আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ

আত্মোপলব্ধি ও মানবতার সেবা

‘আত্মমোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’, এটি একজন সাধকের জীবনের আদর্শ হওয়া উচিত৷ মানুষের কাজ করা উচিত, আর কাজ করার সময়ে মনে রাখা দরকার, সে যা কিছুই করছে তা আত্মমোক্ষের জন্যে৷

মানুষের কর্তব্য

মানব জীবনের লক্ষ্য কী? ঘাত–প্রতিঘাতের মাধ্যমে এগিয়ে চলতে হবে৷ সঞ্চরধারায় যে বিশুদ্ধ আত্মিক ভাব থেকে পঞ্চভূতাত্মক জড়জগতের উৎপত্তি বা প্রপঞ্চের সৃষ্টি হয়েছিল, প্রতিসঞ্চর ধারায় ওই প্রপঞ্চকে পুনরায় আত্মধাতুতে– মূলাধাতুতে রূপান্তরিত করতে হবে৷ এটাই মানবজীবনের লক্ষ্য, যেখান থেকে এসেছিল সেখানেই পঁৌছে যাওয়া৷ চক্রের আবর্তন পূর্ণ করা৷ এটাই মানবজীবনের লক্ষ্য৷ পশুজীবনের লক্ষ্য জড়তার উপাসনা করা৷ মানবজীবনের লক্ষ্য কেন্দ্রে (নিউক্লিয়াসে) পঁৌছে যাওয়া৷ এছাড়া মানবজীবনের দ্বিতীয় কোনো লক্ষ্য থাকতে পারে না৷ মানব জীবনের একমাত্র লক্ষ্য আধ্যাত্মিক সাধনা করা, অন্য কোনো সাধনা নয়৷

সাধনার মন্থন

দুধের মধ্যে যে রকম ঘি ব্যাপ্ত হয়ে থাকে আর মন্থন করলে সেটা ওপরে উঠে আসে, ঠিক সেই রকম তোমার মধ্যে পরমপুরুষ ব্যাপ্ত আছেন  সাধনারূপী মন্থনের দ্বারা তুমি তাঁকে পেয়ে যাবে৷ মন্থন করলে যে মাখন বেরিয়ে আসে, সেটাই পরমপুরুষ৷ তিনি তোমার ভিতরে আছেন  ঘরের মধ্যে কোনো দেবতাকে তুমি বাহ্যিক পূজা করে, বহিরঙ্গিক সাধনার দ্বারা তাঁকে পাবে না৷ বরং সেটার দ্বারা তুমি তাঁর থেকে আরো দূরে সরে যাবে৷

খাদ্য, জীবকোষ, শরীর ও মন

মানুষের এই শরীরটা তৈরী হয়েছে অগণিত ছোট ছোট জীবকোষ দিয়ে৷ এরা দুই ধরনের–(১) এককোষী (Protozoic cells) ও (২) বহুকোষী (Metazoic cells)৷ শরীরের প্রতিটি অঙ্গ–প্রত্যঙ্গ এই প্রকার অসংখ্য জীবকোষ দিয়ে তৈরী৷ এক হিসেবে দেখতে গেলে মানুষের পুরা দৈহিক কাঠামোটাই একটা বড় রকমের বহুকোষী জীব ছাড়া কিছু নয়৷ প্রতিটি কোষের নিজস্ব মন, আত্মা সব কিছুই রয়েছে৷ তবে জীবকোষের মন মানুষের মনের থেকে ভিন্ন৷ এককোষী জীবের চেয়ে বহুকোষী জীবের মন অধিকতর বিকশিত৷ মানুষের মনটা হ’ল অণুমানস তথা অণুদেহের সমস্ত মানসশক্তির সমষ্টি৷ কাজেই মানবমন হ’ল একটা সামূহিক মন৷ ভূমামন যেমন ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি সত্তার সঙ্গে ওতঃপ্রোত ভাবে জড়িত আছেন, অণুমা

অষ্টকমল

আমাদের শরীরে আটটি চক্র আছে৷ মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত ও বিশুদ্ধ– এই পাঁচ চক্র আর এর ওপর আজ্ঞাচক্র, গুরুচক্র ও সহস্রারচক্র*৷ এই হ’ল অষ্টকমল৷ পরমাত্মার লীলা এই অষ্টকমলকে নিয়ে৷

সাধনায় যখন মানুষ এগিয়ে যায় তখন কী হয়?

