৪০ বছরে  নেলি গণহত্যা---বাঙালীর রক্তে ভেজা বিস্মৃত একটি দিন

লেখক
সাধন পুরকায়স্থ

পূর্বপ্রকাশিতের পর,

জায়গাটা অসম তাই সেখানকার মানুষ অধিবাসীদের সহ্য করছেন ও যদি এই ঘটনা পঞ্জাবে ঘটতো, তাহলে সেখানকার  মানুষ নাকি ‘‘অধিবাসীদের কেটে টুকরো  টুকরো করে দিতেন৷’’

এই উত্তেজক ভাষণের ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়,  যদিও শ্রীমতী গান্ধীর দ্বারা পাঠানো ৪০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সি.আর.পি.এফ) ও ১১ কোম্পানি ভারতীয় সেনার উপস্থিতিতে জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ তে অসম বিধানসভা নির্বাচন পার হয়৷ নেলির বাসিন্দাদের ভোট পান তৎকালীন কংগ্রেস (আই) প্রার্থী প্রসাদ দলৈ৷ এর ফলে অসম আন্দোলনের নেতৃত্বের চোখের বিষ হয়ে ওঠেন এই অঞ্চলের বাঙালি গ্রামবাসীরা৷

নেলি গণহত্যায় স্ত্রী আর চার বছরের সন্তান হারানো আলিমুদ্দিন চন্দ কে বলেন, ‘‘এই ঘটনা (কংগ্রেস কে ভোট দেওয়ার) নেতাদের ক্ষিপ্ত করে ও তারা নির্বাচনের জন্যে মোতায়েন করা সি আর পি এফ জওয়ানদের প্রত্যাহারের পরে  রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার হুমকি দেন৷’’

এর পরে আসে সেই দিন৷ প্রত্যক্ষদর্শীরা চন্দকে জানিয়েছিলেন যে ১৮ই ফেব্রুয়ারি ভোর বেলা করে থেকে  ১৪টি গ্রামে  একযোগে আক্রমণ শুরু করে খুনে বাহিনী৷ তাদের মধ্যে সর্বাধিক ছিল ছোট নাগপুর থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা অসমে আনা আদিবাসীরা৷ ভোরবেলায় আগ্ণেয়াস্ত্র, বল্লম, তীর ধনুক ও মশাল নিয়ে এই দাঙ্গাকারীরা আক্রমণ চালায় গ্রামে গ্রামে৷ নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু হয় মানুষের উপর আর প্রতিটি কুঁড়েঘরের চালে মশাল দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়৷ যাঁরা দৌড়ে পালাতে যান তাঁদের গুলি খেয়ে মরতে হয়৷ ঘটনায় হতচকিত হয়ে যান সাধারণ গ্রামবাসীরা, যাঁরা নিজেদের বাড়ির দা-কাটারিও বের করতে পারেননি প্রতিরোধ করার জন্যে৷

‘‘কী করে বন্দুকবাজ খুনিদের আমরা রুখে দিতাম? আমরা  আমাদের কাস্তে বা ছুরি বের করার আগেই তারা আমাদের গুলি করে দিচ্ছিল,’’ মহম্মদ হজরত আলী বলে মাটি পর্বত গ্রামের এক বৃদ্ধ চন্দকে জানান৷ এই আক্রমণের আগাম খবর কিছু মানুষ স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য বাবুলালের  থেকে জেনে গেছিলেন বলে আগের থেকে প্রস্তুত ছিলেন ও পালিয়ে ১১ কিমি দূরে জাতীয় সড়কে পৌঁছে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হন৷ কিন্তু বাকিরা এত ভাগ্যবান ছিলেন না৷  বৃদ্ধ, মহিলা থেক শুরু করে যুবকদের,  এমন কি মাদ্রাসার পড়ুয়া বাচ্চাদেরও রেহাই করেনি  গণহত্যাকারী বাহিনী৷

