প্রভাতী

স্বামী বিবেকানন্দের স্মরণে

লেখক
প্রভাত খাঁ

ন্যায়, সত্য, মানবতার মূর্ত্ত প্রতীক

বিবেকের আনন্দ তুমি,

তুমি বিবেকানন্দ৷ তোমার অমৃত

বাণী জাগায়েছে বিশ্ব সংসারে

একসূত্রে বেঁধে দিতে মানব সমাজে৷

তুমি জাতপাত ভেদাভেদ দূর করি’

                আচণ্ডালে ভালবেসে

মাটির–পৃথিবী পরে সচেষ্ট

                ছিলে এক মানব সমাজ–গড়ি’

তার মনে আনন্দ জাগাতে৷

হে বীর, দৃঢ় চেতা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী

ভারত আত্মায় তুমি প্রতিষ্ঠা করে গেছো

বিশ্ব সংসারে অধ্যাত্মজ্ঞানের

বাণী দিকে দিকে ছড়ায়৷

ক্ষণজন্মা তুমি তোমার

কর্ম এষণা তোমাকে

সু–প্রতিষ্ঠিত করে গেছে

চিরকাল বিশ্ব সংসারে৷

আজ তুমি নাই, মহান কীর্ত্তি তব

জাগ্রত প্রহরীসম সকলের মনে

তোমারে বসায়ে রাখি’ ধন্য

করি’ রেখে যায় কৃতজ্ঞতাপাশে৷

স্বর্ণগর্ভা এ মহান দেশে

তুমিই চিনায়েছ তারে বেদান্তের

ব্রাহ্মীভাবে জগৎ সংসারে বিশ্বমন

জয়করি অধ্যাত্ম প্রেমে’৷

নুকাইঁ নুকাইঁ

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

তৃতীয় ধরনের কপটাচরণও আমরা কম দেখি না৷ শুনেছিলুম, আমেরিকায় এক ভদ্রলোক একটি প্রচণ্ড রকমের মদ্যপান–বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন৷ এক জনসভায় মদের অপকারিতা সম্ক্ষন্ধে তিনি ওজস্বিনী ভাষায় ঠায় এক ঘণ্ঢা বত্তৃণতা করেছিলেন৷ তারপর বললেন–উঃ, উঃ গলা শুকিয়ে গেছে, এক গ্লাস ব্র্যাণ্ডি দাও৷      *        *        *  

সেবার আমি সাহেৰগঞ্জ থেকে দুমকা যাচ্ছি৷ সুদীর্ঘ পথ৷ সাহেৰগঞ্জ শহর পার হবার পরই শুরু হ’ল পাহাড় আর জঙ্গল৷ পশ্চিম রােের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্য অতি রমণীয়৷ ইচ্ছে হল, এই পাহাড়–জঙ্গলের মধ্য দিয়ে মাইল খানেক পায়ে হাঁটি৷ গাড়ি থেকে নেৰে পড়লুম..........হাঁটতে শুরু করলুম৷ কিছু দূর যাবার পর দেখছি, পায়ে নতুন জুতো–পরা সাত–আট বছরের একটি ন্যাংটো ছেলে কঞ্চি দিয়ে মাঠের একটি গর্ত্তের মধ্যে খোঁচা দিচ্ছে৷ আমি তাকে জিজ্ঞেস করলুম–তুর নাম কী বটেক?

সে বললে–রামকৃষ্ণ তুরী বটেক গো৷

আমি বললুম– কী করছিস বটেক?

ছেলেটি বললে–ইন্দুর ধরছি৷

আমি জিজ্ঞেস করলুম–ইন্দুর লিয়ে কী করবি?

সে বললে–পুড়াই খাব৷

আমি জিজ্ঞেস করলুম–ক্ষ্রাহ্মণ–কায়স্থরাও খায়?

