প্রভাতী

খেলা

লেখক
জিজ্ঞাসু

হার নেই জিৎ নেই  শুধুমাত্র খেলা৷ ১৯৯০ থেকে ২০১৮ এই দীর্ঘ আঠাশ বছর  লেগে  গেল, এই প্রতিবেদকের বাক্যবন্ধ বুঝতে৷ বহু সহস্র জনতার  ভিড়ে, মঞ্চে ওঠার সময়, সিঁড়ির মাঝেই নিয়মের বাইরে  গিয়ে, আচমকা  জনতার  দিকে ঘুরে  দাঁড়িয়ে  পড়তেন  সর্বপ্রিয়  সেই মহান অমৃত পুরুষ সবার সেই পরমাত্মীয় জনসমুদ্রকে  জিজ্ঞাসা করতেন, তোমরা  সবাই ভালো আছো তো? সমুদ্র বিগলিত হতো কল্লোলে---ভালো  আছি বাবা! এবার  তিনি হিন্দিতে  বলবেন, মজামে  হ্যায় না  জী৷  আবার  সমুদ্র গর্জন  আনন্দের---হ্যাঁ, বাবা ৷ অমৃত বর্ষণে  যেন ভরে  গেল সমুদ্র৷ স্থান ঃ আনন্দ নগর ধর্মমহাচক্র, পুরুলিয়া৷ সেই  বছরই তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে যাবেন৷ জিজ্ঞাসুর বয়স তখন ৪৬৷ তার সেদিন  প্রশ্ণ ছিল---কী বলছেন উনি? মজা? কোথায় মজা?  কিসের মজা?৷ অন্যায়-অত্যাচার , অবিচার , হাজার  সমস্যায় জর্জরিত  দুঃখী পৃথিবী, আর  তারই মধ্যে  তিনি সবাই কে  মজাতে  থাকতে বলছেন?  আশ্চর্য!

সেদিন জিজ্ঞাসু যে কথাটি বোঝেনি, আজ ২০১৮তে পঁচাত্তরে  পা বাড়ানো জিজ্ঞাসু সেই ‘‘মজায় থাকো’’ কথাটার মানে বুঝল৷ ধন্য হল জীবন৷ ভরে গেল মন৷ কী মানে হতে  পারে কথাটির ৷ এক অপূর্ব ভাবনার ঈশারা  দিয়েছিলেন, সেই বিদ্যুৎ গতির  মহাজন, মহাবিশ্বের অমৃতপুরুষ ৷ এই পৃথিবীতে  মানুষ কীভাবে  থাকবে , তার সংকেত  দিয়েছিলেন সেদিন৷  আজ  তিনি হয়তো  সুদূরের অন্য কোনো গ্রহে৷  জিজ্ঞাসু আজো  এই গ্রহে  থেকে  মজায় থাকার  খেলায় মত্ত৷ জাষ্ট খেলে যাও, কখনো এগোও কখনো পিছিয়ে যাও, বলটা নিয়ে  খেল আনন্দে, পাস দাও, বোকা বানাও প্রতিপক্ষকে, বিদ্যুৎ গতিতে  উপস্থিত হও সঠিক জায়গায়, মারো শট৷ লক্ষ্য ভেদ হল তো হল না হল তো  না হল৷ আরে  বাবা এটা তো প্রকৃতপক্ষে কোনও যুদ্ধ  নয়, নিছক  এক খেলা৷ খেলাতে  হার  আছে  জিত আছে৷ হাসতে হাসতে  জেতো কিম্বা হেরে গিয়েও হাসো,  মজাতে থাক৷  তোমার  হার জিতে  চলমান  এই বিশ্বের  কিছু আটকায়  না৷  এই দিন যাবে  রাত  আসবে, আবার দিন....৷ মানুষ এই মহাবিশ্বপটে অগণিত  গ্যালাক্সির  কোনো কোনে পড়ে থাকা  অসহায়  মানব শিশু, সবে মাত্র ভূমিষ্ঠ হল, হাত পা  নাড়ছে  হেসে হেসে, তাতেই  মজা, লক্ষ লক্ষ বছর  পূর্বে আসা  মানুষের  তুলনায় তার  সভ্যতার  বয়স  মাত্র পনেরো  হাজার  বছর৷ পৃথিবীর  এই শিশু সভ্যতার  বয়স যেন  দুঘন্টা পার  হল মাত্র৷ জেগে ওঠা শিশুটির  নাম মানুষ৷ অনেক  কিছুই  তার  নিয়ন্ত্রণে  নেই, অনেক কিছুই  তার অজানা৷  সে মাত্র  বেহিসেবী খেলতে  জানে, তাতেই আনন্দ পায়৷৷ অজানাকে জানতে চায়  এদিকে  নিজেকেই  জানা হলনা৷ না জাস্ট খেলে যাও৷ মনের আনন্দে৷  অভিনয়ে  মহারাজা হতেই পার৷  নিখঁুত খেল৷ হাবভাব মেকআপ  সব মহারাজার  মত হোক  কিন্তু ভেতরে  ভেতরে  জানো নাটক  শেষে  রঙ মুছে  ঘরে ফিরতে  হবে৷  এটা একটা খেলা৷  খেলা যখন  মজাটা  নাও৷ হার জিৎ নয় মজা পাই তাই খেলি৷ খেলতে খেলতে  এক সময়  ক্লান্তি  আসবে,  ঘুম আসবে বিশ্রামের৷ ....তিনি আমাকে  এত ভালোবাসেন! চলো তাহলে  আরেকটু  খেলে নি, মজাতে  থাকতেই খেলা ৷ মজা তে মাতি৷  সময়  হারিয়ে যাক৷ সবহেরে  ও জিতে যাই৷ হা হা করে হাসি৷ ......এ আমার একান্ত ব্যষ্টিগত---আত্মগত অনুভূতি!

