প্রভাতী

ফাঁসির  মঞ্চে হাসিমুখে

লেখক
আচার্য মুক্তানন্দ অবধূত

সবাই চকিত চকোর  বিস্ময়ে

চেয়ে রয় তোমা পানে

 বজ্রদীপ্ত  স্ফুলিঙ্গ বিদ্যুল্লেখা সম

এ বালক---কোথা হতে  আগমন !

পরাধীন  দেশে  বহিছে

শোষণের  তুফান---এমনি  দুঃসময়ে৷

ব্রিটিশ স্বার্র্থন্বেষী বহিঃশত্রু

কু-বুদ্ধি ব্যবসায়ী মনোভাব  আপ্লুত

অবাধ লুন্ঠনের ফন্দিবাজী গুপ্ত রেখে

প্রবেশিল  মোদের  স্বদেশে

নিরীহ  সরলপ্রাণ ধার্মিক ব্যষ্টিরে

ঘেরিল তারা  রক্তচক্ষু  জালে৷

হে ক্ষুদিরাম --- তুমি  নও  ক্ষুদ্র  মানব

দানবের ত্রাস তুমি

অল্পবয়সে  তব অঙ্গে ফুটন্ত শোণিত ধারা

ব্রিটিশের  রক্তচক্ষু- শাসনে

শোষণের  পরাকাষ্ঠায়

নিস্পেষিত  শত শত  স্বদেশী জনতা৷

ব্রিটিশ- দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ

নিরীহ  জাতির মুক্তিদানে

সংগ্রামে  লড়েছ জীবন-মরণ পণে,

কেহ রোধিতে  পারে না

তোমার  বীর বিপ্লবী জীবন,

ত্যাগ-তিতিক্ষা-সংগ্রামের প্রতিভূ

ধন্য তোমার জীবন

 দৃপ্ত কন্ঠে  ঘোষিছে বার্তা

স্বদেশের  স্বাধীনতা কথা৷

দেশমাতৃকার  সেবায় নিবেদিত

  মরণকে  করেছ বরণ

ক্ষুদ্র স্বার্থকে  তিলাঞ্জলি  দিয়ে৷

আপোষহীন সংগ্রামে  স্বাধীনতা লাভে

প্রয়োজন রাখনি আপন আবাস-নিবাস,

উৎখাত করেছ  কু-শাসন

আপন দেশের  মাটি হতে৷

দাসত্বের  শৃঙ্খল মোচনে

দৃঢ়  সংকল্পে রেখেছ বিরাট  অবদান৷

ভুলছি না , ভুলবো না তোমায়

 বারে বারে মোরা  স্মরণ করি

মেদিনীপুরের দামাল ছেলে

 এগারই  আগষ্ট  স্মরণীয়  দিনে

 ইতিহাস পটে চিহ্ণিত

তোমার  অম্লানকীর্ত্তি,

দেশের সেবায় প্রাণ নিবেদন

স্মরণ  করিছে  দেশবাসী৷

বঙ্গবাসীর  তনয়  তুমি

ফাঁসির  মঞ্চে হাসিমুখে

গেয়েছো স্বাধীনতার  গান৷

তোমার আত্মত্যাগের স্ফুলিঙ্গ স্পর্শে

বাঙালী জাতি জেগেছে আজ

গাহিছে জয়গান

উড়িছে বিজয় নিশান৷

প্রেতলোক বন্ধ

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রাচীনকালে বুদ্ধিজীবীদের ‘কোশস্থ’ বা ‘কায়স্থ’ বলা হত৷ এঁরা জ্ঞানের আক্ষরণের আড়ালে আত্মরক্ষা করার সুযোগ পেতেন৷ অবশ্য কায়স্থদের জন্যে করণ, করণিক, বিদ্যাস্ত্র ও সান্ধি–বিগ্রাহিক শব্দও চলত৷

