প্রভাতী

মা

লেখক
শর্মিলা রীত

তোমার কোলে জন্ম মা গো

    প্রথম আলো দেখা৷

তোমার আঁচল স্পর্শে মা গো

    শুধুই আদর মাখা৷৷

তোমার আঙুল ধরে মা গো

    এক পা দু’পা ফেলা৷

কন্যা সন্তান হয়েও মা গো

    করনি অবহেলা৷৷

 

তোমার হাতের স্পর্শে

    শেখা বর্ণপরিচয়৷

আধো গলায় শিখিয়েছিলে

    পাঠ্য কিশলয়৷৷

মনের মধ্যে জ্বালিয়ে ছিলে

    জ্ঞানের দৃপ্ত শিখা৷

মানব শিক্ষা তোমারই দান

    মুক্ত অন্ধ রেখা৷৷

 

মা তো কেবল মা হয়

    বিকল্প কিছু নাই৷

মরণ কালেও যেন মা গো

তোমার স্নেহের স্পর্শ পাই৷৷

   

 

স্বভাব যায় না ম’লে

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘খভ্রান্তি’ শব্দের একটি অর্থ হ’ল চিল (কালো চিল ও শঙ্খচিল দুই–ই)৷ ‘ভ্রম্’ ধাতুর অর্থ ভুল করা নিলে ‘খভ্রান্তি’ শব্দের একটি যোগারূঢ়ার্থ হৰে–যে একই ভুল ৰার ৰার করে চলেছে৷ একই ভুল জেনে বা না জেনে অনেকেই করে থাকে৷ ধরো, কোন একজন অনেকগুলি সংখ্যাকে ওপর থেকে নীচে গুনে চলেছে৷ ৰার ৰার গণনায় ভুল হচ্ছে৷ খোঁজ নিলে দেখা যাৰে একটি জায়গায় ৰার ৰার মনে মনে সে বলে চলেছে ৫৬ ঞ্চ ১২৷ এই ধরনের ভুলকেও ‘খভ্রান্তি’ ৰলা হয়৷ ‘খভ্রান্তি’–র হাত থেকে ৰাঁচবার অন্যতম উপায় হল উল্টো পথে চলা যেমন গণনার ক্ষেত্রে ওপর থেকে নীচে গুনতে গিয়ে ‘খভ্রান্তি’–তে পড়ছ, তো সেই স্থলে এই ‘খভ্রান্তি’–র হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্যে নীচের থেকে ওপরে গোনো৷ এবার ৫৬ ঞ্চ ১২ না ৰলে আশা করা যায় ৰলৰে ৬৫ ঞ্চ ১১৷

আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিল ......বয়সে ছিল আমার চেয়ে কিছুটা ছোট৷ তার ‘খভ্রান্তি’ ছিল–স্বেচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, মিথ্যে কথা ৰলা৷ তাকে বকাঝকা করলে সে ৰলত, ‘‘কী করৰ দাদা, মুখ থেকে বেরিয়ে যায়৷ যদি ঠিক ৰলতেও চাই তৰুও স্বভাবগতভাৰে মিথ্যে বেরিয়ে যায়৷ সেই ছড়ায় আছে না–

‘‘মনে করি হেন কর্ম করিব না আর,

স্বভাবে করায় কর্ম কী দোষ আমার’’৷

যারা তার স্বভাবের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছল সেই সৰ আত্মীয়–নাত্মীয় চেনা–চেনা সৰাই তার সম্পর্কে ৰলত–ও যখন যা কিছুই ৰলুক না কেন তা গ্রহণ করার আগে তা ভাল করে চেলে নিৰি৷

একবার আমি তাদের জিজ্ঞেস করলুম–হ্যাঁরে, তোরা যে চেলে নিতে ৰলছিস তা কী রকম চালুনিতে চালতে হৰে?

