প্রভাতী

আশায় আশায়

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

ভাসছি, আমি ভাসছি

আনন্দ-সাগরে ভাসছি৷

তুমি যে চুপিচুপি বলে গেলে

আসছি, আমি আসছি৷৷

 

কতদিন কতরাত্রি কেটেছে তোমায় ভেবে

আঁখি-জল ঝরেছে কত না আবেগে৷

আজ এই বাদলা দিনে

সুর ও তালের জাল বুণে

শোণালে তোমার নুপুর ধবনি

মনের দুয়ার গেল খুলি ঝনঝনি৷৷

 

সুদীর্ঘ খর তাপের পরে

আজ যেন শাত্তণী-ধারা ঝরে৷

খুশির ঝিলিক আমার চাতক-চোখে

হৃদয়-পদ্ম নূতন আবেশে ফোটে৷

অজানা পুলকে মেতেছে আমার চিত্তভূমি

জানি, আমি জানি, ঠিক আসবে তুমি৷

ঝাবরমলের ইতিকথা

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

ধনসম্পদের প্রাচুর্য আছে কিন্তু অন্যকে খাওয়ায় না, নিজেও খায় না এমন লোকও পৃথিবীতে অনেক আছে৷ তাদের সম্পদ ‘ভ’ পর্যায়ভুক্ত নয়৷ 

আমার জানা এক শেঠজী (শ্রেষ্ঠী > শেট্ঠী > শেঠী > শেঠ  দক্ষিণ ভারতে ‘চেট্টি’৷ প্রাচীন কালে ৫০০০০০ (পাঁচ লক্ষ) সীনক বা স্বর্ণমুদ্রার মালিককে শ্রেষ্ঠী ৰলা হত৷ ) ছিলেন যিনি টাকার বাণ্ডিলের ওপর ৰসেছিলেন৷ যাতে ঘরের কোনো ঘুলঘুলি ৰা নালি দিয়ে টাকা ৰেরিয়ে না যায়, সেদিকে সৰ সময় দৃষ্টি রাখতেন৷ ছেলেমেয়েদের জন্যে ৰাজার থেকে সৰ সময় হাত–ফেরতা (সেকেন্ড হ্যাণ্ড) জামাকাপড় কিনে দিতেন৷ পাইকারী কাপড়ের দোকানে যেসৰ ছেঁড়া শাড়ী রদ্দী মাল ৰলে ঘোষিত হত সেগুলো কিনে এনে ধরম–পত্নী পাপড় (পর্পটী > পপ্পডি > পপ্পড় > পাপড়) কুমারী দেবীকে উপহার দিতেন৷ ৰলতেন– কেউ শুধোলে ৰোলো, পোলাও রাঁধতে গিয়ে খুন্তীর খোঁচায় শাড়ীটা ছিঁড়ে গেছে৷

শেঠজী জলখাৰারে খেতেন জণ্ডা কা লাৰা অর্থাৎ ভুট্টার খই৷ লোককে ৰলতেন, কলাকন্দ (কলাকন্দ হচ্ছে উৎকৃষ্ট মানের ক্ষীরের সন্দেশ৷) আর ঘিওর (‘ঘিওর’ হল প্রচুর ঘি দিয়ে প্রস্তুত একটি পশ্চিম দেশীয় মিষ্টান্ন৷) না হলে জলখাবার খেতে ভাল লাগে না৷

শেঠজীর নামটা এ্যদ্দিন পরে ঠিক মনে পড়ছে না......  সম্ভবতঃ শেঠ ঝাবরমল ঝুনঝুনবালা.....ৰাড়ী ঝালবার৷ শেঠজী ছিলেন আমাদের শহরের সৰচেয়ে ধনী লোক৷ ভোরের দিকে কেউ তার নাম নিত না কারণ লোকের ভয় ছিল ভোরে ভোরে শেঠজীর নাম নিলে সারাদিন জণ্ডার লাবা খেয়ে থাকতে হৰে৷ শেঠজীর ছেলেটি আমার ভাইয়ের সঙ্গে পড়ত৷ নাম ছিল নাত্থুমল ঝুনঝুনবালা৷ নাত্থুমল লেখাপড়ায় ছিল খুৰ ভাল৷ সে যখন সকল বিষয়ে ফার্ষ্ট হয়ে ষ্ট্যাণ্ডার্ড এইটে উঠল, শহরের সৰাই খুব আনন্দিত৷ হেড মাষ্টারমশায় তাকে প্রথম পুরস্কার দেবার সময় উচ্ছ্বসিত ভাষায় আনন্দ প্রকাশ করলেন৷ ৰললেন–‘‘আমি আশা করি, এই ছেলেটি একদিন আমার সুক্লের তো বটেই গোটা দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে৷’’ কিন্তু ‘‘অবাক  কাণ্ড ভাই, এমন ব্যাপার আর কখনো জন্মে দেখি নাই’’৷