সে বললে–হঁ, উয়ারা নুকাইঁ নুকাইঁ খায়৷

এই ‘নুকাইঁ নুকাইঁ খাওয়া’ লোকের সামনে নিজের ত্রুটি ঢাকার অপচেষ্টা৷ এটাও এক  ধরনের কপটতা৷

ধরা আর সরা

দেশজ শব্দে ‘ট’ যথাযথভাবেই বজায় থাকে৷ আর ‘ড’ বা ‘ড়’ মৌলিক শব্দ হিসেবেই থেকে যায়৷ যেমন, আজ ভুলোর সঙ্গে ভোঁদার আড়ি হয়ে গেল৷ ওরা বলছে, ওরা আর একসঙ্গে মার্ক্ষেল খেলবে না, একটা পেয়ারাও আর কামড়াকামড়ি করে খাবে না৷ গোপনে কান পেতে শোনাকেও আড়িপাতা বলে৷ এটিও বাংলা দেশজ শব্দ৷

সেই যে একজন মহিলা আহ্লাদে আটখানা হয়ে তার এক ৰন্ধুকে বলেছিল–তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে তা ভাষায় বলতে পারছি না৷ ৰন্ধু বলেছিল, তোমার যে কী আনন্দ হচ্ছে তার একটু আভাস আমায় দাও৷ মহিলাটি বলেছিল, আহ্লাদের আতিশয্যে আমার এখন ধরাকে সরা মনে হচ্ছে৷ সেই সময় হয়েছে কী, একজন চাষীর গোরু হারিয়ে গেছে৷ সে গোরু খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে যে বাড়ির বারান্দায় বসেছে সেই বাড়িরই ঘরের ভেতর ওই মহিলাটি বলছে– আমি আনন্দের আতিশয্যে ধরাকে সরা মনে করছি৷ চাষী আড়ি পেতে কথাটা শুনে নিলে৷ এবার সেও আনন্দের আতিশয্যে ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে ঘরের বাইরে থেকে ওই মহিলাটিকে গড় করে বললে–মা লক্ষ্মী, এই বিরাট ধরাটা যখন তোমার কাছে সরা হয়ে গেছে তখন দয়া করে বলে দাও, ওই সরার কোন্খানটিতে আমার গোরুটা রয়েছে৷

জানতি পার নাই

দ্বিতীয় ধরনের কপটাচরণও আমরা খুব ৰেশী দেখে থাকি৷ এই ধরনের কপটাচরণের একটা গল্প মনে পড়ল৷ একবার এক বেতো রোগী চিকিৎসার জন্যে এক হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে এসেছে৷ ডাক্তার তার মুখ থেকে রোগবিবরণী শোনার পর তাকে জিজ্ঞেস করলেন–‘‘প্যাটের মদ্দি যন্ত্রণা অয়?’’

রোগী বললে–কই না তো ডাক্তারবাবু, আমার পেটের মধ্যে তো কোনো যন্ত্রণা হয় না৷ ডাক্তার দাৰড়ানি দিয়ে বললেন–অয়, অয়, জান্তি দ্ব্ত্রুব্ধন্গ্গ পারো না৷

তারপর ডাক্তার আবার শুধোলেন–দাঁতের মাড়িতে ব্যাদনা অয়?

রোগী–কই না তো ডাক্তারবাবু, আমার দাঁতের মাড়িতে কোনো বেদনা তো হয় না৷

ডাক্তার আর একটা রাম–দাৰড়ানি দিয়ে বললেন– অয়, অয়, জ.ান্তি পারো না৷

ডাক্তার আবার শুধোলেন–পায়ের বুড়া আঙ্গুলে ম্যালেরিয়া অয়?

রোগী–কই না তো ডাক্তারবাবু, আমার পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে কিংবা অন্য কোনো আঙ্গুলে ম্যালেরিয়া তো হয় না৷

ডাক্তার ধমকানি দিয়ে বললেন–অয়, অয়, জ.ান্তি পারো না৷

এবার ডাক্তার রোগীটিকে শুধোলেন–কর্ণমূলে টাইপয়েড হয়?

