প্রভাতী
সমর্পণ
বার বার কেন হাত পাতো এসে
কি দেব তোমারে বলনা?
সবই তো তোমার তবু কেন করো
কাঙালপনার ছলনা?
রসে ভরা ফল, সুগন্ধি ফুল
সবুজ শস্যক্ষেত্র,
আকাশ-বাতাস যেদিকে তাকাই
ফেরাতে পারি না নেত্র৷
তোমার আলোয় আলোকিত ওই
চন্দ্র সূর্য গ্রহরা,
সারারাত ধরে কত শত তারা
দেয় যে আলোর মহড়া৷
সাগরের ঢেউ ওঠে আর নাবে
তোমার চরণ ধরতে,
পাহাড়ের চূড়া তোমারেই খোঁজে
চাহে না থাকিতে মর্ত্তে৷
গ্রহে গ্রহে আরো কত দেশ আছে
কি বিচিত্র সৃষ্টি---
তবে কেন আজ হে রাজাধিরাজ,
আমারই প্রতি দৃষ্টি?
দেব আমি আজ দেব এ হৃদয়
একটি মন্ত্রে জপিয়া
‘তব দ্রব্যং’ হে জগৎগুরু,
তোমারই হস্তে সঁপিয়া৷
মদালসা ও গন্ধর্ববিবাহ
‘গন্ধর্ব’ শব্দটি যদি পুংলিঙ্গে ব্যবহূত হয় (গন্ধর্বঃ) তার মানে হয় গন্ধর্ব অর্থাৎ নৃত্যে গীতে বাদ্যে দক্ষ এক প্রকারের দেবযোনি যা’ তেজ, মরুৎ আর ব্যোম এই তিনটি তত্ত্বে তৈরী অর্থাৎ যাতে ক্ষিতি ও অপ্ তত্ত্ব নেই, আর ক্ষিতি ও অপ্ তত্ত্ব না থাকায় সাধারণভাবে তা’ পরিদৃশ্য নয়৷ গন্ধর্ব–প্রেষিত ধ্বনি, রাগাত্মিকা অভিব্যক্তি শ্রুতিগ্রাহ্য, অনুভব্য কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় দৃশ্য নয়৷ মনকে নিজের ক্ষিতি, অপ্ তত্ত্ব থেকে বিচ্যুত করে সম্পূর্ণতঃ ঔর্ধ্বদৈহিক ভাবে নিষিক্ত করতে পারলে তবেই তা’ মানসলোকে দৃশ্য৷
গন্ধর্ব একটি দেবযোনি যা’ কতকটা অপ্সরা পর্যায়ভুক্ত৷
‘‘যথাড়দর্শে তথা ড়ত্মনি যথা স্বপ্ণে তথা পিতৃলোকে৷
যথাড়প্সু পরীবদদৃশে তথাগন্ধর্বলোকে ছায়াতপয়োরিব ব্রহ্মলোকে৷৷’’
আজকাল যাকে মাইক্রোবাইটাম বলা হচ্ছে গন্ধর্ব সেই রকম এক ধরণের পজিটিব মাইক্রোবাইটাম যা’ জীবের শরীরকে মনকে স্নিগ্ধ করে ঊর্ধ্বতর তথা উন্নততর ভাবে অভিষিক্ত করে ক্ষুদ্রত্বের নিগড় ভেঙ্গেচুরে খান খান করে দেয়৷ সপ্ত দেবযোনি সাতটি বিভিন্ন ধরণের পজিটিব মাইক্রোবাইটাম যার সঙ্গে আমাদের অহরহঃ কারবার চলছে কিন্তু যাদের কাছে পেয়েও কাছে পাচ্ছি না অথচ অনুভব করছি সে বা তাঁরা আশেপাশে ইতস্ততঃ উঁকিঝুঁকি মারছে৷
হ্যাঁ, পুংলিঙ্গে ব্যবহূত হলে ‘গান্ধর্ব’ শব্দের অর্থ হ’ল তথাকথিত অশরীরী সঙ্গীত জগতের বাসিন্দা....এক ধরণের মাইক্রোবাইটাম যার গতায়াত স্থূল ও সূক্ষ্ম জগতে রয়েছে, কারণ – জগৎকেও সে ছঁুই–ছুঁই করছে৷ছজজছঝছছঞঁই করছে৷
