প্রভাতী

মাতৃভাষা আমার ভালবাসা

লেখক
শরৎসুনীল নন্দী

ও আমার বাংলা ভাষা

                তোমার কথা মনে এলে

বুকের কোণে সুখের আশা

                এ চিরদিন আপনি খেলে৷

তাই কবিতায় খেলছে কথা

                খেলছে গানে সুরের বাণী,

এ আয়োজন সুধা রসের

                সে কথাটা সবাই মানি৷

এ শুধু নয় মাতৃভাষা

                ছন্দে বাঁধা জন্মান্তরে

বোশেখ থেকে চৈতী রাতে

                জ্যোছ্না ছড়ায় বাড়ি–ঘরে

যতই ভালবাসি তোমায়

                জীবন জোড়া এ যে নেশা

হৃদয় ধরে টান মারে সে

                মাতৃভাষা আমার ভালোবাসা৷

জলটান

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

সংস্কৃত ‘মদ’ ধাতুর একটি অর্থ হল যা শুষে আরাম পাওয়া যায় (ভাবারূঢ়ার্থ), যোগারূঢ়ার্থে জল, সরবৎ, পানা, ফলের রস ও যে কোন তরল বস্তু যা পানীয় পর্র্যয়ভুক্ত৷ উপরি-উক্ত যে বস্তু খেলে জলটান হয় অর্থাৎ যে আহার গ্রহণের পর বার্রার  জলতেষ্টা পায় সেই বস্তুকে ম+ড= ‘ম’ নামে আখ্যাত করা হয়ে থাকে৷ যেমন কম জলে  ছাতু গুলে খেলেও বার বার জলতেষ্টা পায়৷ এই ধরনের জলতেষ্টাকে ‘জলটান’ লা হয়৷

তোমরা সেই লা গড়ের ব্রজবল্লভ সাকের জলটানের  গল্প শুনেছ তো! যদি না শুনে থাক তো একবার লি৷ ব্রজবল্লভ সাক থাকতেন লাগড়ে--- তাঁর পৈতৃক ভদ্রাসনে*৷

কিন্তু ব্রজবল্লভ  সাকের  অন্তরঙ্গ  বন্ধুরা শে কিছুটা দূরে থাকতেন ন-হুগলীতে, অপর অন্তরঙ্গ বন্ধু বিজিত বসু  থাকতেন  জেশিবপুরে৷ বিজিত ড়জ্জের  ছেলেটি লেখাপড়া সমাপ্ত করে সদ্য সেই যে কী যে একটা সরকারী বিভাগ আছে যেখানে খাদ্যশস্য ওজন করে দাম দিয়ে গুদামজাত করা হয় সেই বিভাগটিতে অল্পদিন হল কাজ পেয়েছে৷ আর বিজিত বসুর  ছেলেটি এম.এ. পাশ করেছে, হুগলীর কোন একটি কলেজে  তার পেপেচুরির চাকরি হলো-হলো৷

একদিন প্রাতভ্রর্মণ সেরে ব্রজবল্লভ বসাক বাড়ী ফিরে আসতেই তাঁর স্ত্রী সেয়ানাসুন্দরী বললেন, ‘‘ওগো শোন, তোমার বন্ধু বিজির্তবাবু এইমাত্র খর পাঠিয়েছেন, আজ রাত্তিরে ওঁর ছেলের উ-ভাত৷ তোমাকে নেমতন্ন রক্ষা করতে যেতেই হবে৷ নইলে উনি মনে ভারী দুঃখু পাবেন৷ কাজকর্মে অত্যধিক ব্যস্ত থাকায় নিজে আসতে পারলেন না৷ নইলে তিনি নিজেই এসে তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন’’৷

ব্রজবল্লভ বসাক সেয়ানা সুন্দরীকে শুধোলেন---‘‘কোন জায়গাটার  নাম করেছে ল তো--- নহুগলীর না বাজেশিবপুরের’’৷

সেয়ানাসুন্দরী ললেন---‘‘অত তো জিজ্ঞেস করিনি৷ কারণ যে লোকটি এসেছিল সে ললে  বিজির্তবাবু ব্রর্জবাবুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ৷ নাম নিলেই ঝতে পারবেন’’৷