সামাজিক শিষ্টাচার

লেখক
দাদাঠাকুরের চিঠি

ছোট্ট বন্ধুরা, আমরা একা থাকতে পারি না৷ আমাদের বাবা মা, ভাই–বোনদের নিয়ে পরিবার আছে৷ আবার আত্মীয় স্বজন, পাড়া–প্রতিবেশীদের নিয়ে সমাজ আছে৷ এদের সবাইকে নিয়ে আমরা বাস করি৷ আমরা প্রয়োজনে অপরকে সাহায্য করি, আবার সাহায্য নিই৷ একে অপরের সাহায্য ছাড়া আমরা সমাজে বসবাস করতে পারি না৷ যেহেতু আমরা সমাজে বাস করি তাই আমাদের কিছু সামাজিক আচার–আচরণ মেনে চলা উচিত৷  এই সামাজিক আচার–আচরণগুলিকে সামাজিক শিষ্টাচার বলে৷ এসো আমরা এই সামাজিক শিষ্টাচারগুলি পালন করে আমাদের সমাজকে আরও সুন্দর করে গড়ে তুলি৷

১৷ তুমি যার কাছ থেকে কোন সাহায্য নেবে তাকে ধন্যবাদ জানাবে (বলবে, ধন্যবাদ)৷

২৷ কেউ নমস্কার করলে সঙ্গে সঙ্গে একইভাবে নমস্কার করে তার প্রতি উত্তর জানাবে৷

৩৷ কেউ কাউকে কিছু দিতে বা কারো থেকে কিছু নিতে চাইলে নিম্নবর্ণিত মুদ্রায় করবে৷ ডান হাত বাড়িয়ে বাঁ হাতের দ্বারা ডান হাতের কনুই স্পর্শ করে৷

৪৷ কোন সম্মানীয় ব্যষ্টি সামনে এলে সঙ্গে সঙ্গে  উঠে দাঁড়াবে৷

৫৷ হাই ওঠার সময় মুখ ঢেকে রাখবে ও সঙ্গে সঙ্গে হাতের মাধ্যমে শব্দ করবে৷

৬৷ কথার বলার সময় অনুপস্থিত ব্যষ্টি সম্পর্কে সম্মনজনক শব্দ ব্যবহার করবে৷

৭৷ হাঁচি পেলে তোমার মুখ রুমাল বা হাতের দ্বারা ঢেকে নেবে৷

৮৷ নাকের ময়লা (সর্দি) পরিষ্কার করার পরে হাত ধুয়ে নেবে৷ খাদ্য পরিবেশনের সময় হাঁচি পেলে বা সর্দি পরিষ্কার করলে সঙ্গে সঙ্গে হাত ধুয়ে নেবে৷

৯৷ মল ত্যাগের পর জলের দ্বারা শৌচ করে হাত সাবান দ্বারা পরিষ্কার করবে৷ প্রথমে ডান হাতে সাবান মেখে তারপর ডান হাতের দ্বারা বাঁ হাত পরিষ্কার করবে৷