চন্দের রিপোর্টে বলা হয়েছে যে কোনো ক্রমে ১৪টি গ্রামের  বাসিন্দারা পালিয়ে কপিলী আর কিলিং নদীর সঙ্গমস্থল বসুন্ধরী বিলে পৌঁছান৷ কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয়৷ তাঁদের চতুর্দিকে থেকে ঘিরে ধরে গুলি করে মারতে থাকে দাঙ্গাকারীরা৷ এরমধ্যে  অনেকে প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দিলেও অন্যদিকে উঠতেই তাদের বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়৷ যাঁরা কোনোভাবে জঙ্গলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, তাঁরা কোনোভাবে তখন বেঁচে গেলেও, হিংসার ফলে পাওয়া আঘাতের কারণে তাঁদের জঙ্গলেই মৃত্যু হয়৷ মধ্যাহ্ণে ছয় ট্রাক ভর্তি পুলিশ বাহিনী বসুন্ধরী বিলে হাজির  হলে আক্রান্ত গ্রামবাসীরা মনে ভরসা পেলেও সেই ভরসা ক্ষণস্থায়ী হয়৷ কারণ হত্যাকারীদের আক্রমণ না করে পুলিশ গ্রামবাসীদের তাক করে গুলি চালানো শুরু করে৷ মাটি পর্বতের আব্দুল সাত্তার চন্দ কে জানান, ‘‘আশ্চর্যজনকভাবে  আমাদের  উপর আক্রমণকারীদের গুলি না করে তারা (পুলিশ) আমাদের  তাক করে গুলি চালানো শুরু করে৷ কোনো অজ্ঞাত কারণে পুলিশগুলো আমাদের দিকে নির্দয় হয়ে গুলি চালাতে থাকলো৷’’ বাবুলালের থেকে আগাম খবর পেয়ে সাত্তারও তাঁর পরিবারকে বাঁচাতে সক্ষম হন৷ সূর্য অস্ত যাওয়ার কিছু আগে সি.আর.পি.এফ আসে৷ এই সি.আর.পি.এফ বাহিনীকে দেখে দাঙ্গাকারীরা পালিয়ে যায়৷ তবে সি.আর.পি.এফ তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে আর তাতে বেশ কিছু দাঙ্গাকারীরা মৃত্যু হয়৷ কিন্তু যতক্ষণে সি.আর.পি.এফ .এসে গ্রামবাসীদের বাঁচায় ও জাতীয় সড়কে নিয়ে যায় ততক্ষণে বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে নেলির৷ হাজার হাজার মানুষ মারা গেছেন, অসংখ্য পরিবার শেষ হয়ে গেছে৷ তবে মৃত্যু মিছিল এখানেই শেষ হয় না৷ এর পরে বহু মাস আক্রান্তদের ত্রাণ শিবিরে থাকতে হয় খুবই শোচনীয় অবস্থায়৷ সেখানে অসংখ্য শিশু পেটের সমস্যায় মারা যায় বলে গ্রামবাসীরা চন্দকে জানান৷

নেলি গণহত্যা ঃ বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে ঃ

নেলি গণহত্যা সংক্রান্ত ৬৮৮টি ফৌজদারি মামলা দায়ের  করে পুলিশ৷ এর মধ্যে আবার ৩৭৮টি মামলা ‘‘প্রমাণের অভাবে’’ প্রত্যাহার করা হয় আর ৩১০ মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়া যায়৷ কিন্তু এরই মধ্যে দেশের রাজনীতিতে এমন কিছু ঘটে যার ফল ভোগ করেন এই গণহত্যায় আক্রান্ত ও  নিহতদের  পরিজনেরা৷

১৯৮৪ সালের জুন মাসে শ্রীমতী গান্ধীর সরকার ভারতীয়  সেনা বাহিনীকে অমৃতসরে অবস্থিত শিখ ধর্মের পবিত্র তীর্থস্থান স্বর্ণমন্দিরে খালিস্তানি জঙ্গী নিধনের জন্যে ‘‘অপারেশন বুষ্টার’’ নামক সামরিক অভিযান চালানোর অনুমতি দেয়৷ এরপরে সেনাবাহিনীর  আক্রমণে সেখানে  নিহত হন অসংখ্য সাধারণ শিখ ধর্মালম্বীরা ও বিশ্বজুড়ে এই ঘটনা একটি আলোড়ন সৃষ্টি করে৷ এর বদলা নিতে শ্রীমতী গান্ধীকে তাঁর বাসভবনেই সেই  বছরের অক্টোবর মাসে গুলি করে হত্যা করে তাঁর শিখ দেহরক্ষীরা৷ এই ঘটনার পরে দেশজুড়ে কংগ্রেস পার্টির প্ররোচনায় শিখ নিধন হয়৷

এর পরেই নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার  গড়েন শ্রীমতি গান্ধীর পুত্র রাজীব গান্ধী৷ ক্ষমতায় এসে গান্ধী আমলাদের সাহায্যে আসু ও অসম আন্দোলনের নেতৃত্বের সাথে  অসম চুক্তি সই করেন ১৯৮৫ সালের অক্টোবর মাসে৷ এই চুক্তির ফলে একদিকে যেমন সরকার অসম আন্দোলনের দাবি  মেনে বাঙালিদের ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার পথ রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায়, তেমনি অন্যদিকে নেলি গণহত্যা কাণ্ডের যে সকল মামলায় পুলিশ চার্জশিট জমা দিয়েছিল সেই সকল মামলাও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়৷

