আসুরী শক্তি করো খর্ব

লেখক
স্নেহময় দত্ত

বর্ষার জল ভরা মেঘের বিদায়, নীল অম্বর মাঝে শুভ্র মেঘের নিরুদ্দেশে ভেসে চলা, ধরার বক্ষে শ্যামের প্লাবন, ভোরের বাতাসে হিমেল ভাব আর শিউলির সুবাস, শিশিরসিক্ত শ্যামল তৃণরাজি বনে বনে কুশ-কাশের সমারোহ---আনে নতুন এক আমেজ৷ প্রকৃতির রূপ বৈচিত্র্যের এই কালিক পরিবর্তনই বুঝিয়ে দেয় শরৎ এসেছে৷ প্রকৃতির এই পরিবর্তন মানুষের হৃদয়েও আনে পরিবর্তন---আনে আনন্দের জোয়ার---উৎসবের মেজাজ৷ ঋষি প্রভাতরঞ্জন সরকার তাঁর রচিত ও সুরারোপিত প্রভাত সঙ্গীতে শরৎ ঋতুর বর্ণনায় বলেছেন---

‘‘শরৎ তোমার সুরের মায়ায় আকাশ-বাতাস মাতালো৷

দূর নীলিমার সুধারাশি ধরার জীবন রাঙালো৷৷’’

আরো একটি গানে বলেছেন,

‘‘শরৎ প্রাণে আসে, শরৎ মনে আসে,

শরৎ ভূবনকে দুলিয়ে মর্মে হাসে৷’’

শরৎ ঋতু উৎসবের ঋতু৷ শরতের উৎসবকে বলা হয় শারদোৎসব৷ বর্তমানে বাঙলার বুকে শারদোৎসব মানে দুর্গোৎসব বা দুর্গাপূজা৷ ভারতের অন্য কয়েকটি প্রান্তে এই সময়ে হয় দশেরা উৎসব৷

দুর্গাপূজা বা দশেরার পূজা যে রূপকে হয়ে থাকে তা অশুভ শক্তির বিনাশের রূপ৷ দুর্গাপূজায় যে প্রতিমার পূজা করা হয় তাতে রয়েছে মাতৃআরাধনা---শক্তির আরাধনা৷ দুর্গার স্তোত্রেই বলা হচ্ছে---‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’ ও ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা / নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ হ৷’

পুরাণে বর্ণিত দেবতারা চেয়েছিলেন অশুভ তথা দানব শক্তির লয়৷ তেমনি যুগে যুগে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও চেয়েছেন অশুভ শক্তির বিনাশ, শক্তিরূপের আরাধনা সেই কারণেই৷ ‘রূপং দেহী, জয়ং দেহী, যশো দেহী, দ্বিষো জহি’---রূপ, জয়, যশ, প্রার্থনা সঙ্গে সঙ্গে শত্রুকে নিধন করার প্রার্থনা জানানো হয়েছে৷ ‘মা যা হইবেন’ বলে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর আননন্দমঠে মায়ের যে রূপ বিবৃত করেছেন, তা সেই অসুর বিনাশকারী রূপ৷  তাঁর ভাষায়---‘‘দশ ভুজো দশ দিকে প্রসারিত, ---তাহাতে নানা আয়ূধ রূপে নানা শক্তি শোভিত, পদতলে শত্রু বিমর্দিত, পদস্থিত বীর কেশরী শত্রু নিপীড়নে নিযুক্ত, দিগ্‌ভূজা--নানা প্রহরণ-ধারিণী শত্রু-বিমর্দ্দিনী৷’’ যে সময়কালে বঙ্কিমচন্দ্রের এই রচনা, দেশ তখন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির পদানত৷ বলা বাহুল্য পদানত জাতির মধ্যে শক্তির উন্মেষ ঘটানোর লক্ষ্যেই এই রূপ কল্পনা৷ স্বাধীনতা সংগ্রামী ঋষি অরবিন্দ তাঁর দুর্গাস্তোত্রে দেবীকে ‘কৃপাণপানি দেবী অসুর বিনাশিনী’ বলে উল্লেখ করেছেন৷ আরও একটি স্তোস্ত্রে বলেছেন, ‘‘মাতঃ দুর্গে! আমাদের শরীরে যোগবলে প্রবেশ কর৷ মন্ত্র তব, অশুভ-বিনাশী তরবারি তব, অজ্ঞান বিনাশী প্রদীপ তব আমরা হইব, বঙ্গীয় যুবকগণের এই বাসনা পূর্ণ কর৷ যন্ত্রী হইয়া যন্ত্র চালাও, অশুভ-হন্ত্রী হইয়া তরবারী ঘোরাও....৷’’

