হাওড়া জেলা বর্দ্ধমান বিভাগের অন্তর্গত ছিল৷ হাওড়া জেলা পূর্বে হুগলী ভুক্তির অন্তর্গত ছিল৷ ১৯৩৭ সালে হাওড়া স্বতন্ত্র জেলা হয়৷ ১৮৪৩ সালের আগে পর্যন্ত জেলাটি হুগলী জেলার সঙ্গে ছিল৷ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৬৩ সালে বর্দ্ধমান বিভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে হাওড়াকে প্রেসিডেন্সী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷ যেহেতু হাওড়া ইংরেজ আমলে একেবারে কলকাতার পশ্চিম দিকে গঙ্গার (ভাগীরথীর) পশ্চিম পাড়ে লাগোয়া অবস্থিত, তাই রাজ্যবাসীর সঙ্গেই নানাভাবে যুক্ত হয়৷ শিল্প গড়ে ওঠে ও সারা ভারতের রাজধানী ছিল একসময়ে কলকাতা তাই গুরুত্ব সব দিক থেকে বেড়ে যায় হাওড়া অঞ্চলের৷ ফলে বিভাগও পরিবর্ত্তন হয়৷ প্রেসিডেন্সী বিভাগে চলে যায় হাওড়া৷ জেলাটি ছোট আয়তনের দিক থেকে৷
হাওড়া নামের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেকে বলে যে হাওড়ার কাছাকাছি একটি গ্রামের নাম ছিল হাড়ড়া, সেই নাম থেকে হাওড়া হয়৷ তবে হাওড় শব্দের অর্থ জলময় বিস্তীর্ণ প্রান্তর৷ হাওড় থেকে হাওড়া শব্দের উৎপত্তি৷ শ্রদ্ধেয় ভাষাবিদ শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার এই শব্দটিকেই হাওড়া জেলার নামের ব্যুৎপত্তিগত অর্থই ধরেন৷ সারা পশ্চিম বাঙলার সব নদীর জল এই হাওড়া জেলার নিচু এলাকা দিয়ে বয়ে গেছে৷ তাছাড়া ভাগীরথী, রূপনারায়ণ যে দুটি বড় নদী ও নদ প্রবাহিত ও সরস্বতী, কানা দামোদর সব নদ নদীর উপত্যকা এই হাওড়া৷ হাওড়ার দু’পাশ উঁচু ও মধ্যভাগ নিচু তাই নিচু স্থানে অনেক জলা জঙ্গল আছে৷
আম, জাম, কাঁটাল, নারিকেল, কলা, নানা ফলহীন বড় বড় বনজ গাছপালা, বাঁশ সারা জেলায় দেখা যায়৷ তাছাড়া জলা জায়গায় হোগলা জন্মে৷ ধান, শাকসব্জি প্রচুর হয়৷ নারিকেল গাছ থাকায় এখানে দড়ি তৈরী হয় ও হু’কো তৈরীর কুটির শিল্প আছে৷ কোথাও কোথাও হোগলার মাদুরও হয়৷ পান ও পাটের মত অর্থকরী ফসল হাওড়াতে হয়৷ তাছাড়া ডাল কলাইও হয়৷
কলকাতার প্রতিবেশী জেলা হওয়াতে বড় বড় শিল্প গড়ে ওঠে নদীর তীরে৷ পাটকল, কাপড়ের কল, ইঞ্জিনিয়ারিং ছোট–বড় শিল্পের জন্যে হাওড়া বিখ্যাত৷ হাওড়ার বেলিসিয়াস রোডের ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প বিখ্যাত ছিল৷ তাই এক সময়ে এই এলাকাকে শেফিল্ডের সঙ্গে তুলনা করা হত৷ হাওড়ায় বিখ্যাত শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন আছে৷ এখানে প্রায় ৪৫০ বছরের বটগাছ আজও ঝুরির ওপর জীবিত আছে৷ শিবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ যা বর্ত্তমানে ইয়ূনিবার্সিটিতে রূপান্তরিত হয়েছে৷ সেই কলেজ দর্শনীয় স্থান৷ ভারত সরকারের বিখ্যাত প্রিণ্টিং প্রেস এই হাওড়াতে যা আজ বন্ধ৷ হাওড়ার মাকড়দহ একটি বিখ্যাত স্থান৷ আন্দুলের জমিদারবাটি বিখ্যাত৷ আমতা একটি বদ্ধির্ষ্ণু এলাকা৷ এখানে