ওরা ৰললে–নারায়ণগঞ্জ ৰাজারের একটা দোকানে খুৰ মিহি চালুনি পাওয়া যায়৷ সেই চালুনিতে  চালতে হৰে৷

আমার সেই আত্মীয়টি সৰ শুণে ৰললে–আমার মিথ্যে এতই সূক্ষ্ম যে তা চালৰার মত চালুনি এখনও পৃথিবীতে তৈরী হয়নি৷

আমি ধমকে দিয়ে ৰললুম–হ্যাঁরে, তুই যখন আমার সঙ্গে কথা ৰলৰি তখন আমাকেও চালুনি নিয়ে বসতে হৰে নাকি?

সে আমাকে একটু ভয় পেত৷ সে ৰললে–না দাদা, আপনার চালুনির দরকার পড়বে না৷ যদি একান্তই দরকার পড়ে মোটা চালুনিতেই চলৰে৷

আমি ৰললুম–ওসৰ ন্যাকামি ছাড়৷ আজ থেকে সত্যি কথা ৰলা অভ্যেস কর৷

পরের দিন ওর ৰন্ধুরা আমার কাছে এসে নালিশ করে ৰললে–ও আৰার মিথ্যে ৰলছে৷

আমি ৰললুম–কী মিথ্যে ৰলেছে?

ওরা ৰললে–ও ৰলছিল, রংপুর জেলাটা নাকি আগে ৰুড়ীগঙ্গার চর ছিল৷

আমি ৰললুম–হ্যাঁরে, এখনও অভ্যেসটা ছাড়লি না কেন?

 সে আমাকে কাকুতি–মিনতি করে ৰললে–দাদা, আপনারে কথা দিতেসি এ্যামনডা অর অইৰ না৷

আমি ৰললুম–ঠিক আছে, কথা দিলি–তা’ মনে রাখিস যেন৷

পরের দিনই ওর ৰন্ধুরা এসে ৰললে–ও আৰার মিথ্যে ৰলেছে৷

আমি ৰললুম – কী ৰলেছে?

ওর ৰন্ধুরা ৰললে – ও বলেছে,        বঙ্গোপসাগরটা নাকি আগে ওর পিসেমশাইয়ের জমীঁদারীতে ছিল৷

আমি আবার ওকে মুখঝামটা দিয়ে বকাঝকা করলুম৷ বললুম – ‘‘আবার যদি মিথ্যে বলিস তোরে মাইর্যা ফ্যালাই দিমু’’৷

সে বললে– না দাদা৷ আর কখনও এমনড্যা অইব না৷ আমি আপনারে পাকা কথা দিতেসি৷

তার পরের দিন ওর বন্ধুরা আবার আমার কাছে এসে মামলা দায়ের করে বললে–দাদা, ও আবার মিথ্যে কথা বলেছে৷

আমি ৰললুম–কী ৰলেছে?

ওর ৰন্ধুরা ৰললে–ও ৰলেছে, ওর ঠাকুরদার যেটা সৰচেয়ে ৰড় হাতী অর্থাৎ ঐরাবত ছিল তার নাকটা ছিল শূর্পণখার নাকের মত৷

আমি ওকে অনেক বকাঝকা করলুম৷ ৰললুম – তোর কথার দাম রাখতে পারিস না কেন রে?

ও ৰললে – দাদা, মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়৷ এবার আমি আপনারে পাকা ফাইন্যাল কথা দিতেসি৷ আর এ্যামনডা অইব না৷

তার পরের দিন ৰন্ধুরা আমার কাছে এসে রিট পিটিশন করে জানালে–ওর মিথ্যে ৰলা স্বভাব৷ মানুষ কেন, দেৰতারাও সারাতে পারৰে না৷

আমি ৰললুম – ও আৰার কী মিথ্যে ৰলেছে?

ওরা ৰললে – ও ৰলেছে, ও নাকি আসলে ভূত৷ ট্যাক্স ফাঁকি দেৰার জন্যে পোষাক পরে সেজে–গুজে থাকে৷

আমি শুধোলুম – হ্যাঁরে, এসব কী কথা শুণছি

ও ৰললে – দাদা, এবার আমি আপনারে এক্কেরে পাকা ফাইন্যাল কথা দিতেসি, ভবিষ্যতে আর এ্যামনডা অইৰ না৷