পৌরাণিক গল্প অনুযায়ী প্রেতলোকের বা নরকের অধীশ্বর ছিলেন যমরাজ (Pluto)৷ তিনি মৃত্যুর দেবতা (God of death)৷ যমরাজ প্রেতলোকের তদারকি, হিসাব–নিকাশ (book-keeping) সবকিছুই বেশ ভালভাবেই করে যাচ্ছিলেন৷ কোথাও সামান্যতম খুঁত ছিল না৷ পাণ থেকে চুণ খসবার জো ছিল না৷ কিন্তু পৃথিবীতে জীবের ক্রমশঃ সংখ্যা বাড়ল, তাই মৃত্যুও বাড়ল৷ তদারকির কার্যে যমরাজকে সাহায্য করতেন তাঁর ভগিনী পানকৌড়িবাহিনী যমুনা৷ আর সুরক্ষা বিভাগের •Security õ± Watch-and-ward Department— মুখ্য আধিকারিক ছিলেন জনৈকা কুক্কুরী৷ তার নাম সরমা (‘সরমা’ শব্দের উত্তর ‘ষ্ণেয়’ প্রত্যয় করে ‘সারমেয়’৷ এর অর্থ কুকুর৷ ধরা হয় সব কুকুরই এই সারমেয়ের বংশধর)৷

দিন এগিয়ে চলল৷ মানুষ আর জীবজন্তুর সংখ্যা দ্রুতগতিতে ক্ষেড়ে চলল৷ যমরাজের পক্ষে এই বিরাট কর্ত্তব্য যথাযথভাবে প্রতিপালন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল৷ তিনি ব্রহ্মার কাছে আর্জি পেশ করলেন তাড়াতাড়ি যেন একটি নির্বাচকমণ্ডলী (Selection Board) তৈরী করে কিছু সংখ্যক যোগ্য কর্মচারীকে তাঁর কোটিতে (Department) পাঠিয়ে দেওয়া হয়৷ এখানে পদোন্নয়নের সম্ভাবনা উজ্জ্বল৷ চিঠির পর চিঠি......রীমাইণ্ডারের পর রীমাইণ্ডার লিখেও ব্রহ্মার তরফ থেকে উত্তর আর আসে না৷ যমরাজ পদস্থ কর্মচারীদের ও.জি.এস. On Government Service) পাঠালেন ব্রহ্মার দরবারে৷ কিন্তু সেখানে এক এক কেরাণী এক এক ধরনের কথা বলতে লাগলেন৷ তাঁরা বললেন–বর্ত্তমানে সিকিউরিটি ব্যবস্থার এতই কড়াকড়ি যে ব্রহ্মার সঙ্গে আপনাদের সাক্ষাৎ হবে না৷ অফিসাররা ক্ষুণ্ণ হয়ে ফিরে এসে যমরাজকে সব কিছু জানালেন৷

যমরাজ বললেন–কী আমাকে নিয়ে এত হেনস্থা আমি যদি কিছুদিন নরক বন্ধ করে দি......প্রেতলোক বন্ধ করে দি তাহলে বাছাধনরা ঠ্যালা সামলাক্ষে কী করে আমাকে হেনস্থা করার আগে সাতশ’ বার ভেবে দেখা উচিত তার পরিণাম কী হতে পারে, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে

যমরাজ কিছুদিনের জন্যে মৃত্যু–ব্যবস্থা বন্ধ করে দিলেন৷ চারিদিকে গেল গেল রব–জীবজন্তুর ‘‘পদভারে কাঁপিছে মেদিনী’’৷ প্রাণীদের চাপে পড়ে আকাশ বাতাস ভেঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পৃথিবীর ওপর পড়ছে৷ গ্রহ–তারা–উপগ্রহ– ছায়াপথ সবাই মড়মড়িয়ে ভেঙ্গে হুড়মুড়িয়ে পৃথিবীর ওপর এসে পড়ছে৷ সে এক শোচনীয় পরিস্থিতি ওপর থেকে আকাশ ভেঙ্গে পড়লেও মানুষ–জীবজন্তু কেউই মরছে না৷ তারা থেঁতলে গিয়ে আহত হয়েও বেঁচে থাকছে, কারণ মৃত্যু–ব্যবস্থা এখন বন্ধ হয়ে গেছে৷