১০৷ যখন কোন লোকের কাছে যাবে তখন তিনি যদি অন্য কারোর সঙ্গে কথা বলতে থাকেন, তাহলে তার কাছে যাবার আগে অনুমতি নেবে৷

১১৷ অপরের কোন জিনিস তার পূর্ব অনুমতি না নিয়ে নেবে না৷

১২৷ এমন কোন জিনিস ব্যবহার করবে না যা কার তা জান না৷

১৩৷ কথা চলার সময় কাউকে কর্কশভাবে বা খোঁচা মেরে কথা বলবে না৷ যা বলার তা পরোক্ষভাবে বলবে৷

১৪৷ যখন তখন মুখের মধ্যে আঙ্গুল দেবে না বা দাঁতে নখ কাটবে না৷   

১৫৷ খাবারের আগে হাত, পা, মুখ ধুয়ে নেবে৷

১৬৷ অন্যের দোষ ত্রুটির অযথা সমালোচনা করবে না৷

১৭৷ অপরের ব্যষ্টিগত চিঠিপত্র পড়বে না৷

১৮৷ কারো সঙ্গে কথা বলার সময় অপর পক্ষকে মতামত প্রকাশের সুযোগ দেবে৷

১৯৷ অন্যের কথা শোণবার সময় মাঝে মাঝে মৃদু শব্দ  করে সাড়া দিয়ে বুঝিয়ে দেবে যে তুমি মন দিয়েই তাঁর কথা শুনছ৷

২০৷ কারো সঙ্গে কথা বলবার সময় অন্য দিকে মুখ চোখ ফেরাবে না৷

২১৷ জমিদারী ঠাটে বসে অভব্যের মত পা নাচাবে না৷

২২৷ যাঁর সঙ্গে দেখা করতে বা কথা বলতে যাচ্ছ তিনি যদি সে সময় চিঠিপত্র লেখায় রত থাকেন, সেক্ষেত্রে সামনে পড়ে’ থাকা চিঠিপত্রের দিকে নজর দেবে না৷

২৩৷ কথাবার্ত্তা চলা কালে যদি অপর পক্ষের কথা বুঝতে না পার, তবে সবিনয়ে বলবে, ‘‘দয়া করে’ কথাটা আরেক বার বলবেন কি’’

২৪৷ যদি কেউ তোমার স্বাস্থ্য ও মঙ্গল সম্পর্কে খোঁজখবর নেন, তাঁকে অবশ্যই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাবে৷

২৫৷ রাত্রি ৯টার পর কারো বাড়ী যাবে না অথবা কাউকে বাড়ীতে ডেকে পাঠাবে না৷

২৬৷ যদি কাউকে নেতিবাচক কিছু জানাতেই হয়, ‘‘দয়া করে’, মাফ্ করবেন’’ শব্দগুলি বলে তারপর বাক্যালাপ শুরু করবে৷

২৭৷ আহার গ্রহণ করছেন এমন লোকের সামনে দাঁড়িয়ে কথাবার্ত্তা বলবে না৷

২৮৷ বাঁ হাত দিয়ে কাউকে আহারের খাদ্য বাড়িয়ে দেবে না৷

২৯৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্নান করবে না ও জল পান করবে না৷

৩০৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মূত্রত্যাগ ও মলত্যাগ করবে না৷

৩১৷ কাউকে গ্লাসে করে’ জল দেবার সময় গ্লাসের শুধু নীচের দিকটা হাত দিয়ে ধরতে হয়৷

৩২৷ কাউকে গ্লাসে করে জল পান করতে দেবার সময় প্রথমে হাতের আঙুল দিয়ে গ্লাসটা পরিষ্কার করবে, তারপর আঙুল না দিয়েই পরিষ্কার করবে ও তারপরে গ্লাসে জল ভরবে৷

৩৩৷ ভোজনের সময় যদি খুব বেশী ঘাম ঝরে, তাহলে রুমাল দিয়ে সেই ঘাম মুছে ফেলবে৷

(শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী নির্দেশিত বিধি অনুসারে)

