তোমরা জান, এই বিশ্বে কোন কিছুই স্থির নয়, গতিহীন নয়৷ সব কিছুই চলছে, সব কিছুকে চলতে হবেই৷ গতিহীনতা মানেই মৃত্যু৷ তোমরা জান, ৰদ্ধ জলাশয়ে কেবল আগাছাই জন্মে---আর আগাছা জন্মালেই অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদের উদ্ভব ব্যাহত হয়ে পড়ে৷ তাই কোনও মতেই কোনও অবস্থাতেই তোমরা স্থাণুত্ব বা গতিহীনতাকে প্রশ্রয় দিও না৷
জীবমনের আবশ্যকতা হল গতিশীলতা (movement)৷ ভূমামনও এগিয়ে চলেছে৷ গতি দুই ধরণের হতে পারে---(১) বাহ্য-অভ্যন্তরীণ Extro-internal) (২) অভ্যন্তর-বাহ্যিক (Intro-external)৷ একটা হল শারীর-মানসিক, অপরটা হল মানস -আধ্যাত্মিক৷ এই ধরণের মানসগতির মধ্যে সামঞ্জস্য (balance) বজায় রাখতে হৰে৷ আর যখন এই দুই ধরণের মানস গতির মধ্যে সামঞ্জস্য অক্ষুণ্ণ্ থাকছে তখনই ৰলৰ---তোমার মন সমতায় প্রতিষ্ঠিত আর সাম্যভাবে প্রতিষ্ঠিত মানসিকতাই মানব সমাজের পক্ষে শ্রেষ্ঠ সম্পদরূপে গণ্য৷
মানব মনের গতি প্রথমে বস্তুজগতে উৎপন্ন হয়ে পরে মানস জগতের দিকে প্রধাবিত হয়৷ দ্বিতীয় ধাপে মানসিক জগতে মনের গতি এগিয়ে চলে--তৃতীয়তঃ গতিটা হবে মানস-আধ্যাত্মিক জগতে ও চতুর্থতঃ সম্পূর্ণতঃ অধ্যাত্মজগতে৷ এই যে বস্তুজগৎ থেকে অধ্যাত্মজগৎ অবধি মানপ্রগতি প্রবণতা--এক্ষেত্রে তোমাকে বাহ্য-অভ্যন্তরীণ ও অভ্যন্তর-বাহ্যিক কর্মধারার মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করে চলতে হৰে৷ তাই ভগবান সদাশিব ৰলে গেছেন---‘‘চতুর্র্থে সমতাভাবঃ’’৷ জীবনে সাফল্যের জন্যে বিশেষ করে অধ্যাত্ম সাধকের পক্ষে চতুর্থ অপরিহার্য উপাদান হল ‘সমতাভাবঃ’৷ অর্থাৎ আমি অবশ্যই মানসিক সাম্যাবস্থা অক্ষুণ্ণ্ রাখব, নচেৎ কোন প্রগতিই সম্ভব নয়, আধ্যাত্মিক প্রগতি তো সম্ভব নয়ই৷ তোমরা কখনও মহামান্যতা, (superiority complex), হীনম্মন্যতা, (inferiority complex) ভীতম্মন্যতা, (fear complex) বা পরাজিতম্মন্যতা (defeatist complex) কে প্রশ্রয় দিও না৷ কারণ তুমি বিশ্ব পিতার সন্তান৷ কাজেই তুমি কারও চেয়ে হীন নও৷ তোমরা কোন প্রকার হীনম্মন্যতাকে কখনও প্রশ্রয় দিও না কারণ তোমরা হলে এক অতি উচ্চ মহত্তম পরিবারের সদস্য৷ আর তাই আমি তোমাদের ৰলেছিলাম---তোমাদের পিতা বিশ্বের সর্বাপেক্ষা সম্মানিত সত্তা৷ অনুরূপভাবে তোমরা মহামন্যতা (superiority complex)-কেও প্রশ্রয় দিও না৷ কারণ সমগ্র বিশ্বতো সেই পরমপিতারই সৃষ্টি৷ বিশ্বের কেউই তোমার চেয়ে হীন নয়, সকলেরই তো সমান উত্তরাধিকার৷ কাজেই কারও পক্ষে মহামান্যতাকে প্রশ্রয় দেওয়াটা আদৌ সমীচীন নয়৷