ব্রজবল্লভ বসাক বললে---‘‘তাও তো জিজ্ঞেস করিনি কারণ লোকটি বললে, নেমতন্নকারীর নাম শুণলেই ব্রর্জাবু  বুঝতে পারবেন , বেশী বলার দরকার  পড়বে না’’৷

ব্রজবল্লভ মহাফাঁপরে পড়লেন৷ তিনি এবার বাস্তব বুদ্ধি প্রয়োগ করলেন৷ বিজিত বাঁডুজ্জের ছেলেটি চাকরী করে৷ সুতরাং চাকরী পাওয়ার পরে নিশ্চয় তার বিয়ের ঘটকালি শুরু হয়েছিল৷ তাই তার বিয়েই বেশীই সম্ভব৷ বিজিত বসুর ছেলেটি পেপেচুরির কাজ পাবে, তারপরে পাত্রীর সন্ধান হবে, তারপরে দেনাপাওনার কথা হবে, ঠিকুজী গোষ্ঠী বিচার করে তারপরে পাকা দেখা হবে৷ তারপরে না বিয়ে! শতকরা ৯৯.৯ ভাগ সম্ভাবনা বিজিত বাঁড়ুজ্জের এক্সছলের বিয়ে৷

বলাগড় থেকে বাজেশিবপুর যেতে গেলে সোজা ট্রেনে  যাওয়া যাবে না৷ গঙ্গা পার হতে হবে৷  কিন্তু বনহুগলী যেতে গঙ্গা পার হতে হয় না৷ কিন্তু নহগলী যেতে গঙ্গা পার হতে হয় না৷ ব্রজবল্লভ বসাক কী করবেন৷ ঘনিষ্ঠ বন্ধু তো৷ আত্মীয়ের  চেয়ে বন্ধুর টান বেশী৷ তাই তিনি যেভাবেই হোক বনহুগলীতে গিয়ে পৌঁছুলেন সন্ধ্যে একটু আগেই৷ বন্ধুর ছেলের বিয়ে...... একেবারে বাইরের লোকের মত এসেই হাতটি ধুয়ে পাতে সে  পড়া যায় না৷  দরকার পড়লে ময়দা মাখতে হবে, নুচি লেতে হবে, এমনকি  কোমরে গামছা জড়িয়ে নুচি ভাজতে হবে কিংবা  হাতে ডালের ালতি,ডান হাতে হাতা নিয়ে  পরিবেশন করতে হবে৷ ঘাম মোছবার জন্য কাঁধে একটি গামছাও রাখতে হবে ৷ তাই একটু আগেই  যাওয়া দরকার৷

বনহুগলীতে পৌঁছলেন ব্রজবল্লভ বসাক৷ কিন্তু এ কি! বিজিত বাঁড়ুজ্জের বাড়ী দেখে বিয়ে বাড়ী লে তো মনেই হচ্ছে না৷  বাইরের দিকে একটা আলোও জ্বলছে না৷ সামনে বৈঠকখানায় একটা কম পাওয়ারের আলো টিমটিম করে জ্বলছে  কড়া নেড়ে দরজা খোলাতে হল৷

বিজিত বাঁড়ুজ্জে বললেন--- ‘‘এসো এসো, ব্রজ, তোমার যে আজকাল টিকিটই পাই না৷

ব্রজবল্লভ ঘরে ঢুকে যা দেখলেন তাতে তারমনে নেবে  এল সন্দেহের  কালো ছায়া৷ এ বাড়ী তো বিয়ে-বাড়ী নয়৷ পরিস্থিতি সামলাবার জন্যে বিজিত বাঁড়ুজ্জের সঙ্গে তিনি দু’চারটি কুশল সংবাদের আদান  প্রদান করলেন ৷ বিজিত বাঁড়ুজ্জের চোখ মুখ দেখে মনে হল তার ঘুম আসছে৷ তখন রাত্রিমান পৌনে ন’টা৷ বিজিত বাঁড়ুজ্জে হাঁই তুূলতে তুলতে ললেন, ‘‘ একটু সকাল সকাল খাই কী না  আর  বোঝ তো বয়স হয়েছে--- বিশেষ কিছু সহ্য হয় না৷ রাত্তিরে খই দুধ খেয়ে শুয়ে পড়ি ৷ ওটা একটু হাল্কা জিনিস তো৷’’

ব্রজবল্লভ বসাক ললেন, হ্যাঁ, আমিও অনেকক্ষণ ধরে উর্ঠ উর্ঠ করছিলাম৷ অনেকদিন পরে তোমাকে দেখে এত আনন্দ হচ্ছে যে কী ল৷ ......আচ্ছা চলি৷ তা তোমার  ছেলেটি এখন কী করছ?’’