রোগী–কই না তো ডাক্তারবাবু৷ আমার কানের গোড়াতে বা কানের অন্য কোনো অংশে তো টাইফয়েড হয় না৷

এবার ডাক্তার প্রচণ্ড রাম–ধমকানি দিয়ে বললেন–অয়, অয়, জ.ান্তি পারো না৷

এবার রোগী বললে–তাহলে ডাক্তারবাবু, আমার ব্যামো যখন সেরে যাবে তখনও তো আমি জান্তি পারব না আমার ব্যামো সারল কি না৷

বিদ্যাসাগর

লেখক
সন্দীপ পাল

দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর,

                বিদ্যা দান করে,

অমর হয়ে আছো তুমি

                এ বিশ্ব মাঝারে৷

গরীব জনে দয়া কর

                তুমি যে মহান,

আমি তোমায় ভালবাসি

                লহ মোর প্রণাম৷

নারী ও দুঃসময়

লেখক
রীণা বোস

এত পশুত্ব নীচতা নারীদের ইজ্জত নিয়ে,

পুলিশ কর্তারাও হচ্ছেন হন্যে,

এর প্রতিকার করতে গিয়ে৷

হে নারী যারা তোমাদের ইজ্জত নিয়ে

করে টানাটানি,

হয়ে ওঠো তাদের কাছে দেবী চৌধুরাণী

শিখো ক্যারাটে শিখো জুডো কর আত্মরক্ষা,

তাহলেই দেখবে ভগবান

তোমাদের করবেন রক্ষা৷

অতীতে রক্তবীজকে বধ করেছিলেন মা–কালী

যারা বে–ইজ্জত করে নারীদের

তাদের দাও বলি৷

ভারতের রত্ন

লেখক
শ্যামল বসাক

আমার দেশের বীর শিবাজী

                আমার দেশের বীর ক্ষুদিরাম

                                আমার দেশের শ্রেষ্ঠ যে বীর

                                                নেতাজী সুভাষ তাঁহার নাম৷৷

আমার দেশের বিদ্যাসাগর

                দ্বিজেন্দ্রলাল, নজরুল ইসলাম

                                আমার দেশের ঋষি অরবিন্দ

                                                শ্রীরামকৃষ্ণের তীর্থস্থান৷৷

বিশ্বকবি আমার দেশের

                বিবেকানন্দ দেশের মান

                                বিশ্বসভায় করল প্রচার

                                আমার ভারত আমার দেশ মহান৷৷

তাঁর স্মরণে

লেখক
রতন কুমার দে

জীবন আছে ঠিক করা

কত ছন্দে ভরা

শুরু থেকে শেষ

চলেছে বেশ তাঁর বিধান মত

এখন বুঝে চলো সেই মত৷

মনে রেখো

কিছুই ছিল না

এখন আছ পরে থাকবে না

তাঁকে স্মরণে রেখে

যেন তাঁর চরণ ধরে

হয়ে নত

হে মন তাঁকে ডাক অবিরত

যেন তাঁকে পাও অবিরত৷৷

কী দিয়ে পূজিব

লেখক
সাক্ষীগোপাল দেব

কী দিয়ে পূজিব তোমায় প্রভু

                কোন উপাচারে তোমায় তুষি

কোন অর্ঘ্য পায়ে দিব ঢালি

                বল কিসে তুমি হবে খুশী৷৷

কত ফল ফুলে ধরণী ভরা

                সকলি তোমার নিজ হাতে গড়া

তব ফল-ফুলে কেমনে পূজি

                লজ্জা দীনতা মরমে পশি৷৷

তব দেওয়া এ দেহ মন-প্রাণ

                আমার অহং তাও তব দান

মোর তন মন প্রাণ দিনু ঢালি

                তোমার চরণ প্রান্তে বসি৷৷

 