তার পর কী হয়েছিল আর আমি খোঁজ নিইনি....... তার পরেই ৰাঙলা ভাগ হয়ে গেছল কি না৷

তা হলে তোমরা ‘খভ্রান্তি’ কাকে ৰলে ৰুঝলে তো      (শব্দ চয়নিকা, ১৩শ খণ্ড)

 

রঙিন মন

লেখক
শর্মিলা রীত

শীতের আমেজ শেষের বেলায়৷

ফাগুন মাতল রঙের খেলায়৷৷

ফুলের গন্ধ বিকশিত৷

শুভ্র পলাশ প্রস্ফূটিত৷৷

 

রামধনু ওই রঙের শোভা৷

কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম আভা৷৷

আবির খেলায় মাতল মন৷

বাউল গান আর শান্তিনিকেতন৷৷

 

সবটুকু থাক হিয়ার মাঝে ৷

নতুন বৃন্ত গাছে গাছে৷৷

সবার মনে লাগুক রঙ৷

বসন্ত এসে গেছে৷৷

দেশ পুজ্য নেতাজী

লেখক
প্রভাত খাঁ

কীর্ত্তি যাঁর রহে এ ধরায়

স্বরনের বালুকা বেলায়

তিনিই অমর হন৷

 

স্বাধীনতা, মানবতা তরে

যিনি যান সংগ্রাম করে

দেশ নেতা হয়ে তিনি রন৷

 

স্বার্থক নেতাই হন দেশের নেতাজী

একসূত্রে বাঁধি সবে রচি’মহাজাতি

মুক্তির আশ্বাস দানি করি মহারন৷

 

ব্যষ্টি স্বার্থ যশ খ্যাতি ধন

পায়েতে দলিয়া যিনি যান

তিনিই বরনীয় স্মরনীয় দেশ পূজ্য হন৷

 

বিশ্বকবি ‘‘নেতাজী’’ নামেতে যাঁরে করেন বরণ

তাঁরেই পরমপিতা বজ্র কৌস্তভ কন,

জ্বলন্ত ধূমকেতু উল্কার অনলশিখা হয়ে ইতিহাসে রন৷

 

তোমার অসমাপ্ত কর্ম পূর্ণ করিবারে

জাগিতেছে তরুণের দল দিকে দিকে

ভ্রষ্টাচারী, দলনীতি করিতে দলন৷

বেগুনপোড়া

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

কোন বস্তু অগ্নির সংস্পর্শ এলে তাতে তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়৷ তার দ্বারা বস্তুকে পোড়ানো যায়, জ্বালানো যায় ও ঝলসানো যায়৷ এ ছাড়া স্যাঁকাও যায়৷

পোড়ানোর অর্থ হল বস্তুর বহিরাবরণ অগ্নিদগ্ধ হয়ে বিনষ্ট হয়ে যায় কিন্তু অভ্যন্তর ভাগ অগ্নিপক্ব হয়ে নরম হয়ে যায়৷ জ্বালানোর অর্থ হল বস্তুর অগ্নিসংযুক্তি ঘটার ফলে তার বাহির ও ভেতর দু’ই নষ্ট হয়ে যায় বা ভষ্মে পরিণত হয়৷ ৰেগুনকে পোড়ানো হয়, প্রদীপের সলতেকে জ্বালানো হয়৷ বস্তুর অগ্নিসংযুক্তির ফলে যখন বস্তুর বহিরাবরণ মোটামুটিভাবে পুড়ে যায় কিন্তু ভেতরের দিকটা কোনভাবে নরম হয় না, কিছুটা প্রভাবিত হয় মাত্র, এই ধরনের অগ্নিসংযুক্তিকে ঝলসানো বলে৷ এই ঝলসানোর জন্যে ‘রা’ ধাতুূড প্রত্যয় করে ‘র’ শব্দ প্রযোজ্য (পুংলিঙ্গে)৷