অন্যদিকে অসম আন্দোলনের থেকে কয়েকটি ধারার রাজনীতির উৎপত্তি হয়৷ একদিকে আসু থেকে প্রফুল্ল মহন্ত প্রতিষ্ঠা করেন অসম গণ পরিসদ (অগপ), যে দল নির্বাচনে জিতে অসমে সরকার গড়ে, অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ইয়ূনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ অসম (উলফা) সৃষ্টি হয় হিংসাত্মক আন্দোলন চালিয়ে যেতে৷ এছাড়াও আসু নিজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এই দুই সংঘটনের থেকে আলাদা ভাবে চালিয়ে যেতে থাকে৷ কংগ্রেস যেহেতু তাঁদের বাঁচার অধিকার সুনিশ্চিত করতে পারেনি, তাই নেলি গণহত্যা কাণ্ডের পরে বেঁচে থাকা সেই অঞ্চলের মানুষ প্রাণ বাঁচাতে অগপ-র সাথে সমঝোতা করেন বলে চন্দ তাঁর রিপোর্টে উল্লেখ করেছিলেন৷ অগপ সরকার ঘটন করার পরে অসম চুক্তি অনুসারে নেলি গণহত্যার বাকি মামলাও প্রত্যাহার করে নেয়, ফলে অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরতে থাকে অঞ্চলে৷

অন্যদিকে, নেলি গণহত্যা কাণ্ডে সরকারি খাতায় দেখানো ২,১৯১ মৃত্যদের পরিবার পিছু তৎকালীন সময়ে যেখানে ৫,০০০ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, সি.আরপি.এফ-এর গুলিতে হত গণহত্যাকারীদের অগপ সরকার ‘শহীদ’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়, ও তাদের পরিবার পিছু ৩৫,০০০ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয় বলে গ্রামবাসীরা চন্দ কে জানিয়েছিলেন৷

নেলি গণহত্যা ও বর্তমান ভারত ঃ

নেলি গণহত্যা যেহেতু ১৯৮৪ সালের শিখ গণহত্যা, ১৯৯২ ও ২০০২-এর মুসলিম গণহত্যার আগে হয়েছিল তাই যেমন হিংস্রতার ক্ষেত্রে তেমনি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার ক্ষেত্রেও এই ঘটনা একটি পথ প্রদর্শক ভূমিকা পালন করেছিল, যা ভবিষ্যতের গণহত্যার অংশ নেওয়া হত্যাকারীদের বলিষ্ঠ হওয়ার মানসিক শক্তি জুটিয়েছিল৷ রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট হয়ে যদি কোনো শক্তি গণহত্যায় অংশ নেয় তাহলে তারা যে আইনের  ভয় ছাড়াই বুক ফুলিয়ে দিনের আলোয় অপরাধ করতে পারে সেই প্রমাণ ভারতে নেলি গণহত্যা কাণ্ড প্রথম দেখায়৷ এর পরে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে৷ অসমের মাটি বারবার বাঙালির রক্তে লাল হয়েছে৷ ভীষণ রকমের বহিরাগত বিরোধী সেজে রাজনীতির আঙিনায় ঢোকা অগপ আর অন্যান্য তথাকথিত জাতীয়তাবাদী শক্তি বাঙালি বিরোধীতার সুর তীব্র করলেও হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান স্লোগান তুলে, হিন্দি ভাষা ও উত্তর ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তারকারী বিজেপির লেজুড়ে পরিণত হয়েছে৷ তারা যদিও বা বিজেপি বিরোধিতা করে তবুও সেটা অসমের বাঙালিদের প্রতি বিদ্বেষ থেকে৷ বিগত কয়েক দশকে অসমের হিন্দি প্রীতি চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে৷

বর্তমানে বিজেপি শাসনাধীন অসমে বাঙালি মুসলিম আর হিন্দুদের মধ্যে বিদ্বেষের প্রাচীর তুলে এই জাতির অধিকারকে ক্ষুন্ন করার নানা অভিযোগ বিজেপির বিরুদ্ধে উঠেছে৷ এন.আর.সি করে, ফরেনার্স ট্রাইবুনালের মাধ্যমে অগণতান্ত্রিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব যেমন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তেমনি বুলডোজার চালিয়ে বা সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে বাঙালি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বারবার আক্রমন নামিয়ে আনারও অভিযোগ তোলা হচ্ছে অসমে৷

এই পরিস্থিতিতে, যখন বর্তমানের অধিকারই বাঙালিদের ক্ষুন্ন হয়েছে, সেখানে ৪০ বছর আগে সংঘটিত নেলি গণহত্যা কাণ্ডের শিকার হওয়া গরিব মানুষগুলোর জন্যে ন্যায় আশা করা অনেকটা বালখিল্যতা হয়ে যাবে৷ প্রায় ৩৫ বছর আগে যেভাবে চন্দের রিপোর্টে অসমের অখ্যাত থেকে কুখ্যাত হওয়া নেলির ১৪টি গ্রামের মানুষের বেদনা পরিস্ফূটিত হয়েছিল সেই বেদনা কি আগামী দিনে নতুন প্রজন্মের চেতনায় আঘাত করবে, এই প্রশ্ণের জবাব দেওয়ার সময় কিন্তু এখনো হয়নি৷