স্বাধীনতার ৭৬ বছরেও মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল না

লেখক
আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত

১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট ব্রিটিশরা  স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা  হস্তান্তরের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারী ভারতের নিজস্ব সংবিধান কার্যকর করা হয় ও ভারতকে  গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা  হয়৷ এই সংবিধানে প্রতিটি  মানুষের জীবনধারণের অধিকার, সমানাধিকার, স্বাধীনতার অধিকার প্রভৃতি মৌলিক অধিকার  স্বীকৃত  হয়৷
আজ স্বাধীনতা লাভের ৭৬ বছর পর ও সংবিধান কার্যকর করার ৭৩ বছর পর আমরা দেখছি ওই সব মৌলিক অধিকার তত্ত্বগতভাবে স্বীকৃত হলেও  কার্যতঃ ভারতের  সর্বসাধারণ এই অধিকার লাভ করতে পারেনি৷  এখনও  হাজার  হাজার কর্ষক ও কর্মহীন  মানুষ চরম হতাশায় দলে দলে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে৷ এখনও পৃথিবীতে  ক্ষুধার ইনডেক্সে  ভারতের স্থান প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর থেকেও পেছনে৷ 
অন্যদিকে আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার দেশের অতি ধনীদের ১.৪৫ লক্ষ কোটি টাকার ট্যাক্স মুকুব করে দিয়েছে৷
এদেশের  সরকার যে বেশি করে ধণিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করছে,  বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বা এই দেশের  সরকারেরই পরিবেশিত তথ্য তার প্রমাণ ৷ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘ফোব্‌স’৷ পত্রিকার  এক প্রতিবেদনে  প্রকাশিত  হয়েছিল, ভারতের শীর্ষস্থানীয় পুঁজিপতিদের  গড়ে ১ জনের ১ দিনের  সম্পদবৃদ্ধির  পরিমাণ ১ কোটি  টাকার ঊধের্ব৷ অথচ এদেশে   ২৭  কোটি মানুষ  এখনও পেট ভরে খেতে  পায় না৷ বছরে প্রায় ২ কোটি মানুষের  দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধাজনিত রোগে মৃত্যু হয়৷
সাধারণ মানুষ যেখানে চরম অভাবে অনটনে  শুকিয়ে  মরছে তার পাশাপাশি ধনিক শ্রেণীর মানুষের  বিপুল বিলাসিতা ও অপচয়  ঘটে চলেছে৷
স্বাধীনতার পর কেন্দ্রে  বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেস, জনতা  ও বিজেপি জোট ক্ষমতায় এল৷ বহুবার বহু প্রতিশ্রুতি দিল, কিন্তু  কোনো প্রতিশ্রুতিই রক্ষিত হয়নি৷ ইন্দিরা গান্ধীর ‘গরিবী হটাও’ প্রতিশ্রুতিও যেমন রক্ষিত  হয়নি৷ তেমনি মোদিজী ক্ষমতায়  আসার আগে  প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন,  দুর্নীতি মুক্ত বেকারহীন ভারত গড়ে তুলবেন৷ প্রতিটি গরীব মানুষের  এ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা করবেন৷  কোনো প্রতিশ্রুতিই রক্ষিত হয়নি৷ বরং উল্টো দিকে রাষ্ট্রসংঘের ২০১৮-১৯ এর প্রতিবদনে প্রকাশ পেয়েছে, ভারতে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে৷
এই ৭৬ বছরে  কেউই ভারতের দারিদ্র্য ও বেকার সমস্যা--- দেশের যে মূল  অর্থনৈতিক  সমস্যা তারই কিছুমাত্র  সমাধান করতে পারল না৷ 
কিন্তু এ সমস্যার সমাধান কী?  মহান্‌ দার্শনিক প্রাউট-প্রবক্তা শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার, এই সমস্যা সমাধানের যে পথ দেখিয়েছেন এছাড়া সমস্যা সমাধানের অন্য কোনো উপায় নেই, তাঁর নীতি অর্থনৈতিক  বিকেন্দ্রীকরণের  নীতি৷
