প্রভাতী

গ্রহের বক্রীদশা ও জ্যোতিষী

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

কৌণিক তারতম্যবশতঃ নিজের ক্রান্তিকক্ষে বা ক্রান্তিপথে চলতে চলতে সকল জ্যোতিষ্কই সাময়িকভাবে তার গতি, দ্রুতি ও নির্দিষ্ট পথ কিছুটা পরিবর্তিত করে নেয়৷ জ্যোতিষ্কের ক্ষেত্রে এই অবস্থাকে বক্রীদশা বলা হয়৷ জ্যোতিরঙ্কশাস্ত্রে আর কিছুটা এগোলেই আমরা বিশ্বের শুধু জ্যোতিষ্কেরই নয়, সমস্ত জড় (inanimate objects) ও চেতনসত্তারও (animate objects) চলার পথের বৈশিষ্ট্যগুলি অঙ্কের কাঠামোর মধ্যে এনে ফেলতে পারব৷ এই বক্রীদশার বৈশিষ্ট্য, ও ধরণধারণ ও এর গাণিতিক ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ক্রান্তিজ্যা’৷ কেউ কেউ ভাবেন যে পথে চললে জ্যোতিষ্ক্ রাহুগ্রস্ত হয়ে যায় তাকে বলা হয় ক্রান্তিজ্যা৷ না, তা নয়, ওতে অর্থের অনর্থ করা হয়৷

গ্রহের বক্রীদশা চলার পথে এক স্বাভাবিক পরিণতি৷ পারস্পরিক বহিরঙ্গিক ও আভ্যন্তরীণ বিবর্ত্তনের ফলে এটা হয়ে থাকে৷ জ্যোতির্গাণিতিক গণনায় মানুষ আরও একটু এগিয়ে গেলে সমস্ত গ্রহের গতির ধরনধারণ আয়ত্তে এনে ফেলবে৷ এর কিছুটা আবিষ্কার–সাপেক্ষ, কিছুটা উদ্ভাবন–সাপেক্ষ৷ এই বক্রীদশা জ্যোতির্বিজ্ঞানের কতকটা মূলনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত তো বটেই, এতে জ্যোতিষশাস্ত্রের (Astrology) ফলাফলেরও হেরফের ঘটিয়ে দেয়৷ তাই স্বাভাবিকী জ্যোতিষিক গণনার যা ফলশ্রুতি বক্রীদশায় তা ওলটপালট হবার সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে থেকে যায়৷ তাই একে একেবারে উপেক্ষা করা চলে না৷ চিকিৎসাবিজ্ঞান, বিশেষ করে ঔষধ–নির্বাচনের মত জ্যোতিষ বিজ্ঞানও একটি পরীক্ষামূলক শাস্ত্র (Experimental science)৷ তাই বক্রীদশার ব্যাপারে যথেষ্ট পরীক্ষা না করে ফলাফল সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া বা নির্ণয় করা সঙ্গত নয়৷ এসম্বন্ধে একটি পুরনো গল্প মনে পড়ল৷

তিনি ছিলেন একজন নামজাদা জ্যোতিষী–বর্দ্ধমান জেলার পূর্বস্থলীর কাছাকাছি কোন গ্রামে৷ নির্ভুল গণনার জন্যে তাঁর খ্যাতি ছিল৷ তবে জাগতিক ব্যাপারে বেশী পণ্ডিতের যা হয়ে থাকে তাঁরও তেমনটি হয়েছিল৷ ঘরসংসারের কোনকিছুই ঠিক বুঝতেন না৷ একবার নাকি হাটতলায় কোন একজন উদ্ভিদ বিক্রেতা তাঁকে কাঁচাগোল্লার গাছ বেচে মোটা টাকা হাতড়ে নিয়েছিল৷ সরলবিশ্বাসী ওই জ্যোতিষী ঠাকুর অর্থাৎ আমাদের বুধরাজ শর্মা মেনেই নিয়েছিলেন যে কাঁচাগোল্লার গাছ হয়৷

