প্রভাতী

তব চিত্তে

লেখক
শ্রীমন

জীবনে মরণে তোমাকেই আমি জানি,

জানি প্রভু মনোপটে তব ছবি মানি৷

আলো আঁধারের খেলায় তব লীলায়,

মন মেতেছে, ভুবন মেতেছে বিশ্বদোলায়৷

চির অন্ধকার থাকবে না আর

আলো আনিলে প্রভু,

অসাধ্য সাধন, ভালবাসার বন্ধ দ্বার

খুলে দিলে তবু,

ডাক দিয়েছ সব মানবে

তব করুণার অনুরাগে,

জীবে প্রেম জাগিয়েছ ভবে

তব কুসুম পরাগে৷

তুমি হাসিয়েছ কাঁদিয়েছ

তুমি মাতিয়েছ নৃত্যে

তোমার তরেই যাওয়া আসা

তোমায় চাওয়া চিত্তে৷

চাওয়া-পাওয়া

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

চাই চাই তারে চাই

                কোথায় তারে পাই

সামনে পিছে ওপরে নীচে

                শুধুই খঁুজে যাই৷

 

নয় সে দূরে হৃদয় জুড়ে

                দেখি বসে আছে

পেলে তারে আর কি ছাড়ি

                যাই তাঁর খুব কাছে৷

 

মিষ্টি হেসে ভালবেসে

                যেই সে জড়িয়ে ধরে

তখন চাওয়া হয় যে হাওয়া

                আনন্দে বুক ভরে৷

অরুণোদয়

লেখক
বিরূপাক্ষ

যতই ঘন হোক না কেন,

                রাতের অন্ধকার

আসবে ফিরে রাতের শেষে

                প্রভাত আবার৷

অন্ধকারে পিশাচের দল

                করুক অট্টহাস্য

সূর্যোদয়ের সঙ্গেই সব

                হবেই অদৃশ্য

নোতুন সূর্য প্রাউট যেদিন

                হইবে উদিত,

গণতন্ত্রের মুখোশধারী

                রাত্রির পিশাচদের

                অবসান নেতৃত্ব৷

মানুষজাতির দুঃখের রাত

                দূরে সরবেই

সবার জীবনে অরুণোদয়

                হবেই হবেই৷

 

‘‘চক্রং ভ্রমতি মস্তকে’’

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

আরও কিছুদূর এগিয়ে চলতে চলতে সে সামনে দেখলে আর একটা পাহাড়......তাঁবার*১

কিপ্ঢেকঞ্জুস দেখলে–ছ’পকেট ভরতি রূপোর টাকা নিলে তাতেও তিনটে অসুবিধে৷ প্রথমতঃ অত রূপোর টাকারই বা দাম কত দ্বিতীয়তঃ রূপোর টাকার ভারে সে দ্রুত চলতে পারবে না৷ তৃতীয়তঃ তাতে ঝমঝম শব্দ হবে তাতে চোর–ডাকাতের বুঝতে সুবিধে হবে যে সে অনেক টাকার মালিক৷

সেকালে এক টাকার নোট ছিল না৷ ইংরেজ যুগে কড়ির ব্যবহারও রহিত হয়ে যায়৷ ব্যবহার বেশী ছিল তাম্র মুদ্রা, ব্রোঞ্জ মুদ্রা, নিকেল মুদ্রা ও রৌপ্য মুদ্রার (খাদ–মেশানো সোনার মুদ্রার –যাকে ইংরেজীতে সব্রেন, বাঙলায় গিনি বলা হত যার থেকে গিনি সোণা–ব্যবহারও অল্পস্বল্প ছিল)৷ বিক্রেতারা তাই দিনে যখনই দোকান থেকে বাড়ীতে যেতেন বিক্রয়লব্ধ অর্থ পুঁটলিতে মজবুত ভাবে ক্ষেঁধে পুঁটলিকে ছোট্ট করে এমনভাবে নিয়ে যেতেন যাতে মুদ্রার কোনো আওয়াজ না হয়৷ একটি ছোটখাট বেনের পুঁটলিতে থেকে যেত অনেকগুলি টাকা৷