বস্তুর অগ্নিসংযুক্তিতে যখন বস্তুদেহে বিবর্ত্তন ঘটে কিন্তু কোন অংশই পোড়ে না তাকে আমরা স্যাঁকা বা সেঁক দেওয়া বলি৷ ‘র’ বলতে কিন্তু এই স্যাঁকা বা সেঁক দেওয়াকে ৰোঝায় না অর্থাৎ আমরা যে রুটি সেঁকি সেই স্যাঁকা রুটিকে কিন্তু ‘র’ ৰলতে পারব না৷ তোমরা বেগুন পোড়া বলো, না বেগুন জ্বালানো বলো, না বেগুন ঝলসানো বলো? নিশ্চয়ই বেগুন পোড়া বলো কারণ বেগুন পোড়ানোর পরেই তার ভেতরটি খাও৷

বেগুন–পোড়ার কথা ৰলতে গিয়ে অনেককাল আগেকার একটা ছোট ঘটনা মনে পড়ল৷ সেকালে নাটকে খুব ৰেশী অতি–নাটকীয়তা চলত৷ নাটকের সংলাপ অবশ্যই স্বাভাবিক হওয়া বাঞ্ছনীয়৷ তবে দৈনন্দিন সাদামাটা জীবনে যে ধরনের সংলাপ ব্যবহার করা হয় নাটকের সংলাপের সঙ্গে তার অল্প–স্বল্প তফাৎ থাকে৷ বিশেষ করে স্বাভাবিক জীবনে যখন আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলি তখন হয় আমরা ভাবি যেন আর কেউ তা না শোনে অথবা তখন আমরা আর কাউকে শোনানোর কথা ভাবি না৷ কথাটাকে নিজেদের মধ্যে সীমাৰদ্ধ রাখি৷ কিন্তু নাটকীয় সংলাপে মনে রাখতে হয়, শ্রোতা–দর্শকেরা যেন অভিনয়কারীদের কথা শুনতে পান অথবা হাবভাব দেখে তাঁদের বক্তব্য ৰুঝতে পারেন৷ স্বাভাবিক সংলাপ ও নাটকীয় সংলাপের মধ্যে এটাই ৰড় তফাৎ........এ ছাড়া অন্যান্য তফাৎও আছে৷

 সেকালে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যেত নাটক মানেই অতি–নাটকীয়তা৷ সে সময় একবার আমাদের গ্রামে কোলকাতা থেকে একটি সেরা যাত্রার দল গেছল৷ আমি আর আমার ঠাকুমা যাত্রা দেখতে গেছি (সেকালে বলা হত যাত্রাগান শুনতে যাওয়া)৷ সংলাপ চলছে রাজার সঙ্গে রাণীর৷ রাজা রাংতা–মাখা পোষাক, রাংতার মুকুট পরে রূপোলী রাংতা মোড়া মাখনশিম হাতে নিয়ে এই–মারে–কী–সেই মারে করে যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত হচ্ছে৷ তখন রাজা–রাণীতে কথা হচ্ছে অতি–নাটকীয়ভাবে৷ রাণী ৰলছে–‘‘প্রাণেশ্বর, প্রাণনাথ কোথা যাও ফেলিয়া আমারে?’’

ঠাকমা বললেন–‘‘মরণ দশা মিনসের ঢং দেখ৷’’

আমারও মোটেই পছন্দ হচ্ছিল না৷ তারপর দ্বিতীয়বার যখন রাণী উদাত্ত কণ্ঠে পুরুষালী হেঁড়ে*(*হাঁড়িয়া > হেঁড়ে৷ মুখের সামনে একটা হাঁড়ি রেখে কথা বললে ধ্বনিটি যে ধরনের হয় তাকে বলে হেঁড়ে আওয়াজ৷) গলায় চীৎকার করে বলে উঠল– ‘‘প্রাণেশ্বর...........প্রাণনাথ’’৷

আমি আর থাকতে না পেরে বললুম–‘‘বেগুন–পোড়া মাখো ভাত৷’’

ঠাকমা  শুনে আমাকে বললেন–‘‘ৰেশ বলেছিস্ ....... ৰেশ করেছিস৷ তোকে আমি হীরে–বসানো আংটি গড়িয়ে দোব৷’’

তা যাই হোক্, বেগুনপোড়া খাবার জিনিস৷ তাই আমরা বেগুন পোড়া বলি–বেগুন–জ্বালানো বলি না৷

 