নাত্থুমলের মুখে বিষাদের ছায়া, ঝাবরমলের মুখে তার চেয়ে ৰেশী বিষণ্ণতার কৃষ্ণমেঘ৷ ঝাবরমলকে জিজ্ঞেস করলুম–‘‘এমন আনন্দের দিনে তোমার কপালে চিন্তার ৰলিরেখা কেন?

সে ৰললে–‘‘জানেন সরকার সাহেৰ, ছেলেটি যদি লেখাপড়া শেখে তাহলে ইয়ূনিভার্সিটিতে ‘প্রাপসার’ হৰে কিংবা সরকারী ‘আপসার’ হৰে৷ আমার গদ্দী কে দেখবে? এর চেয়ে ঢের ভাল হত যদি সে কয়েকটি পরীক্ষায় ফেল করত আর আমি সেই যুক্তিতে ওর পড়া ছাড়িয়ে দিতুম৷ তা ছাড়া আরও জানেন সরকার সাহেৰ, ও নিশ্চয় আমার কারখানার কর্মচারীদের মাইনে ৰাড়াবার জন্যে তাদের নিয়ে আন্দোলন করৰে, আমার বিরুদ্ধে তাদের লেলিয়ে দেৰে....তাদের নিয়ে এক মজৰুত ওলিয়ন (ইউনিয়ন .....মজ্দুর ইয়ূনিয়ন) গড়ৰে৷ তাই ভাৰছি কী করা যায়৷ ধরমপত্নীর সঙ্গে ৰাতচিৎ করলুম৷ সে ৰললে–ছেলেটি যখন এতই ভাল....এতই তেজ, ওকে লেখাপড়া শিখতে দাও তোমার যদি পয়সা খরচ করতে অনিচ্ছা থাকে, তাহলে ওকে আমার ৰাপের ৰাড়ীতে পাঠিয়ে দিচ্ছি৷ আমার ভাইয়েরা ওকে মানুষ করৰে৷’’

শেঠজীর সঙ্গে তার ধরমপত্নীর সেদিন দারুণ ওঠাপটক লড়াই হয়ে গেল৷ রাগে দুঃখে ক্ষোভে অভিমানে শেঠনী একদিন খেলেন না৷ তাতে অবশ্য শেঠজী একটু আনন্দিতই হলেন, কারণ তাতে একজনের একদিনের খোরাক ক্ষাঁচল৷

ৰাজারে নাত্থুমলের সঙ্গে আমার দেখা৷ সে কাঁদতে কাঁদতে আমার সামনে এসে দাঁড়াল৷ ৰললে–‘‘সরকার সাহেৰ, আমি রেললাইনে গলা দিয়ে মরৰ৷’’

আমি বললুম–‘‘কেন রে তুই এতটুকু ছেলে, তোর এই দুর্ক্ষুদ্ধি হল কেন?’’

সে ৰললে–‘‘পিতাজী ৰলেছে, আর আমি তোকে পড়াতে পারব না৷ কারৰারে মন্দী চলছে৷ ভুষিমালের ৰেৰসায় একলাখ টাকার লোকসান হয়েছে৷’’

আমি জিজ্ঞেস করলুম–‘‘কথাটা কি সত্যি?’’

সে বললে–‘‘না সরকার সাহেৰ, কথাটা মোটেই সত্যি নয়৷ আসলে ৰাৰুজীর আড়াই লাখ টাকা লাভ হয়েছে৷ ইন্কামট্যাক্স, সেল্স্ট্যাক্স থেকে ক্ষাঁচবার জন্যে নকল খাতায় (দু’নম্বর খাতায়) এক লাখ টাকা লোকসান দেখিয়েছে৷’’

আমি ৰললুম–‘‘তাহলে কী ক রা যায় ৰল৷’’

নাত্থুমল ৰললে–‘‘সরকার সাহেৰ, আপনি একবার পিতাজীকে ৰলুন৷’’

আমি ৰললুম–‘‘তোর মাতাজী যে আমাকে ৰলছিলেন, তোকে মামার ৰাড়ীতে রেখে তিনি পড়াতে চান৷ তাতে কী তোর পিতাজীর আপত্তি রয়েছে?’’