বেনের পুঁটলির কথা বলতে গিয়ে সেকালের একটা গল্পের কথা মনে পড়ল৷ একবার একজন গুরু অর্থসংগ্রহের জন্যে শিষ্যবাড়ী পরিক্রমায় বেরিয়েছিলেন৷ তখন শীতকাল.......সদ্য ধান উঠেছে৷ অর্থসংগ্রহের পবে সেটা ছিল খুব উপযুক্ত সময়৷  শিষ্যবাড়ীতে আসায় শিষ্য তাঁকে খুবই আদরযত্ন করলে৷ তখন তার হাতে দু’পয়সা রয়েছে৷ রাত্রে সে গুরুকে বললে–ঠাকুরমশায়, এখন শীতকাল৷ রাত্রে আপনি কম্বল না লেপ গায়ে দেবেন? আপনার জন্যে দুইই তৈরী আছে৷ গুরু ভাবলেন–এই সময়ে একটু মহাপুরুষ সাজা যাক

সেই যে একবার জঙ্গলের ধারে এক ফকিরের আস্তানার পাশে ঝড়ে অনেকগুলো কাক মরে পড়েছিল, লোকে বললে–‘‘ফকির সাহেব, জঙ্গলের এত কাক ঝড়ে মরল কেন?’’ ফকির বললে–‘‘কাকগুলো আমাকে বড্ড জ্বালাতন করত৷ কাল সন্ধেবেলা ওদের খুব শাসিয়েছিলুম৷ বলেছিলুম–তোরা যদি খুব ভদ্রভাবে থাকতে না পারিস তাহলে তোদের সবাইকে শ্যাষ করে দোব৷ একরাত কাটল না গো, এমন ঝড় এল যে সবাই মরে গেল৷ আমার আদেশ পালন করে ওরা যদি কা কা রব ছেড়ে কুহু কুহু রব শিখে নিত তাহলে ওদের এ দশা হত না৷’’

গুরুমশায় দেখলেন–কাক মরল ঝড়ে, ক্যারামতী পেল ফকির৷ তাই না বাংলায় প্রবাদ আছে–ঝড়ে কাক মরে, ফকিরের ক্যারামতী বাড়ে৷ গুরুমশায় ভাবলেন–আমিও এই শিষ্যবাড়ীতে এসে একবার ক্যারামতী দেখিয়ে দিই৷

সে শিষ্যকে বললে–‘‘দেখ, আমরা সব মহাপুরুষ৷ আমাদের শীত–গ্রীষ্ম লাগে না৷ ওই লেপ–কম্বল কোনো কিছুরই দরকার নেই৷’’

গুরু খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়লেন৷ শিষ্য মানুষটি খুবই ভাল৷ সে গুরুর দোরগোড়ায় কম্বল–মুড়ি দিয়ে বসে রইল৷ যদি গুরুর শীত করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে লেপ বা কম্বল দিয়ে দেবে৷ সে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলে–প্রথম প্রহরে গুরু হাত–পা লম্ক্ষা করে সটান হয়ে শুয়ে রয়েছে৷ সে আপন মনে বললে–‘‘প্রথম প্রহরে প্রভু ঢেঁকি অবতার’’৷ দ্বিতীয় প্রহরে গুরুর একটু শীত করছে ৷ শীতে তিনি হাঁটুকে একটু মুড়ে ফেললেন৷ শিষ্য বাইরে থেকে গেয়ে উঠল–‘‘দ্বিতীয় প্রহরে প্রভু ধনুকে টংকার’’৷ তৃতীয়  প্রহরে শীত আরও বেড়েছে৷ গুরুর শরীর শীতে আরও কুঁকড়ে গেল৷ শিষ্য গেয়ে উঠল–‘‘তৃতীয় প্রহরে প্রভু কুকুরকুণ্ডলী’’৷  চতুর্থ প্রহরে শীত আরও বেড়ে যাওয়ায় গুরুর শরীরটা একেবারে গোল পাকিয়ে গেল৷ তাই দেখে শিষ্য গেয়ে উঠল– ‘‘চতুর্থ প্রহরে প্রভু বেনের পুঁটুলি’’৷ তা সে যাই হোক্, কিপ্ঢেকঞ্জুস বেনের পুঁটলি নিয়ে ঘোরাফেরা করতে চায় না৷