নেতাজী

লেখক
জয়তী দেবনাথ

শতকোটি প্রণাম তোমায়

ধন্য তুমি বীর৷

এই ভারতের গর্ব তুমি ৷

উচ্চ তোমার শীর৷৷

                        তোমার জ্যোতিতে উজ্জ্বল হল

                        এই ভারত-গগন৷

                        দেশমাতার সেবায় তুমি

                        সঁপিলে তনু-মন৷৷

            তোমার কীর্তিতে মুগ্দ আজি

সকল ভারতবাসী৷

ভারত-গীতে বাজে আজও

তোমার মধুর বাঁশী৷৷

                        হে বীর তুমি আজও আছ

                        সবার বরণীয়

                        যুগে যুগে থাকবে তুমি

                        হয়ে স্মরণীয়৷৷

তোমার ছোঁয়ায় ধন্য হ’ল

এই ভারতের ভূমি,

সবার হৃদয় জুড়ে সদা

থাকবে মহান তুমি৷

                        তুমিই মোদের পাথেয় হবে

                        ওগো সুধী পথিক,

                        মতানৈক্যের এই যুগে

                        তোমার পথই সঠিক৷৷

 

নেতাজী প্রণাম

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্‌হা

নেতাজী, নেতাজী, আজাদ হিন্দ্‌ বাহিনীর নেতাজী

নেতাজী, নেতাজী, সকলের আদরের নেতাজী

বাঙলার মহান সন্তান তুমি, ভারতের গৌরব

বিশ্বনিখিলে সততঃ স্পন্দিত তোমার স্বদেশপ্রেমের সৌরভ

শতাব্দীর ধ্রুবতারা তুমি, যুগপুরুষ মহাবিপ্লবী

ত্যাগ-মন্ত্র বলে ভারতবাসীর বুকে এঁকেছিলে দেশাত্মবোধের  ছবি

আসমুদ্র হিমাচল হয়েছে উত্তাল তোমারই অমোঘ আহ্বানে

লক্ষ লক্ষ বীর সৈনিক জেগেছে ‘জয় হিন্দ্‌’ গানে

বিদেশী শাসকের অমানুষিক নিপীড়ন আর পৈশাচিক অট্টহাস

কলঙ্কিত করেছে পৃথিবী ও সভ্য মানুষের ইতিহাস৷

অন্ধঘোর নিশীথের বক্ষ চিরে রক্তিম পূবের আকাশ

উদ্‌ভাসিত করলে যুগ সন্ধিক্ষণে, তুমি, সুভাষ৷

পুষ্পশোভিত নিঃশঙ্ক  জীবনের হাতছানি দিয়েছ বিসর্জন

কণ্টকাকীর্ণ রক্তাক্ত দুর্গম পথ হাসিমুখে করেছ বরণ৷

গগনভেদী হুঙ্কারে ভেঙেছে অত্যাচারীর পাষাণ কারাগার

কেঁপেছে শার্দূল-শয়তান, দুর্বার শক্তিতে তোমার

লালচক্ষু-ভ্রূকূটি অবহেলে, ধূর্ত শ্যেন দৃষ্টি দিয়েছ ফাঁকি

অভ্রংলেহী মদমত্ত বোঝেনি, তুমি বিধাতার এক অপূর্ব সৃষ্টি৷

তরুণ সমাজের আদর্শ তুমি, চির উন্নত শাশ্বত মৃত্যুঞ্জয়

যুব-মানসে যুগে যুগে সঞ্চার’ পৌরুষ অমর অক্ষয়৷

শুভ জন্মদিনে স্মরণে-বরণে জানাই শতকোটি প্রণাম আজি

নেতাজী, নেতাজী, অফুরন্ত যৌবনের অগ্রদূত নেতাজী

নেতাজী, নেতাজী, আপামর দেশবাসীর গর্বের নেতাজী৷৷