সে ৰললে–‘‘পিতাজী ৰলছে, ও যদি লেখাপড়া শেখে তাহলে ও শেঠ না হয়ে ৰাৰু হয়ে যাৰে৷ আমার ৰেৰসা খতম হয়ে যাৰে৷’’

নাত্থুমলের মুখের দিকে চেয়ে আমার মনটা ব্যথাভারাক্রান্ত হয়ে উঠল কিন্তু করৰার কিছু ছিল না, কারণ তখন মেধাবী ছাত্রদের জন্যে তেমন কোনো নিঃশুল্ক্ ছাত্রাবাস ব্দব্ধব্ভস্তুন্দ্বুব্ধব্ ড়প্সপ্পন্দ্বগ্গ ছিল না, তাই আমি কিছুই করতে পারলুম না৷

নাত্থুমল কাঁদতে কাঁদতে ৰাপের গদীতে গিয়েই ৰসল৷ সে লাল রঙের মোটা মোটা খাতাগুলোতে কী যেন লিখত৷ আমাকে রাস্তায় যেতে দেখলেই একবার তাকিয়ে লজ্জায় মুখ নীচু করত৷ আমার পক্ষে সে অবস্থাটা ছিল একেবারে অসহনীয়৷ তারপর থেকে সে আর কখনও আমার সামনে এসে দাঁড়ায়নি৷ ঝাবরমল একটি প্রতিভার অপমৃত্যু ঘটালে৷

একদিন ঝাবরমলের সম্ধী (আমাদের এখানে ৰেয়াইকে ‘সম্ধী’ ৰলা হয়৷) এলেন কোনো দূর দেশ থেকে৷ ঝাবরমলের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল৷ ৰেয়াই কতদিন থাকবেন কে জানে ৰেয়াইমশাইকে তো আর ৰাজরার রুটি আর লংকার অচার খাইয়ে রাখা যাৰে না তিনি এলেন ৰেলা প্রায় ১০–২১  টায়৷ ঝাবরমল দু’হাত ৰাড়িয়ে ৰেয়াইকে স্বাগত জানালেন,.....ৰল্লেন–‘‘আসুন...আসুন৷ আপনার কী কৃপা আজ গরীৰের ঘরে চরণধূলি দিয়েছেন৷ তা আমার ৰেৰসায় মন্দী যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আপনাকে দেখে আমার সে দুঃখ দূর হয়ে গেল৷ তা আমার দুঃখ তো আপনি বুঝৰেনই৷ ৰেৰসা যদি তেজী চলত তাহলে আপনাকে যতটা স্বাগত করতে পারতুম ততটা হয়তো করতে পারৰ না৷ তবু যতটা পারি অবশ্যই করৰ৷’’

ৰেয়াই ৰললেন–‘‘তাতে কী হয়েছে, তাতে কী হয়েছে সে জন্যে আপনি ভাবৰেন না শেঠজী৷’’

ঝাবরমলজী ৰললেন–‘‘জানেন ৰেয়াইমশায়, আমাদের ৰাড়ীর চউকার (হেঁসেল–অঙ্গিকায় ‘ভান্সা’) কাজ ৰেলা দশটার সময় শেষ হয়ে যায়৷ আপনি এসেছেন৷ আপনার জন্যে আবার নোতুন করে চুল্হা (উনুন বা আখা) জ্বালিয়ে রাঁধতে হৰে তো আপনি ৰেয়াইমশায়, আপনার জন্যে দু’চারটে ভাল ভাল রান্না আবার তো করতে হৰে–তা সে আমার আর্থিক অবস্থা যেমনই হোক না কেন৷ রান্নাবান্না সারতে অন্ততঃ দু’ঘণ্ঢা লেগে যাৰে৷ আপনাকে তো আর অতক্ষণ না খাইয়ে রাখতে পারি না৷ হ্যাঁ, আমার উঠোনের কুয়োর জল খুৰই ভাল৷ আপাততঃ অন্ততঃ এক গ্লাস জল খেয়ে গলাটা ৰুকটা ঠান্ডা করে নিন৷ তার পরে চলুন, কাছেই রয়েছে এখানকার সৰচেয়ে উমদা *(*উম্দা মূলতঃ একটি ফার্সী শব্দ৷ ‘উম্দা’, ‘পরায়া’, ‘ৰুলন্দ্’ প্রভৃতি কয়েকটি হিন্দুস্তানীতে ব্যবহূত শব্দ পুংলিঙ্গ–স্ত্রীলিঙ্গ ভেদে ভিন্নতা প্রাপ্ত হয় না, অর্থাৎ উন্নত মানের জিনিসকে ‘উম্দা চীজ ’–ই ৰলৰ, ‘উম্দী চীজ’ নয় যদিও ‘চীজ’ শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ৷ তেমনি স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দের পূর্বে ‘পরায়া’ ব্যবহার করা যাবে, ‘পরায়ী’ হৰে না৷ ‘পরায়ী’ লেখা বা ৰলা একটি সাধারণ ভুল (common error) ৷  ‘ৰুলন্দ্’ শব্দটিও পুংলিঙ্গ–স্ত্রীলিঙ্গে অপরিবর্ত্তিত থাকবে–‘ৰুলন্দী’ হৰে না৷ ‘ৰুলন্দী’ ভাববাচক বিশেষ্য (abstract noun), মানে উঁচাঈ–উচ্চতা৷ ) হোটেল৷ নাম ঃ ‘অতি বিশুদ্ধ্ পরোটা ভাণ্ডার’৷ একেবারে শুদ্ধ্ শাকাহার শুদ্ধ্ ঘি৷