সে আরও এগিয়ে চলল৷ কিপ্ঢেকঞ্জুস এগিয়ে চলল৷ দিনের পর দিন..........মাসের পর মাস৷ চলে গেছে কত বিনিদ্র রজনী.....কত অজস্র বৃষ্টিপাত৷ কিপ্ঢেকঞ্জুসের কোনো দিকেই ভ্রূক্ষেপ নেই৷ লক্ষ্য তার সম্পদ আহরণ.........মন তার বলে চলেছে–‘‘ম্যাঁয় ভুখা হুঁ......ম্যাঁয় ভুখা হুঁ ’’৷

হঠাৎ সে দেখলে ঝকঝকে সোণার*২ পাকা সোণার মুদ্রা–প্রাচীনকালে বলা হত ‘সীনক’৷

সোণার পাহাড় দেখে কিপ্ঢেকঞ্জুসের চোখ ঝলসে গেল–ওঃ আমার জন্ম–জন্মান্তরের সাধ পূর্ণ হল৷ আমি আজ সবচেয়ে ধনী কিন্তু এই ধনরত্ন কী করে নিয়ে যাব কোথায় রাখব ........এই ধনরত্ন আমি সুদে আসলে আরও বাড়াব..........এতদিন জলখাবারে খেতুম তেল–নুন মাখা মুড়ির সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা৷ এবার থেকে কাঁচা লঙ্কা বাদ দিয়ে শুধু শুকনো মুড়ি খাব–খরচ কমাব......আয় বাড়াব৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফ্যাসাদ বাধল কীভাবে এই ধনকে নিয়ে যাওয়া যায় তাই নিয়ে ৷ ছ’টা পকেটে তো এই সোণার পাহাড় আঁটবে না৷      (ক্রমশঃ)

 

*১ (*তাম্রঞ্ছতাম্বঞ্ছতাম্ব্৷ প্রাচীন ভারতের পয়সা সাধারণতঃ তাঁবার হত৷ এই রীতি মোগলযুগ পর্যন্ত গড়িয়ে এসেছিল৷ ইংরেজ যুগে পয়সা তৈরীতে খাঁটি তাঁবার ব্যবহার রহিত করে দেওয়া হয় কারণ তাতে পড়তা পড়ত না৷) পয়সার পাহাড়৷ কিপ্ঢেকঞ্জুস ভাবলে........তাঁবার দাম কড়ির চেয়ে অনেক বেশী হলেও ছ’ পকেট ভর্ত্তি তাঁবার পয়সা নিয়ে গেলে তা এমন কিছু ক্ষড়লোকমির পরিচয় হবে না৷ তাই সে তাঁবার পাহাড় টপকে এগিয়ে চলল৷ আরও কিছুদূর গিয়ে দেখে–রূপোর টাকার* (*প্রাচীন ভারতে রূপোর টাকার প্রচলন ছিল৷ তবে মুদ্রা ছাপানো হত খুব কম৷ কিন্তু টাকাগুলো ছিল খাঁটি রূপোর৷ ইংরেজ যুগের গোড়ার দিকে কিছুদিন খাঁটি রূপোর টাকার ব্যবহার ছিল৷ তবে তাতে কিছুটা খাদ মেশানো হত৷ টাকার কতটা খাদ আছে তা হাতে বাজিয়ে শব্দ শুনেই ক্ষোঝা যেত৷ ব্যবহারযোগ্য রূপোকে বলা হত ‘চাঁদি’৷) (টংকক বা রৌপ্যকম্) পাহাড়৷