দেবতারা প্রমাদ গুণলেন৷ তাঁরা প্রকাশ্যেই প্রোটোকলের নিয়ম ভেঙ্গে এ ওকে বলতে শুরু করলেন–এত কষ্ট করে বাসুকি নাগের মন্থনরজ্জু দিয়ে সমুদ্র মন্থন করে অসুরদের ঠকিয়ে ঠাকিয়ে ফাঁকি দিয়ে অমৃত খেয়ে অমর হলুম৷ আর এখন কিনা মানুষ, জীবজন্তু–এমনকি নেংটি ইঁদুর–ছারপোকাও ফোকটে অমরত্ব লুটে নিচ্ছে৷ হায় হায় দেবতাদের দেবতাত্বের গৌরব আর রইল কি তাঁরা সবাই মিলে ব্রহ্মার কাছে ছুটে গেলেন৷

ব্রহ্মা বললেন–‘‘হ্যাঁ সবই দেখছি, সবই শুনছি, কিন্তু করবার কিছুই নেই৷ সীলেকশন বোর্ডের মতে এত কম মাইনে দিয়ে যোগ্য কর্মচারী পাওয়া যায় না৷ এই জন্যে কর্মী পাঠাতে পারছি না৷’’

দেবতারা বললেন–‘‘মহারাজ, যমরাজকে কর্মী দিতেই হবে, নইলে মহা প্রলয় হয়ে যাবে......মহতী বিনষ্টি হয়ে যাবে......সৃষ্টির অস্তিত্বের প্রাথমিক বিন্দুটি ধুয়ে মুছে শেষ হয়ে যাবে৷ নরক–কর্মচারীদের বেতনের হার বাড়িয়ে দিয়ে যমরাজকে সন্তুষ্ট করুন মহারাজ৷’’

ব্রহ্মা বললেন–‘‘অর্থকোটি (Finance Department) ব্যয় মঞ্জুর করবে তো’’

দেবতারা বললেন–‘‘নিশ্চয়ই করবে....আলবাৎ করবে......একশ’বার করবে৷ আমরাই তো রাজ্যসভা, লোকসভার সদস্য৷ আমরা বিনা ভোটেই এটিকে ‘পারিত’ (pass) করে দোব৷’’

ব্রহ্মা আশ্বস্ত হলেন৷ বললেন–‘‘দেখো, শেষকালে আমাকে যেন ডুবিও না৷ তীরে এসে তরী ডুবলে আমার নাকালের একশেষ হবে৷’’

দেবতারা গালে হাত দিয়ে জিব কেটে বললেন–‘‘তেমন কথাটি আদৌ ভাবক্ষেন না মহারাজ৷ আমরা আপনার একান্ত বশংবদ৷ মনে নেই, নির্বাচনের সময় আমরা আপনার সঙ্গে নির্বাচনী–জোট বেঁধেছিলুম৷’’

ব্রহ্মা বললেন–‘‘নিশ্চয় মনে আছে,......আলবৎ মনে আছে......একশ’বার মনে আছে৷’’