পথশ্রমে ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও ৰেয়াই ঝাবরমলের সঙ্গে সঙ্গে চলল ‘অতি বিশুদ্ধ্ পরোটা ভাণ্ডারের’ দিকে৷ হোটেলের মালিককে ঝাবরমল ৰললেন–‘‘ইনি আমার বেয়াইমশায়....খুব রঈস লোক.....প্রচুর টাকাপয়সার মালিক৷ কখনও অন্যের পয়সায় খান না৷ এমনকি আমি ওঁর অতি নিকট আত্মীয়....আমার  পয়সাতেও কখনো খান না৷ এঁর জন্যে আপনার হোটেলে যে উম্দা উম্দা মেনু আছে তাই নিয়ে আসুন–কচৌরী, খড়ি ৰড়ি, রতুয়া, লড্ডু, ঘিওর, কলাকন্দ, সাৰুদানা কা পাপড়, আলু কা পাপড়, রাৰড়ি আর মালাই৷ এছাড়াও ৰেয়াইমশায় আর যা যা চাইৰেন তাও দিন৷’’

ৰেয়াইকে খেতে ৰসিয়ে দিয়ে ঝাবরমলজী বললেন–‘‘আমার দোকানে কাজ রয়েছে ৰেয়াইমশায়, আমি একটু চলি৷’’ যাৰার সময় হোটেলের মালিককে ৰললেন, ‘‘যদিও নীতিগতভাবে উনি অন্যের পয়সায় খান না, তৰু উনি আমার নিকট আত্মীয়......আমি ওঁকে কিছুতেই ছাড়ৰ না৷ আপাততঃ পেমেন্টটা উনিই করে দেৰেন৷ তবে সেটা পরে আমি জোর করে ওঁর পকেটে ঢুকিয়ে দোৰ৷ উনি আমার অতিথি, আমার টাকায় ওঁকে খেতেই হৰে৷’’

তারপর ৰেয়াইকে বললেন–‘‘ৰেয়াই মশায়, যা খাৰার খেয়ে নিন কিন্তু জল খেয়ে পেট ভরাৰেন না যেন৷ জলটা আমার ৰাড়ীতেই খাৰেন৷ অমন পাচক জল পৃথিক্ষীতে আর কোথাও হয় না৷’’

তারপর ঝাৰরমল ৰাড়ী চলে এলেন....ধরমপত্নীকে ৰললেন–‘‘দেখ, আমরা সৰাই একসঙ্গে তাড়াতাড়ি খেতে ৰসে যাই৷ ৰেয়াই মশায় এ ৰাড়ীতে আসার আগেই খাৰার পাট চুকিয়ে দিতে হৰে তো৷’’

এই যে ঝাবরমলজী এঁর সম্পত্তি থাকুক মানুষের এতে কিছুই যায় আসে না৷ তাই এঁর সম্পত্তি ‘ভ’ পর্যায়ভুক্ত নয়৷

 

*(উম্দা মূলতঃ একটি ফার্সী শব্দ৷ ‘উম্দা’, ‘পরায়া’, ‘ৰুলন্দ্’ প্রভৃতি কয়েকটি হিন্দুস্তানীতে ব্যবহূত শব্দ পুংলিঙ্গ–স্ত্রীলিঙ্গ ভেদে ভিন্নতা প্রাপ্ত হয় না, অর্থাৎ উন্নত মানের জিনিসকে ‘উম্দা চীজ ’–ই ৰলৰ, ‘উম্দী চীজ’ নয় যদিও ‘চীজ’ শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ৷ তেমনি স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দের পূর্বে ‘পরায়া’ ব্যবহার করা যাবে, ‘পরায়ী’ হৰে না৷ ‘পরায়ী’ লেখা বা ৰলা একটি সাধারণ ভুল (common error) ৷  ‘ৰুলন্দ্’ শব্দটিও পুংলিঙ্গ–স্ত্রীলিঙ্গে অপরিবর্ত্তিত থাকবে–‘ৰুলন্দী’ হৰে না৷ ‘ৰুলন্দী’ ভাববাচক বিশেষ্য (abstract noun), মানে উঁচাঈ–উচ্চতা৷)