(*২ প্রাচীন ভারতে, পারস্যে ও এশিয়ার অধিকাংশ দেশে মুদ্রা তৈরী হত পাকা সোণার যার প্রচলিত সংস্কৃত নাম ছিল ‘কাঞ্চন’৷ ‘কাঞ্চন’ বলতে ক্ষোঝায় সেই সোণা যাতে তিলমাত্র খাদ নেই বা বিদূষণ ঘটেনি৷ খাদমেশানো সোণা বা গিনি সোণার উদ্ভব ইয়ূরোপে৷ ভারতে তা এসেছেন ইংরেজ আমলে৷)

বেদপাঠ

লেখক
নিউটন

আদিহীন অন্তহীন নীলিমার বিপন্ন বিস্ময়

নিরন্তর বহমান সময়ের চাকা ঘুর্ণমান

রাত্রির নিয়তি না কি নিয়তির রাত্রি হয় ক্ষয়

সেকেণ্ড মিনিট পলে পলে চলে কোন মহাযান?

পৃথিবীর প্রান্ত হতে মহাশূন্যের পানে কে ধায়

ইতিহাসের প্রথম পাতার পুর্বের যে পৃষ্ঠায়

যেখানে হয়নি লেখা কালি ও কলমের ছোঁয়ায়

লিখিত পাণ্ডুলিপি দেখাবে আর কোন দ্রষ্টায়?

যে নদী আজ বুক ভরা তৃষ্ণার জল রাশি ধরে

পেয়েছে পরিচয় সীমাহীন সমুদ্রের সংজ্ঞায়

কোন রূপে অন্তলীন জলধির যৌবন সম্বরে

অম্বরে ঢেকেছে পঙ্কিল পৃথিবীরে স্নিগ্দ গঙ্গায়?

একমুঠো মাটি আজ সাজিয়েছে পৃথিবীর সাজ

এতো তরুলতা ফুল ফল পাখিদের কোলাহল

স্নিগ্দ রাত্রির অঞ্চল জুড়ে জোছনার কারুকাজ

কে দিলো উচ্ছল প্রাণের হাসিতে ভরা অশ্রুজল?

মহাশূন্যে কোন মাছরাঙা এসে জ্বেলেছে আগুন

দুর করে পৃথিবীর অন্ধকার খুলে রুদ্ধদার

প্রাণে প্রাণে সব ছড়িয়ে দিয়েছে বসন্ত ফাগুন

ম্ঙ্গলদীপ জ্বেলে আনন্দযজ্ঞে ডাকে বার বার?

