প্রভাতী

তোমার কাছে

লেখক
সাধনা সরকার

বড্ড তোমার কাছে যেতে ইচ্ছা করে

ইচ্ছে করে দু-দণ্ড বসি

ভুলে যাই সংসার, সমাজ,

                লাভ-ক্ষতি টানাটানি

শুধু জানি সত্য আছ তুমি

আছ জীবন নদীর গভীরে

                তোমার মত ভালবাসা

                কখনও তো কেউ দেখেনি

                কেউ তো বলেনি কাছে আয়

                আরও কাছে

                আয় আয়৷

তুমি আছো বলেই

লেখক
শিবরাম চক্রবর্তী

তুমি আছো বলেই আছে

                জগতের সব কিছু

তাই তো তোমার কাছে সবাই

                মাথা করে নীচু৷

তুমি আছো তার তরেতেই

                সূর্য সময় ধরে’

রাতের আঁধার দূরে ঠেলে

                উদয় হয় সে ভোরে

আকাশের চাঁদ গ্রহ তারা

                তোমার ইচ্ছায় আলো দেয়

সারা বছর ছয় ঋতুর কাজ

                তোমার কৃপায় পূর্ণ হয়৷

তুমি আছো বলেই আছে

                পাহাড় সাগর মরু ও

তোমার ইচ্ছায় পৃথিবীর বুকে

                সবুজের সমারোহ৷

জীবজন্তু আহার বিহার

                তোমার কৃপায় হয়

জীবের শ্রেষ্ঠ মানুষেরা তাই

                তোমায় জানতে চায়৷

মায়েরই তো খাচ্ছি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

কিছু মানুষ আছে যাদের কুকার্য ধরা পড়বার ভয়ে তারা তাদের সেই কুকার্যের সমর্থনে যুক্তি খোঁজে৷ তারা ‘খল’ পর্যায়ভুক্ত৷

আমি একজন চাটুজ্জে–গিণ্ণীকে জানতুম৷ তিনি দুর্গা পূজার সময় প্রায়ই পূজামণ্ডপে তো থাকতেনই, যেখানে ভোগ রান্না হত সেখানেও তাঁকে খুব বেশী ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত৷ একবার তিনি শাড়ীর নীচে লুকিয়ে কী যেন একটা নিয়ে যাবার সময় স্বেচ্ছাসেবকের হাতে ধরা পড়লেন৷ স্বেচ্ছাসেবকদের সাহসই হল না তাঁর জিনিসটা তল্লাসী করার৷ তারা পূজা কমিটির সেক্রেটারী জনৈক ঘোষ মশায়কে ডাকলেন৷

ঘোষ মশায় আমাকে বললেন–কী করা যায় বলুন তো

আমি বললুম–জনৈক মহিলাকে ডেকে তল্লাসি করে দেখ কী জিনিসটা নিয়ে যাচ্ছেন মহিলা৷ ছানাবড়াও হতে পারে... ধোকার ডালনাও হতে পারে... পোলাউও হতে পারে, আবার রুই মাছের কাঁটাও হতে পারে৷

তল্লাসি করা হল৷ দেখা গেল, রয়েছে পোলাও আর পায়েস৷ ধরা পড়বার পর মহিলা চীৎকার করে গালি দিতে দিতে হাত–পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে বললেন–পাপীতে দেশটা ভরে গেল অধর্ম....অধর্ম....এই অধর্ম সইবে না৷ নারায়ণ, বৈকুণ্ঠ থেকে তুমি সবই দেখছ৷ ঘোর কলি.....ঘোর কলি.....এই অধর্ম কতকাল চলবে৷ 

ঘোষ মশায় বললেন–অধর্ম মানে আপনি চুরি করে লোকের ঘর থেকে জিনিস নিয়ে পালাবেন আর অধর্ম করলুম আমরা আপনার চুরি করা অধর্ম হল না, আমাদের ধরাটা অধর্ম হল

