প্রভাতী

উদ্বাস্তু

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

তোমরা হলে মন্ত্রী নেতা

আমরা যাযাবর

মোদের ভিটে মাটি বেচে

আনিলে স্বাধীনতা৷

তোমরা হলে স্বাধীন সুখী

ভাঙলে মোদের ঘর ঃ

মোদের দেশের মানচিত্র

হারিয়ে গেল কোথা?

মহাজনের গদীর খেলায়

আমরা জুয়ার তাস,

তোমরা পেলে ভায়ের মায়ের

শান্তি স্নেহ সুখ,

আমরা পায়ে পাই না মাটি

চারিদিকে সন্ত্রাস---

পা বাড়ালেই গর্জে ওঠে

উদ্যত বন্দুক৷

উপস্থিত বুদ্ধি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘তন্’ ধাতুর অর্থ হ’ল বেড়ে যাওয়া, অভিব্যক্ত হওয়া৷ যে মানুষ তার ভাবধারাকে নাচে–গানে অভিনয়ে–আবৃত্তিতে অভিব্যক্ত করতে পারে তার জন্যে ‘তন্’ ধাতুর উত্তর ড প্রত্যয় করে ‘ত’ শব্দ ব্যবহৃত হয়৷ তাই এক্ষেত্রে ‘ত’–শব্দের একটি অর্থ হ’ল ণট বা অভিনেতা৷

অভিনেতার মধ্যেও অনেক সময় অদ্ভুত রকমের উপস্থিত বুদ্ধি দেখা যায়৷ সে বিচারে তিনি দু’দিক দিয়েই ‘ত’৷ অভিনয় জগতের ‘ত’–এদের উপস্থিত–বুদ্ধি সম্বন্ধে বা উপস্থিত বুদ্ধির স্বভাব সম্বন্ধে অনেক গল্প প্রচলিত আছে৷ দু’একটি গল্প তোমাদের শোনাচ্ছি ঃ

 সেটা তখন ইংরেজ আমল৷ আমি তখন দিনাজপুরে৷ উত্তর বাঙলার অন্যান্য শহরের মত দিনাজপুরও একটি মাঝারি রকমের ছিমছাম শহর ছিল৷ শহরটি ছিল আমার খুব প্রিয়৷ দিনাজপুর–বাসীর স্বভাবের একটি বৈশিষ্ট্য আমার খুবই ভাল লাগত৷ ওঁরা*(*ওনারা, যেনারা, তেনারা শব্দগুলি গ্রাম্য দোষে দুষ্ট৷ ওঁরা, যাঁরা, তাঁরা–ই শুদ্ধ ওনারা, যেনারা, তেনারা না লেখাই ভাল৷) ছিলেন খুবই নাচ–গান–অভিনয় প্রিয়৷ সেকালে স্থায়ী অভিনয়মঞ্চ কোলকাতার বাইরে আর কোনো শহরেই বড় একটা ছিল না৷ কিন্তু দিনাজপুরে তা–ও ছিল৷ কয়েকজন স্থানীয় অভিনেতা তখন রীতিমত প্রথিতযশা হয়ে পড়েছেন৷ কেবল শহরেই নয়, গ্রামাঞ্চলের দিকেও থিয়েটারের রমরমা৷ সেই সময়টায় ওই দিকটায় ‘সীতা’ নাটকটি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে৷ সীতার ভূমিকায় অভিনয় করে যিনি দু’হাতে যশ কুড়িয়েছিলেন, তাঁর নাম ছিল সম্ভবতঃ আব্দুল লতিফ৷

সীতা নাটকের অভিনয় চলছে৷ শহরে হাজার হাজার গোরুর গাড়ীর ভীড়৷ গ্রামের লোক ঝেঁটিয়ে এসেছে অভিনয় দেখতে৷ হাতে পাট বেচার তাজা টাকা৷ দরকার পড়লে অভিনয়ের জন্যে বেশ কিছু খরচ করতেও তৈরী৷