বিজিত বাঁড়ুজ্জে ললেন,---‘‘ছেলের বিয়ে -থার কী হল?’’

বিজিত বাঁড়ুজ্জে বললেন,---‘‘পাত্রীর খোঁজ তো চলছে, তবে পাত্রী পছন্দ হচ্ছে  তো দেনা-পাওনায় মিলছে না, আবার দেন-পাওনা মিলছে তো পাত্রী পছন্দ হচ্ছে না৷ তবে আশা করি সামনের  মাঘ মাসে বিয়ের ব্যবস্থা হবে৷ সে   খবর তো তুমি আগেই  পেয়ে যাবে’’৷

ব্রজবল্লভ বসাক বাড়ীতে ফিরে এলেন৷ কড়া নাড়তেই সেয়ানা-সুন্দরী দরজা খুলে দিলে৷ ঘরে ঢুকেই  ব্রজবল্লভ স্ত্রীর দিকে একটু বিষণ্ণ্ মুখে তাকালেন৷ সেয়ানাসুন্দরী শুধোলে,---‘‘ব্রজবল্লভ বসাক বললেন,---‘‘আগে এক গেলাস ঠাণ্ডা জল দাও দিকি’’৷

ব্রজবল্লভ ধপাস্ করে চেয়ারে সে হাতটা রাখলেন ডালগালের নীচে৷ জোরে একটা               দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন৷ মনে মনে বললেন, নুচি-পোলাও দুই-ই৷ সেয়ানাসুন্দরী জল নিয়ে এলো৷ ব্রজবল্লভ বসাককে বললে,---‘‘কী করেছিল তোমাকে আর বলতে হবে না, আমি  ঝে নিয়েছি’’৷

ব্রজবল্লভ বসাক ললেন---‘কী করেছিল ল  দেখি’

সেয়ানাসুন্দরী বললে,---‘নিশ্চয়ই পোলাও’৷

ব্রজবল্লভ শুধোলেন--- ‘কী করে ঝলে’