‘‘নগর বাহিরি রে ডোম্বী তোহরি কুড়িয়া
ছোই ছোই জাওসি ব্রাহ্মণ নড়িয়া৷’
‘গান্ধর্ব’ শব্দটি যদি ক্লীবলিঙ্গে হয় (অর্থাৎ যদি গান্ধর্বং/গান্ধর্বে/গান্ধর্বাণি বলা হয়) তার মানে গন্ধর্ব সংক্রান্ত সব কিছু৷ তাদের আচার–ব্যবহার, ভাব–ভাষা, আঙ্গিক, অভিব্যক্তি–মুদ্রা–বাচ, বিবাহ, সামাজিক অবস্থা, বস্ত্র–পরিধানরীতি, উড্ডয়নরীতি–সব কিছুর সমাহার নিয়েই এই ক্লীবলিঙ্গাত্মক ‘গান্ধর্বং’ শব্দ ব্যবহূত হয়৷
গান্ধর্ব বিবাহ একটি হিন্দুশাস্ত্রসম্মত বিবাহ৷ মনু এই বিবাহকে স্বীকৃতি দিয়েছেন, ভারতের ন্যয়াধিকারও এই বিবাহকে স্বীকৃতি দিয়েছে৷ গান্ধর্ব বিবাহে বর–বধুর সম্মতি থাকলেই হ’ল৷ কেবল মালা বিনিময়েই বিবাহ নিষ্পন্ন হয়৷ সাত পাক, সিঁদুর, সামাজিকতা, কন্যাদান, অগ্ণিসাক্ষী কোন কিছুই এতে নেই৷ কেবল একটি স্থায়ী সত্তার সামনে এই মালা বিনিময় অনুষ্ঠিত হয়৷ এই স্থায়ী সত্তা বলতে প্রাচীনকাল থেকে সূর্য, চন্দ্র, তাঁবাঁ, তুলসী, মহাভারত ও গঙ্গোদককে বুঝিয়ে আসছে৷ মূল মহাভারত যে রামায়ণের চেয়ে প্রাচীনতর এ থেকে তারও খানিকটা ঝিলিক মেলে৷ ভারতে বসবাসকারী আর্য বা আর্যেতর প্রাচীন দ্রাবিড়েরা বা বাঙলার আদি অষ্ট্রিকেরা কেউই এ ব্যাপারে রামায়ণকে স্বীকৃতি দেননি৷ বরং পরবর্ত্তীকালে কেউ কেউ গীতা বা শ্রীশ্রীচণ্ডীকে (দুর্গাসপ্তসতী) সাক্ষীরূপে মেনে নিয়েছিলেন৷ যাই হোক, গান্ধর্ব বিবাহ কী তা’ বুঝে গেলে৷
আনন্দমার্গ বিবাহ তাই হিন্দুশাস্ত্রসম্মত গান্ধর্ব বিবাহ যাতে সাক্ষী থাকেন উভয় পক্ষের মাননীয় প্রতিভূরা৷ তাঁরাও মন্ত্র পাঠ করে নিজেদের সাক্ষিত্বকে স্পুষ্টীকৃত করে থাকেন৷
প্রাচীন ভারতে ও মধ্যযুগীয় ভারতে গন্ধর্বদের নিয়ে অনেক গল্প রচিত হয়েছিল৷ মানবে গন্ধর্বে বিবাহাদির গল্প কিছু কিছু রয়েছে৷ মানবে গন্ধর্বে মিলিত ভাবে পূজানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, গীতানুষ্ঠানেরও উল্লেখ রয়েছে৷ কাশীর রাজা নামে পরিচিত চিত্রসেন ছিলেন গন্ধর্ব৷ তাঁর স্ত্রী মদালসা গন্ধর্বী ছিলেন কিনা তার জোরালো প্রমাণ নেই৷ মদালসার সন্তান বিক্রান্ত ও অলর্ক গন্ধর্ব ছিলেন