পৃথিবীর সব দেশেই বেশী পণ্ডিতদের ক্ষেত্রে এমনটি হয়ে থাকে, কারণ তাঁরা তাঁদের সংশ্লিষ্ট বিদ্যা নিয়ে এতই মেতে থাকেন বা ব্যস্ত থাকেন যে পৃথিবীর অনেক বাস্তব ব্যাপারকে তাঁরা অবহেলা করতে থাকেন ও শেষ পর্যন্ত ওই সকল বিষয়ে তাঁদের বাস্তব জ্ঞান বা ফলিত জ্ঞান নষ্ট হয়ে যায়৷ একবার তাঁর স্ত্রী রান্নার জল আনবার জন্যে ঘাটে গেছলেন৷ যাবার সময় বলে গেছলেন–নাতি (দৌহিত্র) ঘুমোচ্ছে, একটু নজর রেখো৷ সে জেগে উঠলে দোলনাটা একটু দুলিয়ে দিও৷ বুধরাজ শর্মা শুধিয়েছিলেন–আন্দাজ কতক্ষণ দোলাতে হবে? গিন্নী বলেছিলেন–পাঁচ–সাত মিনিট দোলালেই খোকা আবার ঘুমিয়ে পড়বে৷

শর্মা মহাশয় বললেন–‘‘বুঝেছি৷ তুমি নিশ্চিন্ত মনে ঘাটে যাও৷’’

শর্মা মহাশয় তখন এই দৌহিত্রের জন্মকুণ্ডলিনী বিচার করতে বসলেন৷ দেখলেন শিশু দীর্ঘজীবী হবে বিদ্বান–বুদ্ধিমান হবে, আঘাত বা আঘাতজনিত রক্তক্ষরণ বড় একটা হবে না, মৃত্যুও বিষক্রিয়ায় হবে না৷ তিনি প্রথমে ভাবলেন–শিশুর যখন কোন বিপদের সম্ভাবনা নেই তখন ওদিকে নজর দিয়ে কী করব৷ বরং আমি নিশ্চিন্ত মনে জ্যোতিষচর্চা করি৷ শর্মা মহাশয় ভাবলেন–গৃহিণী ডিউটি দিয়ে গেছে, ডিউটি যদি ঠিকমত না করি তবে ঘাট থেকে এসে গিন্নী মুখঝামটা দেবে৷ সেটা গৌরবের কথা হবে না৷ তাই আমি এক কাজ করি৷ একবার যাই নিজের কর্ত্তব্যটা আগে আগেই সেরে রাখি৷ পাঁচ–সাত মিনিটের জন্যে দোলনা দোলানো তো৷ আমি মিনিট দশেক দোলনা দুলিয়ে কাজটা আগেই সেরে রাখি৷ যদিও শিশুর ঘুম ভাঙেনি, সে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোচ্ছিল, তবু শর্মা মহাশয় ঘড়ি ধরে দশ মিনিট দোলনা দুলিয়ে দিলেন৷ অতিরিক্ত জোরে জোরে দোলনা দোলানোর ফলে শিশুর ঘুম ভেঙ্গে গেল৷

এবার শর্মা মহাশয়ের মনে আবার প্রথম কর্ত্তব্যটা জেগে উঠল৷ শিশুর ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল৷ আর তাই আমি নজর দি’ বা না দি’ তাতে শিশুর কী ক্ষতি?