পুঁজিপতি শ্রেনীর হাতে বা সরকারের হাতে (যেমন কম্যুনিষ্ট ব্যবস্থায়) অর্থনৈতিক  শক্তির কেন্দ্রীকরণ করা  চলবে না৷  জনসাধারণের হাতে অর্থনৈতিক শক্তির বিকেন্দ্রীকরণ চাই৷
তার প্রথম ধাপ হবে, প্রথমতঃ স্বয়ংসম্পূর্ণ সামাজিক-অর্থনৈতিক অঞ্চল  গড়তে হবে৷ প্রাউট -প্রবক্তা ভারতে জনগণের  হাতে অর্থনৈতিক  শক্তির বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে তথা অর্থনৈতিক যথাযথ উন্নয়নের  জন্যে ভারতবর্ষকে ৪৪টি  স্বনির্ভর  অর্থনৈতিক অঞ্চলে (‘সমাজ’) বিভক্ত করেছেন৷
এর ভিত্তি হচ্ছে--- (১) একই অর্থনৈতিক সমস্যা, (২) একই ধরণের অর্থনৈতিক সম্পদ ও সম্ভাবনা, (৩) জাতিগত সাদৃশ্য, (৪) সাধারণ ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য (৫) একই সেন্টিমেন্টাল লিগ্যাসি৷
এরপর সংশ্লিষ্ট ‘সমাজ’ থেকে অর্থের বহিঃস্রোত ও কাঁচামালের  বহিঃস্রোত বন্ধ করতে হবে৷  সঙ্গে সঙ্গে  ব্লকভিত্তিক পরিকল্পনার  মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক প্রথায় কৃষি সমবায় ও  ব্যাপক শিল্পবিকাশ ঘটিয়ে  স্থানীয় বেকার সমস্যার সমাধান করতে হবে৷ উদ্‌বৃত্ত শ্রমিক অঞ্চলে শ্রম নিবিড় (লেবার-ইনটেনসিব্‌) শিল্প ও  ঘাটতি শ্রমিক এলাকায় মূলধন-নিবিড় শিল্প গড়ে, তুলতে হবে৷ এইভাবে  স্থানীয়  মানুষের  হাতে  অর্থনৈতিক শক্তির  পরিচালনার ভার  তুলে দিতে হবে৷
এইভাবে যথাযথ পরিকল্পনা মফিক শিল্পবিকাশ ঘটিয়ে (সমবায়কে প্রাধান্য দিয়ে) ১০০ শতাংশ  স্থানীয়  মানুষের  কর্মসংস্থানের  ব্যবস্থা করতে হবে৷ যে শিল্পগুলির উৎপাদিত  দ্রব্য অন্যান্য শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে  ব্যবহৃত হবে---সেই সমস্ত শিল্পের পরিচালনার ভার স্থানীয় প্রশাসনের  হাতে ন্যস্ত করতে হবে৷
যেমন , শিল্পের  ক্ষেত্রে  রাজ্য সরকার  বা স্থানীয়  প্রশাসনের  হাতে থাকবে সূতা কল পরিচালনার  ভার৷ তারা  ‘না লাভ না ক্ষতি’র ভিত্তিতে ব্লকে ব্লকে ব্যাপকভাবে খোলার সমবায় বয়নশিল্পকে  সূতা  সরবরাহ করবে৷  আবার সমবায় বয়ন শিল্পগুলি বস্ত্র তৈরী করে  গ্রামে গ্রামে  গড়ে ওঠা কুটির শিল্পের মাধ্যমগুলিতে  রঙ  করার কাজ  (যেমন শাড়ীতে  বাটিকের কাজ) করিয়ে নেবে৷ বাড়ীতে  বাটিকের  কাজ  করিয়ে নেবে৷ বাড়ীতে বসে মহিলারা, বৃদ্ধরাও এই  কাজ করতে পারবে৷ 
এভাবে খাদ্য, বস্ত্র , শিক্ষার  উপকরণ, গৃহনির্মাণের উপকরণ ও বিভিন্ন গাছ-গাছড়ার  ভিত্তিতে নানান্‌ সাধারণ ঔষধাদি জীবন ধারণের নূ্যনতম প্রয়োজনের পরিপূর্তির  ব্যবস্থা করতে হবে৷  ওই  সামাজিক-অর্থনৈতিক  অঞ্চলে  (সমাজ-এলাকা) সমুদ্র উপকূল  থাকলে ওই সমাজ-এলাকার জন্যে অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য লবণও ওই এলাকাতে উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে৷ সোজা কথায়,চেষ্টা করতে হবে, জীবন ধারণের, জন্যে প্রয়োজনীয় সমস্ত সামগ্রী এই এলাকার মধ্যেই উৎপাদন করে এই এলাকাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তোলা৷ এরপর  যে দ্রব্য নিতান্তই এই এলাকাতে উৎপাদন করার কোনো সুযোগ নেই, ওই দ্রব্যকে স্থানীয় উৎপাদিত দ্রব্যের বিনিময়ের মাধ্যমে আমদানি করা৷
এইভাবে প্রাউটে প্রতিটি এলাকার স্থানীয় সম্ভাবনার  সর্বাধিক উপযোগের  ভিত্তিতে কৃষিও শিল্প বিকাশের  পরিকল্পনা নিয়ে নোতুন করে উন্নয়ণ-যজ্ঞ শুরু করতে হবে৷ তবেই দেশের দারিদ্র্য ও বেকার সমস্যা সমাধান হবে৷