ভীম একাদশী করলে

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

লোভী মানুষের মত লোভী জানোয়ারও কোন কিছু পড়ে থাকলে তা’ তুলে আত্মসাৎ করার চেষ্টা করে৷ এই ধরনের অতিলোভী ও অতিভোজী একটি জীব হচ্ছে নেকড়ে বাঘ যা উত্তর ভারতে লাকড়া বা লকড়বাঘা নামে পরিচিত, কথ্য ৰাংলায় ‘নেকড়ে’, ইংরেজীতে প্সপ্তন্দ্র, সংস্কৃতে ‘বৃক’ বা ‘বৃক–ব্যাঘ্র’৷ নেকড়ে প্রচুর পরিমাণে খায়৷ নিজের প্রয়োজনের তুলনায় চার–পাঁচ গুন বেশী খায়৷ নিজের দৈহিক ওজনের চেয়েও বেশী ওজনের ভোজ্য গ্রহণ করে৷ তারপর কয়েকদিন অসাড় হয়ে পড়ে থাকে, উঠতে–বসতে চায় না৷ তারপর হজম হয়ে যাবার পর আবার গা–ঝাড়া দিয়ে ওঠে৷

ইতোপূর্বে তোমাদের বলেছিলুম মধ্যম পাণ্ডব ভীম অতিভোজী ছিলেন৷ তাঁর চরিত্রের প্রধান দোষই ছিল এই অতিভোজিতা (প্সব্জ্ত্রন্তুন্ব্ধম্ভ ঃ ঔদরিকতা ঃ কথ্য বাংলায় ‘পেটুক’, উত্তর ভারতে পেটু)৷ স্বর্গারোহণ পর্বে তাই দেখা যায় স্বর্গের কাছাকাছি জায়গায় এসে ভীমের যখন পতন হ’ল, মৃত্যুকালে ভীম যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করলেন–দাদা, দ্রৌপদীসহ আর তিন ভাইয়ের পতন হয়েছিল বিভিন্ন কারণে...৷ দ্রৌপদীর ত্রুটি ছিল একদেশদর্শিতা৷ পঞ্চপতির পত্নী হওয়া সত্ত্বেও অর্জুনের প্রতি তার টান ছিল বেশী৷ সহদেব, নকুল ও অর্জুনের যথাক্রমে রূপের গৌরব, গুণের গৌরব ও বীরত্বের অহঙ্কার ছিল বেশী৷ কিন্তু আমার কেন পতন হ’ল? তদুত্তরে যুধিষ্ঠির বললেন, ‘‘অতিলোভিতাই তোমার পতনের কারণ৷ ভোজ্যবস্তু* (*এ প্রসঙ্গে খ্যাটনদাস বটব্যাল স্মর্ত্তব্য৷) পেলে তুমি স্থান–কাল–দাতৃপাত্র ভুলে গিয়ে ভোজ্য গ্রহণ করতে ও মাত্রাজ্ঞান রাখতে না৷ তোমার পতন হল তাই৷ ভূতিকামী মানুষের তাই উচিত অন্যান্য দোষের সঙ্গে অতিভোজনরূপ** (**আমাদের বিহারে শিশুকাল থেকে দেখে আসছি এমন কিছু লোক আছেন যাঁরা মানুষ হিসেবে খুবই ভাল কিন্তু নেমতন্ন ৰাড়ীতে পাতে চিঁড়ে (চিউড়া), দই (দহি) ও পেড়া (পেটকাঞ্ছপেডআঞ্ছপেড্ পেড়া) পড়লে তখন তাঁদের আর আন্দাজ থাকে না......আন্দাজ মেলে না৷) দোষকেও ত্যাগ করা৷’’

এ কথা ইতোপূর্বে বলেছি যে অজ্ঞাতবাসে থাকাকালে পাণ্ডবেরা তাঁদের ভিক্ষালব্ধ অন্ন জননী কুন্তীকে এনে দিতেন আর তিনি প্রথমেই তা দু’ভাগে ভাগ করতেন–এক ভাগ কুন্তীসহ চার পাণ্ডবের জন্যে আর অপরাংশ ভীমের জন্যে–

‘‘অর্ধ খান কুন্তীসহ চারি সহোদরে

অর্ধেক বাঁটিয়া দেন বীর বৃকোদরে৷’’

