কলকাতার কাহিনী

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

পূর্ব প্রকাশিতের পর,

দক্ষিণে কালীঘাট ছিল একটি মন্দির–কেন্দ্রিক ছোট্ট গ্রাম৷ এখানে অল্প কয়েক ঘর ব্রাহ্মণ ও পটুয়াদের (পটুয়া বা চিত্রশিল্পী) বসবাস ছিল৷ এই পটুয়ারাই সুবিখ্যাত কালীঘাটের পটের শিল্পী৷ এই কালীঘাটের পট শিল্পকে ধ্রুপদী মর্যাদা দিয়ে গেছেন বাঁকুড়ার বেলেতোড় নিবাসী যামিনীরঞ্জন রায়৷ কালীঘাটের পটশিল্প কত দিনের পুরোনো তার কোন লিখিত ইতিহাস নেই৷ তবে পাঠান আমলের গোড়ার দিকেও এখানে পটুয়াদের বসবাস ছিল৷ সেকালের ৰাঙলার লোক হাটে গিয়ে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে পটও কিনে আনত৷ বিশেষ করে নানান ধরনের হিন্দু দেবদেবীর পটেরই বিক্রিবাটা বেশী হ’ত৷ যেসব মেয়েরা বারমেসে লক্ষ্মী পূজো করতেন তাঁরা পটেতেই তা’ করতেন৷ পাঠান আমলে যখন দুর্গাপুজোর প্রবর্তন হয় তখন মূর্তি গড়ে দূর্গাপূজো করতেন কেবল জমিদারেরাই৷ আর যে সকল মধ্যবিত্ত মানুষ বাড়ীতে দুর্গাপূজো করতেন তাঁরা পটেতেই করতেন৷ যাদের পট কেনার সামর্থ্য ছিল না তাঁরা তা করতেন ঘটে৷ আজ থেকে আনুমানিক একশ’ বছর আগেও সরস্বতী পূজো মুখ্যতঃ ঘটেতেই করা হ’ত৷ পরে সাহেবরা উৎসাহ দিয়ে সরস্বতীর মূর্তিপূজা প্রবর্তন করেন৷

কালীঘাটের মন্দিরটি অনেকবারই ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে গেছে৷ শেষের দিকে বড় মন্দিরটি তৈরী করে দেন বড়িষার সাবর্ণ চৌধুরীরা৷ যশোরের জগন্নাথপুর এলাকা থেকে কুশারী গাঞি–এর কিছু রাঢ়ী শ্রেণীর ব্রাহ্মণ এসে জেলেপাড়ার মাঝামাঝি অংশে গঙ্গার তীর ঘেঁষে বসবাস করতে শুরু করেন৷ এঁরাই হলেন পরবর্তীকালের বিখ্যাত পাথুরেঘাটা ও জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের আদিপুরুষ৷ জেলেরা এঁদের সম্মানে ‘ঠাকুর’ নামে সম্বোধন করত৷ সেই থেকে এঁরা ঠাকুর নামে প্রসিদ্ধ৷

সেকালের কায়স্থরা থাকতেন গোবিন্দপুর এলাকায়৷ পরে যখন রাঢ় অঞ্চলের ওপর মারাঠা বর্গীদের আক্রমণ হয় তখন মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও দুমকা জেলার অবস্থাবান কায়স্থরা চলে যান ভাগলপুর জেলার দত্তবাটির দত্ত জমিদারদের, চম্পানগরের ঘোষ মহাশয়দের ও ঝউয়াকুঠির ঘোষ জমিদারদের আশ্রয়ে৷ তাঁরা বসবাস করতে শুরু করলেন ভাগলপুর, মুঙ্গের জেলার শতাধিক গ্রামে৷ ঘোষ, মিত্র, দত্ত, দাস ও সিংহ পদবীধারী রাঢ়ীয় কায়স্থদের উত্তর পুরুষেরা এখনও সেখানে রয়েছেন৷ ওঁরা ওঁদের সঙ্গে নিজেদের রাঢ়ী শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পুরোহিতদেরও নিয়ে যান৷ আবার মারাঠা বর্গীদের আগমণের সময় বাঁকুড়া, বর্ধমান, হাওড়া ও হুগলী অঞ্চলের অবস্থাপন্ন কায়স্থেরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ইংরেজদের এই কুঠি শহর কলকাতায় চলে আসেন৷ এঁরা কিন্তু যে–কোন কারণে হোক, গোবিন্দপুরে বসবাস করেন নি৷ এঁরা এলেন হাটখোলা, শোভাবাজার, শ্যামবাজার, শ্যামপুকুর, কম্বুলেটোলা, কুমুরটুলী, চিৎপুর প্রভৃতি অঞ্চলে৷