সেয়ানাসুন্দরী ললে---‘ওটুকু আমি জানি গো জানি, পোলাও খেলে দারুণ জলটান হয়’৷

ভুতের ক্রিকেট খেলা

লেখক
শুভ্র ড্যানিয়েল

অমাবস্যার রাতে

          সব ভুতেরা মিলে মিশে

          ক্রিকেট খেলায় মাতে৷

তারার আলো জ্বলে

পেতনিডাঙার মাঠে খেলা

          সারাটা রাত চলে৷

যে দল জিতে যায়

          গাছের ডালে বসে তারা

          পপ–সঙ্গীত গায়৷

যে দল খেলায় হারে

সব ভুতেরা মিলে তাদের

          মাথায় চাটি মারে৷

নোতুন পৃথিবীতে

লেখক
শ্রী রবীন্দ্রনাথ সেন

এসো ভাই, মানবতার গান গাই

এসো ভাই, মানুষের তরে কাজ করে যাই৷

দেখো কত কালে কালে

লোকে চলে দলে দলে

আলো চাই আলো চাই বলে–

কত বাধা ঠেলে, দ্বন্দ্ব হিংসা ভুলে

কামনা কলুষ কালো যবনিকা ফেলে

আলোর আরতি দিতে চলে৷

এসো ভাই, মানবতার গান গাই

এসো ভাই, মানুষের তরে কাজ করে যাই৷

আরো চাই আরো চাই করে

শুধু প্রাণ আছো তুমি ধরে

সুখের স্বপ্ণে ইমারত গড়ে

মানুষের প্রাণ নিয়েছ যে কেড়ে

মানবতার মাঝে দানবতা ভরে

অজ্ঞতার বর্মখানি রয়েছ যে পরে

আর নয় চেয়ে দেখো অরুণোদয়

নব্য মানবতার কথা কারা কয়

নোতুন পৃথিবীর হ’ল যে অভ্যুদয়

যেথা পূর্ণ মানবতা দেবতার প্রতিমূর্তি হয়৷

এসো ভাই, মানবতার গান গাই

হাতে হাত ধরে নোতুন পৃথিবীতে চলো যাই৷

ঊণিশের আহ্বান

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

এসো সদা সচেতন বাংলা ভাষী যত নরনারী

আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা বাঙলা মায়ের সন্তান

হাতে রাখো হাত, মান-অভিমান ছাড়ি,

ওই শোন, অমর ঊণিশের দৃপ্ত আহ্বান

বাঁচাতে বাঙালীর মর্যাদা, বাংলা ভাষার সম্মান৷

বেইমান, শয়তান, হীনচক্রী হেনেছে আঘাত

বাঙলার বুকে, ঐতিহ্য-সংসৃকতি দিয়েছে নির্বাসন

ঢাকা-শিলচরে বাঙালীর গর্বিত প্রতিবাদ

পুলিশ-দুর্বৃত্তের গুলিবর্ষণে সঁপেছে জীবন

বাঁচাতে বাঙালীর মর্যাদা, বাংলা ভাষার সম্মান৷

ঢাকার একুশে ফেব্রুয়ারী, শিলচরের ঊণিশে মে

বঙ্গভাষা-সংগ্রামের ইতিহাস মিলে-মিশে একাকার

বাঙালীর কণ্ঠরোধে শাসকের অত্যাচার এসেছে নেমে

তবু থামেনি ওরা, চিরবিপ্লবী, নির্ভয়, দুর্জয়-দুর্নিবার

বাঁচাতে বাঙালীর মর্যাদা, বাংলা ভাষার সম্মান৷

এসো বাংলা ভাষাভাষী ভাই-বোন সব

ডাকে একাদশ শহীদের রক্তে লেখা উজ্জ্বল নিশান

ধর্ম-বর্ণ-জাতের বিভেদ ভুলে প্রতিটি বাঙালী নিই শপথ---

গড়বই বাঙালীজাতির স্বদেশ, শ্রেষ্ঠ বাঙালীস্তান

বাঁচাতে বাঙালীর মর্যাদা, বাংলা ভাষার সম্মান৷

 

‘ওই মহামানব আসে!’

লেখক
জিজ্ঞাসু

আমরা সাধারণ মানুষেরা, ঋষি কবির ওই বাণীতে আস্থা  হারাচ্ছিলাম, কারণ আমরা এমন একটা যুগ  সন্ধিক্ষণের  সাক্ষী যেখানে ব্যবসার নামে সর্বনাশ বিক্রি হয়৷  ডাক্তারীর নামে ডাকাতি হয়৷  উকিল ও বিচারকেরা বিক্রি হয়ে যান৷ বিশ্ববিদ্যালয়গুলি তোতাপাখী তৈরী করে৷ খবরের মাধ্যমগুলি তিলকে তাল, বা তালকে তিল বানায় নিজেদের  স্বার্থ দেখে৷ বেশীর ভাগ কিশোর-যুবদল নেশাগ্রস্ত  হয়ে হতাশায় ভোগে৷ দারিদ্র্যের শিকার হয়৷ ব্যাংকগুলিকে ভরসা করা যায় না৷ মন ভারাক্রান্ত, অশান্ত, বিক্ষুব্ধ, সন্দেহপ্রবণ! আর যেন ভালো কিছু হবার নয়৷ এই পৃথিবীতে  প্রাচীন সভ্যতাগুলি হারিয়ে যাবার  কারণ মানুষের  অজ্ঞতা, ভয়, অসভ্যতা, হিংস্রতা, জড়তা, স্বার্থপরতা ইত্যাদি জিন ঘটিত  ত্রুটি৷ ২০১৮ সালের পৃথিবীটাও ধর্ম,জাত-পাত আর ক্ষমতালোভী রাজনীতি নিয়ে ভাতৃঘাতী যুদ্ধ  ও শোষণক্ষেত্র হয়ে আছে৷  সার্বিক ভাবে যেন  জীবন্ত  নরক তৈরী  করছে মানুষরূপী  অমানুষেরা ৷ সাধুর মুখোশে  শয়তানের বাস৷ এমন হতাশার  গভীর রাতের জাল ছিঁড়ে যখন এক সোনালী ভোরের আভা অন্তত দেখা যায়, মন আনন্দে ভরে যায়৷ এই ভেবে যে অন্ধকার যত তীব্র হবে মানে প্রভাত হবার  বেশি দেরী নেই৷ এই বিশ্বাস তৈরী হয়ে যায়৷

