প্রভাতী

মহাপ্রয়াণ

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

একুশে অক্টোবর ১৯৯০---তোমার মহাপ্রয়াণ৷

চোখে অবিরাম অশ্রুধারা, অব্যক্ত যন্ত্রণায় দগ্ধ পরাণ৷

স্তব্ধ বৃক্ষলতা, মূক পশুপাখী, চঞ্চল শিশু সহসা গম্ভীর

আকাশে বাতাসে বিষাদের বাঁশী উত্তাল অম্বুধি হ’ল ধীরস্থির

অনিন্দ্য সুন্দর পার্থিব দেহ পঞ্চভূতে হয়েছে বিলীন

ভূবন-ভোলানো তোমার মধুর হাসি স্মৃতিপটে চির অমলিন

কাঁদায়ে সকলে তুমি চলে গেলে, ‘অজানা পথিক’ কোন্ সে অচিনপুরে

নোতুন পৃথিবী গড়ার আশ্বাস সদা-প্রোজ্জ্বল সমগ্র চরাচরে

হৃদয়তন্ত্রীতে সততঃ শুণি তোমার সুরের ঝঙ্কার

মহাবিশ্বে মন্দ্রিত অব্যয় অমৃত প্রণব-ওঁঙ্কার

সুষুপ্তির আঁধারে খঁুজি তোমায়, ভাঙে ঘুম বারে বারে

জাগ্রতের বাস্তবে পাই অনুভবে, ক্ষণিকে হারাই অসীম শূন্যতার হাহাকারে

বলেছ তুমি, থাকবে কাছে, প্রতি অণু-পরমাণু মাঝে

পরশ যেন পাই হে পরমপ্রিয়, তোমারই অভীষ্ট কাজে

জানি ও মানি, তুমি আছো সাথে সবখানে সারা বেলা

কেন তবে তাপিত-নীরে ভাসে গো নয়ান, বুঝি না তোমার লীলা৷

ইচ্ছাপূরণ

লেখক
কল্যাণী ঘোষ

নিশিদিন আমায় তুমি

    অভয় দিয়ে যাও গো–

    অভয় দিয়ে যাও৷

তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করো

    যাহা ‘তুমি’ চাও গো–

    যাহা ‘তুমি’ চাও৷

অরিরে ধ্বংস করে–

    জীবেরে বাঁচাও গো,

    জীবেরে বাঁচাও৷

সবার তরেই আসা–

 সবারে বুঝতে দাও গো–

 সবারে বুঝতে দাও৷৷

এমন বৃষ্টি

লেখক
রতন কুমার দে

এমন বৃষ্টি এখনও দেখিনি আমি

ঘন কালো মেঘ মুষলধারায়

বৃষ্টি আসিছে নামি

দিনের আলো ঢেকে দিয়ে

যেন রাত্রি এসেছে নামি

    সকলি গিয়াছে থামি৷

জলে থৈ থৈ পথ মাঠ ঘাট

বনাঞ্চল হ’ল যে শ্মশানঘাট

বাঁধ ভেঙ্গে নদী বন্যা ঘটাল

    জলে জল একাকার৷

গ্রামের বাড়ী মাটিতে লুটালো

বিদ্যালয় বন্ধ হ’ল

ফসল জলে নষ্ট হ’ল

কত মানুষের মৃত্যু হ’ল

গ্রাম থেকে গ্রাম চুরমার

গরীব আরও গরীব হ’ল

    হাহাকার শুধু হাহাকার৷

যারা বেঁচে আছে কে দেবে ঠাঁই

কে দেবে খাবার আরও যা দরকার

অসহায়–এদের কে হবে সহায়

দেবে আশ্বাস

নদীর বাঁধ ভাঙ্গবে না আর

দূর হবে সংশয়৷

    পাবে তারা নিস্তার৷

ডাকে ওই

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