শারদোৎসবের দিনে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা বিশেষ করে যুবতীর দল মেতে উঠেছে পূজো নিয়ে৷ অতীত দিনের থেকে পূজোর সংখ্যা অনেক বেড়েছে, পূজোর চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে, মৃণ্ময়ী মূর্ত্তিতে চিন্ময়ীর যে আরাধনা, এখন আর তা হয় না৷ বাহ্যিক আরম্বর নিয়েই সকলে ব্যস্ত৷ রকমারী মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, নানা থিমের পূজো নিয়েই সকলে মাতোয়ারা৷ মৃণ্ময়ী রূপের আধারে অন্তর্নিহিত যে ভাব-শক্তির যে আরাধনা---আসুরী শক্তির বিনাসের যে ব্যাকুল প্রার্থনা তা আজ আর নেই৷ অথচ আজকের সমাজে সেই আসুরী শক্তি সমূহেরই প্রাবল্য, আর তা ভিন্ন রূপে---মুখোশের অন্তরালে৷ পেশী শক্তিতে যারা বলীয়ান, বাক্‌ চাতুরতায় যারা পটু, নানা ধরণের অন্যায়-অপরাধ-দুর্নীতির সঙ্গে যারা জরিত, তারাই আজ মাথা উঁচু করে সমাজের বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ সমাজ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে রাজনীতিতে তাদেরই দাপট৷ সাধারণ মানুষকে বাক্‌ চাতুর্যে ভুলিয়ে নির্বিচারে শোষণ-নিপীড়ণ-নির্যাতন চালাচ্ছে৷ এদের দাপটে শিক্ষার  আঙিনা, সামাজিক পরিকাঠামো, রাজনীতির ক্ষেত্র, ধৈর্মস্থান সবই কলুষিত৷ আদর্শহীনতা, নীতিহীনতা, আজকের সমাজে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে---দুর্নীতি আজ রন্ধ্রে রন্ধ্রে, অর্থের লালসা, পদ-যশের উচ্চাভিলাশে এক শ্রেণীর মানুষ মানবতাকে করে চলেছে পদদলিত-ধুলুণ্ঠিত৷

আজকের সমাজের স্নেহ, প্রেম, দয়া, মায়া, মানবিক মল্যবোধ প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তিগুলি অন্তহিত৷ ভাবতেও লজ্জা বোধ হয়, যে দেশ অসংখ্য মনীষী, বিপ্লবীর কর্মকাণ্ডে গৌরবান্বিত, সেই দেশেরই এক শ্রেণীর মানুষ---কিশোর থেকে প্রবীণ পর্যন্ত এমনই এক পর্যায়ে নেমে গেছে যে মানুষ জাতিকে কলঙ্কিত করছে৷ যে দেশে নারী জাতিকে মাতা-ভগিনী রূপে সম্বোধন করা হয়েছে---মাতৃরূপে শক্তির আরাধনা হয়ে এসেছে, সেই দেশেরই কিছু পুরুষ, মাতা-ভগিনীর সঙ্গে আচরণ করছে পশুর মত৷ নারী জাতির মর্যাদা-জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে৷ নিত্যদিন যে কত অসহায়া নারী মনুষ্য দেহধারী পুরুষ পশুদের যৌন লালসার শিকার হচ্ছে তার ইয়ত্বা নেই৷ নিদারুণ এক সামাজিক অবক্ষয় সমগ্র মানব সমাজকে কুরে কুরে শেষ করে দিচ্ছে৷ তথাপি দেশের যুব সম্প্রদায় মাতৃরূপের পূজো নিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে রয়েছে৷ 

আমাদের সমাজ-জীবনের কলুষতার এটা গেল একটা দিক৷ দেশের আরও একটা ভয়াবহ কথার উল্লেখ এই প্রেক্ষিতে অবশ্যই করতে হয়৷ আর সেখানেও মানব রূপী অসুরদেরই ভয়ঙ্কর দাপাদাপি৷ এক্ষেত্রে কবির ভাষাতে বললেই স্পষ্ট হবে ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব৷’ হিংসা-দ্বেষ-নির্বিচারে হত্যা-সন্ত্রাস আমাদের দেশের আজ নিত্য দিনের ঘটনা৷ কশ্মীর থেকে শুরু করে এদিকে অসম কোথায় না করছে এমন ঘটনা৷ সাম্প্রদায়িক ভেদ-বিদ্বেষ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, জঙ্গী হানার দেশ জর্জরিত---দেশের ঐক্য, জাতীয় সংহতি, সার্বভৌমত্ব বিপন্ন৷ যারা ঘটাচ্ছে বলা বাহুল্য তারার দেশের অশুভ শক্তি দানব শক্তি৷ রবীন্দ্রনাথের ‘নৈবেদ্য’ কাব্য থেকে বলতে হয়---

‘‘শতাব্দীর সূর্য আজি রক্ত মেঘ মাঝে

অস্ত গেল, হিংসার উৎসবে আজি বাজে

অস্ত্রে অস্ত্রে মরণের উন্মাদ রাগিনী

ভয়ঙ্করী৷ দয়াহীন সভ্যতা নাগিনী

তুলেছে কুটির ফনা চক্ষের নিমেশে

গুপ্ত বিষদণ্ড তার ধরি তীব্র বিষে৷’