শূন্যেরে ছেড়ে দিলে শূন্যে মেশে অনন্ত শুন্যতায়

রূপ অরূপের খেলা খেলে বসে কোন লীলাময়

যে এসে ফিরে যায় সে কোন অসীম অখণ্ডতায়

বেদান্তের আদি অন্ত বিজ্ঞানের বোঝা বড় দায়৷

জন্ম মৃত্যু কোন বৃন্তে মানবেরে কাঁদায় হাসায়

অনাদিকালের মহাপ্রাণ সাগরের তীরে একা

যে জেনেছে সে চুপ করে আছে বোধিবৃক্ষ ছায়ায়

বসে আছে পেতে এক মহাশূন্যের নিঃশূন্য রেখা৷

তোমার জগতে

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

ব্যথাতুরা এই লাঞ্ছিতা ধরণীকে

নিয়ে চল’ তোমারই

অন্য কোন সুন্দর পৃথিবীতে৷

যেখানে আছে হাসি, আনন্দ

আছে সুর ও ছন্দ

লয়হারা নয় প্রমত্ত প্রলয়

নাই মৃত্যুর হাতছানি, হারানোর ভয়৷

আছে রূপ-রস, মাধুরী-সুগন্ধ

নেই ভেদাভেদ, হিংসা-দ্বন্দ্ব

বুভুক্ষুর যন্ত্রণা, শোষণের ভ্রষ্টনীতি৷

আছে সন্তোষ, প্রেম-প্রীতি

শান্তি-ভালবাসার দখিণা মলয়

বিবেকারুণ-রাগে রাঙে চতুর্বলয়

কুঞ্জে কুঞ্জে বিহগের কুহু-কলতান

মানব কণ্ঠে ধবনিত মুক্তির জয়গান৷

সেই আলোকদীপ্ত অমৃতময়

সত্য-শুভ্র তোমার জগতে

সেবা-সাধনায় মাতিবারে চাই

বিশ্বজোড়া সকল ভ্রাতা-ভগিনী সাথে৷

 

“ভ্রমতি মস্তকে”

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

মনে পড়ে গেল একটা ইতিহাসপ্রসিদ্ধ আখ্যায়িকা৷ গ্রামের নাম কুড়িয়ে–খাওয়া৷ সেখানকার সুপ্রসিদ্ধ মানুষ ছিলেন শ্রীযুক্ত বাবু কিপ্ঢেকঞ্জুস কর৷ কিপ্ঢেকঞ্জুস বৈধ অবৈধ নানান ভাবে টাকা রোজগার করত৷ সে ভেবে দেখলে, হঠাৎ–বড়লোক হতে গেলে শিব ঠাকুরের কাছ থেকে বরদান নিতে হবে৷ অন্য দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্যে কঠোর তপস্যার প্রয়োজন৷ কিন্তু শিব তো ভোলানাথ .....আশুতোষ৷ একটা আকন্দ ফুল আর কয়েকটা বেলপাতা দিলেই সন্তুষ্ট হয়ে যান৷ তাই তাঁকেই ডাকি৷

কিপ্ঢেকঞ্জুসের জানা ছিল শিবের দয়ার শরীর৷ দানব–রাক্ষসেরা শিবের কাছ থেকে বর দান পেত৷ কিপ্ঢেকঞ্জুস শিবের তপস্যায় বসে গেল৷ অল্প দিনের তপস্যায় শিব সন্তুষ্ট হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন৷ বললেন–‘‘চোখ খুলে চা বেটা, আমি এসেছি৷’’

কিপ্ঢেকঞ্জুস বললে–‘‘এসেছো যখন ঠাকুর, আমার মনস্কামনা পূর্ণ করো৷’’

শিব বললেন–‘‘কী তোর মনস্কামনা? তুই আমাকে চাস, না আমার কাছ থেকে আর কিছু চাস?’’

তখন কিপ্ঢেকঞ্জুস বললে–‘‘তুমি তো ছাইমাখা ভিখিরি৷ তোমাকে নিয়ে আমার লাভ কী তুমি আমার বোঝা হয়ে দাঁড়াবে৷ তুমি বরং আমাকে বর দান করো যাতে দু’পয়সার মুখ দেখতে পাই৷’’

শিব বললেন–‘‘এই মাত্র বললি, আমি ছাইমাখা ভিখিরি৷ আবার আমার কাছ থেকে টাকা পয়সা চাইছিস কোন যুক্তিতে?’’

কিপ্ঢেকঞ্জুস বললে–‘‘তুমি যে ছাইমাখা ভিখিরি একথা তো  ঠিকই ৷ কিন্তু দুপুরবেলায় হক্ষিষ্যি করার পর ধনৈশ্বর্যের দেবতা কুবের এসে তোমাকে ম্যাসাজ (হাত–পা টিপে দেওয়া) করে দিয়ে যায়৷ ম্যাসাজ করতে করতে কুবের যখন তোমাকে বলবে–‘ঠাকুর, এবার ডানপাশ ফিরে শোও, সেই ফাঁকতালে তুমি বলে দিও, কুবের কিপ্ঢেকঞ্জুসের দিকে মুখ তুলে চা৷ ওকে কিছু পাইয়ে দে৷’’

শিবঠাকুর বললেন–কুবের যদি আমার কথা না রাখে......