তুক্গুণ

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

আগেকার দিনে  সব নানান ধরণের ঝাড়-ফঁুক, তুক-তাক, ডাকিনীতন্ত্র, যক্ষিণীতন্ত্র, যোগিনীতন্ত্র ইত্যাদির নাম দিয়ে নানান জিনিসের চর্র্চ চলত৷ জিনিসগুলো ভাল কি মন্দ তা নিয়ে আলোচনার  সময় এটা নয়৷ তবে ওই সব জিনিসগুলির মানব সমাজে তেমন কোন কল্যাণ করতে পারিনি৷ ডাকিনী-ডাইনি৷ শোণা যায়  ডাকিনীতন্ত্রে প্রতিষ্টিত হতে গেলে মেয়েদের নাকি প্রথমেই  ওই বিদ্যাপ্রয়োগ করে নিজের স্বামী  অথবা পুত্রকে হত্যা করতে হয়৷  তবেই এই তন্ত্রে সিদ্ধিলাভ  করা যায়৷ সেই জন্যে ডাইনীরা ছিল সর্বকালে ঘৃণ্য৷ তবে ডাইনী ভেবে অনেক নিরপরাধ মেয়েদের ওপরও অত্যাচারও চলত ....আজও হয়তো চলে৷ তবে ডাইনী যে আজও সমাজে একেবারেই  নেই তা বলছি না ৷ মেয়েদের মধ্যে একটা ছড়াই আছে ‘‘জনম গেল ছেলে খেয়ে/ আজ বলে ডাইনী’’৷ অর্র্থৎ আমি কি আজকের ডাইনী গো! আমি এতকাল অনেক ছেলেকে খেয়েছি, এতদিন পরে তোমরা আমাকে ধরছ ডাইনী বলে’৷

ভুত নাবানো, প্রেত নাবানো, যক্ষ-যক্ষিণী নাবানো, বাড়িতে ইঁট ফেলানো, হাড় ফেলানো--- এগুলি সমস্তই ডাকিনীতন্ত্র..... তুক-তাকের কাজ৷ এখনও ক্কচিৎ কখনো খবরের কাগজে দেখবে , ‘‘অমুক বাড়িতে ক্রমান্বয়ে হাড় পড়ছে, অমুক বাড়ীতে ইঁট পড়ছে৷’’--- এগুলিও অবিদ্যা তন্ত্রের ক্রিয়াকলাপ--- এক কথায় অভিচার ক্রিয়া৷ এই অভিচার ক্রিয়া যখন সামাজিকতার বিরুদ্ধে চলে যায় যেমন ঘুষ নেওয়া, পাপকে সমর্থন করা, পাপীর স্বভাব সংশোধনের পূর্বে  তাকে ক্ষমা করা--- এগুলোকে বলে ব্যভিচার (বি---অভি---চর্ ঘঞ্)৷ তুকতাকের কথা বলতে গিয়ে  একটা গল্প মনে পড়ল৷ থাকতুম তখন রংপুরে৷ শহরের কাছ দিয়ে যে নদীটি বয়ে গেছে তার নাম সম্ভবতঃ ধরলা৷  বর্র্ষ ছাড়া অন্যসময়ে নদীটির তেমন কোন পরাক্রম দেখা যেত না৷

একদিন সন্ধ্যে হয় হয়৷ নিয়মমাফিক বেড়িয়ে সেই মাত্র ফিরেছি৷ পাশের  বাড়ীর গবা (সুস্নাত ভট্টাচার্য) আমাকে  বললে --- ওই যে লোকটাকে দেখছেন.... ওই মাঝারি চেহারা, ঝতে পারছেন রংটা মেটে মেটে, ভালভাবে লক্ষ্য করলে মনে হয় পিছনের দিকের চুলগুলি একটু বড় বড়  ওটা টিকি বা ঝঁুটি নয়, পেছনের দিকে চুলগুলো  ও একটু ড় ড় রেখে থাকে৷ হ্যাঁ, বেশীরভাগ সময় ছাই রঙের  প্যাণ্ট  পরে, আজও পরে রয়েছে৷

তখন সন্ধ্যে হয় হয়৷  তাই গবার বর্ণনার সঙ্গে আমি ঠিকভাবে মিলিয়ে নিতে পারলুম না৷ ৷ জিজ্ঞেস করলুম ---গবা ওর পুরো নামটা কী?

গা বললে --- জোসেফ অনিল কুমার ভৌমিক৷

আমি ললুম--- ও করে কী?

গা বললে---ও নানান  ধরণের তুকগুণ জানে৷

আমি ললুম---গুণ!