ব্রহ্মা তখন যমরাজকে ডেকে পাঠালেন৷ যমরাজ বলে পাঠালেন–তাঁর পক্ষে এখন যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ সকাল থেকে তাঁর পিস্শাশুড়ীর বাঁ পায়ের কড়ে আঙ্গুলে ম্যালেরিয়া হয়েছে৷ তাই এখন তাঁর পক্ষে কয়েকদিন বাড়ী ছেড়ে বেরোনো সম্ভব নয়৷ ব্রহ্মা তখন নিজেই ছুটলেন যমালয়ে৷ তিনি গোছানো ভাষায় যমরাজকে বুঝিয়ে বললেন ও তাঁকে আশ্বাস দিলেন৷ যমরাজ বললেন–ভাল মাইনেয় ভাল কর্মচারী না হয় পেলুম কিন্তু ভাল তদারক না পেলে তো আর প্রতিষ্ঠান চলে না, রাজ্যও চলে না৷ আর যমালয়ের মত একটি বিশিষ্ট বনেদী প্রতিষ্ঠান তো চলতেই পারে না৷ ব্রহ্মা তখন তাঁর নিজের দেহের অর্থাৎ কায়ের অভ্যন্তর থেকে অর্থাৎ কায়স্থ একটি দিব্য পুরুষকে বার করে দিলেন৷ ব্রহ্মা যমরাজকে বললেন–যমরাজ, ইনি আমার প্রতিভু, ইনি আমার জ্ঞানকোশে নিহিত ছিলেন৷ তাই এঁর নাম কায়স্থ৷ এঁর এক হাতে থাকবে বজ্র যার সাহায্যে ইনি প্রেতদের ভয় দেখাবেন, আর এক হাতে থাকবে দণ্ড যার সাহায্যে ইনি প্রেতদের শাসন করবেন৷ আর এক হাতে থাকবে মস্যাধার (দোয়াত) ও আর এক হাতে থাকবে লেখনী (কলম)৷ এই দোয়াত–কলমের সাহায্যে ইনি প্রতিটি জীবের জন্যে নিউমারিক্যাল লেজার ও প্রাইস–লেজার রক্ষা করবেন৷ সেই লেজারে কে কবে জীবনে কোথায় কী করেছে তা আদ্যোপান্ত লিপিবদ্ধ থাকবে৷ সেদিকে কেউ একবার তাকালেই একটি জীবনেতিহাসের পূর্ণ আলেখ্য পেয়ে যাবে৷

এই আধিকারিকের নাম চিত্রগুপ্ত অর্থাৎ যাঁর চিত্র মানস জগতে গুপ্ত হয়েই আছে.... যাঁর বৌদ্ধিকতা অপরিসীম৷ এঁর নাম চিত্রগুপ্ত৷ ইনি ব্রাহ্মণের গুণযুক্ত ক্ষত্রিয় অথবা ক্ষত্রিয়ের গুণযুক্ত ব্রাহ্মণ৷ তাই ইনি ব্রহ্ম–ক্ষত্রিয়৷ চিত্রগুপ্ত মহারাজ চার হাতের হলেও কায়স্থদের কাউকেই আমি চার হাতের দেখিনি৷

কায়স্থদের আদিপুরুষ এই চিত্রগুপ্তের ছিল তিন পত্নী ও দ্বাদশ পুত্র৷ তিন পত্নীর নাম–ক্রান্তি, ক্লান্তি, ও রমা৷ পুত্রদের নাম–চারু, সুচারু, চিত্র, চিত্রচারু, অরুণ, অতীন্দ্রিয়, হিমবান, মতিমান, ভানু, বিভানু, বিশ্বভানু, বীর্য্যভানু৷ এঁদের থেকেই আসছে দ্বাদশ শ্রেণীর কায়স্থ–অম্বষ্ঠ (দাশঘোষ), ভট্টনাগর (বসু), সখসেনা (মিত্র), শ্রীবাস্তব (দত্ত), মাথুর (গুহ), গৌড়, সূর্যধ্বজ, বাল্মীকি, কুলশ্রেষ্ঠ, অষ্ঠানা, নিগম, করণ৷ এর বাইরে রয়েছেন আরও সাত প্রকারের কায়স্থ৷ তাঁরা চিত্রগুপ্ত–সঞ্জাত নন৷ এঁরা হলেন উপকায়স্থ (ভাণ্ডারী, পুরকায়স্থ (পুরকায়েৎ), পত্তনপ্রভু কায়স্থ (সূর্যবংশীয় রাজা অশ্বপতির বংশধর), দমনপ্রভু কায়স্থ (চন্দ্রবংশীয় রাজা কামপতির পুত্র), ধ্রুবপ্রভু কায়স্থ (স্বনামখ্যাত ভক্ত ধ্রুবের বংশধর), আদি কায়স্থ (আইকত) ও রায় কায়স্থ (রায়কায়েৎ বা রাইকত)৷

যাই হোক্, গল্প এখানেই শেষ হল৷ তা হলে কায়স্থ কী করে এল তার পৌরাণিক কথাও তোমরা জেনে গেলে৷