‘‘সর্বতঃ পাণিপাদং

তৎ সর্বতোক্ষিশিরোমুখম্৷

সর্বতঃ শ্রুতিমল্লোঁকে সর্বসাবৃত্য তিষ্ঠতি৷৷’’

এই অষ্টকমল যখন ফোটে, তা কেমন করে ফোটে? মানুষ যখন মনের সমস্ত ভাবনা নিয়ে পরমপুরুষেরই উপাসনা করে তখন সমস্ত ভাবনা, সমস্ত আকুতি একের দিকেই ছুটে যায়৷

কীর্ত্তন মহিমা

এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কেবল পরমপুরুষই চরম সত্য–একমাত্র সত্য, একমাত্র অপরিণামী সত্তা, আর তাঁর সৃষ্ট বাকি সব কিছুই পরিণামী সত্তা অর্থাৎ তারা নিয়ত পরিবর্ত্তিত হয়ে চলেছে৷ তাই সেগুলোকে বলতে পারি আপেক্ষিক সত্য, চরম সত্য নয়৷ চরম সত্য হ’ল একমাত্র পরমপুরুষ৷ চরম সত্য সর্বদাই এক, তা কখনও দুই হতে পারে না৷

এই চরম সত্যের যে চক্রনাভি–তাতে কোন পরিবর্ত্তন নেই৷ কোন গতি নেই৷ আবার চরম অগতিও নেই, আপেক্ষিক স্থিতিশীলতাও নেই৷ অবশ্য এই চক্রনাভির বাইরে রয়েছে গতিশীলতা কিন্তু সেখানে অন্য কোনও দ্বিতীয় সত্তা সেই৷

বিজয়োৎসব (বিজয়া)

প্রাচীন সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারে বছরে ছ’টা ঋতুর উল্লেখ আছে৷ গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত৷ কিন্তু ভারতের অনেক স্থানে, বিশেষ করে সমুদ্রের তটবর্তী এলাকায় তথা পূর্ব ভারতে মূলতঃ চারটে ঋতু৷ সেগুলি হচ্ছে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও শীত৷ ৰাঙলায় শীত ঋতু শেষ হতে না হতেই গরম শুরু হয়ে যায়৷ তাই বসন্ত ঋতু এখানে পনেরো দিনের জন্যেও স্থায়ী হয় না, আর হেমন্ত তো শীতেরই অঙ্গ৷

খণ্ডজীবন ও পূর্ণজীবন (১)

 

কিছুদিন আগে ‘মানসাধ্যাত্মিক সাধনার স্তরবিন্যাস’ পুস্তকে বলা হয়েছে যে মানুষের অগ্রগতির চারটে স্তর রয়েছে–যতমান, ব্যতিরেক, একেন্দ্রিয় ও বশীকার৷ এই চারটে স্তরের ভেতর দিয়ে মানুষকে এগিয়ে চলতে হয়৷ এ সম্বন্ধে যা বক্তব্য তা ওই বইয়ে স্পষ্ট ভাষায় লিখে দিয়েছি৷ এখন, মানুষের জীবনটা কী রকম কোথা থেকে তার শুরু, কোথায় বা তার শেষ?

সৎ কী ও অসৎ কী?

‘সৎ’ কী ও ‘অসৎ’ কী– এ সম্পর্কে যে বিচারবোধ তাকে সদাসৎ বিবেক বলে, যা ‘সৎ’–কে ‘অসৎ’ থেকে ও ‘অসৎ’–কে ‘সৎ’ থেকে পৃথক করে দেয়৷ ‘সৎ’ কী? লৌকিক ভাষায় ‘সৎ’ মানে ভালো– সৎ ব্যষ্টি, সজ্জন ব্যষ্টি৷ আর আধ্যাত্মিক অর্থে ‘সৎ’ মানে অপরিণামী সত্তা– যাতে কোনো পরিবর্তন হয় না৷ আর ‘অসৎ’ মানে যা পরিণামী, যার অবস্থান্তর ঘটে৷ ‘সৎ’ বস্তু একই, বাদবাকী সব অসৎ৷ ‘অসৎ’ মানে খারাপ নয়, পরিবর্তনশীল৷

স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ

প্রত্যেক বস্তুর নিজের নিজের ধর্ম আছে, নিজস্ব স্বাভাবিক লক্ষণ আছে৷ সেই লক্ষণ দেখেই মানুষ সংশ্লিষ্ট বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হয়, তার নামকরণ করে৷ প্রত্যেক সত্তার, প্রত্যেক জীবের নিজের নিজের ধর্মে অটুট থাকা শ্রেয়স্ক্র৷

সোণা ও লোহার নিজেদের পৃথক পৃথক ধর্ম আছে৷ ঠিক তেমনি মানুষেরও নিজের ধর্ম আছে৷ মানুষ যদি নিজের ধর্ম থেকে, মানব ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় তবে তাকে মানুষ বলব না৷ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার নিজের ধর্মেই নিহিত৷ তাই তার পবে স্বধর্মে সুদৃঢ় থাকাই বাঞ্ছনীয়৷