শিশু কেঁদে চলেছে৷ শর্মা মহাশয় জ্যোতিষচর্চা করে চলেছেন৷ তিনি ন্যায়দর্শনে পণ্ডিত ছিলেন৷ ভাবলেন ন্যায়দর্শনের মতে আর জৈমিনিক পূর্বমীমাংসা মতে নিজের কর্ত্তব্য করে যেতে হয়৷ তাতে ফলপ্রাপ্তি হয়৷ কর্মফল নিঃশেষ হয়ে যাবার পরে দেবলোক থেকে মর্ত্ত্যলোকে ফিরে আসতে হয়৷ সুতরাং শিশু তার কর্ম করে যাচ্ছে অর্থাৎ কেঁদে যাচ্ছে৷ আর আমিও আমার কর্ম করে যাচ্ছি অর্থাৎ জ্যোতিষচর্চা করে যাচ্ছি৷ শর্মা মহাশয় একমনে জ্যোতিষচর্চা করে যাচ্ছেন৷ ওপর দিকে একবার তাকিয়ে দেখলেন একটা লাল রঙের দড়ি ঝুলছে৷ দড়িটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল যাতে শিশু ওটা দেখে হর্ষোৎফুল্ল হতে পারে৷ হঠাৎ জ্যোতিষী ঠাকুর দেখলেন শিশুর কান্না থেমে গেছে৷ তিনি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলেন ওই লাল দড়িটি একটি লালরঙের সাপে রূপান্তরিত হয়েছে৷ সাপটি দিয়েছে শিশুকে কামড়ে৷ বিষক্রিয়ায় শিশুর মৃত্যু হয়েছে৷

শর্মা তো অবাক৷ সে ভাবলে জ্যোতিষী মতে শিশুর বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হবে না অথচ তাইই হল৷ এটা কি তবে গ্রহের বক্রীদশার ফলশ্রুতি? নইলে এমন তো হবার নয়৷ তিনি তখন শাস্ত্র ক্ষন্ধ রেখে সাপের দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ সাপ তাঁর বাড়ী ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷ জ্যোতিষী ঠাকুর সাপের পিছু পিছু চলতে লাগলেন৷

সাপ এগিয়ে চলেছে৷ জ্যোতিষী ঠাকুরও চলেছেন তার পেছনে পেছনে৷ কয়েক ক্রোশ যাবার পর জ্যোতিষী ঠাকুর দেখলেন কর্ষক পরিবারের একটি পনর–ষোল বছর বয়সের ছেলের পায়ের পেছন দিক থেকে সাপ দিলে এক কামড়৷ ছেলেটি আর্ত্তনাদ করে মাটিতে পড়ে গেল৷ সাপটি কিছুদূর এগিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল৷ ছেলেটির চীৎকারে নিকটবর্ত্তী মাঠ থেকে অন্যান্য কর্ষকেরা ছুটে এল৷ খানিকবাদে ছুটে এল ছেলেটির পিতামাতাও৷ জ্যোতিষী ঠাকুর শুধোলেন–তোমাদের ছেলের নাম কী?

তারা বললে–ছেলেটির নাম বিষ্ণু দত্ত৷

জ্যোতিষী ঠাকুর শুধোলেন–তার বয়স কত?

তারা বললেন–পনের বছর৷

জ্যোতিষী ঠাকুর গণনায় বসলেন৷ দেখলেন ওই রাশি নামের ওই বয়সের ছেলের বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর কোন সম্ভাবনাই নেই৷ তবে এমন কেন হ’ল৷ তবে কি এটা গ্রহের বক্রীদশার ফলশ্রুতি?

সামনের পথ ধরে দু’পা এগোতেই দেখলেন তাঁরই জন্যে অপেক্ষা করছে সাপটি৷ তাকে কাছে পেয়ে সাপটি আরো এগিয়ে চলল৷ শর্মা মহাশয় তার পেছনে পেছনে চললেন৷ কিছুদূর এগোনোর পরে সামনে এল একটি ছোট নদী (জোড়)৷ সাপটি জলে নেবে গেল৷ সবিস্ময়ে জ্যোতিষী ঠাকুর দেখলেন, নদীর অন্য পাড়ে জলের তলা থেকে উঠে এল একটা প্রকাণ্ড ষণ্ডামার্কা ষাঁড়৷     (ক্রমশঃ)