সংযমের ফলে রিপু সমঝে চলে

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে গেলে ভাই,

ছয় রিপুকে বশে রাখার উপায় জানা চাই৷

চেষ্টার মূলে অমূল্য ধন মন তো সবার আছে,

সৎভাবনা সৎচিন্তা রাখা চাই তার কাছে

সুস্থ শরীর ব্যস্ত করে কাম ক্রোধ আর লোভে,

মদ-মোহ-মাৎসর্যও এরাও সাথে শোভে৷

কোন ভাবের কোন রিপুর ধবংস করা নয়,

সংযমেতে ষড়রিপু স্বাস্থ্যের সহায় হয়৷

ধ্যান-আসন-প্রাণায়াম আর সাত্ত্বিক খাদ্যে,

সব রিপুর নুইয়ে মাথা মনই পারে বাঁধতে৷

বিয়ে বাড়ীর খানাপিনা

লেখক
শ্রীকাঞ্চন

বিয়ে বাড়ীর খানাপিনা বেজায় হৈ চৈ,

কেউ বলে লুচি আন কেউ বলে দই

এই পাতে মাছ দে কেউ বলে হেঁকে

এই পাতে রাবড়ি দে নতুন হাঁড়ি থেকে৷

এক কোণে দুই প্রভু বসেছেন খেতে

প্রতিযোগী হয়ে তারা উঠেছেন মেতে৷

একজনে খান যদি লুচি দুই ঝুড়ি

আর জন খেয়ে নেন মণ্ডা চার কুড়ি

সবে বলে আরও দাও আনও দেখি দই

রাবড়িটা আনও দেখি সন্দেশটা কই

খেতে খেতে দুই জনে এলিয়ে পড়েন

সবে বলে আরে আরে কি আর খেলেন

হেনকালে মার মার সদরের কাছে

কেঁদে উঠে ভিখারিটা পলাইয়া বাঁচে৷

পরমাত্মা! তুমি অবিনশ্বর

লেখক
নিশান্ত বিকাশ দত্ত

হে ঈশ্বর৷ তোমার স্পর্শ

ছড়িয়ে আছে এই মহাবিশ্বে

হে পরমাত্মা তোমার অদেখা

প্রাণের স্পন্দন স্পন্দিত

মোদের অন্তর আত্মা৷

আত্মার নাহি বিনাশ

তাই দেহান্তের পরেও

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে,

পরমাত্মা তুমি বিরাজমান

আত্মারূপে

মোদের হৃদয় মাঝারে৷

সাংসারিক মায়া ডোরে আচ্ছন্ন মোরা

পারিনা উপলব্ধি করিতে তোমারে৷

পবিত্র পরশে

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

আমার আঁধার ঘরে কে গো তুমি এলে

    মনের গহন কোণে

    কী গান শোনালে গোপনে

কোন্ সে শিখায় লক্ষ প্রদীপ তুমি জ্বালালে৷

    তোমার মোহন বাঁশির সুরে

    দোলা লাগে আমার হৃদয়-পুরে

কোন্ সে আবেশে অমিয় সুবাসে চিত্ত আমার ভরালে৷

    অজানা এক পবিত্র পরশে

    পরাণ আজ মাতলো হরষে

আলোর প্লাবনে আমার বন্ধ দুয়ার খোলালে৷

    অণু-পরমাণুর রন্ধ্রে রন্ধ্রে

    পুলক জাগে অচেনা ছন্দে

অশেষ করুণাধারায় ত্রিতাপ-জ্বালা আমার জুড়ালে৷

মুন্নীলালের কোষশুদ্ধি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রাচীনকালে কোনো লোক যদি অগ্ণিপরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে বেরিয়ে আসত অর্থাৎ সে যুগের সেই নিষ্ঠুর পরীক্ষাতেও দৈবলীলায় উত্তীর্ণ হয়ে আসত সেক্ষেত্রে এই উত্তীর্ণ হওয়াটাকে বলা হত ‘কোষশুদ্ধি’৷

কোনো জিনিস অযোগ্য লোকের হাতে পড়ে যদি অপব্যবহৃত হয়, তারপর সেটিকে যদি পবিত্র করা অর্থে পুড়িয়ে নেওয়া হয় তখন সেই বস্তুকেও ‘কোষশুদ্ধি’ বলা হয়৷