ওই শোন কে ডাকে মেঘমন্দ্রে দূরগগনে

কার আহ্বান সদা ভাসে মাতাল পবনে৷

বিদ্যুৎ শিখায় কার হাতের লক লকে বেত

অমোঘ পরাক্রমে অন্যায়-অবিচারে টানে ছেদ৷

বঞ্চিতা ধরিত্রীর শূন্য কোল ভরে দিতে

কার আশিস প্রবহমান কল্লোলিনী-স্রোতে

সৃষ্টির ধমনীশিরায় উষ্ণ শোণিত কম্পন

কোন্ যতিহীন সংগীত জাগায় অনুরণন

উদ্বেল বিশ্ববীণার ঝঙ্কৃত প্রতি তারে

ভাঙ্গ্, ভাঙ্গ্ স্বর ওঠে কার ভৈরব হুঙ্কারে

মানুষ হয়ে জন্মেছি সকলে গড়তে সুন্দর মানবসমাজ

জাত-ইজম-বর্ণ ভুলে করব কেবল নোতুন পৃথিবীর কাজ৷

বিনা টিকিটে গঙ্গাস্নান

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রাচীনকালের মানুষ যাঁদের গঙ্গা–যমুনার উপর খুব শ্রদ্ধা–ভক্তি ছিল তাঁরা ভাবতেন ঈশ্বরের করুণাই  অবস্থান্তর প্রাপ্ত হয়ে  গঙ্গাধারার রূপ পরিগ্রহ করে থাকে কারো গঙ্গাস্নানের আকর্ষণ কর্ত্তব্যের প্রেরণায়, কারো বা ধর্মোন্মাদনার প্রেষণায় কেউ বা গঙ্গাস্নান করেন ডগমা বা ভাবজড়তার বশবর্ত্তী হয়ে, আর কেউ বা পুরাণের কাহিনীকে গুরুত্ব দেন বলে৷ সত্যিই গঙ্গা ‘‘পতিত পাবনী’’ এ কথা ঠিকই যে গঙ্গা সুবিশাল আর্যাবর্ত্তের স্তন্যদাত্রী জননী৷ এও ঠিক যে নদীর বহমান ধারায় স্নান করলে তা শরীর মনকে স্নিগ্ধ করে৷ তবে গঙ্গাস্নানে কোন বিশেষ গুণ আছে কি না তা  পণ্ডিতেরা বিচার করে দেখতে পারেন৷ তবে আপাতঃদৃষ্টিতে তেমন গুণ আছে বলে মনে হয় না কারণ মীন ও অজস্র জীবজন্তু গঙ্গায় স্নান করে থাকে, তাদের মল–মূত্র নিত্য গঙ্গায় পতিত হয়৷ তারা গঙ্গা স্নান করে কতটা বৈকুণ্ঠের কাছে পৌঁছোয় তা কেউই  হলফ করে বলতে পারবে না৷ তবে একথা বলক্ষ যে গঙ্গাস্নান হিসাবে মন্দ নয় যদি সেখানে জলক্ষিদূষণ না হয়ে থেকে থাকে৷ পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী বৈকুণ্ঠে নারায়ণের চরণোদক থেকে গঙ্গার উৎপত্তি৷ বাঙলার রাজা ভগীরথ তাঁর তপস্যার বলে গঙ্গাকে মর্ত্ত্যে আনয়ন করেন৷ আকাশ থেকে নীচে নাক্ষবার সময় গঙ্গার তোড়ে বসুন্ধরা যাতে বিদীর্ণা না হন তাই শিব তাঁকে জটায় আশ্রয় দিয়ে তাঁর গতিবেগ বা তোড় কমিয়ে দেন৷ কাহিনী অনুযায়ী গঙ্গা চতুর্ধারায় বিভক্ত হয়েছিল৷ তার একটি ধারা মর্ত্ত্যে  চলে আসে ঃ

‘‘স্বর্গেতে অলকানন্দা মর্ত্ত্যে ভাগীরথী 

দেক্ষলোকে মন্দাকিনী পাতালে ভোগবতী৷’’