এতটুকু অপ্রাসঙ্গিক হবে না দার্শনিক শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকারের ‘‘উল্কা অশনি বহিছে বহ্ণি সফন কালো সর্প’’ (প্রভাত সঙ্গীত)’’---এই কথাগুলির উল্লেখ৷

এই হ’ল আমাদের দেশের ভয়াবহ অবস্থার আর একটা দিক৷ যেখানে ‘‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস’’ ---রবীন্দ্রনাথের এই কথার প্রাসঙ্গিকতার প্রমাণ দিচ্ছে সাম্প্রদায়িক ভেদ-বিদ্বেষে, জঙ্গী আক্রমণে নিত্য দিনের মানুষ খুনের ঘটনাবলী৷

একদিকে ভূলুণ্ঠিত মানবতা, নিদারুণ সামাজিক অবক্ষয়, আর একদিকে হিংসা, সাম্প্রদায়িক ভেদ-বিদ্বেষ সন্ত্রাস, এইরকম ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব শারদোৎসব তথা দুর্গাপূজা৷

পুরাণে বর্ণিত অসুরদের দাপাদাপিতে যেমন তথাকথিত স্বগ্ণের দেব-দেবীরা সংকটে পড়েছিল৷, তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠেছিল, আজ তেমনি মানব রূপী দানবদের তথা আসুরী শক্তিসমূহের প্রাবল্যে দেশ এমনকি সমগ্র বিশ্বও সংকটাপন্ন৷

মানব সমাজকে রক্ষা করার দায়িত্ব মানুষেরই৷---মৃন্ময়ী কোনও দেবদেবী নয়৷ প্রয়োজন শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন সমাজ সচেতন মানুষের৷

উৎসবের ঋতু শরৎ---সেই উৎসব---শারদোৎসব৷ সেই শারদোৎসবকে সার্থক করে তুলতে হলে, প্রকৃতই সর্বজনীন করে তুলতে হলে যে আধারে বা রূপকে এই উৎসব পালিত হচ্ছে---যাকে বলা হচ্ছে অসুর দলনী শক্তি, তার অন্তর্নিহিত ভাবটিকে অর্থাৎ আসুরিক শক্তির বা দানব শক্তির বিনাশকে বাস্তবের মাটিতে সার্থক করে তুলতে হবে৷ ঋষি প্রভাতরঞ্জন সরকারের প্রভাত সঙ্গীতের ভাষায় বলতে হয়, ‘‘জাগাও মানবতা নাশো দানবতা আসুরী শক্তি কর খর্ব৷’’ দেশের তথা সমাজের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সমাজ সচেতন, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের, যুব সমাজকে গ্রহণ করতে হবে বিশেষ ভূমিকা৷  দেশের তথা মানব সমাজের ঐক্য বিনষ্টকারী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নির্মূল করতে হবে---অবসান ঘটাতে হবে হিংসা-দ্বেষ-সন্ত্রাসবাদের৷ সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টি করে যারা সমাজ জীবনকে কলুষিত করছে, যারা মানুষের ওপর শোষণ-নিপীড়ণ-নির্যাতন সৃষ্টিকারী, যারা মানবতার বিরোধী সেই দানব তথা আসুরী শক্তিসমূহকে বিনাশ করতে হবে৷

‘জয়ং দেহী----দ্বিষো জহী’---বলে নিছক প্রার্থনা জানালে হবে না---নিজের মধ্যে প্রকৃত শক্তির উন্মেষ ঘটাতে হবে৷ শক্তি আরাধনা তখনই সার্থক হবে যখন আসুরিক শক্ত সমূহের বিরুদ্ধে----দানবতার বিরুদ্ধে জয় সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে৷ সেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে আজ এগিয়ে চলতে হবে---মাভৈঃ বাণী মানবসমাজকে শোনাতে হবে৷

শারদোৎসবকে উপলক্ষ্য করেই এই নিবদ্ধ৷ তাই পরিশেষে বলি, শারদোৎসবের শেষ লগ্ণ হ’ল বিজয় উৎসব৷ বিজয় উৎসব প্রকৃত অর্থে তখনই সার্থক হতে পারে যখন আসুরিক শক্তিসমূহের বিনাশ ঘটবে৷ প্রসঙ্গতঃ শ্রীশ্রীআনন্দমর্ত্তিজী ভাষায় বলি,

‘‘যথার্থ বিজয়োৎসব মানুষ সেদিনই পালন করবে যখন মানুষের এই সামাজিক শক্তির পতন হবে, আর এই শক্তির মুখ দিয়ে সেদিন আর কোনও আবাজ বের হবে না....এই বিজয়োৎসবে তোমরা ব্যষ্টিগত ভাবে অর্থাৎ মনে মনে আর সমষ্টিগত ভাবে অর্থাৎ জোরে জোরে এই বলে ব্রত নাও যে, যারা মানবতার শত্রু তার বিরুদ্ধে সীমাহীন সংগ্রাম চালিয়ে একদিন আমরা বাস্তবিকই বিজয়োৎসব পালন করবো৷’’