তখন চলছে ইংরেজ যুগের রমরমা৷ লেখক ছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারী কাজের তথ্য সংগ্রাহক৷ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বেধে গেছে৷ প্রতি মুহূর্তে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রিক জীবনে পটপরিবর্ত্তন ঘটে চলেছে৷ লেখককে ক্রমশঃ নিতে হচ্ছে অধিকাধিক দায়িত্ব ও বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভার বা অতিভার৷ সে সময়ে লেখকের যিনি চাপরাসি ছিলেন তাঁর নাম ধরো মুন্নীলাল মিশির৷ মুন্নীলালের বাড়ী ছিল এলাহাবাদে৷ কিন্তু আমাদের এখানে দীর্ঘকাল থেকে সে মুঙ্গের জেলার স্থানীয় ভাষা অঙ্গিকা বেশ রপ্ত করে নিয়েছিল৷ মুন্নীলালের ছিল অজস্র গুণ, কিন্তু দোষ ছিল দু’টি৷ মুন্নী কারণবারির খুব ভক্ত ছিল৷ অমাবস্যায় শনিবারে ও মঙ্গলবারে কালীপুজো দিয়ে কারণবারি পান না করে সে অন্ন গ্রহণ করত না৷ তার মাইনের দিনে লেখক বিশেষ ব্যবস্থার দ্বারা তাঁর স্ত্রীকে পে–ফিসের (বেতন অফিস) সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিতেন যাতে মুন্নী তাঁর পকেট–ভর্ত্তি টাকা নিয়ে বাড়ীতে যাবার পূর্বে শুঁড়িখানায় ঢুঁ মারবার সুযোগ না পায়৷ মুন্নীর স্ত্রী তাঁর অফিসের থেকে সব টাকা নিয়ে চলে যেত৷ কিন্তু মুন্নী তখন পেছনে দৌড়তে দৌড়তে বলত ঃ–

‘‘হে–গে সুমতিয়ার মায় তনিক্ কিরপা তো কর্ আই য়ে ভর কিরপা চাহয়ছী’য়ে৷’’ (ওগো সুমতির মা, একটু কৃপা তো করে যাও৷ আজকের জন্যে তোমার কাছ থেকে একটু কৃপা চাই) অর্থাৎ মুন্নী তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে কয়েকটা টাকা চাইত খাবার জন্যে৷ কিন্তু মুন্নীর স্ত্রী সুমতির মা সেই যে ছোঁ মেরে মুন্নীর পকেট থেকে টাকা নিয়ে নিজের কোঁচড়ে বাঁধত তারপর একটি পয়সাও সে উপুড়হস্ত করত না৷ কিন্তু সুমতির মা সব সময় তো টাকা পাহারা দিয়ে রাখতে পারে না৷ তাই মুন্নী যেভাবেই হোক টাকা জোগাড় করে নিয়ে মদের দোকানে ঢুকে যেত ও কারণবারিতে গলা ভিজিয়ে ধর্ম রক্ষা করত৷

মুন্নীর দ্বিতীয় গুণ বা অবগুণ ছিল সে জাতপাত একটু বেশী করেই মানত......ছোঁয়া–ন্যাপার বিচার ছিল প্রচণ্ড রকমের৷ লেখক একদিন বলেই ফেললে–‘‘হ্যাঁরে তোর যখন ছোঁয়া–ন্যাপার এত বিচার কিন্তু তুই যে কারণবারি পান করিস ওটা কী কেবল কুলীন বামুণে ছোঁয়, না, ওটা ৭০০ জাতে ছোঁয় আবার কোনো কোনোটা তো বিদেশ থেকেও আসে, ম্লেচ্ছরাও তো ছোঁয়৷ তবে ও খেয়ে তোর জাত বাঁচছে কি? এ তো যেন জাত যায় কিন্তু পেট ভরে না’র মত ব্যাপার৷’’