অভিনয় চলছে৷ নাটক তার চরম স্তরে (climax) এসে পৌঁছেছে৷ এবার সীতার পাতাল প্রবেশ৷ ধরিত্রী মাতাকে সম্বোধন করে সীতাকে যা বলতে হবে তার মোদ্দা কথা হচ্ছে–‘‘মাতঃ বসুন্ধরে, দ্বিধা হও, আমি তোমার  স্নেহময় অঙ্গে স্থানলাভ করি’’৷ আব্দুল লতিফে.র নাটকের ভাব ষোল আনাই জানা, ভাষাও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঠোঁটস্থ৷ এই বিশেষ স্থানটিতে সীতা ধরিত্রী মাতাকে সম্ক্ষোধন করে যা বলবেন তার ভাবটিও তাঁর জানা আছে৷ কিন্তু ভাষা একটু গোলমেলে হয়ে গেছে৷ সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ‘‘মাতঃ বসুন্ধরে’’ বলার পরই স্মারকের (prompter) এসে গেল দারুণ কাশি৷ সে কাশির চোটে আর কথা বলতে পারছে না অথচ সীতা তো আর তার প্রত্যাশায় মুখ ক্ষন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না৷ সে তখন উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করে বললে–‘‘মাতঃ বসুন্ধরে, তুই ফাঁক হ, মুই ভিতরত্ ঢুকিম্’’৷

দেখলুম, এ জিনিসটা শ্রোতারা সহজেই গ্রহণ করলেন৷ নাটকের কিছুমাত্র রসভঙ্গ হ’ল না৷

কবি হবার সাধ

লেখক
সাক্ষীগোপাল দেব

চেষ্টা করে ‘গবিতা’ হয়

    কবিতা কেউ বলে না

ব্যাঙের পাশে ঠ্যাং মিলিয়ে

    সে কবিতা চলে না৷

আমি হলুম ব্যাঙের কবি

    ঠ্যাঙ কেবলই ভরসা

ঠ্যাঙটা যদি না পাই খঁুজে

    সব কবিতা ফরসা৷

চিন্তা মনে জাগে অনেক

    মাথামুণ্ডু থাকে না

অকালপক্ক বুদ্ধি আমার

    সময় মত পাকে না৷

মাঝে মাঝে দেখা মেলে

    অনেক হবু হ’ত কবি

জেগে ওঠে সুড়সুড়িটা

    কলম দিয়ে আঁকব ছবি৷

বড়ো কবি হবার তরে

    তাদের দেখে দিই যে লাফ

ফলটা মেলে হাতে হাতে

    ঠ্যাঙ্টা ভেঙ্গে পড়ি বাপ্৷

বৃষ্টি পড়ে

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর

    কলকাতাতে বান,

ট্রাম বাস জিপ ট্যাক্সি মিনি

    ডুবল সকল যান৷

এক কন্যে পা পিছলে

    রাস্তায় সাঁতরান,

আর এক কন্যে জল থইথই

    ডাঙ্গার খোঁজে যান৷

আর এক কন্যে কোমর-জলে

    বলেন, ও ভাই মাঝি,

বাপের বাড়ীর ছাদে যাবো

    ক’পয়সায় রাজী?