চাটুজ্জে গিণ্ণী বললেন–চুরি কোন হারামজাদা বলে চুরি আমি তো মায়ের প্রসাদ নিয়ে যাচ্ছিলুম৷ মায়ের প্রসাদ পেয়েই না আমি আজন্ম নয়, জন্ম জন্ম বেঁচে আছি৷ কোন হারামজাদা না মায়ের প্রসাদ পেয়ে বেঁচে আছে তোরা কি নিজের পায়সায় খাস? এত আস্পর্ধা যে ছোট মুখে বড় কথা বলে৷ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবাই মায়ের প্রসাদ পেয়ে বেঁচে আছে...আমিও আছি, তোরাও আছিস৷ একে বলছিস চুরি তোদের সব্বনাশ হবে....তোদের সব্বনাশ হবে৷

আমি ঘোষ মশায়কে বললুম–দেখ, তোমার সবর্বনাশ হয় হোক, তবুও তুমি সর্বসাধারণের সমক্ষেই চুরিরাণী চাটুজ্জের মুখোস খুলে দাও৷

আমি আর সেখানে দাঁড়াইনি কারণ তখন সেখানে ছুটে চলেছে গালির ফোয়ারা৷ (শব্দ চয়নিকা ১৪শ খণ্ড)

ছোট্ট বেলা

লেখক
শরৎসুনীল নন্দী

একটা শালিখ পুষেছিলুম ছোট্টবেলা

খাঁচার ভেতর বন্দী থেকে করত খেলা,

একটা দু’টো ফরিং দিতুম রঙটা সবুজ

খেতো শালিখ মন ভরে তা একলা অবুঝ৷

একটা হাঁস পুষেছিলুম ছোট্টবেলা

ছেড়ে দিতুম ফিরে আসতো সন্ধেবেলা,

পেট ভরে খায় চালের কঁুড়ে শামুক–গুগ্লি–

ডগোমগো, ডিম দিত সে এ্যাত্তোগুলি

হলুদ দিয়ে চান করালুম শালিখটাকে

চুপ হয়ে সে থমকে গেল, আর না ডাকে৷

হাঁসটা সেদিন সাঁজবেলাতে ফিরল না আর

আম বাগানে খঁুজে পেলুম পালক তাহার

ছোট্টবেলার সেই বেদনা–বুকের ক্ষত

ভোলা কি যায়? ভালবাসার দুঃখ সে তো

এমনি আসে এমনি থাকে জীবন–স্মৃতি

সামান্য নয়, অসামান্য নিঃশব্দ গীতি৷৷

তারকব্রহ্মের শুভ আগমন

লেখক
শ্রীসমরেন্দ্রনাথ ভৌমিক

ঘন তমসায় ঢাকা চারিধার

                                চরম অবক্ষয়তায়,

পূবদিকে ঐ জাগিল ‘প্রভাত’

                                তোমারই হউক জয়৷

ভব যাতনায় কাতর মানব

                                খোঁজে মুক্তির দিশা,

‘প্রাউট’ নামের আলোক শিখায়

                                কাটবেই অমানিশা৷

দ্বন্দ্ব কাটবে, স্বাধীনতা দেবে

                                তোমার দেখানো পথ,

ওই পথে সাথী চালাও চালাও

                                তোমার জীবন রথ৷

মনের মাঝে লুকিয়ে আছ

লেখক
সাক্ষীগোপাল দেব

মনের মাঝে লুকিয়ে আছ

                বুঝতে পারি আমি

ধরতে গেলে দাও না ধরা

                ধরতে তোমায় নারি৷৷

কেন খেল এমন খেলা

                দিনে দিনে যায় যে বেলা

সব খেলাতে হেরে গেছি

                চাও কি শেষে হারি৷৷

তুমি আমার প্রাণের সখা

                ধরা দিয়ে দাও হে দেখা

তুমি হেরে দাও জিতিয়ে

                আমার ভবের কাণ্ডারী৷৷

প্রগতির জন্যে নজরুল

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

স্বাদেশিকতার উদ্দীপনায়

জাগিয়ে গিয়েছো জাতিরে,

প্রভাতীর গানে মুখর করেছো

আঁধার সুপ্ত রাতিরে৷

অত্যাচার মরণের গান

লিখেছো সাহস-দীপ্ত,

লাঞ্ছিত যত উৎপীড়িতের

হৃদয়ে করেছো ক্ষিপ্ত৷

চারণগীতির  সুরের আগুনে

বাঙালীর মন মাতালে.