মহাপ্রয়াণ

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

একুশে অক্টোবর ১৯৯০---তোমার মহাপ্রয়াণ৷

চোখে অবিরাম অশ্রুধারা, অব্যক্ত যন্ত্রণায় দগ্দ পরাণ৷

স্তব্ধ বৃক্ষলতা, মূক পশুপাখী, চঞ্চল শিশু সহসা গম্ভীর

আকাশে বাতাসে বিষাদের বাঁশী উত্তাল অম্বুধি হ’ল ধীরস্থির

অনিন্দ্য সুন্দর পার্থিব দেহ পঞ্চভূতে হয়েছে বিলীন

ভূবন-ভোলানো তোমার মধুর হাসি স্মৃতিপটে চির অমলিন

কাঁদায়ে সকলে তুমি চলে গেলে, ‘অজানা পথিক’ কোন্ সে অচিনপুরে

নোতুন পৃথিবী গড়ার আশ্বাস সদা-প্রোজ্জ্বল সমগ্র চরাচরে

হৃদয়তন্ত্রীতে সততঃ শুণি তোমার সুরের ঝঙ্কার

মহাবিশ্বে মন্দ্রিত অব্যয় অমৃত প্রণব-ওঁঙ্কার

সুষুপ্তির আঁধারে খঁুজি তোমায়, ভাঙে ঘুম বারে বারে

জাগ্রতের বাস্তবে পাই অনুভবে, ক্ষণিকে হারাই অসীম শূন্যতার হাহাকারে

বলেছ তুমি, থাকবে কাছে, প্রতি অণু-পরমাণু মাঝে

পরশ যেন পাই হে পরমপ্রিয়, তোমারই অভীষ্ট কাজে

জানি ও মানি, তুমি আছো সাথে সবখানে সারা বেলা

কেন তবে তাপিত-নীরে ভাসে গো নয়ান, বুঝি না তোমার লীলা৷

যাযাবর

লেখক
পথিক

আমি যাযাবর, আমি পথে পথে ঘুরি

                বাধি নাই কভু ঘর

রাতের তারার মত যাত্রা অবিরত

লক্ষ্য মোর ভৌগোলিক সীমার বাহিরে

কোন এক অবজ্ঞাত স্বর্গের দুয়ারে৷

পথে মোর তপ্ত মরুভূ,

মাথার ওপরে সেও ছন্নছাড়া আকাশের ধু–ধু৷

অনেক পর্বত আমি এসেছি ডিঙিয়ে–

আরও যাব বীরব্রত নিয়ে,

আসুক সহস্র বাধা রাতি,

অন্তরে জ্বলিছে মোর অনির্বান জ্যোতি৷

সুখ? সুখে মোর নাহি প্রয়োজন,

ও থাক অন্যের তরে থাক সর্বক্ষণ,

ওরা থাক সুখে, গতির আনন্দ মোর বুকে

গতির আবেশে থাকে যখন নর্তকী

তখনই তো রিনিকি–ঝিনিকি৷

ঈশ্বরের ইচ্ছায় সব কিছু হয়

লেখক
বিভাংশু মাইতি

ঈশ্বরের ইচ্ছায় সব কিছু হয়

                ফুল ফোটে পাখী গায়,

                                রাত ভোর হয়৷

                শিশু কাঁদে রবি হাসে

                                মধু বায়ু বয়

ঈশ্বরের ইচ্ছায় সব কিছু হয়৷

                *    *    *

প্রভু তোমায় রাখবো ধরে মনে

খেলা–ধূলা পড়াশুনায়

সব কাজে সব–খানে

ঈশ্বর তোমায় রাখবো ধরে মনে৷

সকাল বেলায় ঘুম ভাঙলে

ধরবো তোমায় মনে

রাতের বেলায় ঘুমিয়ে যাব

ওই রাঙা চরণে

ভুলবো না কখনো তোমায়

রাতে কিংবা দিনে

প্রভু তোমায় রাখবো ধরে মনে৷

মুন্নীলালের কোষশুদ্ধি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রাচীনকালে কোনো লোক যদি অগ্ণিপরীৰায় কৃতকার্য হয়ে বেরিয়ে আসত অর্থাৎ সে যুগের সেই নিষ্ঠুর পরীৰাতেও দৈবলীলায় উত্তীর্ণ হয়ে আসত সেক্ষেত্রে এই উত্তীর্ণ হওয়াটাকে ৰলা হত ‘কোষশুদ্ধি’৷

