সাতের দশক থেকে আমরা বাঙালী দল দিল্লির বঞ্চনা ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে৷ সেদিন কোনো সংবাদপত্র (তখন ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছিলনা) আমরা বাঙালী শব্দটাও প্রচার করত না৷ আজ ভারতীয় বাঙালীরা যে বিপদের সম্মুখীন, আমরা বাঙালী সেই দিনই এই বিপদ আসার ইঙ্গিত দিয়েছিল৷ কোন রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবীরা আমরা বাঙালীর কথায় কান দেয়নি সেদিন৷
বরং সংবাদ মাধ্যম, এক শ্রেণীর ব্লক হেড বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতারা আমরা বাঙালীকে প্রাদেশিক, সাম্প্রদায়িক, বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রভৃতি অপবাদ দিয়ে জনগণ থেকে আমরা বাঙালীকে দূরে রাখতে চেয়েছিল৷ তারাই আবার সেদিন অসম গণপরিষদ, তেলেগু দেশম প্রভৃতি দলের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে নামতো৷ আজ বাঙালীরই এই দুঃসময়ের জন্যে ওইসব দলগুলো দায়ী৷
সাতের দশকের শেষ দিকে সেই সময়কার বিখ্যাত সাংবাদিক রঞ্জিত রায় লিখিত একটি বই প্রকাশিত হয়---ধবংসের পথে পশ্চিমবঙ্গ৷ তার আগে অবশ্য ওই বইয়ের প্রবন্ধ গুলি হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড ও আনন্দবাজারে প্রকাশিত হয়েছিল৷ যুগান্ত পত্রিকার সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্য ধারাবাহিক লিখেছিলেন দিল্লির বঞ্চনা নিয়ে--- বাঙালী কোথায় শিরনামে৷ সেদিনের কোনো রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীরা সেই সব বইকেও গুরুত্ব দেয়নি৷
১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম ক্ষমতায় আসে৷ দিল্লির বঞ্চনার বিরুদ্ধে সিপিএমও কোনো আন্দোলন করেনি৷ তাদের মৌখিক অভিযোগ ছিল কেন্দ্র পশ্চিমবাংলার সঙ্গে বৈমাতৃকসুলভ ব্যবহার করছে৷ এই পর্যন্তই৷ সেই সময় আমরা বাঙালী সংগঠন দিল্লির শাসকের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করে৷ তখন জনতাদল বিদায় নিয়ে ইন্দিরা গান্ধী আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে৷ সেই সময় সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তখন প্রমোদ দাশগুপ্ত একটি কয়েক পাতার প্রচার পুস্তিকা প্রকাশ করে, পুস্তিকার ওপরে লেখা ছিল--- এ বিপদ রুখতে হবে৷ সিপিএমের সেই বিপদ ছিল আমরা বাঙালী সংগঠন৷ আমরা বাঙালীর দাবি ছিল--- ভারতবর্ষে যদি গোর্খারেজিমেন্ট, শিখ রেজিমেন্ট হতে পারে তবে বাঙালী রেজিমেন্টও করতে হবে যা ব্রিটিশ আমলে ছিল৷ স্থানীয় বেকারদের ১০০ শতাংশ চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে৷ দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা শিক্ষা আবশ্যিক করতে হবে৷ সরকারি বেসরকারি সব কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি৷ এতে সিপিএমের বিপদ কোথায় ছিল! তবে শুধু এই প্রচারে সিপিএম থেমে থাকেনি৷ আমরা বাঙালীকে সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদ বলে প্রচার করতে লাগলো৷ তখনকার বিরোধীদল কংগ্রেস ও সংবাদপত্রগুলো সেই প্রচারে সামিল হলো৷ আমরা বাঙালীর আন্দোলনের একটি অঙ্গ ছিল সরকারি বেসরকারি সমস্ত জায়গার হিন্দি নাম ফলক গুলো আলকাতরা মেরে দেওয়া৷ দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল যারা এভাবে শহরকে কালি করছে তাদের জন্য প্রয়োজন লঠ্যঔষধি৷ সিপিএমের হাতে সেদিন খুন হয়েছিল নৈহাটির আমরা বাঙালীর সক্রিয় কর্মী নিরঞ্জন দাস৷ কিন্তু মজার কথা হল সিপিএম কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন বাংলায় লেখার দাবিতে ধর্মতলার কে সি দাসের মিষ্টির দোকানের সাইনবোর্ডে আলকাতরা মারে ওই সব পত্রিকাগুলো আবেগে আপ্লুত হয়েছিল৷