সপ্তগ্রাম বন্দরের পতনের পর সেখানকার গন্ধবণিক ও সুবর্ণৰণিকেরা চলে এলেন মুখ্যতঃ চুঁচড়োয় ও গৌণতঃ ভাগীরথীর তীরের অন্যান্য শহরগুলিতে৷ কলকাতায় যখন ইংরেজদের ব্যবসা জমে উঠল তখন চুঁচড়োর সুবর্ণবণিকেরা অনেকে চলে এলেন কলকাতায়৷ তাঁরা বাস করতে লাগলেন শহরের ভাগীরথীর কোলঘেঁষা পশ্চিমাঞ্চলে৷ কলকাতার ব্যবসা তখন ভাগীরথী দিয়ে মুখ্যতঃ নদীপথে চলত৷ সেকালকার চুঁচড়োর নামজাদা মানুষ ছিলেন গৌরী সেন৷ তাঁর অর্থপ্রাচুর্যের, দরাজদিল্ ও দরাজহস্তের খ্যাতি তখন দেশজোড়া৷ এখনও লোকে বলে থাকে ‘‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন’’৷ এই মৎস্যজীবী, পিরালী ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, তন্তুবায়, তন্তুবণিক ও সুবর্ণবণিকেরাই ছিলেন কলকাতার সাবেকী বাসিন্দা৷

পিরালী ছাড়া অন্য যে সব ব্রাহ্মণ গোড়ার দিককার কলকাতায় এসেছিলেন তাঁদের অনেকেই মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসির পর কলকাতা ছেড়ে হাওড়া জেলার ব্রাহ্মণ–প্রধান বৃহৎ গ্রাম বালীতে চলে যায়৷ (ইংরেজরা নৌ–চলাচলের সুবিধার জন্যে বালী গ্রামেই ভাগীরথী থেকে সরস্বতী নদী পর্যন্ত একটি সংযোজক খাল কাটান৷ এই খাল কাটার ফলে বালী গ্রামের উত্তরাংশ অবশিষ্ট গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়৷ পরে হুগলী জেলা থেকে কেটে যখন নতুন হাওড়া জেলা তৈরী হয় তখন মূল বালী গ্রামটি নবগঠিত হাওড়া জেলার অন্তর্গত হয়, আর বিচ্ছিন্ন ওতোরপাড়া গ্রামটি হুগলী জেলাতেই থেকে যায়)৷ কলকাতায় ব্রহ্মহত্যা হয়েছিল বলে তাঁরা এই স্থান ত্যাগ করে গঙ্গার পশ্চিমকূলে (‘গঙ্গার পশ্চিমকূল বারাণসী সমতূুল) অর্থাৎ রাঢ়ে গিয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন৷ তারপরে কার্যব্যপদেশে ব্রাহ্মণেরা যদিও কলকাতায় আসতেন, কিন্তু এখানে থাকাকালে অন্ন–জল স্পর্শ করতেন না বা রাত্রিবাস করতেন না৷ ভোরে এসে সন্ধেয় ফিরে যেতেন৷