মোসাহেব

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

কথায় বলা হয়, খোসামদে পাহাড়ও গলে মাখন হয়ে যায়৷ খোসামদে দুর্বাসা মুনিও গলে যান৷ সেই খোসামদের জন্যে ‘কাণ্ড’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়৷ ‘খোসামদ’ শব্দটি এসেছে ফার্সী ‘খুসামদ’ থেকে৷ অনেকে ‘খুসামদ’–কে মার্জিত রূপ দেবার জন্যে ‘তোষামোদ’ বলে থাকেন৷ না, ‘তোষামোদ’ বলে কোনো শব্দ নেই৷ শাস্ত্রে বলেছে, খোসামদকারীর প্রতি মুহূর্তেই প্রতি পদবিক্ষেপেই অধোগতি হয়, কারণ সে প্রতি মুহূর্তে, প্রতি পদবিক্ষেপে কেবল স্বার্থচেতনায় অস্বাভাবিক কাজ করে থাকে৷ আগেকার দিনে রাজাদের বা অবস্থাপন্ন লোকেদের বেতনভুক খোসামদকারী থাকত৷ তাদের বলা হত মোসাহেব–যারা সব সময় নিজেদের কর্ত্তাকে  ‘সাহেব’, ‘সাহেব’ বলে তুষ্ট রাখবার চেষ্টা করে৷ আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী ওই  ‘সাহিব’ শব্দটির আদিতে  ‘মু’ সংযুক্ত করে তাদের বলা হয় মুসাহিব বা মোসাহেব৷ এইভাবে বিভিন্ন গুণের সঙ্গে ব্যষ্টির সংযোগ সাধন করে ক্রিয়া বা বিশেষ্যের আদিতে ‘মু’ যোগ করে আরবীতে বিভিন্ন শব্দ সৃষ্ট হয়ে থাকে৷ যেমন মুয়াল্লিন, মুয়াজ্জিন (যিনি আজান দেন), মুজাহিদ (যিনি জেহাদ বা ক্রুসেডে অংশগ্রহণ করেন), মুহাজির (যিনি অন্য দেশ থেকে এসে হাজির হয়েছেন অর্থাৎ রেফিউজী), মুসাফির (যিনি সফর বা ভ্রমণ করে চলেছেন) প্রভৃতি৷ সেই যে মোসাহেবের একটা গল্প আছে না

রাজামশায়ের একজন মোসাহেব চাই৷ তিনি খবরের কাগজে যথাবিধি কর্মখালির বিজ্ঞাপন দিলেন৷ জানিয়েও দিলেন, ‘‘আবেদনকারীকে দরখাস্তের সঙ্গে ৫০০ টাকার ক্রশ চেক দিতে হবে যা প্রত্যর্পণযোগ্য নহে৷ হাজারে হাজারে দরখাস্ত এল৷ লিখিত পরীক্ষার পর মৌখিক পরীক্ষা চলছে৷ রাজামশায় বসে রয়েছেন৷ তাঁর সিংহাসনের বাঁ হাতলটা ধরে ঘাড় বেঁকিয়ে মন্ত্রীমশায় একটু কেতরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন৷ এক একজন কর্মপ্রার্থী আসছেন ইন্টারভিউ (সংজ্ঞ–প্রতীতি) দিতে৷

রাজামশায় প্রথম জনকে জিজ্ঞেস করলেন–‘‘তুমি কি মোসাহেবের কাজ পারবে?’’

সে বললে–‘‘নিশ্চয় পারব, জাঁহাপনা৷’’

রাজামশায় তার নাম খারিজ করে দিলেন৷ দ্বিতীয় কর্মপ্রার্থী এলেন–একজন চালাক–চতুর যুবক.......চোখে মুখে খই ফুটছে৷

রাজামশায় তাকে বললেন–‘‘মোসাহেবের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরু দায়িত্ব তুমি কি এ কাজ পারবে?’’

কর্মপ্রার্থী বললে–‘‘একবার চান্স দিয়ে দেখুন শাহানশাহ্, আমি নিশ্চয় পারব৷’’ রাজা তাকেও না–পসীন্দ*(*শব্দটা ফার্সী৷ তাই ‘না–পছন্দ’ না বলে ‘না–পসীন্দ’ বলাই বেশী ভাল৷ তবে এর বাংলা রূপ হিসেবে ‘না–পছন্দ’ও চলতে পারে’৷) করলেন৷ বলা বাহুল্য, এরও চাকরী হ’ল না৷

পরের কর্মপ্রার্থীটি খুক্ষই শিক্ষিত কিন্তু ইন্টারভিউ কেমন হবে তাই ভেবে সে পৌষের শীতেও ঘেমে গেছল........রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে সে রাজার সামনে এসে দাঁড়াল৷

রাজামশায় তাকে শুধোলেন–‘‘মোসাহেবের এই মহান কর্ত্তব্যে তুমি কি সমর্থ?’’