ভীম নেকড়ে বাঘের মতই খেতে পারতেন তাই তাঁকে বলা হত ‘বৃকোদর’৷ এ প্রসঙ্গে তোমাদের ভৈমী একাদশীর কথাও বলেছি৷ একবার ভীমের নজরে এল সমস্ত প্রতিষ্ঠিত মানুষ...সাত্ত্বিক মানুষ একাদশীতে উপবাস করে থাকেন৷ কেউ উপবাস না করলে লোকে জিজ্ঞাসা করে–আপনি কি আজ অসুস্থ?...আপনার বয়স কি বারর নীচে? কিন্তু দ্বাদশোর্ধ্ব হয়েও ভীম একাদশী করেন না৷ এজন্যে ভীম আত্মগ্লানিতে ভুগতে লাগলেন৷ একদিন প্রত্যুষে কুন্তীকে বললেন, ‘‘মা, আমিও আজ একাদশী করবো৷’’

কুন্তী বললেন, ‘‘না বাছা, তোমার আর একাদশী করে কাজ নেই৷ তুমি ক্ষিদে–তেষ্টা সহ্য করতে পার না৷ অনর্থক কষ্ট করৰে কেন?’’

ভীম বললেন, ‘‘না মা, আমি বিশ্বজনকে দেখিয়ে দোৰ, আম্মো পারি৷’’

কুন্তীদেবী বললেন, ‘‘তবে একটু চেষ্টা করে দেখ বাবা, বেশীক্ষণ তিষ্ঠোতে না পারলে আমাকে ৰলো৷ আমি তোমার জলখাবার তৈরী করে রাখৰো৷’’

সূর্যোদয়ের পরেও পাঁচ মিনিট উৎক্রান্ত হয়ে গেল৷

ভীম ৰললে, ‘‘দেখলে মা, সূর্যোদয়ের পর পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেল৷ তৰুও আমি তোমাকে বলিনি ‘মা, খেতে দাও’৷

কুন্তী ৰললেন, ‘‘এই জন্যেই তো লোকে তোমাকে মহাবীর ৰলে খাতির করে৷ তুমি কি গায়ের জোরেই শুধু বীর মনের জোরেও যে বীর তা’ প্রমাণ করে দিলে৷’’

সূর্যোদয়ের পর দশ মিনিট কেটে গেল৷ ভীম হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ৰললে–মা, দশ মিনিট পেরিয়ে গেল৷ আমি ডায়েরীতে লিখে রাখলুম, তুমিও লিখে রাখো৷ ভীম ও কুন্তী যথাবিধি ডায়েরীতে তা’ লিখেও রাখলেন৷ ভীম একটু বাড়তি ফোড়ন কেটে বললে–‘‘যদিও একটু একটু ক্ষিদে পাচ্ছে তবু আমার দৃঢ় প্রত্যয় আমি এ ক্ষুধাকে জয় করে নোব৷’’ আবার খানিকক্ষণ বাদে ভীম বললে–‘‘মা, পনর মিনিট হল, আপ্রাণ চেষ্টা তো করলুম ক্ষিদে যেন একটু বেশীই পাচ্ছে, কী করা যায় বল তো’’

কুন্তী বললেন–‘‘কী আর করা যায় ছেলেমানুষ তুমি–ক্ষিদে পেয়েছে, আমি তো আগেই ৰলেছিলুম, তোমার জলখাবার তৈরী করে রেখেছি৷’’

ভীম তখন ৰললে–‘‘তুমি যদি ৰল তাহলেই জলখাবার খাব–না বললে খাব না৷ মায়ের আদেশ তো মানতেই হবে৷ তাই তুমি যদি বল তবেই খাৰ, নইলে খাৰ না৷’’

কুন্তী বললেন–‘‘আমি তোমাকে বলছি, তুমি খাও৷ এতে কোন দোষ হৰে না৷ কথাটা তোমার ডায়েরীতে লিখো না, আমার ডায়েরীতেও লিখবো না৷’’

ভীম তার পরে তাঁর প্রাতরাশ সেরেছিলেন সাত মণ খই খেয়ে৷ সেই থেকে সেই তিথিটিকে লোকে ভৈমী একাদশী বলে থাকে৷ কেউ যদি এখনও একাদশীর দিনে লুকিয়ে চুরিয়ে খেয়ে ফেলে কিংবা একাদশী তিথিতে অল্প জলখাবারও খায় (তা পরিমাণে যেমনই হোক না কেন) লোকে ঠাট্টা করে তাকে ভৈমী একাদশী বলে৷