বহুবছর আগেই  াা আনন্দমূর্ত্তিজীর ভবিষ্যবাণী ছিল---মানুষ একদিন গবেষণাগারেই উন্নত মানুষের জন্ম দেবে৷ শোষণমুক্ত নোতুন পৃথিবী তৈরী  হবে৷ আজ কি আধুনিক জীববিজ্ঞানীর মুখে তারই প্রতিধবনি  পাচ্ছি!! সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা ‘NATURE’’ - এর মাধ্যমে জানা যাচ্ছে নেদারল্যান্ডের  Merlin and Hubrecht institute in Utrecht এ কর্মরত গবেষক  জীববিজ্ঞানী Dr.Nicolas Riveren এক নোতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনার সিংহদরজায় উপস্থিত৷ তাঁর মতে  গবেষণাগারেই Stem Cell  বানিয়ে নিয়ে , পছন্দ  মত মানব ভ্রূণ তৈরী সম্ভব যেখানে  কোনো নারীর ডিম্বাণু ও পুরুষের  শুক্রাণু নিষ্প্রয়োজন৷ তার মানে, দেহ কোষের  মধ্যে থাকা  তরলের একটা অংশে থাকা জিন (মাতা পিতার  দেহমানসিক বৈশিষ্ট্য) থেকে  সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে, গবেষণা গারে  তৈরী নোতুন মানুষ৷  ফলে তারা জিন ঘটিত  যা  কিছু  ভয়, দূর্বলতা, অসুখ, কুভ্যাস, অজ্ঞতা, হিংস্রতা সেসব থেকে মুক্তি পাবে৷ দক্ষ ও গতিবান  হবে৷ মনশক্তিকে  বিস্তারিত  চেতনায় রূপান্তরণের  তাৎক্ষণিক ক্ষমতা হবে৷ তেমন সমর্থ মানুষেরা  ভোগবাদ বা মৃত্যু ভয় বা নাম যশ বা ক্ষমতার দাপটের  কাছে বিক্রি হবেন না৷ এমন মানুষেরাই তো ধূলির এই ধরণীতে প্রাউটকে বাস্তবায়িত করবেন ও এক মহাবিশ্ব পরিবার বানিয়ে নেবেন৷ কবির বাণী মিথ্যা হবে না!

পর্বতের মূষিক প্রসব

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

যে কথা আগে বললুম, কুক্কুর বর্গীয় ও মার্জার বর্গীয় জীবেদের সম্বন্ধে যে কথা খাটে কতকটা সেই কথাই খাটে উদ্ভিদ বর্গীয়ের সম্বন্ধেও৷