না৷ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাসে দন্তকথায় চারণগাথায় মিলেমিশে এক হয়ে গেছে৷ যাঁর কথা বললুম এই সেই মদালসার পুত্রের নাম ছিল অলর্ক (ক্ষ্যাপা কুকুর)৷ চিত্রসেনের সঙ্গে মত বিরোধ হওয়ায় যিনি দেহত্যাগ করেন ও যাবার সময় চিত্রসেনের হাতে অঙ্গুরীগ্রথিত বাণীতে লিখে গেছলেন, ‘‘জগতে কোন কিছুই কামনা করিবে না৷ যদি কোন কামনা করিতেই হয় তবে মুক্তি কামনা করিও৷ জগতে কোন কিছুর প্রতি আসক্তি রাখিবে না৷ যদি কোন আসক্তি রাখিতেই হয় তবে পরানুরক্তি রাখিও’’৷ এই সেই মদালসা যিঁনি নিজপুত্র শিশু অলর্ককে ঘুম পাড়াতে গিয়ে যে ঘুমপাড়ানী গান গেয়েছিলেন সে গান বৈরাগ্যের গান, সে গান বন্ধন ছেঁড়ার গান–
‘‘শুদ্ধোড়সি বুদ্ধোড়সি নিরঞ্জনোড়সি সংসারমায়া পরিবর্জিতোড়সি৷
সংসারস্বপ্ণং ত্যজ মোহনিদ্রাং মদালসোল্লাপমুবাচ পুত্রম্৷’’
এই সেই অলর্ক যিনি একাকলে মহর্ষি অষ্টাবক্রের কাছে রাজাধিরাজযোগে শিক্ষা নিয়েছিলেন৷ (‘‘গান্ধর্ব ‘শব্দ–চয়নিকা’ ২২শ পর্ব)
নাম নিতে নাই
ভূতকে ভয় পেয়ে সন্ধের পরে কেউ কেউ বলেন–উনি......তিনি.......তাঁরা হাওয়ায় ভর দিয়ে চলেন–সেই যে নাম নিতে নেই......দেখে এখনই গা ছমছম করছে......ওই শ্যাওড়া গাছটির দিকে একদম তাকিও না৷
যাঁরা এমন বলেন তাঁরা ভূত–প্রেতকে উপদেবতা বলেন৷ দেখনি, সাপের ভয়েতে রাত্রিতে লোকে সাপকে ‘লতা’ বলে৷ দিনের আলোয় সাপকে সহজেই দেখা যায়৷ তাই কিছুটা সতর্ক থাকাও যায়৷ রাতে ভাল করে দেখা যায় না তো, তাই রাতে ভূতের ভয়ের মত সাপের ভয়ও ক্ষেশী৷ তাই দিনের বেলায় যাঁরা ভূতকে ভূত বলেন, রাত্রে তাঁরা বলেন, উনি......তিনি......ইত্যাদি৷ আবার রাত্রে তাঁরা সাপকে বলেন ‘লতা’৷ বসন্ত হলে বলেন, ‘মায়ের দয়া হয়েছে’৷
সেটা ১৯৪০ সাল৷ কলকাতায় সেবার দারুণ বেরিবেরি রোগের প্রাদুর্ভাব৷ কলকাতার আশেপাশের শহরগুলিতেও সেই অবস্থা৷ ওলাওঠার১ (১কলেরা) দেবী ওলাইচণ্ডীর মত বেরিবেরির তখন কোনো নিজস্ব দেবী ছিল না (এখন হয়েছে কিনা জানি না)৷ পাছে বেরিবেরি নামটা মুখে আনলে বেরিবেরি পায়ে চেপে বসে সেই ভয়ে কিছু কিছু মহিলা ওই নামটাই নেওয়া ক্ষন্ধ করে দিলেন৷
