কালের প্রয়োজনে বাঙালী তার হৃতগৌরব আবার ফিরে পাবে।

লেখক
এইচ, এন, মাহাতো

ছোটবেলায় শুনতাম -- "মোদের গরব মোদের আশা আ-মরি বাংলা ভাষা" অথবা "বাংলার মাটি বাংলার জল বাংলার বায়ু বাংলার ফল পূর্ণ হোক পূর্ণ হোক হে ভগবান"। তখন খুবই ছোট, দেশ নাকি স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু আমার ঠাকুমা বলতেন কী লাভ হোলো স্বাধীনতায় ! আমি আমার স্বামী, মেঝোছেলে, ভাই বা ওপাড়ার মিলন কাকুরা কী পেল?  তারাতো জীবন দিলো আর আমাদেরকে অকুল পাথারের কোন দ্বীপে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল। তারপর গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মত পূর্ববঙ্গ থেকে আসা হাজার হাজার আত্মীয় স্বজনের এক কাপড়ে দেশ ত্যাগের জ্বালা। আমি খুব ছোট না হলেও তাদের কথাগুলো শুনতুম--- গোয়াল ভরা গরু, তাদের দুধ, গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ কত কী। আজ তারা স্বর্বসান্ত, দিশেহারা--- কী করবে কেউ কিচ্ছু জানেনা। তার ওপর নানা ব্যাধিতে  না পায় ডাক্তার, না ঔষধ পাতি!কে দেখবে  তাদেরকে?  তারা যে বহিরাগত! আমার আশ্চর্য লাগত যারা এসেছিলেন

তারাও বাংলা ভাষায় কথা বলে, আমরাও বাংলায় কথা বলি, তবে তারা কেন বহিরাগত। আমি যাদের কাছে এত সম্পদের কথা শুনেছি তাদের ছেলেরা বড় বড় লাইন দিয়ে কিছু চাল অথবা অন্য কিকি এনে একবেলা খেয়ে দিন চালাতো। আবার শুনতাম পাশের বাড়ির ছেলেকে চুরির দায়ে পুলিশ থানায় নিয়ে গেছে, এই নিয়ে কত দরবার। আমি তখন থেকেই  বাঙালী জাতির এই নিদারুণ কষ্টের কারণ খুজতে শুরু করলাম। ইতিহাস বেত্তাগণ কোথাও লেখননি বাঙালীরা কোথাও উপনিবেশ গড়ে অন্য দেশের সম্পদ লুটপাট করে বাঙালীস্তানকে সাবলম্বী করেছে। ঐতিহাসিকগণ এটাও স্বীকার করেছে ভারতের অন্য প্রত্যান্ত প্রদেশের  বা বর্হিভারতের অনেকে এসে বাঙালীস্তানের সম্পদ লুটপাট করে নিয়ে গেছে। এরথেকে এটাই প্রমাণ হয় প্রকৃতির সম্পদে ভরা ছিলো বাঙালীস্তান। আমরা এখনো দেখছি অন্য প্রদেশ থেকে আসা মানুষরা এখানকার সম্পদ, অর্থ লুটপাট করে নিজের প্রদেশে নিয়ে যাচ্ছে।আর সেই

বাঙলায় বাঙালী আজ স্বর্বহারা।  কবি তাঁর কলমে লিখেছেন "এমন দেশটি কোথাও খুজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্ম ভূমি"। অর্থাৎ কবিতার ভাষায় কবির জন্ম হয়ে ছিলো এই বাঙালীস্তানে। আমি একটু বড়ো হয়ে আমার শিক্ষকদেরকে এই বাঙালী ও বাঙালীস্তানের ইতিহাস জানতে চাইতাম। পরবর্তীতে আমার জীবনের একটি দিক খুলে যায় মহান দার্শনিক (সামাজিক অর্থনৈতিক দর্শন প্রাউট প্রণেতা) পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকারের সংস্পর্শে এসে।  তার বাণী ও ব্যাষ্টিত্ব আমার বাঙালীস্তানকে  জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছিলো।