শ্রাবণ মাসে

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

শ্রাবণ মাসে দূর আকাশে

তোমারই ইচ্ছায়

ঘোর কালো     মেঘের দলও

সূর্যেরে ঢেকে দেয়৷

শ্রাবণ মাসে বর্ষণ আসে

তোমার কৃপাতে

বর্ষার জলে চাষীরা মিলে

চাষ করে আনন্দে৷

শ্রাবণ মাসে তরুর তলে

এসে যখন দাঁড়াবে

বৃষ্টির ধারা তোমার গায়ে

একটুও না পড়বে৷

শ্রাবণ মাসে মায়ের কাছে

দৌড়ে গিয়ে সোজা

মুঠো ভরা  তালের বড়া

খেতে বড় মজা৷৷

 

প্রতিদান

লেখক
শিবাশীষ সেনগুপ্ত

মায়ের কোলে জন্ম নিল  ছোট্ট রাজা সোনা

সে ছিল খুব আদরের   মায়ের চাঁদের কণা৷

রাজা  যখন হাত বাড়িয়ে  হাসতো  কচি মুখে

মায়ের মুখ  উঠতো ভরে  সেই মুখটি দেখে৷

ব্যস্ত  হত বাবা তার   অফিস থেকে ফিরে

সেই রাজা এখন  যুবক হয়েছে বিয়ে দশদিন পরে৷

রাজা এখন বড় চাকুরে   দামী হবু  বর

বিয়ের পরই  ঘর করবে   মা-বাবা হবে পর৷

অন্য কোথাও থাকবে সে  অন্য স্বপ্ণ নিয়ে 

অতীত ভুলবে খুব সহজে   বাবা মাকে  ভুলে৷

যার জন্য মা-বাবার    এত  পরিশ্রম 

তারই জন্য ঠিকানা তাঁদের---বৃদ্ধাশ্রম৷

বন্দী পাখি

লেখক
সাগরিকা বিশ্বাস

বদ্ধ ঘরে বন্দী এক সবুজ তাজা পাখি৷

আটকা পড়ে ওই সে ঘরে করছে ডাকাডাকি৷৷

উড়তো পাখি আকাশ পানে সবুজ পাখা মেলে৷

হারিয়ে যেতো কোন সুদুরে  বাসনা মনে হলে৷৷

প্রাণ খুলে সে গাইত গান বলতো নানান কথা৷

প্রকৃতি মাঝে থেকে পাখি ভুলতো সকল ব্যথা৷৷

যেদিন সে বন্দী হল সোনার খাঁচা ঘরে৷

হারিয়ে গেল স্বাধীনতা হঠাৎ এক পলে৷৷

আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ণ তার হল যে ধোঁয়াশা৷

শেষ হল এক নিমেষে রঙীন যত আশা৷৷

বদ্ধ ঘরে বন্দী পাখী হারাল সব কিছু ৷

বাঁধল জীবন সোনার তারে রইল না আর কিছু৷৷

আমি কেমন সেয়ানা মেয়ে

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রাচীনকাল থেকেই ভাশুর শ্বশুরের তুল্য পূজ্য রূপেই গণ্য হয়ে এসেছে৷ তাই ভাশুরের সম্ক্ষোধনসূচক সাম্মানিক শব্দ হচ্ছে বড় ঠাকুর/বট্ঠাকুর৷ কিন্তু প্রাচীনকালে সামাজিক বিধি ছিল এই যে ভাশুরকে ছোঁয়া চলে না৷ এ সম্পর্কে একটা গল্প আছে৷  ঘটনাটি  ঘটেছিল মানাদে  (মহানাদ)*৷ তাড়াতাড়ি বলছি শোনো৷

বউ–(স্বগত) চোর এসেছে...........বাড়ির চারপাশে সিঁদকাঠি নিয়ে ঘোরাফেরা করছে.......সব বুঝছি, মুখটি খুলছি না............আমি কেমন সেয়ানা মেয়ে.........দেখি কী হয়

..........চোর সিঁধ কাটছে.......... শব্দ শুনছি, চোখটি বুজে  পড়ে আছি, মুখটি খুলছি না.......আমি কেমন সেয়ানা মেয়ে.........দেখি কী হয়