মনে আছে, ছোটবেলায় আমাদের মুঙ্গের জেলায় একবার দারুণ প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল৷ লোকে তখন আর প্লেগকে২ (২অঙ্গিকা ভাষায় গিল্টি/গিট্টি) প্লেগ বলত না৷ সবাই বলত ‘বহ্হী ক্ষীমারী’৷ তারপর দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করত৷
আমাদের পাড়ার গাঙ্গুলী মশায় বেরিবেরির নাম শুণে থর থর করে কাঁপতেন৷ বাড়ীতে মাত্র দু’টি প্রাণী–গাঙ্গুলী মশায় আর গাঙ্গুলী–গিন্নী৷ তাঁরা ঠিক করলেন, আগেভাগেই ডাক্তার ডেকে এনে বাড়ীতে বেরিবেরি ঢোকা ক্ষন্ধ করে দেওয়া হোক৷
ডাক্তারবাবু এসে গাঙ্গুলী মশায়ের ঘরে ঢুকলেন৷ পাশের ঘরে আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলেন গাঙ্গুলী–গিন্নী৷ পর্দার আড়াল থেকে গাঙ্গুলী–গিন্নী জোর গলায় বললেন–কত্তা, আগে ডাক্তারকে শুধোও ওই রোগের কী কী লক্ষণ৷
ডাক্তার জোর গলায় গাঙ্গুলী মশায়কে বললেন–গাঙ্গুলী মশায়, আপনার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করুন, ওই রোগ মানে কোন রোগ?
গাঙ্গুলী মশায় ডাক্তারকে বললেন–ওই রোগ মানে ৰেরিৰেরি৷
পর্দার আড়াল থেকে গাঙ্গুলী–গিন্নী মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন–কত্তা, তোমার কি ভিমরতি হয়েছে? তোমাকে সাত শ’ বার বলেছি ও নাম নিও না, একটু উল্টো করে বলো রেক্ষিরেক্ষি৷
ডাক্তারবাবু বললেন–বুঝেছি, বুঝেছি৷ ওই রোগ হলে পা ফোলে, হজম শক্তি চলে যায়, শরীর দুর্বল হয়ে যায়, চোখ খারাপ হয়ে যায়৷ এইগুলিই প্রধান লক্ষণ৷
পর্দার আড়ালে থেকে গাঙ্গুলী–গিন্নী জিজ্ঞেস করলেন–কত্তা, তুমি যে সব সময় তামাক খাচ্ছো, ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করো তামাকে ভিটামিন আছে কিনা৷ তামাক খেলে রোগ বাড়ে না তো?
ডাক্তার একটু উঁচু গলায় বললেন–গাঙ্গুলী মশায়, আপনার স্ত্রীকে বলুন ঠিকভাবে টানতে পারলে তামাকে ভিটামিন পাওয়া যায়৷ অন্যথায় পাওয়া যায় না৷
গাঙ্গুলী মশায় বললেন–ঠিকই তো ঠিকই তো, কী যেন একটা শাস্ত্রের কোথাও আছে–
‘‘তাম্রকূটং মহদদ্রব্যং শ্রদ্ধয়া দীয়তে যদি৷
অশ্বমেধসমপুণ্যং টানে টানে ভবিষ্যতি৷’’
অর্থাৎ তামাক হ’ল একটি উন্নত মানের বস্তু৷ কেউ যদি কাউকে শ্রদ্ধার সঙ্গে তামাক অফার করে তাহলে গ্রহীতা যত বার টান দেবেন দাতা তত বার অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল পেতে থাকবেন৷