সুতরাং গঙ্গাস্নান মানে বিষ্ণুর চরণোদকে স্নান৷ এই ভেবে ভক্ত পুণ্যার্থী গঙ্গাস্নানে আকৃষ্ট হবেনব বৈকি তাঁরা গঙ্গাকে বিষ্ণুর করুণার বিগলিত রূপ হিসেবে ভাববেন বৈকি

অন্য কাহিনী অনুযায়ী গঙ্গা শিবের পত্নী৷ শিবজায়া গঙ্গার জলবিধৌত হতে কোন্ শৈব, কোন্ শাক্ত না চাইবেন তাই গঙ্গা যে কেবল বৈকুণ্ঠনিবাসী নারায়ণের পাদোদক তাই নয় শাক্ত শৈবের কাছে গঙ্গা পুণ্যতোয়া৷

    ‘‘হরিপাদপদ্মবিহারিণ্

    গঙ্গে হিমবিধুমুক্তাধবলত্৷

*      *      *

    তব তটনিকটে যস্য নিবাসঃ

    খলু বৈকুণ্ঠে তস্য নিবাসমঃ৷

*      *      *

    ভাগীরথি সুখদায়িনি মাতস্তব

    জলমহিমা নিগমে খ্যাতঃ৷

*      *      *

    ‘‘দেবি সুরেশ্বরি ভগবতি

    গঙ্গে ত্রিভুবনতারিণি তরলতরঙ্গে৷

    শঙ্করমৌলিনিবাসিনি বিমলে,

    মম মতিরাস্তাং তব পদকমলে৷৷’’

*      *      *

    নাহং জানে তব মহিমানং,

    ত্রাহি কৃপাময়ি মামজ্ঞানম্৷’’

*      *      *

সুতরাং সাধারণ মানুষই নয়, জ্ঞানী–গুণীরাও গঙ্গাকে ক্ষিগলিত করুণা হিসেবে দেখেছিলেন৷ তাই গঙ্গা–মহিমাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় না৷ অন্য নদীর সঙ্গে গঙ্গার গুণগত পার্থক্য খুব কম৷ বরং গঙ্গার তীরবর্ত্তী শিল্পকেন্দ্রগুলি যে পরিমাণ আবর্জনা গঙ্গাজলে নিক্ষেপ করে তাতে গঙ্গাস্নানে রোগ বৃদ্ধিও অক্ষশ্যই ঘটতে পারে৷

‘‘এক ডুব কাক ডুব দুই ডুব ব্যাঙ

তিন ডুবে শরীর টান চার ডুবে গঙ্গা স্নান৷’’

‘‘জাহ্ণবী–যমুনা বিগলিত করুণা’’

বর্ধমান জেলার বেশীর ভাগ অংশই অ–গঙ্গার দেশ, তাই দেখেছি গ্রামাঞ্চলের সাদামাঠা অনেক মানুষই বলে থাকেন মরণান্তে তাকে যেন তিরপুণী (বর্ধমানের গ্রাম্য মানুষ ত্রিবেণীকে ‘তিরপুণী’ বলে৷ বর্ধমানের গ্রাম্য ছড়ায় আছেঃ

‘‘চালভাজা খেতে খেতে গলা হয় কাঠ

হেথা কোথা জল পাক্ষ সেই তিরপুণির ঘাট

তিরপুণির ঘাটাতে বালি ঝুরঝুর করে

সোনার গায় রোদ লেগেছে ডালিম ফেটে পড়ে৷’’)  ঘাটে দাহ করা হয়, ছাইগুলো যেন গঙ্গাজলেই শেষ আশ্রয় পায়৷