ও বললে–‘‘সাহাব, আমি তো আর সোজাসুজি মদ খাই না৷ আমি তো ওগুলোকে মায়ের মন্দিরে নৈবেদ্য রূপে চড়িয়ে দিই৷ তারপর প্রসাদ হিসেবে ওটাকে কারণবারি রূপে পান করি–মদ রূপে নয়৷ প্রসাদে তো সাহাব দোষ নেই৷’’

আমি বললুম–সে কেমন

ও বললে–এই যেমন ধরুন না কত্তা, এই মায়ের মন্দিরে মণ্ডা আতপচাল নৈবেদ্য দিই৷ ওই মণ্ডা যে দুধে তৈরী হয়ে থাকে সেই দুধ যে তৈরী করে থাকে, সেই দুধটা যে এনেছিল তারাও তো আমার মত নৈকষ্য কুলীন নয় যেহেতু নৈবেদ্য চড়ানো হয়েছে তাই সেটা প্রসাদ হয়ে গেছে, সেই মণ্ডায় দোষ নেই৷

তারপর আমি বললুম–‘‘তোর যুক্তি গ্রহণযোগ্য৷’’

সে বললে–‘‘এই যে আতপ চাল, ওটা যার জমিতে হয়েছিল, যে কেটেছিল, যে কুটেছিল তারা কি আমার মত বনেদী বামুণ? নিশ্চয়ই তা নয়৷ ওই চালের মধ্যেই কি অল্পমাত্রায় জলও নিহিত ছিল না যেহেতু ওই আতপ চাল হয়ে গেল প্রসাদী তাই ওতে কোনো দোষ নেই৷ তাই দেশী হোক, বিদেশী হোক, মদ যখন পূজান্তে কারণবারিতে রূপান্তরিত হয় তখন তাতে দোষ থাকে না৷’’

একদিন মুন্নীলাল আমার এ্যালুমিনিয়ামের গেলাসটা নিয়ে গেছল অন্য কোনো অফিসারের টেবিলে৷ সে টেবিলের জনৈক মিলিটারী অফিসার তাঁকে তাঁর গেলাসটা দিয়ে এক গেলাস জল আনতে বললেন৷ সেদিন মাস পয়লা৷ সেদিন মুন্নীর মন থেকে অন্য সব চিন্তা অপসৃত হয়েছিল৷ তাঁর মাথায় কারণবারির কথাই ঘুরছিল৷ তাই সে ভুল করে আমার গেলাসে জল ভরে নিয়ে সেই সামরিক অফিসারটির টেবিলে রেখে দিলে আর তাঁর গেলাসটিতে জল ভরে রেখে দিলে আমার টেবিলে৷

আমি বললুম–‘‘মুন্নী, এ গেলাসটা তো আমার নয়৷ দেখিসনি, আমার গেলাসে স্বস্তিক চিহ্ণ আঁকা আছে৷’’

মুন্নী বললে–‘‘ভুল হোয় গেলয়’’ (ভুল হয়ে গেছে)৷

আমি বললুম–‘‘অখ্নি কী হোতেয়’’ (এখন কী হবে)?

মুন্নী সঙ্গে সঙ্গে বললে–‘‘কোষশুদ্ধি হোতেয়৷ শাস্ত্র মঁ একর বিধানোঁ ছে’’ (কোষশুদ্ধি হবে৷ শাস্ত্রে এর বিধানও আছে)৷

মুন্নী চলে গেল সেই ভদ্রলোকের গেলাসটা নিয়ে৷ কিছুক্ষণ পরে সে আমার গেলাসটা নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল৷

ও বললে–‘‘কোষশুদ্ধি করীকে নানয়ছীয়ে’’ (কোষশুদ্ধি করে আনছি)৷

মুন্নী উধাও৷ খানিক বাদে যখন এল তখন তার দু’চোখে জল৷

আমি জিজ্ঞাসা করলুম–কী হোলয়......কী হোলছে (কী হল, কী হয়েছে)?