পর্দার আড়াল থেকে গাঙ্গুলী–গিন্নী বললেন–কত্তা, ডাক্তারকে শুধোও, তামাকের মত আর কোন্ কোন্ জিনিসে ভিটামিন আছে৷ কাল থেকে তোমাকে সেই সব জিনিস খাওয়াব৷
ডাক্তার বললেন–টম্যাটোতে ভিটামিন আছে, পালং শাকে তো আছেই৷ তাছাড়া পালং শাক হার্টের রোগের ওষুধ রূপেও দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত৷
‘‘পালঙ্ক্যা মধুরা স্বাদুঃ শ্লেষ্মলা হিতকারিণী৷
বিষ্টাম্ভিনী মদশ্বাসপিত্তরক্তব্৷৷’’
ডাক্তার বললেন–তাছাড়া আপনি হাফ–বয়েল্ড ডিমও খাবেন৷ পর্দার আড়াল থেকে গাঙ্গুলী–গিন্নী রণরঙ্গিণী মূর্ত্তিতে চীৎকার করে শুধোলেন–কত্তা, পোড়ারমুখোকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করো৷ তুমি বামুনের ছেলে বয়েল৩ (৩হিন্দীতে বৈল’ (বাংলা উচ্চারণ ‘বয়েল’) মানে বলদ৷) খাবে কী গো৷ সব গেল....গেল৷ এক্ষুণি ডাক্তারকে বিদায় করে দাও৷ আমি ওর পেছনে পেছনে গোবর জলের ছড়া দিতে দিতে যাব৷
সেদিন সন্ধ্যায় পাড়ার ছেলেরা বেরিবেরির হাত থেকে পাড়াকে বাঁচানোর জন্যে রক্ষেকালী পুজোর ব্যবস্থা করেছে৷ পুজোর সঙ্গে নানান ভ্যারাইটি ফাংশান অ্যাণ্ড পারফরম্যান্সের ব্যবস্থা আছে৷ ঠোঁটে সিঁদুরমাখা গায়কীরা এসেছেন৷ গায়কেরা তেমন পাত্তা পাননি৷ নানান সিন–সিনারি দিয়ে শ্মশানের দৃশ্য এঁকে প্যাণ্ডেল সাজানো হয়েছে৷ রক্ষেকালীর পুজো তো শ্মশানের দৃশ্যগুলো ঠিকভাবে না ফোটাতে পারলে বিউটিটাই নষ্ট হয়ে যাবে৷ বেরিবেরির ভয়ে পাড়ার অনেকেই সেখানে জড়ো হয়েছেন–এসেছেন গাঙ্গুলী মশায়ও৷ সবাইকার মুখে এক কথা৷ এবার থেকে ঢেঁকি–ছাঁটা চাল খেতে হবে৷ ময়দার বদলে চোখল–মিশ্রিত আটা খেতে হবে৷ রোগটা নাকি ঢোকে কলে তৈরী সর্ষে তেলের ভেতর দিয়ে৷ তাই ঘানির তেলই খেতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি৷
গাঙ্গুলী মশায়ের খাবার সময় হয়ে গেছে৷ তাই তিনি বাড়ী ফিরবেন৷ হঠাৎ পায়ে চটিটা গলাবার সময় আর্ত্তস্বরে রে–বি রে বি.... রে–বি রে–বি চীৎকার করে গাঙ্গুলী মশায় অজ্ঞান হয়ে গেলেন৷ খানিকক্ষণ সেবা–শুশ্রুষা করার পর সবাই জিজ্ঞেস করলে–কী হয়েছে গাঙ্গুলী মশায়, অত ভয় পেলেন কেন?