আমি জানতে পারলাম যে মোঘল আমলের পূর্বে যারা এখানে এসেছে লুটপাট করে চলে গেছে। মোঘলরা শাষণ ও শোষণ বা অত্যাচার করেছে, কিন্তু বেশি সংখ্যক সম্পদ এদেশেই খরচ করেছে। তার জন্য কিছু কিছু করদ রাজ্য বা স্বাধীনচেতা রাজারা লড়াই করেছে, কিন্তু সারা ভারতজুড়ে মোঘল বিরোধী সংঘটিত কোন আন্দোলন হয়নি। এরপর এলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। তারা র অর্থ ও সম্পদ লুট করতে শাসনের নামে ঔপনিবেশবাদ গড়ে তুলতে গিয়ে নানা প্রকারের আইন তৈরী করে প্রায় দুই শত বছর রাজত্ব কায়েম করে। ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মূল উৎস খোঁজ করতে গিয়ে ইংরেজরা বুঝতে পারে বাঙালীরাই এর উৎস। ইংরেজরা ভারতে দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে দেখলেন সুবা বাংলা বা বাঙালীস্তানের জনগণের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড না ভাঙ্গলে বাঙালীরা ব্রিটিশ শক্তির ওপর বারবার আঘাত হানবে। তাই তাদের অর্থনৈতিক উৎসকে বাঙালীস্তানের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। সেই সময় ভারতে অসম বলে কোন রাজ্য ছিলো না। তারা বাঙালীস্তানকে কেটে ১৮৭৪ সালে উত্তর- পূর্বাঞ্চলের অসমতল স্থানটির রাজনৈতিক নাম রাখল অসম। বাঙালীস্তানের স্থানীয় নাগরিকগন এই প্রস্তাবে রাজি ছিলো না। বাংলার  কৃষি অঞ্চলকে কেটে অসম তৈরী করলেও ইংরেজরা বলে ছিলো বাঙালীদের ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন প্রকার ব্যাঘাত ঘটবে না। কেননা আজকে যারা নিজেদের অসমের মূল অধিবাসী বলে দাবি করে তারা ছিলো বহিরাগত। তাই তাদের ভাষার সেই সময় কোন মূল্য ছিলো না। এই বাঙালীদের সঙ্গে থেকে তারা শিক্ষিত হয়েছে, কাপড় পরতে শিখেছে, কৃষি কাজ করতে ও সুসম খাদ্য রান্না করে খেতে শিখেছে। এক কথায় ভদ্র হতে শিখেছে। আজ এই ক্ষুদ্রমনা অসমিয়ারা বহিরাগত হয়েও ভারতীয়! অন্যদিকে স্থানীয় বাঙালীরা আজ তাদের নাগরিকত্ব, শিক্ষা, চাকুরী, কর্মসংস্থান ও জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত।

 আবার ব্রিটিশরা বাঙালীস্তানকে অর্থাৎ বঙ্গকে ১৯০৫ সালে দুই ভাগে বিভক্ত করতে গিয়ে তৎকালীন আমলে মহাপুরুষ বাঙলার জলন্ত অগ্নিপিন্ড বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,ঋষি অরবিন্দ আরো অনেকে বঙ্গভঙ্গের তীব্র প্রতিবাদ করলে চতুর ইংরেজ বঙ্গভঙ্গ রোধ করতে বাধ্য হয়।  ১৯১২ সালে অসমকে সমৃদ্ধ করতে বাংলার কৃষি অঞ্চল রংপুর জেলার ধুবড়ি অঞ্চল আজ অসমের চারটি জেলা, ময়মনসিংহের নওগাঁ অঞ্চল, জয়ন্তীয়া, খাসিয়ার সমতল, সিলেটের কাছাড় আজ যাহা তিনটি জেলা, অসমের সঙ্গে জুড়ে দেয়। অন্যদিকে বাঙলার শিল্পাঞ্চল রৌড়কেল্লা, ধানবাদ বোকারো সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে বাঙলা থেকে কেটে ওড়িশা ও বিহারকে দেওয়া হয়। শুধুমাত্র বাঙলা ও  বাঙালীকে ভাতে ও হাতে মারতে দমন, পীড়ন ও শোষণের দাবানল চালাতে সুবিধা হবে এই চিন্তা করেই। সব শেষে বাঙলা আরো ভাগ হলো। ভারতের স্বাধীনতার নামে তৈরী হলো পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গ। এটা হিন্দিসাম্রাজ্যবাদীদের দুরভিসন্ধি, কেননা দুই বাঙলা এক থাকলে দিল্লিকে বাঙালীস্তানের কথায় চলতে হতো। আজ যেমন উত্তর প্রদেশের কথায় চলে।