কোনো জিনিস অযোগ্য লোকের হাতে পড়ে যদি অপব্যবহূত হয়, তারপর সেটিকে যদি পক্ষিত্র করা অর্থে পুড়িয়ে নেওয়া হয় তখন সেই বস্তুকেও ‘কোষশুদ্ধি’ ৰলা হয়৷

তখন চলছে ইংরেজ যুগের রমরমা৷ লেখক ছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারী কাজের তথ্য সংগ্রাহক৷ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ক্ষেধে গেছে৷ প্রতি মুহূর্তে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রিক জীবনে পটপরিবর্ত্তন ঘটে চলেছে৷ লেখককে ক্রমশঃ নিতে হচ্ছে অধিকাধিক দায়িত্ব ও বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভার বা অতিভার৷ সে সময়ে লেখকের যিনি চাপরাসি ছিলেন তাঁর নাম ধরো মুন্নীলাল মিশির৷ মুন্নীলালের ৰাড়ী ছিল এলাহাবাদে৷ কিন্তু আমাদের এখানে দীর্ঘকাল থেকে সে মুঙ্গের জেলার স্থানীয় ভাষা অঙ্গিকা ক্ষেশ রপ্ত করে নিয়েছিল৷ মুন্নীলালের ছিল অজস্র গুণ, কিন্তু দোষ ছিল দু’টি৷ মুন্নী কারণৰারির খুৰ ভক্ত ছিল৷ অমাবস্যায় শনিবারে ও মঙ্গলবারে কালীপুজো দিয়ে কারণবারি পান না করে সে অন্ন গ্রহণ করত না৷ তার মাইনের দিনে লেখক বিশেষ ব্যবস্থার দ্বারা তাঁর স্ত্রীকে পে–ফিসের (বেতন অফিস) সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিতেন যাতে মুন্নী তাঁর পকেট–ভর্ত্তি টাকা নিয়ে ৰাড়ীতে যাবার পূর্বে শুঁড়িখানায় ঢুঁ মারবার সুযোগ না পায়৷ মুন্নীর স্ত্রী তাঁর অফিসের থেকে সব টাকা নিয়ে চলে যেত৷ কিন্তু মুন্নী তখন পেছনে দৌড়তে দৌড়তে ৰলত ঃ–

‘‘হে–গে সুমতিয়ার মায় তনিক্ কিরপা তো কর্ আই য়ে ভর কিরপা চাহয়ছী’য়ে৷’’ (ওগো সুমতির মা, একটু কৃপা তো করে যাও৷ আজকের জন্যে তোমার কাছ থেকে একটু কৃপা চাই) অর্থাৎ মুন্নী তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে কয়েকটা টাকা চাইত খাবার জন্যে৷ কিন্তু মুন্নীর স্ত্রী সুমতির মা সেই যে ছোঁ মেরে মুন্নীর পকেট থেকে টাকা নিয়ে নিজের কোঁচড়ে ক্ষাঁধত তারপর একটি পয়সাও সে উপুড়হস্ত করত না৷ কিন্তু সুমতির মা সব সময় তো টাকা পাহারা দিয়ে রাখতে পারে না৷ তাই মুন্নী যেভাবেই হোক টাকা জোগাড় করে নিয়ে মদের দোকানে ঢুকে যেত ও কারণবারিতে গলা ভিজিয়ে ধর্ম রৰা করত৷

মুন্নীর দ্বিতীয় গুণ বা অবগুণ ছিল সে জাতপাত একটু ৰেশী করেই মানত......ছোঁয়া–ন্যাপার বিচার ছিল প্রচণ্ড রকমের৷ লেখক একদিন ৰলেই ফেললে–‘‘হ্যাঁরে তোর যখন ছোঁয়া–ন্যাপার এত বিচার কিন্তু তুই যে কারণবারি পান করিস ওটা কী কেবল কুলীন ৰামুণে ছোঁয়, না, ওটা ৭০০ জাতে ছোঁয় আবার কোনো কোনোটা তো বিদেশ থেকেও আসে, ম্লেচ্ছরাও তো ছোঁয়৷ তবে ও খেয়ে তোর জাত ক্ষাঁচছে কি? এ তো যেন জাত যায় কিন্তু পেট ভরে না’র মত ব্যাপার৷’’