গাঙ্গুলী মশায় বললেন–আমার রেবিরেবি হয়েছে৷
পাড়ার ছেলেরা শুধোলে–আপনার বেরিবেরি হয়েছে কী করে বুঝলেন দাদু, আপনার বেরিবেরি হয়েছে৷
গাঙ্গুলী মশায় বললেন–আসার সময় চটিতে ভালভাবেই পা গলে ছিল, এখন আর চটিতে পা গলানো যাচ্ছে না৷ তার মানেই রেবিরেবিতে পা ফুলে গেছে৷
পাড়ার একটা ফুটবল–পাগল ছেলে এসে বললে–দাদু, ফুটবল খেলুন, বেরিবেরি পায়ের ত্রিসীমানায় ঘেঁষবে না৷
ভীত–সন্ত্রস্ত–বিরক্ গাঙ্গুলী মশায় বললেন–ফুটবল খেলব ও জগতে গিয়ে৷
আরেকটা ছেলে এসে বললে–দেখি দেখি, কোন্ চটিতে আপনার পাটা গলছে না৷
এক মিনিট নিস্তব্ধ৷ এ যেন শ্মশানের স্তব্ধতা৷ তারপর ছেলেটি বললে–গাঙ্গুলী মশায়, আপনার ঠিকেয় ভুল হয়েছে৷ আপনি ভুল করে ঘোষাল মশায়ের চটিতে পা গলিয়েছিলেন৷
তা যাই হোক্, বেরিবেরিকে যেমন গাঙ্গুলী মশায় ভয়ে ভক্তিতে ‘রেবিরেবি’ বলতেন ভূতকে অনেকে ভয়ে ভক্তিতে ‘উপদেবতা’ বলে থাকে৷
নেশা ছাড়াতে ভাই যোগ সাধনা চাই
সবই নেশা সর্বনাশা
নেশাকে রদ করো
নেশা ছেড়ে তেড়ে–ফুড়ে
যোগের নেশা ধরো৷
সবই নেশা রোগের বাসা
হাটার নেশায় হাটো,
দেখবে তখন রোগকে কেমন
সে করে দেয় খাটো৷
সব নেশারই একই পেশা
দেহে সে বিষ ঢালে
যোগসাধনায় মন দৃৃতায়
নেশারে মেরে ফেলে৷
সব নেশাই মরণ পাশা
খেলাতে সদাই সঙ্গ চায়,
সৎ সংঘ নেশা ভঙ্গ
করতে যোগের শিক্ষা দেয়৷
বৃষ্টি বৃষ্টি
ঝম্ঝম্ ঝমাঝম্
লাগাতার বৃষ্টি
সারাদিন সারারাত
একী অনাসৃষ্টি৷
মা রেগে গজ্গজ্
বাবা রেগে কাঁই–
‘কতদিন দেবো আর
অফিস কামাই৷’
ভরে গেছে নর্দমা
ভরে গেছে ঝিল
ভরে গেছে নদীনালা
যতো খাল বিল৷
ময়ূর ময়ূরী খুশি
শোনা যায় কেকা–
ডাহুক ডাহুকি খুশি
খুশি খুকু খোকা৷
হাফ–ছুটি ফুল–ছুটি
প্রায় প্রতিদিন
খুকু নাচে খোকা নাচে
ধিন্তা ধিধিন৷
সারারাত ধরে চলে ব্যাঙেদের গান
দাদু জেগে বসে থাকে
চেপে ধরে কান৷
দুপুরে ঘুমোয় দাদু
বাজে তার নাক
আমলকি ডালে বসে
ভেজে বুড়ো কাক
মোসাহেৰ
কথায় বলা হয়, খোসামদে পাহাড়ও গলে মাখন হয়ে যায়৷ খোসামদে দুর্বাসা মুনিও গলে যান৷ সেই খোসামদের জন্যে ‘কাণ্ড’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়৷ ‘খোসামদ’ শব্দটি এসেছে ফার্সী ‘খুসামদ’ থেকে৷ অনেকে ‘খুসামদ’–কে মার্জিত রূপ দেবার জন্যে ‘তোষামোদ’ ৰলে থাকেন৷ না, ‘তোষামোদ’ ৰলে কোনো শব্দ নেই৷ শাস্ত্রে ৰলেছে, খোসামদকারী প্রতি মুহূর্তেই প্রতি পদবিক্ষেপেই অধোগতি হয়, কারণ সে প্রতি মুহূর্তে, প্রতি পদবিক্ষেপে কেবল স্বার্থচেতনায় অস্বাভাবিক কাজ করে থাকে৷ আগেকার দিনে রাজাদের বা অবস্থাপন্ন লোকেদের বেতনভুক খোসামদকারী থাকত৷ তাদের ৰলা হত মোসাহেৰ–যারা সৰ সময় নিজেদের কর্ত্তাকে ‘সাহেৰ’, ‘সাহেৰ’ ৰলে তুষ্ট রাখবার চেষ্টা