এবার তৎকালীন আমলে ব্রিটিশের ছত্রছায়ায় থাকা হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের  ধামাধরা কংগ্রেস (এখন অবশ্য অনেক দল তৈরী হয়েছে, যেমন--- জনতাদল, বিজেপি,  মার্কসবাদেরদল, বিভিন্ন রাজ্যের তৃণমূল সহ স্থানীয় দল (এদের পূর্ব পুরুষগন একসময়ে কংগ্রেসে ছিলো বা বিরোধী ছিলো)।  ১৯১২  সালে ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেসের বার্ষিক  অধিবেশনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো বাঙলা ও বাঙালীরা যাতে একযোগে হাতে হাত মিলিয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াই করে।  স্বাধীনতা পর আবার সমগ্র বাঙালীস্তানকে এক ছাতার তলায় এনে তার হৃতগৌরব ফিরিয়ে দেবে। ৭০ বছর পরেও কংগ্রেস কেন, কোন কেন্দ্রীয় সরকার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। ভারতে ভাষা ভিত্তিক রাজ্য হওয়ার পরেও, বাঙালীরা প্রশ্ন করলে সাম্প্রদায়ীক বলা হয়।

  বাঙালীর প্রতি কেন এই বিমাতৃসুলভ আচরণ? কারন হোলো বাঙালীস্তান যদি তার হৃতগৌরব অর্থাৎ মানবিকতায়, ধর্মে, ধনে, মানে, শিক্ষা-সাহিত্যে-শিল্পকলায়, শিল্পে, সংস্কৃতিতে, ব্যবসা-বানিজ্যে ইত্যাদি ইত্যাদিতে বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে তবে শোষণের অবসান ঘটবেই ঘটবে। বাঙালীস্তান তথা ভারতবর্ষের মানুষ রাজনৈতিক, ধর্মীয় অর্থাৎ মজহব বা ধর্ম মতবাদের নামে, সামাজিক, অর্থনৈতিক, দেশাচারের নামে মৌলবাদীরা ( সে যে সম্প্রদায় বা ধর্মের মতবাদ হোক) তারা আর মানব তথা মনুষ্যত্ববোধকে আঘাত দিতে পারবেনা। বাঙালী জাতিসত্তা আবার বিশ্বের কাছে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করবে। বাঙালী তার কর্মের দ্বারা এই শোষণ বঞ্চনার জবাব দেবে। বাঙালীস্তানের মানুষ মানবতাকে,  মূল্যবোধকে নব্য মানবতায় রূপ দিয়ে বিশ্বের দরবারে আলোকিত করবে ও বাঙালী তার হৃতগৌরব নিজেই প্রতিষ্ঠা করবে।

  বাঙালী জাতিসত্তা কে পুনরায় তার উচ্চ আসনে বসাতে এসেছেন মহান দার্শনিক, যুগদ্রষ্টা শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার তাঁর যুগোপযোগী সামাজিক অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে যাহা প্রাউট নামে পরিচিত। প্রাউটের আলোকেই বাঙালী আবার ত্রিভুবন জয় করবে।

শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার তার যুগান্তকারী বাণীতে বলেছেন, " বাঙালী নামধেয় জনগোষ্ঠী অতীতে জীবিত ছিল, আজও জীবিত আছে, ভবিষ্যতে আরও দুর্দান্তভাবে জীবিত থাকবে।’'