মনে পড়ে গেল আমার ছোট বয়সের পাড়াতুত এক ঠাকুমার কথা৷ ঠাকুমা রোজ ট্রেনে করে ছয় মাইল দূরবর্ত্তী গঙ্গায় ডুব দিয়ে আসতেন৷ অতি ভোরে বেরুতেন, ফেরবার সময় হাতে ছাপ, কপালে ছাপ, বুকে তিলক, নাকে রসকলি লাগিয়ে ফিরতেন৷ সবই করতেন.... কেবল করতেন না টিকিট৷ ইষ্টিশানে চেকারবাবু যখন হাত পেতে শুধোতেন –মা, আপনার টিকিটটা? কোলকুঁজো ঠাকুমা বাঁ হাতটা উপরের দিকে কেৎরে দিয়ে বলতেন–আ মরণ মিনসের ছেলে পেছনে রয়েছে দেখছ না টিকিটটা তার হাতেই রয়েছে৷

চেকারবাবু কোন কোন দিন শুধু হাসতেন, কেবল বলতেন–মা, রোজই তো বলেন ছেলে পেছনে আসছে৷ কই, এক দিনও তো আপনার ছেলের টিকি দেখতে পাই না৷

ঠাকুমা একটু ঝাঁঝালো ভাষায় বলতেন–আমার ছেলে কি ভিনদেশী নাকি যে মাথায় টিকি রাখবে বাঙালী পোলা মাথায় টিকি রাখে না মরণ....মিনসের মরণ

একদিন আমি বুকে বল  নিয়ে সাহসে  ভর দিয়ে  শুধোলুম–হ্যাঁ গো ঠাকুমা, তুমি যে   গঙ্গাস্নান করো, কষ্ট করো, তিলক–ছাপ, চন্দন–ছাপ, তিলক–মাটি লাগাও, সেই যে নাকে রসগোল্লা না কী একটা লাগাও এ তো পুণ্যি করা ঠিক, কিন্তু বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণ করায় সব পুণ্যি তো বরবাদ হয়ে যাবে....এ যেন সেই এক ভাঁড় গোদুগ্ধে এক ফোঁটা গোরোচনা৷

ঠাকুমা বললেন–খোকন, ওইখানেই তো ভুল করলি৷ বিনা টিকিটে ভ্রমণের পাপটার দিকে তাকিয়ে দেখলি কিন্তু গঙ্গাস্নানের পুণ্যিটার দিকে ভাল করে তাকালি না ৷ গঙ্গাস্নানে যে পরিমাণ পুণ্যি হয় বিনা টিকিটে ভ্রমণে সে তুলনায় পাপ একেবারেই অকিঞ্চিৎকর৷ তাই দু’য়ে যে গায়ে গায়ে শোধ হবে তার জো নেই৷

‘‘একবার গঙ্গাস্নানে যত পাপ হবে,

পাপীদের সাধ্য নাই তত পাপ করে৷’’

(শব্দ চয়নিকা)

