আন্তর্জাতিক শুভ নববর্ষ ২০২৪

লেখক
আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত

কালের নিয়মে বয়স বেড়ে গেল একটা বছর৷ বিপরীতে আয়ুক্ষয় হল একটা বছর৷ বিগত বছরে কি পেলাম কি হারালাম, সে হিসাব করলে হিসাবের ঝুলিতে শূন্যই থাকবে৷ মূল্যবান একটা বছরের অনেকটাই বাজে কাজে, বাজে কথায় কেটে গেছে৷ সে হিসাব থাক!

আর পাঁচটা দিনের মতই নিঃশব্দে অন্ধকারের চাদর সরিয়ে নববর্ষের প্রথম প্রত্যুষ পূবআকাশে প্রকাশিত হলো৷ কিন্তু মানব সমাজের মানুষের জীবনের অন্ধকার কী সহজে অপসারিত হবে? পুরাতনের কঙ্কাল আঁকড়ে গণ্ডীবদ্ধ জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে? সাম্প্রদায়িকতার গণ্ডী, জাতপাতের গণ্ডী, প্রাদেশিকতার গণ্ডী সব সংস্কারের বন্ধন ছিন্ন করে, সব অন্তরায় প্রতিহত  করে মানুষ কবে উদার ঐক্যে সুসম্বদ্ধ হয়ে মনুষ্যত্ব অর্জনের দুঃসাধ্য সাধনায় ব্রতী হবে!

প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই নববর্ষ আসে যায়, কত সহজে, কিন্তু মানুষের জীবন এত সহজ নয়৷ বিধাতা মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছে৷ মানুষ সেই বুদ্ধিকে দুর্বুদ্ধিতে পরিণত করে নিজের চারিদিকে অন্ধকারের প্রাচীর গড়ে তুলেছে৷ এই অন্ধকারের প্রাচীর মানুষের বুদ্ধি ভ্রষ্টতার, যুক্তিবিচারহীন যথেচ্ছাচারিতায় রচিত৷ সেই প্রাচীর ভেঙে মানুষ আজও বেরিয়ে আসতে পারল না৷ তাই মানুষের নববর্ষের বিজয়বার্তা ঘোষনার সময় এখনও আসেনি৷

তবু মানুষ আমরা এগিয়ে চলেছি দিনে দিনে পলে পলে সেই মঙ্গল পরিণামের দিকে৷ আজ নববর্ষের নবীন সূর্যের আলোকে স্নান করে আমরা এগিয়ে চলবো সব তুচ্ছতা দূরে সরিয়ে অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারের জাল ছিন্ন করে৷

এদিকে বৎসর শেষের আগেই আর্থিক দুর্র্যেগের পূর্বাভাষ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার, অভিশপ্ত সাম্প্রদায়িকতা শাসকের প্রশ্রয়ে পালিত হচ্ছে৷ ক্ষুধার অন্নের পরিবর্তে উপাসনার মন্দির দিয়ে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে৷ গণতন্ত্রের বেদীতে ব্যষ্টিতন্ত্রের স্বৈরাচারী আত্মপ্রকাশ দিন দিন প্রকট হচ্ছে৷ জনসাধারণ শাসকের  দয়ার দানের অপেক্ষায়, শাসক ধনকুবেরদের প্রসাদ লোভী, তার পদসেবায় ব্যস্ত চৌকিদারিতে ব্যস্ত৷ জনগণের তন্ত্র সংবিধানের পাতায় আবদ্ধ৷ রাষ্ট্র চলছে পুঁজিপতির অঙ্গুলী হেলনে রাজনৈতিক দলের তত্ত্বাবধানে৷ রাষ্ট্রের ঘাড়ে ঋণের বোঝা চাপছে, ধনকুবেরদের ঋণ মুকুব হচ্ছে৷ বিজ্ঞানের কল্যাণে বহিঃপ্রকৃতির সম্পদে মানুষের অঞ্জলি ভ’রে উঠছে, হৃদয়ের দিক দিয়ে মানুষ দিন দিন নিঃস্ব, রিক্ত সংকীর্ণ গণ্ডীবদ্ধ জীবনে অভ্যস্ত হচ্ছে৷ ন্যায় নীতি বিবেক সব হারিয়ে মনুষ্যত্বের দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে৷

জীবন থেকে অনেকটা সময় চলে গেছে৷ মানুষ আর কতদিন এই পৃথিবীতে জরাজীর্ণ হয়ে বাস করবে? পুরাতনের আবর্জনা ঝেড়ে ফেলে সমস্ত প্রকার বাধা বিঘ্নকে দু-পায়ে দলে, নববর্ষের নব প্রভাতে নবীন আলোকে জেগে উঠুক মানুষ নবযুগের সৃষ্টির এষনায়৷

জীবনের সর্বক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছে আনন্দমার্গ নবযুগের পথ প্রদর্শক হয়ে৷ আনন্দমার্গ কালের গতিপ্রবাহ প্রসূত কোন পরিবর্তন নয়৷ এক সুসন্নিবদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার অর্থনৈতিক সামাজিক ও আধ্যাত্মিকতার দৃঢ় সংযোগ আনন্দমার্গ যা মানব ইতিহাসে আসে কখনও পরিলক্ষিত হয় নি৷ আনন্দমার্গের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক সংঘটন, মানসিক চিন্তাধারা,আধ্যাত্মিক অনুশীলন প্রচলিত ব্যবস্থাগুলো থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও নোতুন এক জীবনাদর্শ যা মানুষকে মানুষ করে গড়ে তুলবে৷ আসুন ২০২৪ এর প্রথম প্রত্যুষ থেকেই আনন্দমার্গের স্বতন্ত্র ও বৈপ্লবিক জীবনাদর্শকে পাথেয় করে আদর্শ সমাজগড়ার কাজে ব্রতী হই৷