আমার জানা এক বসু মহাশয় সাত সমুদ্র তের নদী ঘুরে শেষ পর্যন্ত এসে বসলেন পৈত্রিক ভদ্রাসনে৷ বর্ধমান জেলার রায়না থানার পলাশন গ্রামে৷ ভদ্রলোক ও তাঁর স্ত্রী দুজনেই দারুন রকমের বৃক্ষপ্রেমিক৷ এধরণের বৃক্ষপ্রেমিককে তাইলা্যণ্ডে ‘বৃক্ষশ্রী’ উপাধি দেওয়া হয়, ভারতে দেওয়া হয় ‘কৃষিপণ্ডিত’৷ সেবার ভদ্রলোক গ্রামে এসে গাছের ক্যাটালগ দেখে বিভিন্ন দেশ থেকে সেরা সেরা গাছ আনতে লাগলেন ও বর্ধমান জেলার মাটিতে তাদের ফুলোতে ও ফলাতে থাকলেন৷ একবার তিনি শুণলেন এক অদ্ভুত রকমের ফুলের কথা৷ ফুলটির রঙ শ্বেত শুভ্র (ত্তন্প্তন্সম্ভ ভ্রড়ন্ব্ধন্দ্ব)৷ পাপড়িগুলো সাজানো কতকটা যেন গোলাপের মত৷ গন্ধে আকাশ বাতাস মধুময় হয়ে ওঠে–গাছে দারুণ আঠা৷ আঠার ফলে চোরেরা ফুল তুলতে সাহস করে না৷ অর্থাৎ এই ফুল একদিকে যেমন বাগানের শোভা বর্দ্ধন করে অন্যদিকে  তেমনি তস্ক্রের হাত থেকে নিজেই নিজেকে রবা করে৷ দক্ষিণ আমেরিকার একটা বিশেষ গ্রীষ্মপ্রধান আর্দ্র অঞ্চলে এদের বাস৷ এদের বাঁচাতে গেলে শিশুকালে তালপাতা কিংবা কলাপাতার ঠোঙা দিয়ে সকাল দশটা থেকে চারটে পর্যন্ত ঢাকা দিয়ে রাখতে হয়৷ এদের গায়ে সন্ধ্যায় ফুরফুরে হাওয়াও লাগাতে হয়৷ এ্যামোনিয়া সারের সঙ্গে সর্ষের খইল ও তার সঙ্গে কম্পোজ সার সমপরিমাণে মিশিয়ে চালুনিতে  ভালভাবে চেলে সমপরিমাণ ক্ষোন–ডাষ্ট মিশিয়ে শতকরা পাঁচ ভাগ গ্যামাক্সিন মিশিয়ে শেকড়ের আশপাশে ছিটিয়ে দিতে হয়৷ তবে শেকড়ের এক ইঞ্চি দূরত্বের মধ্যে ওই সার থাকা চলে না৷

ভদ্রলোক স্ত্রীকে বললেন, ‘‘শুণছ গো, গাছ নিয়ে নোতুন একটা গবেষণা করার সুযোগ এল৷ আমাদের বদ্দমান জেলায় যা কেউ কখনও দেখে নেই এবার তেমনটি হক্ষ্যে’’৷ ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকা রবাণা হয়ে গেলেন৷ চার পাঁচদিনের মধ্যে ফিরে এলেন৷ এসে বোসগিন্নীকে বললেন, ‘‘দেখ এবার সাগরসেঁচা মাণিক আননুম্৷ বদ্দমানের মাটিতে সেই মাণিকের গাছ হব্যে’’৷

ভদ্রলোকের কাজেকর্মে কোনখানটিতে তিলমাত্র খুঁৎ রইল না৷ প্রাণ ঢেলে বীজগুলোকে তোবাজ করতে লাগলেন৷ অনেক কষ্ট করে সার সংগ্রহ করলেন৷ বোসগিন্নী ওই সারকে চালবার জন্যে বর্ধমান–রাণীগঞ্জ বাজার থেকে বিশেষ ধরণের মিহি চালুনি আনালেন৷ ভদ্রলোক সন্ধ্যের সময় নিয়মিতভাবে বীজতলার পাশে বসে সিঙ্গুর থেকে কিনে আনা তালপাতার পাখায় বাতাস করে যেতে থাকলেন৷ কাঁধের গামছাটা মধ্যে মধ্যে বাঁ হাতে তুলে নিয়ে ঘাড়–মাথা–কপাল–মুখ্ ঘাম মুছে যেতেন৷ মধ্যে মধ্যে চশমাটা খুলে নিয়ে ভাপে ঢাকা কাঁচ দু’টো ধুতিতে মুছে নিতেন৷ এই গলদ্ঘর্ম অবস্থা বোস মশায়ের চলেছিল বেশ কিছুদিন ধরে৷ যখন ভদ্রলোকের মনে হত সিঙ্গুরের ছোট পাখায় আর শাণাচ্ছে না তখন তারকেশ্বরের গাজনের মেলা থেকে কিনে আনা ক্ষিরাট আকারের তালপাতার পাখা দিয়ে দু’হাতে ক’রে হাওয়া করে যেতেন৷