আমার গর্ব করো খর্ব

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

আমার মাঝে আমায় নিয়ে

করলে আমার শুধুই খোঁজ

তখন দেখি কেবল আমি’-র

ভাবনা নিয়েই করি ভোজ৷

ব্যতিক্রমী হতেও পারি

ভাবি যখন তুমি আমি

শ্বাস প্রশ্বাসের ছন্দের ধারায়

হারিয়ে করি আমায় দামী৷

সেই দামের অমূল্য ধনে

আনন্দের সুর উঠলে ভেসে

সুমুখ পানে তখন দেখি

দাঁড়িয়ে আছ তুমি হেসে৷

তখন আমার আমি’র গর্ব

এক নিমেষে হ’ল শেষ

তখন তোমার চরণ ধরে

আমায় ভাল রাখি বেশ৷

প্রার্থনা

লেখক
অরুণিমা

পরমপুরুষ তোমার কাছে

    প্রার্থনা করি,  

লেখাপড়া শিখে যেন

    ‘মানুষ’ হতে পারি৷

সমাজসেবা করি যেন

    ঢেলে মন-প্রাণ,

উঁচু-নীচু, ছোট-বড়,

    সবার সমান৷

মানুষ পশু-পাখী আর

    তৃণ তরুলতা

সবার সাথে থাকে যেন

    ভাব সমতা৷

বাবার প্রতি শ্রদ্ধা যেন

    থাকে আমার মনে,

মায়ের প্রতি ভক্তি যেন

    থাকে সর্বক্ষণে৷

এই আশিস দাও গো আমায়

    আমার পরম গুরু

(তব) চরণরেণু মাথায় নিয়েই

    কর্মজীবন শুরু৷

নোতুন প্রভাত

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

হাহাকার-আর্তনাদ- লাঞ্ছনা

সর্বনাশা নষ্টামির  কুটিল  আবর্ত্তে

জীবনের প্রবাহ  দিশাহারা৷

সংকীর্ণতার তূণ হ’তে  নিরন্তর

ছোটে ভেদ-বিভেদের  তীক্ষ্ম শর

সমস্যা জর্জর  সমাজের বুকে,

দেহে তার  গলিত কুষ্ঠের ক্ষত---

 মুক্তি-পথ  রুধেছে শোষণের লোমশ হস্ত৷

 *      *      *       

হে যুগ-চেতনা, জাগ্রত বিবেক!

 আঘাত হানো  ভাবজড়তার  বন্ধ দ্বারে

 হে শাশ্বত, উষ্ণ  জীবন !

 ধবনি তোল হিমায়িত শব-ঘরে৷

অমানিশার  দুর্ভেদ্য জাল  ছিঁড়ে

উঠুক দিগন্ত-রাঙ্গা নবীন সূর্য্য৷

উদ্বোধিত  হোক  মানুষের জয়গান

 আর আনন্দমূখর  নোতুন প্রভাত৷

ইটালিয়ান সেলুন

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘ব’  বলতে গিয়ে একটা ছোট্ট গল্প মনে পড়ল৷ তোমরা বাগবাজারের গঙ্গার ঘাটে গিয়ে দেখেছ নিশ্চয়, সারি সারি নাপিত বসে রয়েছে৷ যার দাড়ি কামাবার আছে সে উবু হয়ে বসে পড়ছে, আর নাপিত–ভায়া তার ‘ব’–কাজ করে দিয়ে যাচ্ছে৷ সময়ে সময়ে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলছে–এই নিয়ে আঠাশটা দাড়ি হ’ল৷ আর দু’টো দাড়ি হলেই বাড়ী ফিরছি৷ রেস্তোরাঁয় যেমন শুণতে পাও, ‘ওই দিকে চারটে চা নিয়ে যা’৷ যাই হোক্, কোনো বনেদী লোক এসে পৌঁছুলে নাপিত–ভায়া তখন তাকে বসবার জন্যে ইট অফার করত৷ এই ইটে বসে দাড়ি কামানোকে বলা হত ইটালিয়ান সেলুন৷

১৯৩৯–৪০ সাল অবধি দেখেছি যাঁরা উবু হয়ে বসে দাড়ি কামাতেন নাপিত–ভায়া সাধারণ ঠান্ডা জল দিয়ে তাঁদের দাড়ি কামিয়ে দিতেন আর দক্ষিণা নিতেন এক পয়সা৷ আর যাঁরা ইটালিয়ান সেলুনে বসতেন তাঁদের সাবান–মিশ্রিত গরম জল দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেওয়া হত৷ নাপিত–ভায়া তাঁদের কাছে প্রণামী নিতেন দু’পয়সা৷