ঠিক তেমনই তোমরা যেন ভীতন্মন্যতাকে (fear complex) প্রশ্রয় দিও না৷ তোমরা অপরের ভয়ে ভীত হবেই বা কেন? যখন স্বয়ং পরম পিতা পরমেশ্বর তোমার নিত্যসঙ্গী, তখন তোমার অপরের থেকে ভয় কিসের? তুমি কাউকে ভয় করবে না--কোন মানুষকেই না---কোন তত্ত্ব বা মতবাদকেও না, ভাবজড়তাকেও না৷
তোমরা জান ভাবজড়তা ৰলতে আমরা বুঝি এমন একটা আইডিয়া (Idea complex) বা মত যার চারদিকে একটা গণ্ডী টেনে দেওয়া হয় ও সেই গণ্ডীর বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়৷ ‘তোমাকে এই মতটা মানতেই হৰে, তুমি এর বাইরে যেতে পার না’--- এই ধরণের জিনিসকে ৰলা হয় ভাবজড়তা (dogma)৷ তোমরা এই জাতীয় কোন ভাবজড়তাকে ভয় কর না৷ তাই ৰলি, কোন প্রকার ভীতন্মন্যতা যেন তোমাকে পেয়ে না বসে৷ এই পৃথিবীতে তুমি কখনও একলা নও শুধু এই পৃথিবী গ্রহটাতেই নয়, বিশ্বের সর্বত্রই পরমপুরুষ পরিব্যাপ্ত তাহলে ভয় আর কাকে করবে!
তারপর আসছে পরাজিতসুলভ মনোভাব (defeatist complex) বা (complex of hopelessness)৷ এটা কখনও তুমি প্রশ্রয় দিও না৷ পরমপুরুষের দিকে তোমার গতিপথ অবারিত৷ কাজেই অসহায়ৰোধ, নৈরাশ্য অথবা পরাজিতসুলভ মনোভাব --- এগুলো তুমি কিছুতেই মেনে নেবে না৷ ভূমার পথে তোমার যাত্রাপথ অনন্ত বিস্তৃত কাজেই তোমার তো কোন পরাজয় নেই৷ তাই পরাজয়ের ভাবনাই বা কেন থাকবে৷
এখন প্রশ্ণ হল ঃ মানব অস্তিত্বের সার্থকতা কোথায়? মানব-অস্তিত্ব হল ভাবাদর্শের ধারাপ্রবাহ মাত্র৷ এই প্রবাহের প্রাথমিক বিন্দু (Supreme positivity) ও (Supreme negativity) -র মধ্য দিয়ে আবার ও (Supreme positivity-তে ফিরে যাবে৷ অর্থাৎ স্থূল পশু-স্তর থেকে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তুমি সূক্ষ্মতম মানবতার দিকে এগিয়ে চলেছ---তোমার গন্তব্যস্থল হল অতি গৌরবোজ্জ্বল, মহা-মহিমান্বিত৷ কাজেই পরাজয়ের ভয় পাবার অবকাশ কোথায়! এই বিশ্বের কেউই তুচ্ছ নয়৷ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি সত্তা, প্রতিটি অভিব্যক্তিই গুরুত্বপূর্ণ৷ এ তোমরা---সকল ছেলে ও সকল মেয়েরা ---প্রত্যেকেই এক একজন ভি-আই-পি---very important person --- অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাষ্টি৷ (সকালবেলা, ২রা অক্টোবর ১৯৭৯, কলিকাতা)