ও ৰললে–‘‘সাহাৰ, আমি তো আর সোজাসুজি মদ খাই না৷ আমি তো ওগুলোকে মায়ের মন্দিরে নৈবেদ্য রূপে চড়িয়ে দিই৷ তারপর প্রসাদ হিসেৰে ওটাকে কারণবারি রূপে পান করি–মদ রূপে নয়৷ প্রসাদে তো সাহাৰ দোষ নেই৷’’

আমি ৰললুম–সে কেমন

ও ৰললে–এই যেমন ধরুন না কত্তা, এই মায়ের মন্দিরে মণ্ডা আতপচাল নৈবেদ্য দিই৷ ওই মণ্ডা যে দুধে তৈরী হয়ে থাকে সেই দুধ যে তৈরী করে থাকে, সেই দুধটা যে এনেছিল তারাও তো আমার মত নৈকষ্য কুলীন নয় যেহেতু নৈবেদ্য চড়ানো হয়েছে তাই সেটা প্রসাদ হয়ে গেছে, সেই মণ্ডায় দোষ নেই৷

তারপর আমি ৰললুম–‘‘তোর যুক্তি গ্রহণযোগ্য৷’’

সে ৰললে–‘‘এই যে আতপ চাল, ওটা যার জমিতে হয়েছিল, যে কেটেছিল, যে কুটেছিল তারা কি আমার মত বনেদী ৰামুণ? নিশ্চয়ই তা নয়৷ ওই চালের মধ্যেই কি অল্পমাত্রায় জলও নিহিত ছিল না যেহেতু ওই আতপ চাল হয়ে গেল প্রসাদী তাই ওতে কোনো দোষ নেই৷ তাই দেশী হোক, ক্ষিদেশী হোক, মদ যখন পূজান্তে কারণবারিতে রূপান্তরিত হয় তখন তাতে দোষ থাকে না৷’’

একদিন মুন্নীলাল আমার এ্যালুমিনিয়ামের গেলাসটা নিয়ে গেছল অন্য কোনো অফিসারের টেক্ষিলে৷ সে টেক্ষিলের জনৈক মিলিটারী অফিসার তাঁকে তাঁর গেলাসটা দিয়ে এক গেলাস জল আনতে ৰললেন৷ সেদিন মাস পয়লা৷ সেদিন মুন্নীর মন থেকে অন্য সক্ষ চিন্তা অপসৃত হয়েছিল৷ তাঁর মাথায় কারণবারির কথাই ঘুরছিল৷ তাই সে ভুল করে আমার গেলাসে জল ভরে নিয়ে সেই সামরিক অফিসারটির টেক্ষিলে রেখে দিলে আর তাঁর গেলাসটিতে জল ভরে রেখে দিলে আমার টেক্ষিলে৷

আমি ৰললুম–‘‘মুন্নী, এ গেলাসটা তো আমার নয়৷ দেখিসনি, আমার গেলাসে স্বস্তিক চিহ্ণ আঁকা আছে৷’’

মুন্নী ৰললে–‘‘ভুল হোয় গেলয়’’ (ভুল হয়ে গেছে)৷

আমি ৰললুম–‘‘অখ্নি কী হোতেয়’’ (এখন কী হবে)?

মুন্নী সঙ্গে সঙ্গে ৰললে–‘‘কোষশুদ্ধি হোতেয়৷ শাস্ত্র মঁ একর বিধানোঁ ছে’’ (কোষশুদ্ধি হক্ষে৷ শাস্ত্রে এর বিধানও আছে)৷

মুন্নী চলে গেল সেই ভদ্রলোকের গেলাসটা নিয়ে৷ কিছুক্ষণ পরে সে আমার গেলাসটা নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল৷

ও ৰললে–‘‘কোষশুদ্ধি করীকে নানয়ছীয়ে’’ (কোষশুদ্ধি করে আনছি)৷

মুন্নী উধাও৷ খানিক বাদে যখন এল তখন তার দু’চোখে জল৷

আমি জিজ্ঞাসা করলুম–কী হোলয়......কী হোলছে (কী হল, কী হয়েছে)?