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল গেঁজেলদের গল্প৷ যখন কোনো নবাগত, গেঁজেল হবার জন্যে শিক্ষানবিশ (এ্যাপ্রেন্টিস) হিসেবে গেঁজেল ক্লাবের সদস্য হয় তখন গোড়ার দিকে তাকে উবু হয়ে বসে গাঁজায় দম টানতে হয়৷ এই উবু হয়ে বসা অবস্থায় তাদের বলা হয় উবু–গেঁজেল বা এ্যাপ্রেন্টিস–গেঁজেল৷ তারপর গেঁজেলদের যোগ্যতার একটা পরীক্ষা হয় যাকে বলতে পারো যোগ্যতা–পরিমাপক পরীক্ষা (suitability test or efficiency test)৷ সেই যোগ্যতা–পরীক্ষায় যে উত্তীর্ণ হয় সে তখন থেকে বসবার জন্যে ইট পায়৷ ইটে বসার পর থেকে আর তাকে উবু–গেঁজেল বলা হয় না–বলা হয় ইটালিয়ান গেঁজেল৷ একবার ভাগীরথীর তীরে (ডান তীর না বাঁ তীর মনে পড়ছে না৷ ডান তীর হলে বর্ধমান জেলা, বাঁ তীর হলে নদীয়া জেলা) গেঁজেলদের সভা বসেছে একটা মাদার*(*কলকাতায় আমরা বলি মাদার, ২৪পরগণা ও মেদিনীপুর জেলায় বলে ড্যাফল৷ রাঢ়ের কোথাও কোথাও বলে ডেলো বা ডাউয়া৷ খণার বচনে আছে–‘‘শোণরে বলি চাষার পো৷ বাঁশ বনের ধারে মান্দার রো৷’’ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘‘আঁধার হল মাদার গাছের তলা৷’’) গাছের তলায়৷ অনেকগুলো উবু গেঁজেল ক্রমাগত দাবী জানিয়ে আসছিল–তাদের যোগ্যতার পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে না৷ এর ফলে তাদের ইটালিয়ান গেঁজেল হবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে৷ এতে তাদের প্রতিভাকে দাবিয়ে রাখা হচ্ছে, মানবতার বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে৷ গেঁজেল–সর্দার ছিলেন শ্রীযুক্ত বাবু দমফাটা সিং৷ তিনি বললেন–‘‘ঠিক আছে, তাহলে আজকেই পরীক্ষাটা হয়ে যাক্৷’’

দমফাটা সিং বললেন–‘‘গাঁজার প্রথম টান দেবার সময়েই একটা ভাব নিতে হবে৷ কার ভাবটি কতখানি মঞ্চসার্থক হচ্ছে তারই ভিত্তিতে তাকে খেতাব দেওয়া হবে ও ইট দেওয়া হবে৷’’

গেঁজেলরা বললে–‘‘একটু বুঝিয়ে বলুন, আরও একটু খোলসা করে, একটু ব্যাখ্যা করে বলুন৷ তাতে আমাদের খোলতাইটা মানাবে ভাল, মৌতাতটা শানাবে ভাল৷’’

সর্দার গেঁজেল বললে–‘‘এই ধরো, কেউ গোরুর ভাব নিলে৷ তার সামনে যদি একশ’ টাকার নোট রাখা হয় সে সঙ্গে সঙ্গে নোটটা চিবোতে থাকবে, মাথা নাড়তে থাকবে, শিঙ্ দিয়ে গুঁতোতে যাবে আর হাম্বা হাম্বা আওয়াজ করতে থাকবে৷ কেউ শো’রের ভাব নিলে৷ সে সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি জায়গায় যত কচুগাছ দেখবে আর মুখে আওয়াজ করতে থাকবে ‘‘ঘোঁৎ ঘোঁৎ ঘোঁৎ–রতনে রতন চেনে শো’রে চেনে কচু.......ঘোঁৎ ঘোঁৎ ঘোঁৎ৷ কেউ হয়তো ভোঁদড়ের ভাব নেবে৷ সে সামনের হাত দু’টো পায়ের মত করে ছুটতে ছুটতে জলে ঝাঁপ দেবে আর মুখে করে মাছ ধরবে৷ নাম জিজ্ঞেস করলে বলবে, ‘‘ভোঁ...ভোঁ...ভোঁ৷’’ গেঁজেলদের ভাষায় একে বলা হয় ভাব নেওয়া৷’’