করে৷ আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী ওই ‘সাহিৰ’ শব্দটির আদিতে ‘মু’ সংযুক্ত করে তাদের ৰলা হয় মুসাহিৰ বা মোসাহেৰ৷ এইভাবে বিভিন্ন গুণের সঙ্গে ব্যষ্টির সংযোগ সাধন করে ক্রিয়া বা বিশেষ্যের আদিতে ‘মু’ যোগ করে আরক্ষীতে বিভিন্ন শব্দ সৃষ্ট হয়ে থাকে৷ যেমন মুয়াল্লিন, মুয়াজ্জিন (যিনি আজান দেন), মুজাহিদ (যিনি জেহাদ বা ক্রুসেডে অংশগ্রহণ করেন), মুহাজির (যিনি অন্য দেশ থেকে এসে হাজির হয়েছেন অর্থাৎ রেফিউজী), মুসাফির (যিনি সফর বা ভ্রমণ করে চলেছেন) প্রভৃতি৷ সেই যে মোসাহেক্ষের একটা গল্প আছে না
রাজামশায়ের একজন মোসাহেৰ চাই৷ তিনি খৰরের কাগজে যথাক্ষিধি কর্মখালির বিজ্ঞাপন দিলেন৷ জানিয়েও দিলেন, ‘‘আবেদনকারীকে দরখাস্তের সঙ্গে ৫০০ টাকার ক্রশ চেক দিতে হবে যা প্রত্যর্পণযোগ্য নহে৷ হাজারে হাজারে দরখাস্ত এল৷ লিখিত পরীক্ষার পর মৌখিক পরীক্ষা চলছে৷ রাজামশায় বসে রয়েছেন৷ তাঁর সিংহাসনের বাঁ হাতলটা ধরে ঘাড় বেঁকিয়ে মন্ত্রীমশায় একটু কেতরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন৷ এক একজন কর্মপ্রার্থী আসছেন ইন্টারভিউ (সংজ্ঞ–প্রতীতি) দিতে৷
রাজামশায় প্রথম জনকে জিজ্ঞেস করলেন–‘‘তুমি কি মোসাহেবের কাজ পারবে?’’
সে ৰললে–‘‘নিশ্চয় পারব, জাঁহাপনা৷’’
রাজামশায় তার নাম খারিজ করে দিলেন৷ দ্বিতীয় কর্মপ্রার্থী এলেন–একজন চালাক–চতুর যুবক.......চোখে মুখে খই ফুটছে৷
রাজামশায় তাকে ৰললেন–‘‘মোসাহেবের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরু দায়িত্ব তুমি কি এ কাজ পারবে?’’
কর্মপ্রার্থী ৰললে–‘‘একবার চান্স দিয়ে দেখুন শাহানশাহ্, আমি নিশ্চয় পারৰ৷’’ রাজা তাকেও না–পসীন্দ*(*শব্দটা ফার্সী৷ তাই ‘না–পছন্দ’ না ৰলে ‘না–পসীন্দ’ ৰলাই বেশী ভাল৷ তবে এর ক্ষাংলা রূপ হিসেবে ‘না–পছন্দ’ও চলতে পারে’৷) করলেন৷ ৰলা বাহুল্য, এরও চাকরী হ’ল না৷
পরের কর্মপ্রার্থীটি খুৰই শিক্ষিত কিন্তু ইন্টারভিউ কেমন হবে তাই ভেবে সে পৌষের শীতেও ঘেমে গেছল........রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে সে রাজার সামনে এসে দাঁড়াল৷
রাজামশায় তাকে শুধোলেন–‘‘মোসাহেবের এই মহান কর্ত্তব্যে তুমি কি সমর্থ?’’
উৎসাহের অগ্ণিতে প্রদীপ্ত হয়ে কর্মপ্রার্থীটি ৰললে–‘‘নিশ্চয়ই পারৰ৷ একশ’ বার পারৰ, স্যার......কথা দিচ্ছি স্যার....কেবল একবার একটা চান্স দিন স্যার....ন্দব্ভব্দব্ধ ন্তুড়্ত্রুন্তুন্দ্ব হ্মপ্তন্দ্ব্ত্রব্দন্দ্ব৷’’
রাজামশায় তাকেও বাতিল করে দিলেন৷ এবার যে ছেলেটি এল তার চোখে–মুখে বুদ্ধির ঝলক ছিল কিন্তু প্রজ্ঞার গভীরতা ছিল না৷
রাজামশায় তাকে শুধোলেন–‘‘খোসামদের কাজটা তুমি কি পারবে?’’