‘‘শয়ন–উত্থান–পাশমো

            তার মধ্যে ভীমে ছোঁড়া

পাগলার চউদ্দ, পাগলীর আট

            এই নিয়ে কাল কাট৷

এও যদি না করতে পারিস

            ভগার খাদে ডুবে মরিস৷’’

শয়ন–একাদশী (জগন্নাথের শয়ন), উত্থান–একাদশী (জগন্নাথের রোগ থেকে উত্থান), পার্শ্ব–একাদশী (কলমীশাকের বিছানায় পটোলের ৰালিশে জগন্নাথের শয়ন), ভৈমী একাদশী (ভীমের একাদশী ব্রত উদ্যাপন), পাগলার চউদ্দ (অর্থাৎ শিব চতুর্দশী), পাগলীর আট (মহাষ্টমী)–এগুলি প্রাচীনকালে অবশ্য পালনীয় ৰলে গণ্য করা হত৷ ৰলা হত এইগুলিও যদি না করতে পার তবে ভগার খাদে......অর্থাৎ রাজা ভগীরথ যে খাল কাটিয়েছিলেন সেই খালে অর্থাৎ ভাগীরথীর জলে ডুৰে মর অর্থাৎ সেখানে যেন শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়৷

 

আমি তো রোজ স্বপ্ন দেখি

লেখক
শ্রী রবীন্দ্রনাথ সেন

আমি তো রোজ স্বপ্ণ দেখি নতুন ভোরের

আমি তো রোজ স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের

অমানিশার অবসানে এসেছে নতুন ঊষা

দেখেছি তিমির বিনাশী নতুন দিশা

উদার আকাশে বিহঙ্গরা মেলে পাখা

মুক্ত বাতাসে দোলে সবুজের শাখা৷

দেখি পৃথিবীর সাজিখানি ভরা নানা ফুলে

কাঞ্চন কেয়া কুন্দ কুমুদ কমলে

সুষ্ঠু সবল সুন্দর সতেজ প্রতি দল

সুরভিত সুশোভিত হাসে অনুপল

শ্যামল সুন্দর মধুর ধরাতল৷

মানুষে মানুষে নেই বিভেদ ঘৃণা–বিদ্বেষ

জ্ঞানের আলোয় ভরা মুক্ত বুদ্ধির এক দেশ৷

শোষণ বঞ্চনা নেই,

নেই নিদারুণ যন্ত্রণা অনাহার

আধি ব্যাধি হয়েছে শেষ, শেষ দম্ভ অহংকার৷

গুণী পায় মান, ঋষি পায় সম্মান

কর্ষক শ্রমিক সবারই সমান অধিকার৷

তীব্র কটাক্ষ চক্ষে তবু মৃদু হাসি হেসে,

ভৈরব বেশে কারা যেন দাঁড়িয়েছে এসে৷

আর দেরী নয় ঃ তাই অবশেষে

ভালবেসে সবে পাশাপাশি বসে

ভাগ করে পান করে মধু

ধরণীর মধুভাণ্ড হতে৷

 

উৎসর্গ

লেখক
আচার্য প্রবুদ্ধানন্দ অবধূত

সুন্দর বাগানের ফুল পাতা

দিনে দিনে ঝরে পড়ে!

নিয়তির ডাক,

যে না বোঝে,

বিষন্নতায় ভোগে সে

ব্যথা-বেদনায় অন্তরে৷

 

বিধাতার লীলা খেলা,

সৃষ্টির রচনা ভার,

হাসাও কাঁদাও প্রভু,

বুঝিনা লীলা তোমার৷

 

তুলে নিলে নিজ কোলে

মোদের প্রিয় কেশবানন্দদারে,

তোমার কোলই হোক আলোকিত,

বিদায় জানাই, সশ্রদ্ধায়,

ছল ছল আঁখি ব্যথা ভ’রে৷

উৎসর্গ করি তাঁরে তোমার চরণে৷