গা বললে---হ্যাঁ, ওই যে কীসব অবিদ্যা তন্ত্র-টন্ত্র হয় না, তারই একটা নাম গুণ, কেউ কেউ বলে তুক্গুণ আর এ সব ব্যাপারে যারা অভিজ্ঞ তাদেরও লা হয় গুণী৷

আমি বললুম--- এগুণের  সঙ্গে সত্ত্ব-রজঃ-তমোগুণের কোন  সম্পর্ক আছে নাকি রে?

গা এক গাল হেসে ললে--- না, না, জিনিসটা লোক ঠকানো কিনা বলতে পারছি না,  তবে লোকে  মানে.... ভয় পায়৷ ভূত ছাড়ানো, ভূতে ধরানো, বাটি চালানো, আরো কত কী ও জানে!৷ ভূত নর্াাতেও নাকি পারে!

আমি ললুম--- তাই নাকি !

গা বললে--- আপনার সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দোব৷

আমি ললুম--- না, ওর গুণের কথা শুণেই আমার ভয় করছে, গা শির্শির্ করছে...গায়ে কাঁটা দিচ্ছে৷ আমি দূরে থেকেই নমস্কার জানাচ্ছি৷

গা আরো একটু হাসল৷ হেসে বললে--- না, আপনার সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দেবো৷ আগে তো ওকে বলে রাখব যাতে ও আপনার সামনে কোনো তুকগুণ না করে৷

গবার সঙ্গে আর বেশী কথা হয়নি৷

খেয়েদের রাত্রিতে শুয়ে পড়লুম৷ খাটের পাশে আমার মাথার কাছে ছিলএকটা জলভর্ত্তি  কঁুজো৷ তখন রংপুরের জলের বিশেষ প্রশংসা ছিল না৷ আমি আলাদা করে ফিল্টার  করা জল ব্যবহার করতুম৷ থাকত ওই কঁুজোতেই৷

শুলুম তো ঠিক সময়েই  কিন্তু পোড়ার চোখে  ঘুম আর আসেই না৷ ডান পাশ, বাঁ পাশ, এপাশ, ওপাশ .... কেবল পাশেরই খেলা.... একবারও ফেল নয়৷ হঠাৎ একটা  হালকা তন্দ্রা  নেবে এল৷ ভাবলুম---যাক, তারিয়ে নাক ডাকানো যাবে, চুটিয়ে  ঘুমানো যাবে৷

মাঝরাতে কেমন যেন  একটা কী হয়ে গেল! হঠাৎ দেখলুম আমার বাঁ পাশের কুঁজোটার  কাছেই শূন্যে  ভাসমান  একটি মুখ৷ তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকেই, নজরটা কটমটে৷

আমি ললুম--- কে তুমি  বাছাধন এত রাত্তিরে  বিরক্ত করতে এসেছে!  তোমার  কি আর কাজকম্ম কোন কিছু  নেই! মুণ্ডুটা অর্র্থৎ মুখটা ললে--- মুই তোক্ খাম৷

আমি ললুম --- মোক্?

মুণ্ডুকে ললুম--- তোর শরীর লতে তো কেবল মুখটা! মুখ দিয়ে আমায় খাবি  আর  তোর গলা দিয়ে আমি বেরিয়ে আসব৷  তাতে তোর লাভটা কী হর্ে?

মুণ্ডু ললে--- ভয় দেখাতে এসেছি৷

আমি ললুম--- এ কীরকম বিটকেল মানসিকতা! শেষে খিটকেলের একশেষ হবে৷  আমার সঙ্গে লেগে তুই পার পাবি!

সে হাঃ হাঃ করে হাসল৷  ঘরের চারিপাশ কেঁপে উঠল৷ আমি মারলুম  এক লাথি৷ মুণ্ডুটি আবার নীচে নেবে এল--- ঠিক আগের বারের যেখানে  ছিল সেই খানে  নেবে এল৷ সে ললে--- তুই ভয় পাচ্ছিস না?

আমি ললুম--- না

সে ললে--- তোর খাটটা আমি ওপরের ছাতের দিকে তুলে দের্া৷

আমি ললুম--- ওসব করে তোর লাভ কী হবে!

