শিব কে ছিলেন?

লেখক
আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত

সারা দেশজুড়ে ‘শিবচতুর্দশী’ তথা শিবরাত্রি কিছুদিন আগে পালিত হ’ল৷ আর এই উপলক্ষ্যে সর্বত্রই শিবপূজা, শিবের নামে ব্রত, মোটকথা শিবকে কেন্দ্র করে সারা দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ, সবশ্রেণীর মানুষই, ‘শিব’ বা সদাশিবে’র প্রতি তাদের অন্তরের ভক্তি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করল৷

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ণ ওঠে, এই শিব কে? শিব কি অন্যান্য দেবতাদের  মত কাল্পনিক কোনো দেবতা? অথবা শিব নামে রক্তমাংসের  মানুষ কেউ  এই ধরার ধূলায় অবতীর্ণ হয়ে  ধরার ধূলাকে পবিত্র করে গেছেন৷ ভারতীয় পূরাণে শিবের অজস্র কাহিনী রয়েছে৷ তবে নানান্‌ আজগুবি গল্পও রয়েছে৷ নেশাখোর, কোথাও বা ‘নেংটা’ শিব বলে উল্লেখ  করা হয়েছে৷ গায়ে সাপ জড়ানো রয়েছে, মাথায় বিশালাকার  জটা, জটার ওপরে রয়েছে চাঁদ আবার জটার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসছে গঙ্গা৷ কখনো তাণ্ডব নৃত্যরত৷ ভুত-প্রেত সঙ্গী৷ বাহন বলদ৷  এখন প্রশ্ণ, বাস্তবে শিব বলে কেউ ছিলেন কি? আনন্দমার্গের  প্রতিষ্ঠাতা মহাযোগী শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী তাঁর রচিত ‘নমঃশিবায় শান্তায়’ পুস্তকে ও অন্যান্য  বহু প্রবচনে ঐতিহাসিক শিবকে তুলে ধরেছেন৷ মানব সমাজে  তাঁর  মহান্‌ অবদানের কথাও তুলে ধরেছেন৷  শিব কে? তিনি বলেছেন, শিব মানব শরীর নিয়েই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন আজ থেকে ৭ হাজার বৎসর পূর্বে৷ আর্যরা  তার আগেই ভারতের  উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারতে  প্রবেশ করে বসবাস করছে৷ আর্যদের পূর্বে ভারতে  বাস করত মঙ্গোলীয় গোষ্ঠী৷ অষ্ট্রিক গোষ্ঠী ও অষ্ট্রিক আর নিগ্রো গোষ্ঠীর মিশ্রণ-জাত দ্রাবিড় গোষ্ঠী৷ শিব ছিলেন মহাতান্ত্রিক, মহাকৌল৷ তন্ত্র শাস্ত্র তাঁর অবদান৷ তন্ত্রের এক সূক্ষ্ম অংশ যোগ৷ তাই তিনি ‘মহাযোগী’ বা ‘যোগীশ্বর’ নামেও খ্যাত৷ তিনিই প্রথম মানুষকে ব্রহ্মবিদ্য শিক্ষাদান করেন৷ অধ্যাত্ম সাধনা, আসন, প্রাণায়াম শিবই  প্রথম মানুষকে শিখিয়েছেন৷  তাই আধ্যাত্মিক সাধনার  জগতে শিব ‘আদিগুরু’ রূপে খ্যাত৷ শিব ছিলেন  মহাকৌল৷ ‘মহাকৌল’ শব্দটির অর্থ যিনি সাধনার সাহায্যে  নিজের কুলকুণ্ডলিনী শক্তিকে ঊধের্ব উত্তোলন করে  সহস্রারস্থিত পরম শিবের (এখানে ‘শিব’ মানে দর্শনোক্ত ও সাধনশাস্ত্রোক্ত বিশুদ্ধ চৈতন্য--- পবম ব্রহ্ম) সঙ্গে মেলাতে পারতেন৷ শুধু তাই নয় তিনি ইচ্ছা করলে অন্যের কুলকুণ্ডলিনীকেও পরম শিবের সঙ্গে মিলন ঘটাতে পারতেন৷  কুণ্ডকুণ্ডলিনীর প্রতীক হ’ল ‘সাপ’৷ ফনা  উঁচিয়ে থাকা সাপ জাগ্রত কুলকুণ্ডলিনীর প্রতীক৷

আর মানুষের ধারণা চন্দ্রের  ১৫টি কলা আমরা দেখি, আর ষোড়শ কলা, যেটা আমরা দেখতে পাই না, তা পরম শান্তির  আগার আর তা রয়েছে সদা ধ্যানমগ্ণ ব্রহ্মানন্দে বিভোর শিবের মস্তকে৷

কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে  নয়, সঙ্গীত শাস্ত্রের ক্ষেত্রেও শিবের অবদান অবিস্মরণীয়৷ ‘সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি---এই সুর সপ্তক শিবেরই আবিষ্কার৷ শিব এই সঙ্গীতবিদ্যা তাঁর শিষ্য ভরত মুনীকে শিখিয়ে তাঁর মাধ্যমে  সারা দেশে এর প্রচার  করেছেন৷ তাই শিবের এক নাম ‘নাদতনু’৷ নৃত্যের ক্ষেত্রে ছন্দ প্রধান তাণ্ডব নৃত্যের  প্রবর্তক শিব৷ তাই শিবের আর এক নাম ‘নটরাজ’৷ শিবের নির্দেশেই পার্বতী মুদ্রা-প্রধান ‘ললিত নৃত্য’ প্রবর্তন করেছিলেন৷ ‘তাণ্ডবে’র ‘তা’ ও ললিতের  ‘ল’ নিয়েই ‘তাল’ শব্দটি এসেছে৷ চিকিৎসা ক্ষেত্রে ‘বৈদ্যক শাস্ত্র’ও শিবেরই অবদান৷ তাই শিবকে বলা হয় বৈদ্যনাথ৷ শিব সেই আদিম সমাজে বিধিবদ্ধ বিবাহ-ব্যবস্থারও প্রচলন করেন৷ তখন ভারতবর্ষে ছিল প্রধানতঃ ৩টি সংঘর্ষশীল  জনগোষ্ঠী৷ এক, আর্য দুই, মঙ্গোলীয় গোষ্ঠী তিন---অষ্ট্রিক ও দ্রাবিড় মিশ্রনজাত জনগোষ্ঠী৷ (অষ্ট্রিকো-দ্রাবিড়য়েড)৷ শিব তৎকালীন আর্য ও অনার্য জনগোষ্ঠীর  মধ্যে মিলনের জন্যে আর্যকন্যা ‘গৌরী’, মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর  কন্যা ‘গঙ্গা’ ও অষ্ট্রিকো-দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর কন্যা ‘কালী’কে বিবাহ করেছিলেন৷তাই গ্রামীণ ছড়াতে রয়েছে--- ‘‘বৃষ্টিপড়ে, টাপুর টুপুর নদে এল বাণ শিবঠাকুরের বিয়ে হবে  তিন কন্যা দান৷’’

শিব হিমালয় অঞ্চলে (কৈলাস) বাস করতেন ও চমরী গোরুর পিঠে  চড়ে ঘুরে ঘুরে তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা, সহ অন্যান্য শিক্ষাদান করে বেড়াতেন৷ শিবের কাছে কোনো জাতিভেদ ছিল না৷ আর্যরা জাতিভেদ মানত তাই প্রথম প্রথম  আর্যরা  শিবকে  মেনে নিতে  পারে নি৷ বিভিন্ন আর্যশাস্ত্রে দেবাসুর সংগ্রামের যে কাহিনী প্রচার  করা হত, আসলে তা ছিল আর্যদের সঙ্গে প্রাগার্য গোষ্ঠী অর্র্থৎ ভারতে-আর্য আগমনের আগে থেকে  যে সমস্ত  জনগোষ্ঠী ছিল তাদের সঙ্গে সংঘর্ষের ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি৷ গৌরবর্ণ, দীর্ঘকায় আর্যদের ‘সুর’ বা ‘দেবতা’ বলা হ’ত আর কৃষ্ণ বা পীতবর্ণের আর্যেতর অনার্য জনগোষ্ঠীর লোকেদের তাচ্ছিল্যের ভাষায় ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’ প্রভৃতি  বলা হ’ত৷ এখানে একথা বলে রাখি, সাত হাজার  বছর পূর্বের শিবকে নিয়ে বিভিন্ন পুরাণে অনেক কাল্পনিক কাহিনী রচিত ও প্রচারিত হয়েছে৷ সমস্ত  কাহিনী সত্য নয়৷ পুরাণ হ’ল, লোকশিক্ষার্থে রচিত কাহিনী৷ সেখানে সত্য, আধা কাল্পনিক  বা পুরোপুরি  কাল্পনিক কাহিনীও স্থান পেয়েছে৷ সেইভাবে  শিবকে  নিয়েও বহু কাল্পনিক কাহিনী রচিত হয়েছে, তাই সব কাহিনী সত্য নয়৷ সত্য ও কল্পনার  ধুম্রজাল  সরিয়ে শিব প্রকৃতপক্ষে  কে ছিলেন, কী তাঁর অবদান সেটা জানা আজ খুবই  প্রয়োজন৷ আর জানলে দেখব, আজকের দেশ তথা সমগ্র  বিশ্ব যেভাবে দিশাহীনভাবে ধবংসের  দিকে ছুটে চলেছে, সেক্ষেত্রে  শিবের প্রকৃত শিক্ষা আজকের বিশ্ব সমস্যা সমাধানে এক নোতুন দিশা  দেখাতে  পারে৷

পরমশ্রদ্ধেয় ‘শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার তন্ত্র ও আর্য-ভারতীয় সভ্যতা’ প্রবচনে বলেছেন, ‘‘শিবের সংসার গোটা  ত্রিভুবন৷ তাঁর মর্যাদা কোন দেশ বিশেষে সীমিত নয়৷  তবু ভারতের  সভ্যতা  ভারতের  সমাজ বা তথাকথিত ভারতীয় জাতির  যদি কোন জনক খুঁজতেই হয় তবে একথা জোর করে’ বলব, বিশ্ব-জাতির সঙ্গে ভারতীয় জাতির জনক father of the Indian nation) হ’বার  যোগ্যতা কেবল শিবেরই আছে৷ পাঁচ হাজার  বৎসরের  বেশী পুরানো এই তথাকথিত  ভারতীয়  জাতটার পিতা হবার যোগ্যতা কেবল এই বুড়ো  শিবেরই আছে... আর কারো নেই৷’’                                                                                                   (তন্ত্র ও আর্য ভারতীয় সভ্যতা)৷