গোবিন্দপুর কালীঘাটের মধ্যে ছিল গহন অরণ্য৷ রাত্রে পথ চলা তো দূরের কথা, দিনদুপুরেও কেউ একা সে পথ মাড়াত না৷ কালীর মন্দিরে পূজো দিতে যাবার সময় ৪০/৫০ জনের একটি দল লাঠিসোঁটা নিয়ে সেই পথ দিয়ে যেত৷ নইলে ঠ্যাঙ্গাড়েদের হাতে প্রাণ হারাতে হ’ত৷ শোণা যায় ঠ্যাঙ্গাড়েরা দিনদুপুরে মানুষ মেরে গাছে ঝুলিয়ে রাখত৷ গোবিন্দপুর এলাকায় ছিল চৌরঙ্গী বাবার আশ্রম (নাথযোগী ৰাৰা চৌরঙ্গীনাথ)৷ তীর্থযাত্রীদের এই দূরবস্থা দেখে চৌরঙ্গীৰাৰা খুবই ব্যথা অনুভব করতেন৷ তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে জঙ্গল কাটিয়ে কালীঘাট যাবার একটি রাস্তা করে দেন৷ রাস্তাটি বহুকাল ধরে ‘চৌরঙ্গী–ৰাৰার রাস্তা’ নামে পরিচিত ছিল৷ যাঁরা এই রাস্তাটির নাম পূর্ণতঃ বা অংশতঃ পরিবর্ত্তন করেছেন তাঁরা কেন এটা করতে গেলেন বুঝতে পারছি না৷ চৌরঙ্গী ৰাৰার আশ্রমের কিছুটা পূর্ব দিকে ছিল ধর্মরাজ ঠাকুরের স্থান৷ ধর্মরাজ ৰুদ্ধেরই নামান্তর৷ পাল আমলের শেষের দিকে ৰাঙলায় এই ধর্মরাজ বা ধর্মঠাকুরের পূজার প্রবর্ত্তন হয়৷ কলকাতার মত হাওড়ার শালিখাতেও*(কেউ কেউ ভুল করে ‘শালকিয়া’ বা ‘শালকে’ লিখে থাকেন৷ এই হাওড়ে ভরা অঞ্চলটি মুখ্যতঃ ‘হাওড়া’ নামে পরিচিত ছিল৷ আর হাওড়গুলির মাঝামাঝি ডাঙ্গা এলাকায় ছিল ৰড় ৰড় ৰট গাছ৷ এই সুপ্রাচীন ৰট গাছগুলির একটি এখন শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে রয়ে গেছে৷ সম্ভবতঃ এটিই ভারতের প্রাচীনতম বটগাছ৷ সম্ভবতঃ বললুম এই কারণে যে ঠিক এমনই সুপ্রাচীন আর একটি বটগাছ রয়েছে নদীয়া জেলার বাগচিজমসেদপুরের কাছে৷ হাওড়ের মধ্যে এই বটগাছগুলিতে বাস করত প্রচুর সংখ্যায় শালিখ পাখী৷ তাদের নাম থেকেই শালিখা বা শালখে৷) ধর্মরাজতলা বা ধর্মতলা রয়েছে৷ কলকাতার এই ইতিহাসবাহক ধর্মতলা ষ্ট্রীটটির নাম পরিবর্ত্তন করে আজকাল কেন ‘লেনিন সরণী’ রাখা হয়েছে তা’ ৰুঝতে পারছি না৷ মহামতি লেনিনের সঙ্গে কলকাতার এই অংশের কী ধরনের যোগাযোগ ছিল তা’ আমার জানা নাই৷ তাঁর নামে কি কোন নতুন বা অনৈতিকহাসিক রাস্তা বা পার্কের নামকরণ সম্ভব ছিল না ৰৌদ্ধ যুগের শেষের দিকে বাঙলায় নাথধর্মের পাশাপাশি এই ধর্মরাজপন্ধী ৰৌদ্ধধর্মও চলছিল৷ খুব সম্ভব চড়কপূজার প্রবর্ত্তনও সেই সময়ই হয়েছিল৷ আমাদের কলকাতায় অনেকগুলো চড়কডাঙ্গা ছিল ও আছে৷ সেই সুদিনের অপেক্ষায় আছি যখন চড়কডাঙ্গাগুলোর নামও পাল্টে যাবে!