..........সিঁধ কেটে চোর ঘরে ঢুকল........পাশ ফিরে শুলুম......... চোখ খুললুম না........... আমি কেমন সেয়ানা মেয়ে.......দেখি কী হয়

...........চোর জিনিসপত্র সব জড়ো করলে............পুঁটলিতে বাঁধল.......পুঁটলিটা প্রকাণ্ড হল............সিঁধের গর্ত্ত দিয়ে তা গলানো যাবে না............আমি কেমন সেয়ানা মেয়ে...........সব দেখে চলেছি, ‘রা’–টি কাড়ছি না

.........কিন্তু এইবার পুঁটলিটা নিয়ে চোর যাবে কোথায় ........ডানে আস্তাকুড়, বাঁয়ে বট্ঠাকুর, দু’য়ের কাউকেই ছুঁতে নেই, ছুঁলেই চান করতে হয়......  .....চোর, যাবি কোথায়....... ডানে আস্তাকুড়, বাঁয়ে বট্ঠাকুর..........এই বার.......৷

*হুগলী জেলার অন্তর্ভুক্ত মহানাদ স্থানটি বৌদ্ধ যুগে বাঙলার অন্যতম সাংসৃক্তিক কেন্দ্র ছিল৷ স্থানটি অল্প দিনের জন্যে রাঢ়ের রাজধানীও ছিল৷ পরে বন্যার বালিচাপা পড়ে যাওয়ায় রাজধানী পাণ্ডুয়ায় (হুগলী জেলা) স্থানান্তরিত হয়৷ পাঠান যুগের মাঝামাঝি সময়ে পাণ্ডুয়া বিধ্বস্ত হয়৷ পাণ্ডুয়ার মিনারটি (পেঁড়োর পীর) কমবেশী সেই সময়কারই৷

‘না তাকাইঁ’

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

রাঢ়ের মানুষ একদিকে  যেমন দার্শনিক চিন্তা করেছে, অন্যদিকে তেমনি হালকা মেজাজে হাসি–তামাসা–নৃত্য–গী উচ্ছল হয়ে উঠেছে৷ রাঢ়ের মানুষ মজলিশী, মিশুক ও খোসমেজাজী৷ দারিদ্র্যভারে জীর্ণ হলেও সে মানুষকে ডেকে খাওয়ায়–খাওয়ায় তা–ই যা সে নিজে খায়–ভাত, কলাইয়ের ডাল রাঢ়ী বাংলায় ‘বিরি’), বড়ি–পোস্ত আর কুমড়োর তরকারি রাঢ়ী বাংলায় ‘ডিঙ্লা’)৷ তার আচরণে–ব্যবহারে কোনো দারিদ্র্যগত সংকোচ নেই৷ বিনা কষ্টেই সে স্পষ্ট কথা বলে থাকে৷ রাঢ়ের মানুষের সরলতার একটি নিদর্শন ঃ

জনৈক সরলক্ষুদ্ধি অশিক্ষিত রাাী কর্ষককে১ বিচারক নাকি জিজ্ঞাসা করেছিলেন–‘‘হাঁ রে, তু যে বলছিস জমিনটা তুর তা তু বলত্যে পারিস জমিনটাতে ক’টা আল আছে?’’ অশিক্ষিত কর্ষক সে প্রশ্ণের উত্তর দিতে পারলে না৷ সে আকাশ পানে চেয়ে রইল৷ বিচারক শুধোলেন–‘‘কী ভালছিস (দেখছিস) বটেক?’’ কর্ষক তখন শুধোলে–‘‘হাঁ রে সাহেব, তু যে ই ঘরটাতে অনেকদিন ধর্যে ম্যাজিসটারি করছিস তা তু উপরদিকে না তাকাইঁ বল না কেনে ঘরে ক’টা কড়ি–বরগা আছে৷’’ তখন বিচারক শুধোলেন–‘‘তু যে ই কথাগুলান বললি ইটা তুকে কে শিখাইঁ দিইছিল?’’ কর্ষক বললে–‘‘কেউ শিখাইঁ নাই, মু লিজেই বললম, বাকী কথাগুলান উকিলবাবু শিখাইঁ দিইছিল৷ মু ল্যাজ্য কথা বললম, তু ল্যাজ্য বিচার কর্৷’’২