মুন্নী ৰলছে–জ্বরী গেলয়....জ্বরী চুকলছে (জ্বলে গেছে......গলে  শেষ হয়ে গেছে)৷

আমি ঠিক ৰুঝতে পারলুম না ও কী ৰলতে চায়৷ ও তখন পকেট থেকে এ্যালুমিনিয়ামের একটা ডেলা বের করে দেখালে৷

আসলে মুন্নী গেলাসটি রেখেছিল কোষশুদ্ধি করবার জন্যে ফার্ণেসের ওপরে৷ এ্যালুমিনিয়ামের গেলাস তো৷ অত উত্তাপ সহ্য করবে কেন সে গলে একটা এ্যালুমিনিয়ামের ডেলায় পরিণত হয়ে গেছে৷

আমি ৰললুম–শাস্ত্র মঁ  একরে কোষশুদ্ধি  কহয়ছে কী (শাস্ত্রে  কি একেই  কোষশুদ্ধি

ৰলে)?

যাই হোক্, তোমরা ‘কোষশুদ্ধি’ কাকে ৰলে ৰুঝে গেলে তো

পোড়া মাটির ভাঁড়

লেখক
ভবেশ কুমার বসাক

সপ্তমীতে হাঁটছি যখন ফুটপাতটা দিয়ে

দেখছি কতক যীশুর শিশু ময়লা দেহে শুয়ে,

বাপ-মা তাদের কাজের ফাঁকে মধ্যরাতে আসে

অষ্টমীতে শূন্য হাতে চোখের জলে ভাসে

নবমীতে সেই প্রভাতে বেরিয়ে শিশুর পিতা

সারাটা দিন ‘ভিৰা দিন’ বলছে তারই মাতা৷

ক’জন মিলে নদীর কূলে দাঁড়িয়ে ওরা চার

বিসর্জনের দিনে হাতে পোড়া মাটির ভাঁড়৷

 

বড্ড ভালবাসি

লেখক
সাধনা সরকার

চড়াই, বাবুই, টুনটুনিকে

     দাও না একটু ঠাঁই,

গাছ কেটো না কেটো না গো

     ওগো মানুষ ভাই৷

ফুরুৎ ফুরুৎ উড়ছে কেমন

     চোখ ঘুরিয়ে চায়,

ওরা আছে আমরা আছি

     আকাশ ভরে তায়৷

বেঁচে থাকার এমন সুবাস

     আছে বা কোন্খানে৷

আকাশ-বাতাস সবার সাথে

     এমন মনের টানে৷

এই পৃথিবীর ভালবাসা

     বড্ড ভালবাসি,

দু-হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছি

     দাও না রাশি রাশি৷

জাগ্, ওঠ্, শোন্

লেখক
প্রভাত খাঁ

বন্ধ ঘরের অন্ধকারে মনটাকে

আর আটকে রাখিস্ নারে৷

নোতুন আলোর পরশখানি পেতে

দে না তারে সুযোগটুকু করে৷

জীবন বড়ই ক্ষণস্থায়ী জেনেও

মায়ার ফাঁদে পা দিয়ে তুই চলিস্৷

সৎকর্মই আসল কর্ম বুঝেও

তবু কেন দূরে দূরে থাকিস্৷

করবো, করবো বলে আর

বৃথা সময় নষ্ট করিস না৷

উঠবো, উঠবো, উঠবো বলে

ঘুমঘোরে আর পড়ে থাকিস না৷

দেখ্না চেয়ে আকাশ-বাতাস

ডাকছে সদাই তোরে৷

তারই মহান বাণী তোর মনেতে৷

স্পন্দিত হয় আজিও এ নোতুন ভোরে৷

ছুটে যায়

লেখক
জয়া সাহা

মানুষ জীবনে লক্ষ্য হারিয়ে

টালমাটাল পায়ে এগিয়ে চলেছে,

তাই তো কোথাও ভূমিকম্প, কোথাও সুনামি,

কোথাও খরা, আবার কোথাও বন্যা৷

মারামারি, কাড়াকাড়ি, সন্ত্রাস, জঙ্গিহানা

দূষণের জ্বালায় বাতাস করছে হাঁসফাঁস৷

সব কিছুর মাঝেও একটা উজ্জ্বল আলো

তোমায়আমায় হাতছানি দিচ্ছে

যেন বলছে তাঁর পানে ছুটে চলাই

জীবনের লক্ষ্য, জীবনের গতি৷

হে আলোর প্রতিভূ, আলোর দিশারী

তোমারে জানাই মোর শতশত প্রণতি৷

অস্থির মন যায় না যেতে তোমাপানে

ছুটে চলে অন্য কোথায় অন্য কোন খানে৷

আমারে রেখো প্রভু তোমার স্মরণে

তুমিই আমার, তুমিই আমার শ্রেয়

থেকো মোর সাথে জনমে জনমে৷