উৎসাহের অগ্ণিতে প্রদীপ্ত হয়ে কর্মপ্রার্থীটি বললে–‘‘নিশ্চয়ই পারব৷ একশ’ বার পারব, স্যার......কথা দিচ্ছি স্যার....কেবল একবার একটা চান্স দিন স্যার....just a chance please¼’৷

রাজামশায় তাকেও বাতিল করে দিলেন৷ এবার যে ছেলেটি এল তার চোখে–মুখে বুদ্ধির ঝলক ছিল কিন্তু প্রজ্ঞার গভীরতা ছিল না৷

রাজামশায় তাকে শুধোলেন–‘‘খোসামদের কাজটা তুমি কি পারবে?’’

সে বললে–‘‘সত্যিই রাজাসাহেব, খোসামদের কাজটা আমি কি পারব’’

রাজামশায় বললেন–‘‘হ্যাঁ, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারো৷’’

সে বললে–‘‘হ্যাঁ, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি৷’’

রাজামশায় আড়চোখে মন্ত্রীর দিকে চাইলেন৷ মন্ত্রী বললেন–‘‘মহারাজ, ইনিই সর্ক্ষগুণান্বিত, এঁকেই বহাল করুন৷ আজকের দিনে ইনিই বিশ্বমানবতার প্রতিভূ......জয়মাল্য পাবার ইনিই অধিকারী৷’’

রাজামশায় প্রার্থীকে বললেন–‘‘বুঝলে হে, আজ থেকে তোমার চাকরী হল৷’’

তাহলে বুঝলে ‘কাণ্ড’ বলতে এই খোসামদকে বোঝায়৷ সংস্কৃতে কিন্তু মোসাহেবকে বলা হয় ‘বিদুষক’৷ ‘মোসাহেব’ অর্থে সীমিত ক্ষেত্রে সংস্কৃতে ‘ভাণ্ড’ শব্দটিও চলত যার থেকে বাংলার ‘ভাঁড়’ শব্দটি এসেছে (যেমন–গোপাল ভাঁড়)৷ তবে ‘ভাঁড়’ বলতে ক্লাউনকেও ক্ষোঝায়৷ ‘‘আর ‘ভাঁড়ামি’ করতে হবে না’’–এমন কথা যখন আমরা বলে থাকি তখন কিন্তু সেটা ‘ভাণ্ড’ বা ‘ভাঁড়’ থেকে আসছে না, আসছে ‘ভণ্ড’ থেকে অর্থাৎ ভণ্ডামি অর্থে ‘ভাঁড়ামি’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷

স্বর্গসুখ

লেখক
ভবেশ কুমার বসাক

জীবনের এই রথ খোঁজে যে সঠিক পথ

প্রতি পদে সফলতা পেতে

অনেক বাঁধার ব্যথা     কঠোর বাস্তবতা

বয়ে যায় সময়ের স্রোতে৷

জীবন ছন্দে আছে আঁকা  কত-শত অভিজ্ঞতা

আশা-নিরাশা সকালে-বিকালে

কত হিংসা, কত দ্বেষ    এভাবেই বেলা শেষ

বাধা পড়া অতৃপ্তি শৃঙ্খলে

ভাবনার শেষ নাই আজ তাই দিও ঠাঁই

চিরমধুর আনন্দমূরতি তুমি

তোমাতে সঁপিয়া প্রাণ    গেয়েছি জীবনের গান

সে গানে নেই হানাহানি,

শেখালে কথা ও সুরেতে  সবারে ভালবাসিতে

তোমার শ্রীচরণে নাই কোন দুখ

ক্ষমা চাই নিজ ভুলে    হাসি মুখে নিলে তুলে

তোমাতেই পাই স্বর্গসুখ৷

তোমাকে বন্দনা করি

লেখক
সাধনা সরকার

নিখিল বিশ্ব বন্দনা করে

সূর্য, তারা প্রণত

তোমাকে দেখি আলোকে পুষ্পে

আহা কী আনন্দ

তুমি এসেছো ভালবেসেছো

চরণ ধূলায় ধূসরিত আমাদের প্রাণ

তুমি আছ

তোমার বন্দনা বিশ্বভূবনে

এসো তুমি এসো কাছে

এ প্রাণ মন তোমার

সু-বাতাস আজ ভবনে ভূবনে

তুমি আমার পরমতম

চির বিরাজ প্রাণপুরুষ

তোমাকে বন্দনা করি

সমর্পিত প্রাণ মন....