রাঢ়ের মানুষ এমনই সহজ সরল৷ তাই রাঢ়ের গ্রাম্যজীবনে যেমন উৎসবের অন্ত নেই, তেমনি আমোদ–প্রমোদের উপকরণেরও অন্ত নেই৷ সস্তা ও সাধারণ বিলাস–ব্যসন রাঢ়ের মজ্জাগত৷ তবে তাকে কিছুতেই রাঢ়ের সহজ সরল জীবনের পরিপন্থী হতে দেওয়া হয়নি৷

১৷ ‘কৃষক’ শব্দটি বৈয়াকরণিক বিচারে অশুদ্ধ৷

২৷ ঘটনাটি সম্ভবতঃ জামতাড়া আদালতে ঘটেছিল৷

প্রভু, সকলি তোমারই ইচ্ছা

লেখক
রতন কুমার দে

প্রেমময় তুমি হে প্রভু

তোমারই ইচ্ছা কে বুঝিতে পারে

তুমি জানাও যারে

সেই জানে প্রভু

সে তোমারে দেখে

তার মনোরথে৷

সত্ত্ব, তম, রজঃ গুণে

রেখেছো তুমি এ ভুবনে

ত্রিগুণের অতীত যারা

তারা থাকে তোমার সনে

তারা থাকে আনন্দধামে

সকল সৃষ্টি তোমারই প্রভু

আছি তবু মায়ার ঘোরে

যারে তুমি দাও গো ধরা

সে তোমায় দেখে তার মনোরথে৷

আমার স্বপ্ণ

লেখক
কোয়েল ঘোষাল

আমি যদি পাখি হতাম

নীল আকাশে  উড়তে পেতাম৷

আমি যদি বিদ্যুৎ হতাম

অন্ধকারে  আলো দিতাম৷

আমি যদি জল হতাম

তৃষ্ণার্তের তৃষ্ণা মেটাতাম৷

আমি যদি তারা হতাম

নীচের সবাইকে দেখতে পেতাম৷৷

আমি যদি গাছ হতাম

সবাইকে অক্সিজেন দিতাম৷

আমি  যদি খাবার হতাম

ক্ষুধার্তেরে অন্ন দিতাম৷

খেলা শেষে

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

এত করে’ ডাকি তোমায়

তবু ধরা নাহি দাও

কাছে এসে একটু হেসে

আবার দূরে চলে যাও৷

এখানে ওখানে শুধু তোমায়

খুঁজি আমি বারে বারে

কিছুতেই নাহি পাই

বিশ্ব চরাচরে৷

আর কতদিন এমন করে’

ফাঁকি দিয়ে রইবে সরে’