চলো আঁধার পেরিয়ে যাই

লেখক
আচার্য নিত্যসত্যানন্দ অবধূত

চলো আঁধার পেরিয়ে যাই আলোর পানে৷

এসো ভূবন ভরিয়ে দিই গানে গানে৷৷

এসো গিরি-মরু-কান্তার যাই পেরিয়ে,

এসো সুনীল আকাশ-সীমা যাই ছাড়িয়ে

জাগি নূতন দিনের নব স্বপ্ণ নিয়ে---

যত দুঃখ-ব্যথা মোরা ভাগ করে’ নিই৷৷

যত বিঘ্ন বাধা এই ধরণী তলে,

চলো যাই চলো যাই দু’পায়ে দলে’৷

বলো, ‘‘অমৃত-পু মোরা মৃত্যুঞ্জয়,

যত অত্যাচারীর ত্রাস, মোরা দুর্জয়

মোরা ভোরের পাখী যত আঁধার রাতে---

ভোর হলো, ভোর হলো ডাক দিয়ে যাই’’৷

প্রতিবাদ

লেখক
তীরন্দাজ

আমি এক প্রতিবাদ

ফীনিক্স পাখীর মত

উঠে আসি বারবার

আমি দুর্দম দুর্বার৷৷

যতই আসুক ঝড়

সাইক্লোন তুফানের বান,

ততই এগিয়ে যাব

করে দিয়ে ছারখার

শোষণ আর অবিচার

আর দমনের কারাগার৷৷

একটাই লক্ষ্য আমার

একটা এমন পৃথিবী,

যেখানে অরুণের রাঙা আলো

অন্ধকার করে দিয়ে দূর

ছেয়ে দেবে উজ্জ্বল রোদ্দুর

এনে দেবে আলোর সকাল

যে সকাল তোমার আমার৷৷

মনুষ নহীঁ, দেওতা হ্যায়

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

তোমরা এমন কিছু কিছু মানুষ নিশ্চয় দেখেছ যাদের শরীরে মায়ামমতা অত্যন্ত বেশী৷ বিপদে আপদে সবাই তাঁদের দ্বারস্থ হয়, তাঁরাও বিপন্ন মানুষকে বাঁচাবার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকেন৷ নিজেকে বিপদে ফেলেও অন্যকে বাঁচাবার চেষ্টা করেন৷ একটি ঘটনার কথা মনে পড়ল৷

সেটি ১৯৪৬–৪৭ সালের কথা৷ ভারতে নানান স্থানে তখন সাম্প্রদায়িকতার কৃশাণু জ্বলছে৷ এই আগুন জ্বালাতেন  বা জ্বালিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতারা৷ আমি তাঁদের জন্যে ঘৃণা সূচক পলিটিক্যাল পিগ •political pig— শব্দটি ব্যবহার করেছিলুম৷ তাদের কাছে মানুষের জীবনের দাম ছিল না৷ তাদের উদ্দেশ্য ছিল যে কোন পন্থায় তাদের রাজনৈতিক মতলব হাসিল করা৷ এজন্যে মানুষ মরে মরুক....শান্তির নীড় গ্রামগুলি ওই আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলে জ্বলুক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধি ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে বড় কথা৷ আমরা যে পাড়াটিতে থাকতুম সেটি ছিল সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু দুই সম্প্রদায়েরই বাসভূমির সীমান্তরেখা৷ আমাদের বাড়ীটি ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাড়ার শেষ হবার কয়েক পা মাত্র দূরে৷

স্থানটি বিহারের একটি ছোট্ট শহর৷ তখন সন্ধ্যেবেলা৷ একজন বাংলাভাষী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক সিল্কের লুঙ্গি বেচতে আমাদের পাড়ায় প্রায় ঢুকে পড়েছিল৷ আমরা তাকে তাড়াতাড়ি আমাদের পাড়া ছেড়ে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত পাড়ায় চলে যেতে বললুম৷ আমাদের বাড়ী থেকে প্রায় একশ’ হাত দূরে৷ লোকটি ছিল ময়মনসিং জেলার৷ একে বিহারে সে কখনও আসেনি, তার ওপর এখানকার ভাষাও সে ভাল জানত না৷ সে বললে–‘‘কি করে যাব কর্ত্তা, সেখানে তো আমার জানা–চেনা কেউ নেই৷’

আমার এক অতি নিকট আত্মীয় ওই সময় আমাদের বাড়ীতে ছিলেন৷ তিনি তার হাত ধরে টেনে আমাদের বাড়ীতে ঢুকিয়ে নিলেন৷ লোকটি তখন ভয়ে কাঁপছে৷ চারিদিকে দাঙ্গা–কাজিয়া তখন চরম অবস্থায় পৌঁছেছে৷ সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাদের বাড়ীতে এসে বললে–সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকটিকে তোমাদের বাড়ীতে ঢুকতে দেখেছি, তোমরা ওকে আমাদের হস্তে সমর্পণ করো৷