আঁধার পেরিয়ে

লেখক
আচার্য নিত্যসত্যানন্দ অবধূত

রাতের আঁধার ফিরে আসবে সকাল,

                ভোরের সূর্য উঠবেই

এই শীতের হিমেল হাওয়া তুচ্ছ করে’

                নতুন কলি ফুটবেই৷

                আবার সূর্য উঠবেই৷৷

অযুত বিহঙ্গের কলকাকলী

                আবার ধবনিবে দিকে দিকে

রঙ বেরঙের শত পুষ্প ঘিরে

                আবার অলি জুটবেই৷৷

জড়তার বন্ধন যাবে যে খুলে

                মুক্ত হবে যত প্রাণ,

ধবনিবে আবার দিক্-দিগন্তরে

                মানবাত্মার জয়গান৷৷

সকল হৃদয় মাঝে আবার হবে

                সুন্দরের আরাধন

নোতুন যুগের নব আশা নিয়ে

                পীড়িত মানব হাসবেই৷

                ভারের সূর্য উঠবেই৷৷

পাটোয়ারী বুদ্ধি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘ক্রথ্’ ধাতুর অর্থ হ’ল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে কাউকে হত্যা করা৷ দেবোদ্দেশ্যে বা ধর্মের নামে পশুহত্যা এই পর্যায়ে পড়ে৷ ক্রথ্ + অচ্ = ক্রথ৷ ‘ক্রথ’ মানে যাকে হত্যা করা হচ্ছে৷ ক্রথ্ + ল্যুট্ = ক্রথন মানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে হত্যা করা, ধর্মের নামে হত্যা করা, অথবা যাকে হত্যা করা হচ্ছে৷ কেউ যদি ভাবে ধর্মের নামে পশু–হত্যা করলে উভয় পক্ষেরই লাভ অর্থাৎ মানুষের লাভ দুটো ঃ তার লোল জিহ্বা পাবে নিরীহ পশুর মাংস আর অর্জন করবে পুণ্য আর ওই নিরীহ হতভাগ্য পশু, যে জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল করেছিল মানুষ নামে জীবকে বিশ্বাস করে, সে পাবে পশুজীবন থেকে মুক্তি–এ ধরনের জিনিসগুলি ভাবের ঘরে চুরি ছাড়া কিছুই নয়৷ সম্ভবতঃ মানুষ জাতের ইতিহাসে এই ধরনের স্বার্থপরতা ও ধর্মের নামে অধর্ম নির্মোকের প্রথম বিরোধিতা করেছিলেন গৌতম ক্ষুদ্ধ৷ সেই যে গল্প আছে না–

এজন পরম শাক্ত প্রতি বছর ঘটা করে কালীপূজা করতেন৷ হঠাৎ দেখা গেল পঞ্চাশ বছর বয়সে তার ভীমরতি ধরেছে৷ লোকে শুধোলে–হ্যাঁগো, এতদিন ধ’রে নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো করে এলে আর এই পঞ্চাশ বছর পরে এমনকি ভীমরতি ধরল যে পুজোটিই বন্ধ ক’রে দিলে?

সে বললে–হ্যাঁ ভাই, কী আর করব৷ গত বছর অবধিও দু’চারটে দাঁত ছিল, এবছর একটা দাঁতও আস্ত নেই৷ অথচ বলি তো দিতেই হবে৷ কী করি বল৷ বলি না দিলে তো পুজোয় খুঁত হয়ে যাবে৷ তাই পুজোটিই বন্ধ করে দিলুম৷

দেবোদ্দেশ্যে কোন স্বার্থপূর্ত্তির পরে কোন বিশেষ ধরনের বলি দেওয়াকে ‘ক্রথ’ ধাতুর আওতায় আনা যায়, অর্থাৎ হে জগজ্জননী, হে বিশ্বমাতা, তুমি আমার ছেলেটাকে পরীক্ষায় পাস করিয়ে একটা চাকরি জুটিয়ে দাও মা৷ মেয়ের বিয়ের জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরে মরছি৷ বিনা পণে একটি সৎপাত্র জুটিয়ে দাও মা, তোমাকে জোড়া পাঁঠা বলি দেব৷ এই পাঁঠা বলিও ‘ক্রথ’ ধাতুর অন্তর্ভূক্ত৷ দেবতার সঙ্গে এটি একটি দেনা–পাওনার –স্বার্থ বিনিময়ের খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়৷