খেলবে লুকোচুরি আমার সাথে৷

দিনের শেষে সন্ধ্যা আসে

পল গুণছি তোমারই আশে

ভক্তি-কুসুম মালা গেঁথে৷

জানি, সবই তোমার অশেষ লীলা

অণু-ভূমায় সারা বেলা,

তোমার কৃপায় আমার সময় এলে

সংস্কারের যত কালি ধুয়ে

নেবেই তোমার মধুময় কোলে তুলে

ভবের খেলাশেষে তোমাতেই যাব হারিয়ে৷৷

খানার মর্ম সবাই বোঝে না

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘কৌশিকা’ শব্দের একটি অর্থ হ’ল রেকাবি, পিরীচ (পেয়ালা–পিরীচ), ডিশ, প্লেট (চায়ের প্লেট), জলখাবারের জন্যে ব্যবহার করা ছোট আকারের কানা–উঁচু থালা, ফুলকাটা থালা, সরা প্রভৃতি৷ প্রাচীন ভারতে এই প্রত্যেকটি জিনিসই ‘কৌশিকা’ নামে পরিচিত ছিল ও জলখাবারের জন্যে এই বাসনই সাধারণতঃ ব্যবহার করা হত৷ প্রাচীন রাঢ়ে রান্না করা জলখাবারের জন্যে ‘কৌশিকা’–ই ব্যবহার করা হত৷ কিন্তু না–রাঁধা জলখাবারের জন্যে ছোট আকারের একপ্রকার পাত্র যাকে ছোট ধুচুনী বা পেত্তে বলা হয় বা বলা হত তা–ই ব্যবহার করা হত৷ রাঢ়ের পণ্ডিতেরা এই জন্যে ছোট আকারের ধুচুনী বা পেত্তের জন্যে সংস্কৃত ‘কৌশিকা’ শব্দ ব্যবহার করতেন৷

পাশ্চাত্ত্য প্রভাবে মানুষ বাঁশ–বেতের ভোজনপাত্রের ব্যবহার কমিয়ে ফেলেছিল৷ বাঙলায় যখন সাহেবরা আসেন তখন ভোজনপাত্র হিসেবে বাঁশ–বেতের আধার ব্যবহূত হত৷ পাশ্চাত্ত্য প্রভাবে বাঙালী যখন একটি ইঙ্গ–বঙ্গ সমাজ গড়ে তুলেছিল এই কলকাতা শহরেরই বিভিন্ন অংশে, ডিরোজিওর প্রতিপত্তি যখন তুঙ্গে সেইরকম সময়ের মানুষেরা সাধারণ বাঙালীর খাদ্যকে ‘খাবার’ তথা ভাল বাঙলায় ‘আহার’ বা ‘ভোজন’ বলত৷ সাহেবী খানাকে তারা ইচ্ছে করেই ‘খানা’ বলতে  শুরু করে৷ বাংলা ভাষায় ‘খানা’ শব্দটি চলে আসছে ৭০০ বছর ধরে ঠিকই কিন্তু ইঙ্গ–বঙ্গ সমাজে ‘খানা’ শব্দটি ব্যবহূত হতে থাকে বিশেষ করে সাহেবী চালের খাবারের জন্যে......আরও বিশেষ করে ভোজ্যে শূকরমাংসের ব্যবহার থাকলে৷ সেই সময়কার একটি ছোট্ট গল্পের কথা মনে পড়ল৷

তোমরা নিশ্চয় অনেকেই জান হুগলী জেলার জনাই ছিল ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের একটি শ্লাঘার বস্তু৷ বেশ সুশিক্ষিত গ্রাম৷ সংসৃক্তের জ্ঞানের জন্যে রাা–বাঙলায় এই জনাবতীপুর (জনাই) অনেকের কাছেই পরিচিত ছিল৷ বৌদ্ধযুগে ও বৌদ্ধোত্তর যুগে বাঙলায় এর প্রভাব দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল৷ বৌদ্ধোত্তর যুগের শেষ চরণে জনাই–এরও প্রতিদ্বন্দ্বী জুটে গেল৷ যারা জুটল তারা হচ্ছে পণ্ডিত কায়স্থদের গ্রাম বাক্সা (বাকসারিকা), কৈকালা (কপিত্থকলিকা) ব্রাহ্মণ–গ্রাম ভাণ্ডারহাটী, সিঙ্গুর (সিংহপুর) প্রভৃতি৷ ইংরেজ আমলের মাঝামাঝি সময়ে এদের অনেকে রাক্ষসী ম্যালেরিয়ার আক্রমণে ধ্বংস হতে বসেছিল৷ এখন কেউ কেউ টাল সামলে নিয়েছে.....কেউ আর তা পারেনি৷ সে যুগে এদের সবাইকার মধ্যে চলেছিল একটা বন্ধুত্বপূর্ণ বৈদগ্ধ্য প্রতিযোগিতা৷ প্রাক্–পাঠানযুগের ঠিক পূর্ব চরণে ভাণ্ডারহাটী একটি নামজাদা পণ্ডিত–গ্রাম রূপে পরিচিত ছিল৷ ভাণ্ডারহাটীর তো বটেই, ভাণ্ডারহাটীর কাছাকাছি গ্রামের বসবাসকারী পণ্ডিতেরাও নিজেদের ভাণ্ডারহাটী গোষ্ঠীর মানুষ বলে পরিচয় দিতেন৷ ঠিক তেমনই ভাণ্ডারহাটী গোষ্ঠীর একজন স্বনামধন্য মানুষ ছিলেন বিদ্যাভূষণ বাচষ্পতি৷ বাচষ্পতি মশায় ছিলেন তীক্ষ্ণধী প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব সম্পন্ন এক বিরাট পণ্ডিত৷ কাব্য, সাংখ্য, ব্যাকরণ, স্মৃতি সবেতেই ছিল তাঁর সমান দখল৷ অথচ মানুষটি ছিলেন সদালাপি, নিরহঙ্কার৷ দেখে কে বুঝবে, তিনি অত বড় পণ্ডিত৷ কেউ তাঁকে শ্লেষ বর্ষণ করে কথা বললে, ঠোক্কর তুলে ঘা দিলে তিনি তাকে সেইভাবে প্রত্যুত্তর দিতেন না–দিতেন হাস্যরসিকতার মাধ্যমে, বৈদুষ্যমণ্ডিত ভাষায়৷