কিপ্ঢেকঞ্জুস বললে–‘‘ত্রিভুবনে কার ঘাড়ে ক’টা মাথা আছে যে তোমার কথা ঠেলতে পারে৷ কুবের তোমার কথা শুনবেই শুনবে৷’’

শিব বললেন–‘‘আমি কুবেরকে বলে দোব৷ আর কুবের যা বলবে তোকে জানাব৷’’

কিপ্ঢেকঞ্জুস বললে–‘‘ঠাকুর বেশ কিছুদিন ধরে তপস্যা করে আজ তোমার ইন্টারভিউ পেয়েছি৷ আবার দ্বিতীয়বার ইন্টারভিউ পেতে গেলে অনেকদিন তপস্যা করতে হবে৷ এদিকে আমাদের দোকানের কেনাবেচা লাটে উঠতে বসেছে৷ কুবেরের কী উত্তর হবে তা অনুমান করে নিয়ে তুমি আগাম বলে দাও আমাকে কী করতে হবে৷’’

শিব বললেন–‘‘আহাহা বেচারা বারবার কেনই বা আমার জন্যে তপস্যা করবে আহাহা বেচারা ......... মোহগ্রস্ত বেচারা’’

শিব কিপ্ঢেকঞ্জুসকে বললেন–‘‘ওই যে দিগন্তবিস্তৃত অরণ্যানী*১ তুই নাকের সোজা ওর ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলতে থাক৷ কথাটা আমি কুবেরকে জানাব৷ সে দরকারমত ব্যবস্থা করবে৷’’

কিপ্ঢেকঞ্জুস এগিয়ে চলল..........এগিয়ে চলল তার অশেষ গতিতে৷ গাছপালা সে দেখছে না...........গাছপালা নিয়ে গবেষণা করতে সে আসেনি৷ পশুপক্ষীর জীবন–চর্যার দিকেও সে তাকাচ্ছে না কারণ তাদের নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় তার নেই৷ সে কি শিবঠাকুরের কথা ভাবছে? না না না শিবঠাকুর তখন তার কাছে পর্দার আড়ালে সরে যাওয়া জিনিস৷ সেকি কুবেরের কথা ভাবছে?–না, তাও নয়৷ সে ভাবছে কুবেরের ধন–সম্পদের কথা৷

কিপ্ঢেকঞ্জুস এগিয়ে চলেছে৷ তার বাঘের ভয় নেই......সাপের ভয় নেই........জল থেকে উঠে–আসা কুমীরের ভয় নেই৷ ধনসম্পদের মোহে সে আচ্ছন্ন৷ মোহের চশমায় তার দৃষ্টি অস্পষ্ট হয়ে গেছে৷ কে কী বলবে, কে কী ভাববে, তা ভাবার অবসর তার নেই৷ সে চলেছে......সে চলেছে.........অর্থগৃধ্ণুতার চরমত্বের দিকে৷ হঠাৎ কী যেন একটা দেখে কিপ্ঢেকঞ্জুস থমকে দাঁড়াল৷ সে তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না.....সামনে কড়ির*২  পাহাড়..........ডাইনে কড়ির পর্বত........ বাঁয়ে কড়ির টিলা........পেছনে কড়ির ঢিবি৷ সে জয় ঘোষণা করলে কিন্তু কার জয়? শিবের জয় নয়......কুবেরের জয়  নয়......কড়ির জয় পরক্ষণেই সে ভাবলে–কড়ির আর দাম কতটুকু সঙ্গে তো তার রয়েছে ছটা পকেট–কোটের চারটে পকেট আর প্যান্টের দুটো পকেট, ছটা পকেট–ভরতি কড়ি নিলেও তার দাম এমন কিছু হবে না৷