‘‘জগৎ যে মায়ের ছেলে

তার কি আছে পর–ভাবনা৷

তুমি তৃপ্ত করতে চাও মায়েরে,

হত্যা করে ছাগলছানা৷৷’’

এ ব্যাপারে আবার অনেক মানুষ ঈশ্বরের সঙ্গে পাটোয়ারী বুদ্ধির খেলাতেও নেবে পড়ে৷

একবার শুণেছিলুম একজন অতিভক্ত মায়ের কাছে মানত করেছিল তার ছেলেটার একটা চাকরি জুটলে আর মেয়েটা পাত্রস্থ হলে সে মায়ের মন্দিরে জোড়াপাঁঠা চড়াবে৷ যথাকালে মায়ের দওলতেই হোক বা অন্য কোন কারণেই হোক ছেলেটার একটা হিল্লে হ’ল, মেয়েটার মাথাতেও বিয়ের জল পড়ল৷ একবার তাকে নাকি স্বপ্ণে মা এসে বললেন–হ্যাঁরে, তোর কাজ করে দিলুম, জোড়াপাঁঠা চড়াচ্ছিস না কেন আমি আর কতকাল আলোচাল–মটরদানার সঙ্গে কাঁচকলা–ঘি–সন্ধব নুনের হবিষ্যি চালিয়ে যাব?

অতিভক্ত বললে–এই দেখ মা, বেমালুম ভুলে গেছলুম৷ সাতশ’ কাজে ব্যস্ত থাকি তো তা আমার আর কী দোষ৷ আমার সাতশ’ কাজে ব্যস্ত করে তুমিই তো রেখেছ৷ তা যাই হোক, পাঁঠার আজকাল আগুন–ছোঁয়া বাজার দর৷ আমার গ্যাঁট খসালেও অত টাকা নাববে না৷ তাই হাতীবাগান বাজার থেকে রোব্বারের হাটে তোমার জন্যে একজোড়া গোলাপায়রা এনে চড়িয়ে দোব৷

দিন গেল, মাস গেল৷ আবার ছ’মাস কেটে গেল৷ আবার নাকি মা এসে বলেছিলেন–হ্যাঁরে জোড়া পাঁঠা তো দিলি না, জোড়া পায়রারও তো মুখ দেখতে পেলুম না৷ তা তুই করছিস টা কী

সে বললে–দেখ মা, হাতীবাগান বাজারে গিয়ে পছন্দসই পায়রা পেলুম না৷ কোনটার ঠ্যাঙ ভাঙা, কোনটার ন্যাজ ছেঁড়া, ওই সব খুঁতের জিনিস দিয়ে তো আর তোমার সামনে বলি দেওয়া যায় না৷ আমাকে তো মা’র মন যুগিয়ে চলতে হবে৷ তাই ভাবলুম তোমার জন্যে এক জোড়া আখ বা একজোড়া ছাঁচি কুমড়ো বলি দোব৷

মা নাকি তাকে বলেছিলেন–যা করবার তাড়াতাড়ি সেরে ফেল৷ তোর জন্যে আমি তো আর আলাদা এ্যাক্কাউণ্ঢ (হিসেবপত্র.....খেরো খাতায়) রাখতে পারব না৷

আবার ছ’মাস কেটে গেল৷ আবার নাকি মা এসে তাকে বললেন–হ্যাঁরে আখও দিলি না, ছাঁচি কুমড়োও দিলি না৷ ভেবেছিলুম শীতের দিনে একটু আখ চিবিয়ে খাব, ছাঁচি কুমড়ো দিয়ে নারকোল–কুমড়ি রাঁধব৷ তুই কী রে কী ধরনের কুপুত্তুর তুই৷

অতিভক্ত বললে–আমার আর কী দোষ বল৷ আমি ভাল আখ ও ছাঁচি কুমড়োর খোঁজে অনেকের ক্ষেতেই ঢুঁ মেরেছি৷ ভাল আখ আর ছাঁচি কুমড়োর ক্ষেতে সর্বত্রই কড়া পাহারা বসানো হয়েছে৷ তোমার জন্যে যে দু–চারটে তুলে আনব তার জো নেই৷ তার চেয়ে ভাবছি তোমার নামে এক জোড়া গঙ্গা ফড়িং বলি দোব৷

মা নাকি তাতে বিরক্ত হয়ে চলে গেছলেন৷ বলেছিলেন–তুই আমার কাছে পাটোয়ারী বুদ্ধি খাটাচ্ছিস, তোকে দেখে নোব ব্যাটাচ্ছেলে৷

আরও ছ’মাস চলে গেল৷ অতিভক্ত একজোড়া গঙ্গা ফড়িংও বলি দিলে না৷ এবার নাকি মা এলেন রণরঙ্গিণী মূর্ত্তি নিয়ে বললেন–আজই একটা হেস্তনেস্ত করব, আজই একটা এসপার ওসপার হবে৷ বল তুই আমার জন্যে বলি দিবি কি দিবি না?