যথাকালে বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম হ’ল৷ ভদ্রলোক বড় করে একটা সত্যনারায়ণ দিলেন৷ গাঁ শুদ্ধ লোক পেসাদ পেয়ে গেল........শুভেচ্ছা জানাল, ওই দক্ষিণ আমেরিকার ফুলের গাছের অঙ্কুর যেন তাড়াতাড়ি বের হয়৷ গাছের পাতা এলে যেন তাদের অবশ্যই ডাকা হয়৷ ফুল দেখবার নেমতন্ন যেদিন করা হবে সেদিন যেন আরো একবার একটা বড় করে সত্যনারায়ণ দেওয়া হয়৷

বোসবাবু বললেন, সে আর বলতে যেদিন বীজ থেকে অঙ্কুর বেরুবে বুঝতে হবে আমার মানব জীবন সার্থক হয়েছে৷ যেদিন পাতা বেরুবে সেদিন আমার নয়, গোটা বদ্দমান জেলার সকলের মানব জীবন সার্থক হয়েছে, আর যেদিন ফুল আসবে সেদিন আমাদের অক্ষয় স্বর্গবাস৷

যথাকালে পাতা বেরুল৷ বোসমহাশয় স্বগতভাবে বললেন এমন পাতা কোন স্বপ্ণলোকে কখনও কোথাও দেখেছি দেখেছি বলে মনে হচ্ছে৷ বসুগৃহিণী মনে মনে বললেন–এই ধরণের পাতা আমার বাপের বাড়ীতে কোন্নগরের মিত্তির বাড়ীর পেছনের দিকে আস্তাকুঁড়ের পাশে যেন দেখেছি একথা মনে হচ্ছে৷ তবে আস্তাকুঁড়ের পাশে দেখেছি একথা তো কত্তাকে বলতে পারি না৷ যাই হোক কত্তাকে চেপেই যাই৷

গাছটি আরও বড় হ’ল৷ বসু মহাশয় পাড়ার লোকদের কোন খবর দিলেন না, কারণ তার মনে যেন কেমন কেমন ঠেকছে৷

বসুমহাশয় বললেন, ‘‘গিন্নী, আমারও যেন কেমন কেমন লাগছে৷ তবে এখন কথাটি না বলাই ভালো৷ কিছুদিন আর মুখ খুলো না, ফুল আসুক তখন দেখা যাবে৷’’

দেখতে দেখতে গাছে কুঁড়ি এল৷ ভদ্রলোকের বুকের ধড়ফড়ানি বেড়ে গেল৷ বসু গিণ্ণী বললেন, ‘‘কত্তা আমারও শরীরটা যেন তেমন ভাল লাগছে না৷ রগ টনটন করছে .....কেমন গা বমি বমি করছে........অম্লশূলের ব্যথাটা যেন কেমন চেগে উঠেছে৷ আমি কপালে গামছা বেঁধে একটু শুয়ে পড়ি৷

 

পরদিন সকালের কথা৷ রোজ ভোরে বসুমশায় গিণ্ণীকে ডাকেন–এসো গো, চল গাছ দেখি গে৷ আজ আর গিণ্ণীকে ডাকলেন না৷ নিজেই ধীর পায়ে বাগানে গাছটির কাছে বসলেন৷ গাছটির কাছে আসার সময় তার আর পা সরছিল না–হাঁটু নড়ছিল না৷ গাছের পাশে এসে তিনি আস্তে আস্তে বসে পড়লেন৷

ফুল এসেছে৷ শুধু একা আসেনি৷ সঙ্গে নিয়ে এসেছে বসু পরিবারের জন্যে হতাশার হিমালয়৷ ভদ্রলোক না ডাকলে কি হবে, বসুগিণ্ণী নিজের থেকেই এলেন৷ রগে তখন গামছা বাঁধা৷ গাছটির কাছে এসে তিনি ধপাস করে পড়ে গেলেন ৷ ভাগ্যিস বসুমশায় পাশেই ছিলেন, তাই তিনি গিণ্ণীর হাত ধরে ফেললেন৷ নইলে গিণ্ণী তো মুখথুবড়ে গাছটির ওপরেই পড়ে যেতেন৷