সে ললে --- একটু ভয় দেখানো হবে৷

আমি ললুম--- তবে রে.... এখন একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক, তুই বড় গুণী না আমি বড় গুণী৷ তোর গুণের  সঙ্গে আমার হাতের গুণের পরীক্ষা হোক৷

আমি খাট থেকে উঠে তার টিকিটা ধরে জোরে তার মুণ্ডুটা ঘোরাতে  লাগলুম ......বোঁ..বোঁ...বোঁ..শোঁ... শোঁ...শোঁ৷ তারপর মুণ্ডুটা ছঁুড়ে ফেলে দিলুম জানালা দিয়ে ঘরের বাইরের দিকে৷

মুণ্ডুটা আর ফিরল না৷ হাতে কঠিন কোন কিছুর স্পর্শ পেলুম৷ ঠাহর করে দেখি মুণ্ডুটা ছঁুড়তে গিয়ে আমি হাতে করে জোরে একটা ঘুষি চালিয়েছি কঁুজোটার ওপর৷ কঁুজোটা ভেঙ্গে ফুটিফাটা৷ ঘরময় জল...জল৷  যে মুঠোটা দিয়ে মুণ্ডুটার টিকিটা ধরেছিলাম একবার মনে হল হাতে যেন টিকিটা লেগে রয়েছে৷ তার সঙ্গে কিছুটা রক্তও৷ আরেকবার ভাল করে তাকালুম৷ দেখলুম টিকিও নেই, রক্তও নেই, তবে কোন কিছু যে ধরেছিলুম তার প্রমাণ স্বরূপ হাতে একটা হালকা ব্যাথা রয়েছে৷ যদ্দুর সম্ভব মনে হয় জিনিসটা ঘটেছিল স্বপ্ণে৷ প্রশ্ণ জাগল---ঠিক  কি স্বপ্ণ? না, সেটা ছিল জেগে থাকার অবস্থা? না, সেটা ছিল না-জাগা না ঘুমানো অবস্থা?

ঘরটার মধ্যে কেমন একটা অস্বাভাবিক ভাব! কেমন যেন একটা খাঁ....খাঁ.... কেমন যেন একটা অশরীরী ফিসফাস! না, চারিদিকে তাকালুম, ঘরের কোণগুলো তন্নতন্ন করে দেখলুম কেউই নেই৷ রয়েছি আমি আর রয়েছে মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া ফুটিফাটা সেই কঁুজোটা৷

পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই  গবাকে ডেকে পাঠালুম৷ ললুম--- গা, চল তো একটু নদীর দিকে৷

গবা বললে--- এ সময় তো ওদিকে কেউ থাকে না৷

আমি ললুম--- এমনি একটু যেতে চাই৷ আমি তো পথঘাট চিনি না৷ তুই চিনিস, তাই৷

গা ললে--- হ্যাঁ, হ্যাঁ, তবে দু’জনে দুটো লাঠি হাতে নিয়ে নি’৷

গার সঙ্গে গেলুম! শহর থেকে শে কিছুটা দূরে৷

জায়গাটা ঠিক শ্মশান নয়, তবে মনে হয় সূদূর অতীতে শ্মশান ছিল৷

জায়গাটার একটু কাছাকাছি এলুম৷ গা বললে--- একটা মৃতদেহ রয়েছে না!

আমি ললুম--- তাই তো মনে হচ্ছে৷

দু’জনে তার কাছাকাছি গেলুম৷

আমি ললুম--- মৃতদেহ নয়.... হাতটা নড়ছে...একটা পা-ও সময় সময় ছঁুড়ছে....নাড়ছে৷

আরো একটু কাছে গিয়ে গবা ললে--- এই সেই জোসেফ.... কাল রাত্তিরে যার কথা বলছিলুম৷ রাতে ওর বাড়ীতে গিয়ে আমাদের মধ্যে যে কথাবার্র্ত হয়েছিল তা-ও ওকে  লেছিলুম৷

সে লেছিল --- শুণলুম.... ভাল, ভাল৷

আরেকটু কাছে গেলুম৷ লোকটা তখন হয় অচেতন,না হয় অর্ধচেতন৷ মুখটা দেখে অবাক হয়ে গেলুম৷ রাত্তিরে সেই ঘটনায় যে মুখটা দেখেছিলুম এটা হুবহু সেই মুখ৷

গাকে  ললুম--- একটু টিকির কাছটা দেখ তো!