সব যখন তৈরী, পরীক্ষারম্ভের ঘণ্ঢী যখন বাজে বাজে এমন সময় উবু–গেঁজেল ঘণ্ঢাকর্ণ ঘোড়ইয়ের পিতৃদেব লম্বাকর্ণ হঠাৎ সেখানে এসে হাজির ৷ কম বয়সে তারও গেঁজেল–জীবনের অভিজ্ঞতা ছিল৷ তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে সর্দার–গেঁজেল দমফাটা সিং ঘণ্ঢাকর্ণকে বললে–‘‘ওই দেখ, তোর বাপ্ আসছে৷ তুই এখন যদি মানুষ সেজে থাকিস তাহলে তোকে কথার উত্তর দিতে হবে৷ তাই তুই এখন তাড়াতাড়ি কোনো পশু–পক্ষী বা জন্তু–জানোয়ারের ভাব নিয়ে নে৷’’ ঘণ্ঢাকর্ণ সঙ্গে সঙ্গে টিয়াপাখীর ভাব নিয়ে নিলে৷ লম্বাকর্ণ এসে বললে–‘‘চল্ ঘণ্ঢাকর্ণ, বাড়ী চল্৷ সারাদিন শুধু টো টো করে ঘুরে বেড়ানো আর গাঁজা খাওয়া৷ এখন চাষের সময়.......ধান রোয়ার কাজ চলছে, বাড়ী চল্৷ ঘণ্ঢাকর্ণ মুখটা ছুঁচলো করে টিয়াপাখীর মত কুট কুট করে ছোলা কাটতে লাগল আর বলতে লাগল–‘‘ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ’’৷

লম্বাকর্ণ বললে–‘‘ঢঙ শিখেছে  টিয়াপাখীর ভাব নিয়েছে দেখাচ্ছি মজা’’।  লম্বাকর্ণ তখন মুখে করে ঘণ্ঢাকর্ণের ঘাড়টা কামড়ে ধরলে আর তারপর হুলো বেড়ালের ভাব নিয়ে বললে, ‘‘ম্যাঁও, ম্যাঁও, ম্যাঁও৷’’

ঘণ্ঢাকর্ণ তো টিয়াপাখী সেজেছে৷ বেড়াল তার ঘাড় ধরেছে৷ তাই সে আরও একবার ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ করে ঘাড়টি কাৎ করে নেতিয়ে পড়ল৷ বেড়ালরূপী লম্বাকর্ণ টিয়াপাখীরূপী ঘণ্ঢাকর্ণকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল৷

যাইহোক্ দাড়ি কামানোর কথা বলতে গিয়ে ইটালিয়ান সেলুনের কথা এসে গেল আর সেই প্রসঙ্গে এসে গেল ইটালিয়ান গেঁজেলের কথা৷ তোমরা সুযোগ পাও তো একবার দমফাটা সিংয়ের কাছে গিয়ে খোঁজ নিও৷ এই ঘটনার পরে ঘণ্ঢাকর্ণ গেঁজেল সভায় আর আসত কিনা বা এসে থাকলে সে ইটালিয়ান গেঁজেল বলে গণ্য হয়েছিল কিনা, হ্যাঁ, জেলাটা বর্ধমান না নদীয়া, সেটাও সেই সঙ্গে খোঁজ নিয়ে রেখো৷

তোমাকে বন্দনা করি

লেখক
সাধনা সরকার

নিখিল বিশ্ব বন্দনা করে

সূর্য-তারা-প্রণত

তোমাকে দেখি আলোকে পুষ্পে

আহা কী আনন্দ

তুমি এসেছো ভালবেসেছো

চরণ ধূলায় ধূসরিত আমাদের প্রাণ

তুমি আছো

তোমার বন্দনা বিশ্বভূবনে

এসো তুমি এসো কাছে

এ প্রাণ মন তোমার

সুবাতাস আজ ভবনে ভূবনে

তুমি আমার পরমতম

চির বিরাজ প্রাণপুরুষ

তোমাকে বন্দনা করি

সমর্পিত প্রাণমন....