অতিভক্ত বললে–মা, তুমি তো সর্বত্রই আছ৷ তা আমাকে নিয়ে আর কেন লীলাখেলা করছ৷ তোমার মন্দির থেকে এক ঢিলের রাস্তাতেই তো গড়ের মাঠ৷ সকাল সন্ধ্যেতেই তো সেখানে ফড়িং ওড়ে যথেষ্ট পরিমাণে৷ বর্ষার ভিজে হাওয়ায় বড় বড় গঙ্গা–ফড়িং আসে৷ তুমি কোনদিন প্রাতর্ভ্রমণে বা সান্ধ্যভ্রমণে দু’চারটে বা দু–চার ডজন কেন, যত ডজন ইচ্ছে গঙ্গাফড়িং ধরো আর খেয়ো৷ আমাকে আর নিমিত্তের ভাগী কর কেন

হ্যাঁ বলছিলুম কি, এই অতিভক্ত যদি কোন একটা বলি সত্যিসত্যিই দিত তবে সে বলি ‘ক্রথ্’ ধাতুর আওতায় আসত৷ একথা বলাই বাহুল্য যে ধর্মের নামে এই ধরনের পাটোয়ারী বুদ্ধি মানুষ সমাজে যথেষ্ট ক্ষতি করেছে৷ বিশ্বের স্রষ্টী শক্তির, আদ্যাশক্তির নামে এই ‘ক্রথ্’ ধাতুর ব্যবহার নিশ্চয় কোন শুভ চিন্তার দ্যোতক নয়৷

চোর

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

এক যে আছে চোর, চুরি করাই স্বভাব তার৷

কেউ তাকে বাসে না ভালো জোটে না আহার৷

কোন্ কারণে চুরি করে কেউ করেনা খোঁজ

দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় সকলে রোজ রোজ৷

পরণে তার নেইকো পিরহান পেটে নেই ভাত

ঘর নেই দোর নেই রাস্তায় দিনরাত৷

কেউ বোঝে না ব্যথা তার নেই কারো দরদ

ধরা পড়লে পিটুনি খায় কপালে গারদ৷

বিশ্বপিতার এই ধরণী সবার অধিকার

চোরের কেবল নেই অধিকার এ কেমন বিচার!

মহা সদ্বিপ্র

লেখক
চিত্রা

জাগ্ দুনিয়ার প্রতিটি সর্বহারা

ওঠ্ জেগে সব বন্দী ক্রীতদাস,

মহাসদ্বিপ্র দিয়েছে তোদের ডাক্

দিয়েছে তোদের মুক্তির আশ্বাস৷

এই বিশ্বের কত মানুষের ঘরে---

ওঠে আজ শুধু দৈন্যের হাহাকার,

ওরে তোরা আজ চেয়ে দেখ চারিদিকে

চলিয়াছে কত অবিচার-অনাচার৷

আয় ছুটে মহাসদ্বিপ্রের ডাকে,

দেয় সে তোদের নূতন আলোর দিশা৷

প্রতি মানুষের বিহ্বল হৃদয়েতে

জাগবে যে আজ নবীন দীপ্ত আশা৷

তোমার কাছে প্রার্থনা

লেখক
সাধনা সরকার

তুমি এসো আর একবার এসো৷

যাদের ভালোবেসেছিলে

বাঁধা আছে তারা

ভালোবাসায়, মানুষের জন্যে

অগাধ ভালোবাসায় ও

তোমার অবাধ স্বপ্ণ

আত্মায় বহন করেই

ওঁরা ছুটে চলেছে প্রান্তর নগর

দেশে-বিদেশে গ্রহান্তরে

আত্মার আত্মীয় হয়ে৷

ওরা মৃত্যুকে জয় করেছে

ক্ষুধা পথের দুর্গমতা নিত্যসঙ্গী

বন্ধু ওদের

তবুও চলেছে দুর্গম পথে

জয় হোক ওদের

বারবার৷