রাজ্যে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন শুরু হয়েছে৷ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সরকার ঘটনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এই প্রক্রিয়া মাঝে মাঝে করতে হয়৷ শেষ এস আই.আর হয়েছিল ২০০২ সালে৷ সেই সময় মিলি জুলি সরকারের প্রধান শাসক দল ছিল বিজেপির প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী৷ তখন কিন্তু এস আই আর নিয়ে দেশে এত শোরগোল হয়নি৷ এত আতঙ্কের পরিবেশ ছিল না, এস আই আর আতঙ্কে মৃত্যুর মিছিলও দেশবাসীকে দেখতে হয়নি৷
এবার কিন্তু পরিবেশ ভিন্ন৷ এবার এস.আই.আর সাম্প্রদায়ীকতার বিষে জর্জরিত৷ এস.আই.আরের লক্ষ্য একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রহীন করা৷ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে লক্ষ্যটা আরও একটু বড়৷ এখানে লক্ষ্য শুধু একটি বিশেষ সম্প্রদায় নয়, বাঙালী জনগোষ্ঠীটাই৷ স্বাধীনতার ৭৮ বছর পর বোট দিয়ে একাধিক সরকার ঘটন করার পরও একটি জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্বের প্রমান দিতে হবে! সেই জনগোষ্ঠী---স্বাধীনতা সংগ্রামে যার অবদানের ধারে কাছে আসতে পারবে না পঞ্জাব ছাড়া অন্যকোন রাজ্য৷ স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও দিল্লির বঞ্চনা, অবহেলা, ষড়যন্ত্রে সেই বাঙালী আজ তিলে তিলে ধবংসের পথে৷ হায় বাঙালী! স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রাম করে সত্যিই অপরাধ করেছে৷
দ্বিজাতি তত্ত্বের দোহাই দিয়ে দেশ ভাগ হয়েছিল৷ স্পষ্ট করে বললে ভাগ হয়েছিল বাঙলা ও পঞ্জাব৷ লক্ষ্য লক্ষ্য উদ্বাস্তুর ভার মাথায় নিয়ে কেন্দ্রের সহযোগিতায় পঞ্জাব নিজেকে গড়ে নিয়েছে৷ কিন্তু বাঙলা! ৭৮ বছরের শোষণ অবদমন নিপীড়নে বাঙলা আজ বিপন্ন৷ অর্থ সম্পদ গেছে, ভাষা, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি গেছে, এখন তো জাতির অস্তিত্বের সংকোট৷ যারা স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে দূরে ছিল, বলা ভালো ব্রিটিশের অনুরক্ত ছিল, তারা আজ রাজার আসনে বসে ‘জনগণমন’ গানের সমালোচনা করে, আধুনিক ভারতের জনক রামমোহনকে ব্রিটিশের দালাল বলে, তালাক প্রথার চেয়েও নৃশংস বর্বর সতীদাহ প্রথাকে সমর্থন করে, সেই ধর্মান্ধের দল আজ নির্দ্ধারন করছে বাঙালী বাংলাদেশী না ভারতীয়! ধর্মমতের রঙ দেখে নাগরিকত্ব ঠিক করা হচ্ছে৷
জাতের নামে শুধু নয়, ধর্মের নামে এই বজ্জাতি রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অরবিন্দ বিবেকানন্দের ভূমিপুত্ররা আর কতদিনের সহ্য করবে! ধর্মের দোহাই দিয়ে জাতপাতের ভেদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ একটা রাষ্ট্রকে কিভাবে কত নীচে নামাতে পারে ভারত তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দু-দুটো পরমাণু বোমায় জাপান প্রায় ধবংস হয়ে গেছিল৷ সে আজ বিশ্বের উন্নত একটি রাষ্ট্র৷ আর ভারত! এত বনজ, জলজ, কৃষিজ, খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ পৃথিবীতে খুব কমই আছে৷ শুধুমাত্র অন্ধ বিশ্বাস, ধর্মীয় গোঁড়ামী, কুসংস্কার দেশটার সর্বনাশ করছে৷ ডিজিটাল ইন্ডিয়ার শ্লোগান দিয়ে গো-দুগ্দে সোনা হাতড়ানো, মহাভারতের যুগে ইন্টারনেটের খোঁজ পাওয়া ধর্মান্ধ শাসকের সব থেকে বেশী মাথা ব্যাথা বাঙালী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে৷ বিশ্বাসঘাতক মির্জাফরের হাত ধরে ব্রিটিশ বাঙলার দরজা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল৷ আবার বাঙালীই তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দেশ থেকে তাড়িয়েছে৷ কিন্তু যাবার সময় বাঙলার চরম সর্বনাশটা করে দিয়ে গেছে পরাধীন ভারতের ব্রিটিশ অনুরক্ত দেশীয় পুঁজিপতিদের দিয়ে৷ স্বাধীনতার প্রথম রাত থেকেই ভারতে বাঙালী জনগোষ্ঠীকে নির্মুল করার যে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল জহরলাল নেহেরু সেই ষড়যন্ত্রকেই পূর্ণতা দিতে এই.এস.আই.আর৷ অন্ধ ধর্মীয় আবেগে উৎসাহ দিয়ে বাঙালীর মধ্যে আবার বিভাজন আনতে চাইছে দিল্লীর শাসক৷ কিন্তু বাঙালী এত সহজ বস্তু নয়৷
চৈতন্য মহাপ্রভু জগৎ মিথ্যা তত্ত্বকে প্রথম অস্বীকার করেছেন, রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন, সামাজিক অবিচার ও শোষনের বিরুদ্ধে ঝলসে উঠেছে শরৎচন্দ্রের কলম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কার বর্জিত মানব ধর্মের সাধনা করার আহ্বান জানিয়ে গেছেন৷ এই মাটির মানুষকে অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারে ভরা অসার ধর্মমতের আবেগে ভাসিয়ে রাজনৈতিক মুনাফা লোটা অসম্ভব৷ ২০২১-২৪-এর নির্বাচনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে দিল্লির শাসক৷ তাই এন.আর.সি, সিএএ, এস.আই.আর৷ ধর্মের নামে বজ্জাতি করে বাঙলা দখলের দিবাস্বপ্ণ যে কেউ দেখতেই পারে৷ কিন্তু বাঙালী আর কতদিন এই বজ্জাতিকে প্রশ্রয় দেবে!
- Log in to post comments