দেখা গেল টিকির কাছে  একগোছ চুল কে যেন টেনে ছিঁড়ে নিয়েছে৷ সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে দরদরিয়ে রক্ত৷

সেই রক্তপাতের ফলেই এ অচৈতন্য বা অর্ধ-চৈতন্য হয়ে রয়েছে৷

আমরা তাকে পাঁজাকোলা করে হাসপাতালে পৌঁছে দিলুম৷

এটা কি সেই তুক্ গুণ! তর্ে কি এরও নাম গুণ?

আমার কথাটি ফুরোল/ নটে গাছটি মুড়োল?    

 

উৎস

শব্দ চয়নিকা ২৪/১০৮

দেশ বরেণ্য নেতাজী সুভাষ

লেখক
প্রভাত খাঁ

কীর্ত্তি যার রহে এ ধরায়

স্মরণের বালুকাবেলায়

                তিনিই অমর হন৷

স্বাধীনতা মানবতা তরে

যিনি যান সংগ্রাম করে

দেশপূজ্য হয়ে তিনি রণ৷

সার্থক নেতা তাই দেশের নেতাজী

এক সূত্রে বাঁধি সবে রচি মহাজাতি

মুক্তির আশ্বাস দানি’ করি’ মহারণ

ব্যষ্টিস্বার্থ, যশ, খাতি, মান

চরণে দলিয়া যিনি যান

তিনিই বরণীয় স্মরণীয় দেশের পূজ্য হন৷

বিশ্বকবি ‘নেতাজী’ নামেতে যাঁরে করেন বরণ

তাঁরেই পরমপিতা ‘বজ্রকৌস্তুভ’ ক’ন

জ্বলন্ত ধুমকেতু,

উল্কার অনলশিখা হয়ে ইতিহাসে রণ৷

তোমার অসমাপ্ত কর্ম পুর্ণ করিবারে

জাগিতেছে তরুণের দল দিকে দিকে

ভ্রষ্টাচারী দলনীতি করিতে দলন৷

 

রক্ত ও স্বাধীনতা

লেখক
শ্রীপথিক

                নেতাজী,

                তুমি আমাদের বলেছিলে

                                রক্ত দাও স্বাধীনতা দেব৷

                আমরা বলেছিলুম রক্ত নয়

                                বিনা রক্তেই তো স্বাধীনতা পাব৷

                অত্যাচারীর হৃদয়ে ঘটবে  পরিবর্তন,

                ওরা নিজেরাই যেচে স্বাধীনতা দেবে৷

 

                স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি .....

                কিন্তু সেই তো রক্ত আমাদের দিতেই হচ্ছে

                গ্রামে গঞ্জে শহরে নগরে

                কিন্তু সে রক্ত তোমার চাওয়া

                গাা লাল রক্ত নয়,

                এ রক্ত বিশ্বাসঘাতকের নীল রক্ত

                ভ্রাতৃঘাতী আত্মঘাতী রক্ত৷

                হায়, সেদিন যদি আমরা তোমার ডাকে

                                হৃদয়ের তাজা লাল রক্ত

                রক্তগোলাপের মত

                পূর্ণ স্বাধীনতার চরণে অর্ঘ্য দিতুম

                 তাহলে এমনি করে হয়তো

                চক্রবৃদ্ধি হারে সুদে মূলে

                                ঋণ শোধ করতে হ’ত না৷

স্বাধীনতাও

মরুভূমির আলেয়ার মত হ’ত না৷

তবু আমরা আশাহত নই

লক্ষ কোটি চোখে এবার উজানের স্রোত–

হৃদয়ে বাজে তোমার আশার বাণী

অন্ধকারের বক্ষ ভেদ করে

প্রভাতের অরুণ আলোয়

আদিগন্ত উদ্ভাসিত হয়ে উঠবেই উঠবে৷