কিপ্ঢেকঞ্জুস কড়িকে খারিজ করে এগিয়ে চলল৷    (ক্রমশঃ)

*১ ক্ষৃহৎ অরণ্য এই অর্থে অরণ্যানী৷ ক্ষৃহৎ হিম অর্থাৎ অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হিম এই অর্থে হিমানী৷ কিন্তু ক্ষৃহৎ যবন এই অর্থে ‘যবনানী’ নয়, ‘যবনানী’ মানে যবনের লিপি বা লেখা৷ ‘অরণ্যানী’ শব্দ শুদ্ধ হলেও ‘বনানী’ শব্দ শুদ্ধ নয়৷

*২ কড়ির জন্যে সংস্কৃতে অনেকগুলি শব্দ থাকলেও কটিকা ও ক্কথিকা–এই দুটো শব্দই বেশী প্রচলিত৷ প্রাচীনকালে হাটেবাজারে লেনদেনে কড়িই বেশী চলত৷ তাম্রমূদ্রা অচল ছিল না৷ তবে বাজার–চালু তাম্রমুদ্রার সংখ্যা বা পরিমাণ ছিল কম৷ কড়ি তৈরীর জন্য টংকশালার (টাঁকশালার) দরকার পড়ে না৷ তাই লেনদেনে ছিল তারই অবাধ ব্যবহার৷ খুব বেশী দামী জিনিসের লেনদেনে টংকক (টাকা) বা রৌপ্যকম্ (রূপেয়া) ব্যবহার করা হত৷ এই টংকক বা রৌপ্যকমের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বিশেষ যোগাযোগ ছিল না৷ এমনকি সাধারণ মানুষ অনেক সময় কড়ির ব্যবহার না করে অদলবদল প্রথায় কাজ চালাত৷ এই ‘অদলবদল’ শব্দটি আমাদের ছোটবেলায় রােে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হত৷ ছোটবেলাতে তাই দেখেছি এক কুনকে চালের বিনিময়ে শাক–মাছ–তরীতরকা নানান জিনিস কেনা চলত৷ বীরভূমের খয়রাসোল থানায় দেখেছি ছুতোর কাঠের পিলশুজ তৈরী করে হাটে বসে চালের বিনিময়ে তা বেচছে৷ আধুনিক যুগের বার্টার ব্যবসায় প্রথাও কতকটা এই ধরনের৷

তা যাই হোক রূপোর টাকার ব্যবহার খুবই অল্পই ছিল৷ মুদ্রা মানে সোনাই চলত৷ কিন্তু বাজারে সাধারণ লেনদেনে সোণা বা স্বর্ণমুদ্রার (সীনক) ব্যবহার ছিল না৷ সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে তাই কড়ি অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত থাকত৷ আগেকার দিনে মেয়েরা যে লক্ষ্মীপুজো করতেন তাতে লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে অবশ্যই কড়ি থাকত৷ আমাদের ছোটবেলায় কোলকাতায় দেখতুম বিয়েতে বরণের সময় বরকে বলা হত ঃ

‘‘কড়ি দিয়ে কিনলুম, দড়ি দিয়ে বাঁধলুম,

হাতে দিলুম মাকু একবার ভ্যা কর তো বাপু৷’’

জানি না কোনো কোনো বোকা বর সত্যিসত্যিই ভ্যা করত কিনা৷ এখনও আমরা ব্যবহারের ভাষায় টাকাকড়ি, পয়সাকড়ি, মাইনেকড়ি বলে থাকি, যদিও কড়ি বড় একটা চোখে দেখি না৷