এহেন বিদ্যাভূষণ বাচষ্পতি মশায় কলকাতায় খুব কমই আসতেন৷ কলকাতার ইঙ্গ–বঙ্গ সমাজের সঙ্গে তিনি মানিয়ে চলতে পারতেন না৷ সংস্কৃত কলেজের পণ্ডিত মশায়রা চাইতেন তিনি কলকাতায় আসুন–তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন৷ কিন্তু বাচষ্পতি মশায়ের কলকাতার প্রতি এই অনীহা তাঁদের ব্যথিত করত৷

একবার তিনি কলকাতা এলেন৷ তাঁকে দেখেই ইঙ্গ–বঙ্গ সমাজ কিছুটা বিরক্ত হ’ল.......দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হ’ল কারণ বাচষ্পতি মশায় কারোর খাতির রেখে কথা বলতেন না৷ যদিও কথা বলতেন অত্যন্ত ভদ্রভাবে৷ সেবার কলকাতায় দু’চার দিন থেকে গেলেন৷ বাচষ্পতি মশায় এবার গ্রামে ফিরবেন৷ ইঙ্গ–বঙ্গ সমাজ প্রতিপদেই তাঁর উপস্থিতিতে পর্যুদস্ত হয়ে চলেছিল৷ তাঁরা ভাবলেন একবার অন্ততঃ বাচষ্পতি মশায়কে অপ্রতিভ করতে হবে–একটা অন্ততঃ ভাল রকমের ঠোক্কর দিতে হবে৷

ইঙ্গ–বঙ্গ সমাজের কয়েকজন তাগড়া তাগড়া মানুষ শূকর মাংসের খাদ্য খাচ্ছিলেন৷ তাঁরা ভাবলেন, এটাই তো মোক্ষম সুযোগ৷ তাঁরা বাচষ্পতি মশায়কে বললেন–‘‘আচ্ছা বাচষ্পতি মশায়, আপনি তো পাণ্ডিত্যের সমুদ্র–যেমন উদার তেমনই ব্যাপক৷ তাহলে আমাদের সঙ্গে বসে একবার খানা খেয়ে আমাদের কৃতার্থ করে দিয়ে যান৷’’ বাচষ্পতি মশায় এর উত্তরে একগাল হেসে বললেন, ‘‘দেখো, আমি একে হুগলী জেলার গ্রাম্য মানুষ–তার ওপর আবার গরীব৷ আমি তোমাদের ওই খানাটানা চোখেও দেখিনি কখনও........জানিও না, তাই খাই–ও না৷ আমরা গেঁয়ো ভূত৷ আমরা খানা–ডোবায় মলত্যাগই করতে যাই৷’’ বাচষ্পতি মশায় তাঁর স্বগ্রামে ফিরে গেলেন৷