কর্ত্তার চোখে জল......গিণ্ণীর জীর্ণ মুখে হতাশার কাজল চিহ্ণ৷ এত কষ্ট করে, এত সার দিয়ে, এত পাখার বাতাস করে ঘটা করে সত্যনারায়ণ দিয়ে যে গাছটিকে আজানুম,সে যে আমাদেরই আস্তাকুড়ের পাশে অযত্নে গজিয়ে ওঠা ঘেঁটু ফুল৷

গিণ্ণী বললেন, ‘‘ঘেঁটুফুল গো ঘেঁটুফুল৷’’

কর্ত্তা বললে, ‘‘ঘেঁটুফুল গো ঘেঁটুফুল৷’’

কর্ত্তা বললে, ‘‘ভাল ক্ষাংলায় যাকে বলি ঘণ্ঢাকর্ণ’’৷

যাই হোক যে কথা জীবজগতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য উদ্ভিদ জগতের ক্ষেত্রেও তাই প্রযোজ্য.......বুঝলে 

 

উৎস

(শব্দ চয়নিকা, ১১/১৯১)

ইচ্ছে

লেখক
অনির্বান

মনের গভীর থেকে উঠে আসা এক রাশ ইচ্ছে---

মিশিয়ে তাঁর সংকল্পে৷

ফুলে ফুলে ঢাকা সেই ইচ্ছেকে বয়ে নিয়ে যাও৷

পথের দু’ধারে একটা একটা করে

ফুলের কুড়ির সৌরভ---এখন সারা বিশ্বে৷

পশুর দল ছুটে পালাচ্ছে, পাশবিকতা মুখ থুবড়ে

শোষণের পতাকা শতছিন্ন৷

স্বর্ণালি সূর্যের সোনালী আলোয় স্নানযাত্রা৷

মুগ্দ সবাই, নোতুন আলোয় ধোয়া চোখে৷

তাঁর বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়েছে প্রাণ ভরে৷

দৃষ্টি ধুয়েছে তাঁর আলোয় নোতুন করে৷

খুশির জোয়ারে ভরে গেছে মন-প্রাণ৷

গভীর থেকে উঠে আসা একরাশ ইচ্ছে

নিঃশ্বাস নিল নোতুন বাতাসে৷

রবীন্দ্র প্রণাম

লেখক
প্রভাত খাঁ

কোন পুণ্য ফলে এ ধরার ধূলিতে

তুমি এসেছিলে বঙ্গ জননীর ক্রোড়ে৷

তোমার সৃষ্টির মাঝে মানুষেরে–

দিয়েছো মর্যাদা, গাছপালা

ফলফুল জীবজন্তু সকলের

রয়েছে যে স্থান তোমার

জগতে৷ ব্রাত্য তুমি৷

হে মহান মূূ ম্লান মুখে

তুমি যোগায়েছ ভাষা৷

সাহিত্যের ফুলবনে ফোটায়েছ

ফুল ব্রাহ্মীচেতনার, তাই

তুমি কাব্যের জগতে

কবিগুরু হয়ে বিরাজিছো

এ মর্ত্যভূমিতে৷ যতদিন

চন্দ্র, সূর্য রবে ততদিন

তোমার কিরণ ছটা

রবে উজ্জ্বল৷

পরাধীনতার গ্লানি

বুকে বেজেছিলো

তাই বাজাইয়া রুদ্রের বিষাণ

তুমি তরুণের উষ্ণরক্তে

ধরাইয়া জ্বালা গেয়ে গেলে

স্বাধীনতা গান৷

রবিকবির জীবন সাধনা

লেখক
শ্রীপথিক

ওগো কবি –

‘কড়ি ও কোমল’ সুরে

                কার গান গাও?

‘সোণার তরী’টি বেয়ে

                কোথা তুমি যাও?

‘খেয়া’ঘাট পেরিয়ে

                মাঠ–বাট ছাড়িয়ে

চুপি চুপি কার তুমি ‘অভিসারে’ যাও?

কোন ‘মানসী’রে ‘গীতিমাল্য’ পরাও?

লইয়া ‘গীতাঞ্জলী’ ‘নৈবেদ্য’র থালি

‘বলাকা’র সাথে সাথে কোথা তুমি ধাও?

‘জীবন দেবতা’ তরে অর্ঘ্য সাজাও?