ভাববে ঘন করে জ্বাল দেওয়া ক্ষীরের সমুদ্রের ওপর বিষ্ণু ৰুঝি শুয়ে আছেন৷ না, তা নয়৷ ক্ষীর সমুদ্র মানে দুধের সমুদ্র৷ একটি ধ্যানমন্ত্রে আছে –
‘‘দিব্যশঙ্খংতুষারাভং ক্ষীরোদার্ণব সম্ভবম্’’৷৷ এখানে ক্ষীরোদার্ণব মানে দুধের সমুদ্র৷ ৰাংলার ক্ষীর দু’রকমের হয়–নরম ক্ষীর ও খোয়া ক্ষীর৷ পেটকা বা প্যাড়া ওই খোয়া ক্ষীরে তৈরী হয়৷ পুলিপিঠেতেও আমরা ওই খোয়া ক্ষীরের পুর দিই৷
গোরু পোষার পরেই দুগ্ধ দোহন করতে মানুষ শিখল৷ পুরুষেরা ৰড় ৰড় ভারী ভারী কাজ করত, দুগ্ধ দোহনের কাজ করত মেয়েরা৷ দুহিতৃৃ শব্দের প্রথমার এক বচনে দুহিতা মানে দুগ্ধ দোহনকারিণী৷ দুহিতা > জুহিয়া > ঝিয়া > ঝিয় > ঝি – ‘‘ঝিকে মেরে বউকে শেখানো’’ ‘‘ঝিয়কু মারি বহুকু শিখাইবা’’ ভাইঝি, বোনঝি, ভাসুরঝি প্রভৃতি৷
মানুষ গোরুর সংস্পর্শে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দুধের গুণ জেনে ছিল৷ একটি খাদ্যে যদি সর্বাধিক খাদ্য গুণের দরকার হয় তবে তা দুধেই পাওয়া যাবে৷ আর গোরুর দুধের পরে মানুষ মোষের দুধের সংস্পর্শে এল৷ উটের,, ভেড়ার সংস্পর্শে এসে সবাইকার দুধ খেয়ে মানুষ ৰুঝল যে গোরুর দুধে যে গুণ আছে, মোষের দুধেও তা আছে–আছে হয়ত বা বেশী পরিমাণে৷ স্নেহজাতীয় পদার্থ মোষের দুধেই সোয়া গুণ থেকে দেড় গুণ বেশী থাকে৷ এই জন্যে মোষের দুধ ষোলো থেকে চল্লিশ বছরের মানুষের পক্ষে ঠিক, তার কম বা বেশী বয়সের মানুষের পক্ষে ঠিক নয়৷ বিহারের যেখানে মোষের দুধ বেশী পরিমাণে পাওয়া যায়, সেখানেও শিশুকে ও ৰৃদ্ধকে গোরুর দুধ খাওয়ানো হয়৷ ভেড়ার দুধে স্নেহ জাতীয় পদার্থ কম৷ তাই পুষ্টিতে ষোলো আনা সাহায্য করে না৷ উটের দুধে, ছাগলের দুধে স্নেহ জাতীয় পদার্থ নেই বললেই চলে৷ তাই তাতে পুষ্টিও খুবই কম৷ গাধীর দুধ প্রায় মানুষের দুধের সমান ৰলে গণ্য করা হয়৷ তাই মাতৃহারা কচি শিশুর পক্ষে গাধীর দুধ উপযুক্ত হলেও দু’বছরের বেশী বয়সের শিশুর পক্ষে গাধীর দুধ কম পুষ্টিকর৷ মাহিষ ঘৃত (ভইসা) বেশী পরিমাণ খেলে, পেট খারাপ বা আমাশয় হবার সম্ভাবনা থাকে৷ কিন্তু গোরুর দুধের ঘি সাধারণতঃ ক্ষতি করে না৷ তাই আতপ চালের নিয়মিত ব্যবহারে যে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে তার হাত থেকে বাঁচবার জন্যে প্রাচীনকালে আতপ ভক্ষণকারীরা আতপ ওদনের (আতপ চাল) সঙ্গে গাওয়া ঘি ভক্ষণ করতেন৷ দুগ্ধে বিশেষ করে গোদুগ্ধে এই প্রাণশক্তি জোগানোর সামর্থ্য আছে ৰলে ও তৎসহ রোগ নিরাময়ের গুণ থাকায় তার একটি নাম ‘গদাহ্ব’৷