হ্যাঁ, ধর্মরাজ পূজোর কথা বলছিলুম৷ মধ্য ৰাঙলায় মোটামুটি ভাবে ও রাঢ় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ধর্মরাজ পূজো প্রচলিত ছিল৷ বাঁকুড়া ও বীরভূমে ধর্মরাজ অব্রাহ্মণ–পূজিত শিব বলে গোড়ার থেকেই গণ্য হয়ে আসছিলেন৷ পূর্ব রাঢ়ে ও মধ্য ৰাঙলায় ধর্মরাজ কোথাও কোথাও বুড়ো শিব আখ্যা পেয়েছিলেন৷ এই অঞ্চলে অনেক গ্রামে ও অনেক শহরে যেমন ধর্মরাজতলা আছে তেমনি বুড়ো শিবতলাও আছে৷ তফাতের মধ্যে এই যে ধর্মরাজের পূজারীদের অধিকাংশ ছিলেন অব্রাহ্মণ অর্থাৎ জাতৰাঙালী পর্যায়ের মানুষ, মুখ্যতঃ কৈবর্ত ও সদ্গোপ৷ তাঁরা সাধারণতঃ ‘দেবাংশী’ নামে পরিচিত হতেন৷ কিন্তু বুড়ো শিবের পূজারী ছিলেন প্রধানতঃ চক্রবর্ত্তী পদবীধারী ৰৌদ্ধ ব্রাহ্মণেরা৷ পরবর্তীকালে এই বুড়ো শিবের ৰৌদ্ধ রঙ পাল্টে পৌরাণিক শিবে রূপান্তরণ করা হয়৷

উত্তর কলকাতায় লোকের চাপ বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ–পূর্ব দিকে জঙ্গল কেটে নতুন গ্রামের পত্তন করলেন ওই অঞ্চলের নামকরা মানুষ ভবানীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় (এ ব্যাপারে কিছুটা মতভেদ আছে)৷ তাঁরই নামে ভবানীপুর অঞ্চলটা গড়ে ওঠে৷ সেকালের ভবানীপুরের সেই সুপ্রাচীন পদ্মপুকুরটি দীর্ঘকালের ইতিহাস বহন করে আসছে৷ কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় শেষের দিকে এই পদ্মপুকুর রোডেই থাকতেন৷ সেই জান তো, তাঁর জামাইকে লেখা নিমন্ত্রণ লিপিটি–

‘‘তপ্ত তপ্ত তপ্সে মাছ, গরম গরম লুচি৷

অজ মাংস, বাঁধা কপি, আলু কুচি কুচি৷৷

শীতের দিনে এসব যদি খাবে থাবা থাবা৷

.......নম্বর পদ্মপুকুরে শীঘ্র এসো ৰাৰা৷৷’’

কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন তাঁর ‘‘বৃত্রসংহার কাব্য’’–র জন্যে৷ কবি হেমচন্দ্রের একটি ভুল আজ ভারতের অধিকাংশ ভাষাতেই সংক্রামিত হয়ে পড়েছে৷ তিনি ‘ছায়া’–র সঙ্গে মেলাতে গিয়ে ‘কায়া’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন৷ সংস্কৃতে ‘কায়া’ বলে কোন শব্দ নেই৷ শব্দটি ‘কায়’ (‘চি’ ধাতুূঘঞ্ প্রত্যয়)৷ আজ ‘কায়া’ শব্দটি ভুল হলেও ব্যাপকভাবে চলছে৷