সে বললে–‘‘সত্যিই রাজাসাহেৰ, খোসামদের কাজটা আমি কি পারৰ’’
রাজামশায় ৰললেন–‘‘হ্যাঁ, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারো৷’’
সে ৰললে–‘‘হঁ্যাঁ, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি৷’’
রাজামশায় আড়চোখে মন্ত্রীর দিকে চাইলেন৷ মন্ত্রী ৰললেন–‘‘মহারাজ, ইনিই সর্ক্ষগুণান্বিত, এঁকেই ৰহাল করুন৷ আজকের দিনে ইনিই বিশ্বমানবতার প্রতিভূ......জয়মাল্য পাবার ইনিই অধিকারী৷’’
রাজামশায় প্রার্থীকে ৰললেন–‘‘বুঝলে হে, আজ থেকে তোমার চাকরী হ’ল৷’’
তাহলে ক্ষুঝলে ‘কাণ্ড’ ৰলতে এই খোসামদকে ক্ষোঝায়৷ সংসৃক্তে কিন্তু মোসাহেৰকে ৰলা হয় ‘বিদূষক’৷ ‘মোসাহেৰ’ অর্থে সীমিত ক্ষেত্রে সংসৃক্তে ‘ভাণ্ড’ শব্দটিও চলত যার থেকে ক্ষাংলার ‘ভাঁড়’ শব্দটি এসেছে (যেমন–গোপাল ভাঁড়)৷ তবে ‘ভাঁড়’ ৰলতে ক্লাউনকেও ক্ষোঝায়৷ ‘‘আর ‘ভাঁড়ামি’ করতে হবে না’’–এমন কথা যখন আমরা বলে থাকি তখন কিন্তু সেটা ‘ভাণ্ড’ বা ‘ভাঁড়’ থেকে আসছে না, আসছে ‘ভণ্ড’ থেকে অর্থাৎ ভণ্ডামি অর্থে ‘ভাঁড়ামি’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷
এক ঝাঁক পায়রা
যা যা উড়ে যা রে পাখী....
এক ঝাঁক পায়রা.... ল্যাক প্যাক ল্যাক প্যাক
ডানা মেলে উড়ে যা রে পাখী৷
আকাশের তারাগুলি
জোনাকি পোকার মত
ঝিক্মিক্ ঝিক্মিক্ আলো দিয়ে
যায় পৃথিবীকে---
এই পৃথিবীর পশুপাখী লতাগুল্মকে৷
আর কেউ তো ভালবাসিতে জানে না
ভালবাসিলে হৃদয় দিয়ে হৃদয় পাওয়া যায়৷
যা যা রে উড়ে যা রে পাখী...৷
প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্ণেন সেবয়া
ভবেশ কুমার বসাক
হে প্রভু,
তব বাণী প্রণিপাতেন---
কভু ভুলি না যেন,
তব চরণারবিন্দে রব আনন্দে
রেখো না আর কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্বে৷
আমার এ ক্ষুদ্র জীবন
তব চরণকমলে করি আত্মসমর্পণ৷
হে পরমপিতা
তোমার পাথেয় নিয়ে
তোমার গড়া তরী বেয়ে
লক্ষ্য পানে যেন থাকি হয়ে নিঃসংশয়,
আনবো, আনবোই জয় নিশ্চয়৷
কবে, কখন, কিরূপে, কোথায়?
এ প্রশ্ণ যেন মনে না রয়
সদা কর্মে অবিচল থাকি যেন
মেনে তব বাণী পরিপ্রশ্ণেন৷
হে পরমেশ্বর,
তব কথা মনে যেন চিরন্তন রয়
এ ধরায় কোনও কিছু কারো পর নয়,
সকলি আপন ভেবে সেবা দিতে চাই
জীবন সার্থক করার অন্য পথ নাই৷
এ জীবন সার্থক তব বাণী পাওয়া,
প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্ণেন সেবয়া৷৷