মুন্নী বলছে–জ্বরী গেলয়....জ্বরী চুকলছে (জ্বলে গেছে......গলে  শেষ হয়ে গেছে)৷

আমি ঠিক বুঝতে পারলুম না ও কী বলতে চায়৷ ও তখন পকেট থেকে এ্যালুমিনিয়ামের একটা ডেলা বের করে দেখালে৷

আসলে মুন্নী গেলাসটি রেখেছিল কোষশুদ্ধি করবার জন্যে ফার্ণেসের ওপরে৷ এ্যালুমিনিয়ামের গেলাস তো৷ অত উত্তাপ সহ্য করবে কেন সে গলে একটা এ্যালুমিনিয়ামের ডেলায় পরিণত হয়ে গেছে৷

আমি বললুম–শাস্ত্র মঁ  একরে কোষশুদ্ধি  কহয়ছে কী (শাস্ত্রে  কি একেই  কোষশুদ্ধি

বলে)?

যাই হোক্, তোমরা ‘কোষশুদ্ধি’ কাকে বলে বুঝে গেলে তো

শ্রাবণী পূর্ণিমা তিথি

লেখক
শ্রীপথিক

শ্রাবণী পূর্ণিমা তিথি

সদ্গুরু রূপে  আবির্ভূত

                হলেন আনন্দমূর্ত্তি

কালীডাকাত মন্ত্র পেল

                ছাড়ল ডাকাতি

আজকে যারা বিপথগামী

                তাদের আকুতি

মোদের জীবনে আলো দাও

                ঘুচুক আঁধার রাতি৷

কালীচরণ

লেখক
প্রভাত খাঁ

                পবিত্র শ্রাবণী-পূর্ণিমায়

                কালিচরণ দীক্ষা নেন কাশিমিত্র ঘাটে

                মহাসম্ভূতি বাবার করুণায়৷

                এ যেন সেই ভয়ংকর কালিয়াদমন

                তরণ তারণ শ্রীকৃষ্ণের হাতে

                দ্বাপরে ব্রজভূমে তাঁর সেই বাল্যলীলায়৷

                তাঁরই নির্দেশে কালিকানন্দ হয় কালিচরণ

                জনারণ্য ছেড়ে যান

                অধ্যাত্মসাধনে পর্বত জঙ্গলে

                হিংসাদ্বেষ ছাড়ি’ জগৎ কল্যাণে৷

                মনে পড়ে রত্নাকর দস্যুবৃত্তি ছাড়ি’

                ‘রাম নাম’ জপ করি হয়ে বাল্মীকি

                মহাকাব্য রামায়ণ রচি ‘মহাকবি ’ হন৷

                পৃথিবীর বুকে ধর্মসংস্থাপনে

                                                ও আধ্যাত্মিক বিপ্লবে

                বিপথগামী কালিচরণই হন কালিকানন্দ

                এটি তাঁরই অক্ষয়কীর্ত্তি প্রথম দীক্ষিত

                জগৎকল্যাণে এক ব্রতী সুসন্তান৷

শ্রাবণী পূর্ণিমা

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

শ্রাবণের বর্ষণস্নাত নির্জন গঙ্গাতীর

মৃদুমন্দ বহে সুশীতল স্নিগ্দ সমীর

নীল নভে খণ্ড খণ্ড মেঘমালা

পূর্ণচন্দ্র সাথে অবিরাম লুকোচুরি খেলা

জ্যোৎস্না ধৌত বটবৃক্ষতলে উপবিষ্ট

শুভ্রবেশ, সৌম্যকান্তি জ্যোতির্ময় পুরুষশ্রেষ্ঠ৷

সহসা আগুয়ান, নৃশংস দস্যু, নাম কালীচরণ

‘পতিতপাবন’ হরির সর্বস্ব করিতে হরণ৷

মহাসম্ভূতি তারকব্রহ্ম রূপে যিনি আবির্ভূত

তাঁরই অহৈতুকী কৃপায় পাতকী হ’ল সর্বপাপ মুক্ত

সিদ্ধ মন্ত্রপাতে চিত্তে উদ্ভাসিল দিব্যানুভূতি

শ্রাবণী পূর্ণিমার পুণ্যলগ্ণে পূর্ণ প্রকাশিত

আনন্দঘন বিশ্বমাঝে তুমি আনন্দমূরতি৷