যেসব মায়েদের মৃতবৎসা রোগ ছিল তারা সন্তান যাতে না মরে সেইজন্যে ভূমিষ্ঠ হবার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানকে ধাইকে (দাই–midwife, সংস্কৃতে ‘ধাত্রী’) দান করত৷ তারপর যেন অন্যের ছেলেকে কিনছে এই রকম ভান করে সেই ধাইয়ের কাছ থেকে একটা কড়ি, তিনটে কড়ি, পাঁচটা কড়ি, সাতটা কড়ি বা ন’টা কড়ি দিয়ে কিনে নিত৷ আর সন্তানেরও নাম ঠিক তেমনি রাখা হত৷ সেকালে কড়ি নিয়ে বেচাকেনা চলত বলেই ছাত্রদের অঙ্ক শিখবার সময় কড়াক্রান্তি শিখতে হত৷

অবাক কাণ্ড

লেখক
শিবরাম চক্রবর্তী

দেখছে মদন স্পষ্ট চোখে গাছে উঠছে গোরু,

জোড়া বাঁদর নিয়ে হারু চাষ করছে শুরু৷

আলু–পটল, উচ্ছে–বেগুন রান্না হয়ে গাছে,

খাওয়ার ইচ্ছা না হলেও আসছে মুখের কাছে৷

আরব সাগর দিচ্ছে পাড়ি যত উটের দলে,

মরুর বুকে দেখছে আবার জাহাজ ছুটে চলে৷

হিমালয় পাখা মেলে আকাশেতে উড়ছে,

চিতল–বোয়াল উঠোনটায় ডিস্কো নাচন নাচছে৷

একি কাণ্ড পাঠশালাতে পশুরা সব পড়ছে

মানুষ যত পশুর মত কামড়া–কামড়ি করছে

গাছের মাথা নীচে পোঁতা গোড়া আকাশ মুখে,

পায়ে হেঁটে চলত যারা হাতে হাঁটছে সুখে

ঘরটা এবার উল্টে গিয়ে শূন্যপানে ওড়ে

ঘুমের মধ্যে মদনবাবু খাট থেকে যান পড়ে৷ 

আনন্দেরই টান

লেখক
সাধনা সরকার

সবুজপাতা আকাশ নীল

                কে যাবি আয় সাথে

জোনাকজ্বলা ফিনকি ফোটা

                আনন্দগানের সাথে৷

ডাকছে আকাশ ডাকছে বাতাস

                ডাকছে খোকা খুকু

কি আনন্দ আকাশ জোড়া

                নেইকো আর দুখু

মেঘের পরে মেঘ জমেছে

                আনন্দ আর গানে

কে কোথায় সব আয়রে তোরা

                 ভালোবাসার টানে

দেখ চেয়ে দেখ মাটির কাছে

                 চাঁদা মামার গান

বুকের মাঝে ছলকে ওঠে

                আনন্দেরি টান৷  

 

রয়েছো মোরে ঘিরে

লেখক
শ্রীপথিক

ধর্ম ভুলে কর্ম নিয়ে মত্ত ছিলুম বলে,

আজকে প্রভু, কর্ম হয়েই এলে৷

গানের সুরে বিভোর হতুম তাই

গানের তোড়া আজ উপহার পাই৷

নাচের তালে দুলতো কোমল মন

তোমার নামে সকাল সাঁঝে তাই বুঝি নাচাও

ফুলের শোভা প্রাণটি ভরে ভালবাসতুম বলে

নিজের হাতে ফুলের বাগান আজকে রচে যাও৷

কানন ছেড়ে ঘরের কোণে

                লুকিয়ে ছিলুম বলে

চার দেওয়ালে যেদিকে তাকাই

                তোমার দেখা মেলে

লেখার মাঝে ডুবেছিলুম

                তাই লেখনীর পাশে

আজকে দেখি

                তোমারই ছায়া ভাসে৷

আমার তুমি ভালোবাসো

                প্রাণের অধিক করে

তাই তো দেখি সব দিকেতেই

                রয়েছো মোরে ঘিরে৷