একসময়ে বড় বড় অট্টালিকা সমৃদ্ধ ধনী ব্যষ্টি বসবাস করতেন৷ নানা কারণে বিশেষ করে ম্যালেরিয়ার দরুণ এই সব অট্টালিকা ত্যাগ করে তাঁরা কলকাতামুখী হন৷ তাই আমতা বর্ত্তমানে কিছুটা অনাদৃত৷ কিন্তু আন্দুলের বাজার বেশ সমৃদ্ধশালী৷ হাওড়া ষ্টেশন বিখ্যাত রেল যোগাযোগ কেন্দ্র৷ উত্তর–পূর্ব রেল, উত্তর–পশ্চিম ও দক্ষিণ–পূর্ব রেলের সংযোগস্থল ও কেন্দ্র হিসেবে হাওড়া ষ্টেশন বিখ্যাত৷ প্রধান রেল ষ্টেশন হাওড়া৷ এই সুবিধা থাকায় হাওড়ার গুরুত্ব বেড়েছে অনেকখানি৷ তাই হাওড়ার গঙ্গার তীরবর্ত্তী এলাকা মুখ্যতঃ বৃহত্তর কলকাতা হিসাবেই স্বীকৃত৷ সারা ভারতের লোক সমাগম হয় এই হাওড়া ষ্টেশনে৷ তাছাড়া কলকাতার সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী সেতু হ’ল হাওড়া ব্রীজ যার নাম রবীন্দ্র সেতু৷ এই সেতু হ’ল দোলার মত ঝুলন্ত সেতু৷ সেতুটি ১৫০০ ফুট লম্বা ও ৭১ ফুট চওড়া৷ তাছাড়া কলকাতার সঙ্গে সংযোগ আছে হাওড়ার আর একটি সেতুর যার নাম বিদ্যাসাগর সেতু৷
গাদিয়াড়া হাওড়ার একটি পর্যটন কেন্দ্র৷ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব৷ বাগনান পান উৎপাদনে বিখ্যাত৷ হাওড়ার রবীন্দ্র সেতুর অদূরে অবস্থিত বেলুর মঠ একটি বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান৷ এরই অদূরে অবস্থিত সালকিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং ও জাহাজ মেরামতের জন্যে বিখ্যাত কারখানা৷ হাওড়ার পাঁচলায় বিখ্যাত পরচুল তৈরী হয়৷ হাওড়ার গ্রামে ফুটবল, ব্যাটমিণ্টন এমনকি ক্রিকেট খেলার বল তৈরী হয়৷ পুঁথি ও জরির কাজ–এই জেলার মানুষের জীবন জীবিকা৷ সরকার এদিকে নজর দিলে আরও ভাল হয়৷ বড়গাছিয়াতে তালা–চাবির কারখানা আছে৷ উলুবেড়িয়া কলেজ দর্শনীয় স্থান৷ তাছাড়া জগাছার দুর্গাবাড়ি বিখ্যাত স্থান৷ মার্গগুরু শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী পদার্পণ এখানে হয়েছিল৷ এর অদূরে রাম–সীতার মন্দির বিখ্যাত৷ এদিকে হাওড়ার সাঁতরাগাছির ওল বিখ্যাত৷ এছাড়া সাঁতরাগাছিতে দক্ষিণপূর্ব রেলের ইয়ার্ড আছে৷ বিখ্যাত কর্মবীর আলামোহন দাশের দাস নগরের লৌহ শিল্পের কারখানা বিখ্যাত ছিল৷
হাওড়া জেলায় চণ্ডী, ধর্মঠাকুরের ও শীতলার মন্দির, প্রায় সব গ্রামেই আছে৷ ওলাইচণ্ডীর মন্দির বিখ্যাত৷ রাণীহাটী হাওড়ার একটি সংযোগ রক্ষাকারী বর্দ্ধিষ্ণু শহর৷ এর অদূরে বিকিহাকোলার হাইস্কুলটি খুবই বিখ্যাত৷ এছাড়া হাওড়ার ঘুসুরিতে তিব্বতীদের একটি মন্দির আছে৷ এই জেলা শিল্পে সমৃদ্ধ৷ তাছাড়া জেলাটি গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত হওয়াতে ও কলকাতার প্রতিবেশী জেলা হওয়ার জন্যে ভারতের বিভিন্ন ভাষভাষী এই জেলায় আসে৷ ফলে নানা জাতের মানুষের মিলনভূমি এই জেলাটি৷ এর অতীত ইতিহাস নোতুন করে লেখার সময় এসেছে৷ তরুণ–তরুণীদের একাজে এগিয়ে আসতে হবে৷ হাওড়ার গৌরব আজ অস্তমিত৷
- Log in to post comments