‘অগ্ণিবীণা’র উন্মাদনায়

মুক্তির গানে মাতালে৷

লৌহকপাট করতে পারে নি

তোমার কন্ঠ রুদ্ধ,

শেকলভাঙার ঝংকার তুলে

কলমে করেছো যুদ্ধ৷

বিপ্লবী তুমি, সৈনিক তুমি

বিদ্রোহী দুর্দান্ত,

তোমার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়

বাংলার প্রতি প্রান্ত৷

 

বেগুন পোড়া

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

কোন বস্তু অগ্ণির সংস্পর্শ এলে তাতে তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়৷ তার দ্বারা বস্তুকে পোড়ানো যায়, জ্বালানো যায় ও ঝলসানো যায়৷ এ ছাড়া স্যাঁকাও যায়৷

পোড়ানোর অর্থ হল বস্তুর বহিরাবরণ অগ্ণিদগ্ধ হয়ে বিনষ্ট হয়ে যায় কিন্তু অভ্যন্তর ভাগ অগ্ণিপক্ব হয়ে নরম হয়ে যায়৷ জ্বালানোর অর্থ হল বস্তুর অগ্ণিসংযুক্তি ঘটার ফলে তার বাহির ও ভেতর দু’ই নষ্ট হয়ে যায় বা ভষ্মে পরিণত হয়৷ বেগুনকে পোড়ানো হয়, প্রদীপের সলতেকে জ্বালানো হয়৷ বস্তুর অগ্ণিসংযুক্তির ফলে যখন বস্তুর বহিরাবরণ মোটামুটিভাবে পুড়ে যায় কিন্তু ভেতরের দিকটা কোনভাবে নরম হয় না, কিছুটা প্রভাবিত হয় মাত্র, এই ধরনের অগ্ণিসংযুক্তিকে ঝলসানো বলে৷ এই ঝলসানোর জন্যে ‘রা’ ধাতু  + ড প্রত্যয় করে ‘র’ শব্দ প্রযোজ্য (পুংলিঙ্গে)৷

বস্তুর অগ্ণিসংযুক্তিতে যখন বস্তুদেহে বিবর্ত্তন ঘটে কিন্তু কোন অংশই পোড়ে না তাকে আমরা স্যাঁকা বা সেঁক দেওয়া বলি৷ ‘র’ বলতে কিন্তু এই স্যাঁকা বা সেঁক দেওয়াকে ক্ষোঝায় না অর্থাৎ আমরা যে রুটি সেঁকি সেই স্যাঁকা রুটিকে কিন্তু ‘র’ বলতে পারব না৷ তোমরা বেগুন পোড়া বলো, না বেগুন জ্বালানো বলো, না বেগুন ঝলসানো বলো? নিশ্চয়ই বেগুন পোড়া বলো কারণ বেগুন পোড়ানোর পরেই তার ভেতরটি খাও৷

বেগুন–পোড়ার কথা বলতে গিয়ে অনেককাল আগেকার একটা ছোট ঘটনা মনে পড়ল৷ সেকালে নাটকে খুব বেশী অতি–নাটকীয়তা চলত৷ নাটকের সংলাপ অবশ্যই স্বাভাবিক হওয়া বাঞ্ছনীয়৷ তবে দৈনন্দিন সাদামাটা জীবনে যে ধরনের সংলাপ ব্যবহার করা হয় নাটকের সংলাপের সঙ্গে তার অল্প–স্বল্প তফাৎ থাকে৷ বিশেষ করে স্বাভাবিক জীবনে যখন আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলি তখন হয় আমরা ভাবি যেন আর কেউ তা না শোনে অথবা তখন আমরা আর কাউকে শোনানোর কথা ভাবি না৷ কথাটাকে নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি৷ কিন্তু নাটকীয় সংলাপে মনে রাখতে হয়, শ্রোতা–দর্শকেরা যেন অভিনয়কারীদের কথা শুনতে পান অথবা হাবভাব দেখে তাঁদের বক্তব্য বুঝতে পারেন৷ স্বাভাবিক সংলাপ ও নাটকীয় সংলাপের মধ্যে এটাই বড় তফাৎ........এ ছাড়া অন্যান্য তফাৎও আছে৷