আমাদের সেই আত্মীয়টি তখন বাড়ী থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এলেন৷ তিনি সংখ্যাগুরু ওই বিরাট রণোন্মত্ত বাহিনীকে বললেন–লোকটিকে আমিই বাড়ীতে ঢুকিয়ে রেখেছি৷ লোকটি বিপন্ন৷ তোমরা যদি লোকটিকে চাও আমি তাকে তোমাদের হস্তে সমর্পণ করতে রাজী আছি–একটি সর্ত্তে৷ তোমরা আমাকে এখনই মেরে ফেল....তারপর আমার মৃতদেহের ওপর দিয়ে চলে যাও ওই বাড়ীতে....লোকটিকে বাড়ী থেকে বার করে আনো৷ যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি ততক্ষণ আমি তোমাদের ওই লোকটির কাছে যেতে দোবনা–তা সে সংখ্যায় তোমরা হাজারই হও, লাখই হও৷ আক্রমণকারীরা বলতে বলতে গেল,  ‘‘দেওতা হ্যায়৷’’          (শব্দ–চয়নিকা, ১৩শ খণ্ড)

আমরা বাঙলী

লেখক
সৌরভ চউধুরী

বাঙ্লা মোদের দেশ

         বাংলা মোদের গৌরব

বিশ্বকবির গীতাঞ্জলি

         ছড়ায় বিশ্বে সৌরভ৷

বাঙ্লারই দুলাল নিমাই

         আর প্রভু নিত্যানন্দ

রামমোহন বিদ্যাসাগর

         স্বামী বিবেকানন্দ৷

আমাদের ঋষি অরবিন্দ

         সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম

বীরশ্রেষ্ঠ নেতাজী

         আর শহীদ ক্ষুদিরাম৷

বাঙ্লা মোদের গর্ব

         বাঙ্লা মোদের প্রাণ

আমরা বাড়াব সবাই

         বাঙ্লা সম্মান৷৷

বিশ্বরূপ

লেখক
ব্রহ্মদেব

বর্ষাকালের সন্ধ্যাবেলায় ঝিঝির ডাকে ডাকে

ঝির–ঝিরি–ঝির বৃষ্টি পড়ার টাপুর টুপুর ফাঁকে

ঝিঝি দেখতে দেখতে গিয়ে দেখতে পেলেম যাকে

মন কি আমার সেই ক্ষণেতে খঁুজতে ছিল তাকে?

পরশ আমার গায় তখন শীতল করিয়া যাওয়া

কে সেই মাঝে বইয়েছিল সন্ধ্যাতারার হাওয়া

বৃষ্টি যখন ঝির–ঝিরি–ঝির পড়ছে ফাঁকে ফাঁকে

আমি তখন দেখছি যেন লুকিয়ে থাকা কাকে

তখন আমার বিশ্বরূপ দেখতে গিয়ে পাই

আমার মাঝে আমার আমি তখন যে আর নাই৷

সীমার মাঝে

লেখক
স্বপন দে

সীমার মাঝে অসীম তুমি

কেমনে তোমায় পাই

অনলে অনিলে সাগরের তলে

খুঁজে ফিরি মরি তাই৷

পরমেশ্বর তোমার কথাই

মনে ভাবি বার বার

সবাকার লয়ে কি খেলায় আছ

হিসাব মিলেনা তার৷

বিশ্ব তোমার হাতের মুঠোয়

বিশ্বের তুমি প্রাণ

জগৎ মাঝারে তোমার কাননে

আমরা তোমার দান৷

তুমি চাও প্রভু সন্তান তব

আসুক তোমার কাছে

বরাভয় দানে হাসি মুখ খানি

মধুর বাঁশরী বাজে৷

সে বাঁশির টানে বল এস সবে

সুখের সাগরে ভাসো

দেবগুণে হও প্রতিষ্ঠিত

অসুরগণকে নাশো৷৷