এত অতীত ঘাঁটার কারণ হলো আজ বাঙলার এই যে রাজনৈতিক দলগুলো এনআরসি, সিএএ, এস আই আর এর বিরুদ্ধে চিৎকার করছে এই দলগুলিও তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা বাঙলার আজকের এই দুর্দিনের জন্য দায়ী৷ সিপিএম আজ মহাশূন্যে বসে তৃণমূল বিজেপির যে সেটিং তত্ব দেখছে, এই সেটিং তত্ব স্বাধীনতার আগে থেকেই সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে ও বাঙালীর বিরুদ্ধে কংগ্রেস কমিউনিস্ট আরএসএস এর মধ্যে ছিল৷ তিনজনেই সুভাষ চন্দ্রের চরম বিরোধী ছিল৷
আজ কিন্তু বাংলার দুয়ারে সত্যিই বিপদ এসে দাঁড়িয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস সিপিএম অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে৷ তৃণমূল দিল্লির শাসকের বিরুদ্ধে লড়লেও হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবে না৷
গত ৭৮ বছরে এইসব রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে বাঙালী কি পেয়েছে? দেশ ভেঙে যারা তথাকথিত স্বাধীনতার নামে ক্ষমতার দখল নিয়ে ছিল আটাত্তর বছর ধরে তারা শুধু দল ভেঙেছে আর দল গড়েছে, পাড়ায় পাড়ায় গণ্ডি কেটেছে , কংগ্রেসের পাড়া সিপিএমের পাড়া সি পি আই এর পাড়া, ফরওয়ার্ড ব্লকের পাড়া,আরএসপির পাড়া, তৃণমূলের পাড়া বিজেপির পাড়া! একের পাড়ায় আর একজন ঢুকলে ছুরি খেয়েছে বোমা খেয়েছে গুলি খেয়েছে, এইভাবে ভাই ভাইয়ের রক্তে হাত রাঙিয়েছে, ভাই ভাইয়ের ঘরে আগুন লাগিয়েছে, হাজার হাজার মা-বোনের হাতের শাঁখা ভেঙেছে সিঁথির সিঁদুর মুছেছে আর পাড়ায় পাড়ায় শহীদ বেদী করেছে৷ ৭৮ বছরে বাঙলার অর্থনীতি পুরোপুরি গ্রাস করেছে পশ্চিমি হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী শোষক গোষ্ঠী, শিক্ষা সংস্কৃতি শিল্প সাহিত্য ভাষা আজ বিপন্ন, ধবংসের শেষ কিনারে৷ এখন ভারতীয় বাঙালীদের বিদেশি বানিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে ভরার ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণ প্রায়৷ বাঙালী এখনো বাম কংগ্রেস বিজেপির ঝান্ডা নিয়ে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই করে সেই ধবংসের পথেই এগিয়ে চলেছে৷ এই পরিস্থিতিতে বাঙলার প্রতিটি শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানবতাবাদী মানুষের কাছে প্রশ্ণ কোনটা সাম্প্রদায়িক কোনটা বিচ্ছিন্নতাবাদ? ধর্মীয় মতে ও রাজনৈতিক মত পার্থক্যের বিভেদ নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার জন্য এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত, নাকি বাঙালী পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়াটা সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদ? বাঙালী মানে বাঙলার হিন্দু বাঙলার মুসলমান বাঙলার বৌদ্ধ বাঙলার খ্রিস্টান বাঙলার কংগ্রেস বাঙলার কমিউনিস্ট আমরা সবাই বাঙালী৷ আজ ভারতবর্ষে বাঙালী যে ভয়ংকর বিপদের সম্মুখীন এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে হলে বাঙালীকে দল মতের ঊর্ধে উঠে ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে৷ বিদ্রোহী কবি নজরুলের কথায় --- ‘বাঙালী যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে বাঙালীর বাঙলা সেদিন সে অসাধ্য সাধন করবে৷’ বিপদ যতই ভয়ঙ্কর হোক উদ্ধার পাওয়া দুরূহ কাজ নয় যদি সব বিভেদ মতপার্থক্য ভুলে আমরা মিলতে পারি৷
তাই আসুন, আজ আমাদের পরিচয় রাম নয়, বাম নয়, ডান নয়, কংগ্রেস নয়, কমিউনিস্ট নয়,বিজেপি নয়,আজ আকাশ বাতাস মুখরিত করে আজানের সুর ধবনিত হোক মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে, মন্দিরে মন্দিরে বাজতে থাকুক শঙ্খ বাদ্য, কিন্তু বাঙলার পথে ঘাটে, বাঙলার হাটে বাজারে, বাঙলার মাঠে ময়দানে আমাদের একটি মাত্র পরিচয়--- আমরা বাঙালী ---আমরা বাঙালী ---আমরা বাঙালী৷
- Log in to post comments