 সেকালে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যেত নাটক মানেই অতি–নাটকীয়তা৷ সে সময় একবার আমাদের গ্রামে কোলকাতা থেকে একটি সেরা যাত্রার দল গেছল৷ আমি আর আমার ঠাকুমা যাত্রা দেখতে গেছি (সেকালে বলা হত যাত্রাগান শুনতে যাওয়া)৷ সংলাপ চলছে রাজার সঙ্গে রাণীর৷ রাজা রাংতা–মাখা পোষাক, রাংতার মুকুট পরে রূপোলী রাংতা মোড়া মাখনশিম হাতে নিয়ে এই–মারে–কী–সেই মারে করে যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত হচ্ছে৷ তখন রাজা–রাণীতে কথা হচ্ছে অতি–নাটকীয়ভাবে৷ রাণী বলছে–‘‘প্রাণেশ্বর, প্রাণনাথ কোথা যাও ফেলিয়া আমারে?’’

ঠাক্মা বললেন–‘‘মরণ দশা মিনসের ঢং দেখ৷’’

আমারও মোটেই পছন্দ হচ্ছিল না৷ তারপর দ্বিতীয়বার যখন রাণী উদাত্ত কণ্ঠে পুরুষালী হেঁড়ে* গলায় চীৎকার করে বলে উঠল– ‘‘প্রাণেশ্বর...........প্রাণনাথ’’৷

আমি আর থাকতে না পেরে বললুম–‘‘বেগুন–পোড়া মাখো ভাত৷’’

ঠাক্মা শুনে আমাকে বললেন–‘‘বেশ বলেছিস্ ....... বেশ করেছিস৷ তোকে আমি হীরে–বসানো আংটি গড়িয়ে দোব৷’’

তা যাই হোক্, বেগুনপোড়া খাবার জিনিস৷ তাই আমরা বেগুন পোড়া বলি–বেগুন–জ্বালানো বলি না৷ 

(*হাঁড়িয়া > হেঁড়ে৷ মুখের সামনে একটা হাঁড়ি রেখে কথা বললে ধ্বনিটি যে ধরনের হয় তাকে বলে হেঁড়ে আওয়াজ৷)

উৎস

(‘বর্ণ বিচিত্রা’ থেকে গৃহীত)

শাক-সব্জির কাব্য

লেখক
অরুণিমা

ঝিঙে বলে, আমায় খেলে

                বাড়বে তোমার বুদ্ধি,

পালং বলে, আমায় খেলে

                বাড়বে সবার শক্তি৷

নিম বলে, আমার পত্রে

                চর্ম রোগের মুক্তি,

কাঁকরোল বলে, আমায় খেলে

                বাড়বে স্মৃতিশক্তি৷

গাজর বলে, আমায় খেলে

                অনেক বড় হবে,

লাউ বলে, আমায় খেলে

                দৃষ্টিশক্তি বাড়বে৷

মুলো বলে, আমায় খেলে

                লিভার ভালো থাকবে,

উচ্ছে বলে, মুলোর আগে

                আমায় তবে রাখবে৷

আমরা সবাই তোমার সেবা

                করে যেতে চাই

তোমায় যেন আদর্শবান

                রূপে দেখতে পাই৷

মানুষ

লেখক
কল্যাণী ঘোষ

ঈশ্বর পাঠালো মানুষ করে৷

মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব ধরণীর পরে৷৷

সম্পদ যাহা কিছু আমাদের তরে৷

ভালবেসে তা’ দিলেন উজাড় করে৷৷

একটি জীবন সে তো নয় চিরতরে৷

তার কাছে ঋণী মোরা ভুলি কী করে৷৷

তিনি সদা জাগ্রত হৃদয় জুড়ে৷

শুভবোধ নিয়ে চলি শুভপথ ধরে৷৷

তাঁহার আশিস নিয়ে সকলের তরে

জীবন সফল করি ভালো কাজ করে৷৷