প্রভাতী

জয়

লেখক
কল্যাণী ঘোষ

গগনে পবনে একটি বাণী ধ্বনিত হয়

সদা সত্যেরই জয় সত্যেরই জয়৷

এসো সবাই বাজাই জয়ের ডঙ্কা,

নির্ভয়ে থাকি নেই আর কোন শঙ্কা

শোন, ডাকিছে মোহন, বাঁশীর সুরে,

দিচ্ছে নাড়া সবার হূদয়পুরে

এসো সবাই নাহি ভয় নাহি ভয়,

সত্যের পিছে আছে মঙ্গলময়৷

থাকবে না থাকবে না কারো কষ্ট

ধর্মের অসিতে করবে বিনষ্ট৷

মিথ্যাচারীর নেই কোনও স্থান,

এসো মোরা গাই মহা মিলনের গান৷

 

প্রার্থনা

লেখক
অরুনিমা

পরমপুরুষ তোমার কাছে

          প্রার্থনা করি,

লেখাপড়া শিখে যেন

          মানুষ হতে পারি৷

সমাজসেবা করি যেন

          ঢেলে মন প্রাণ,

উঁচু–নীচু, ছোট–বড়

          সবাই সমান৷

মানুষ–পশু–পাখী আর

          তৃণ তরুলতা,

সবার সাথে থাকে যেন

          ভাব সমতা৷

বাবার প্রতি শ্রদ্ধা যেন

          থাকে আমার মনে,

মায়ের প্রতি ভক্তি যেন

          থাকে সর্বক্ষণে৷

এই আশিস দাও গো আময়

          আমার পরমগুরু–

(তব) চরণরেণু মাথায় নিয়েই

          কর্ম জীবন শুরু৷

মানব ধর্ম

লেখক
দাদাঠাকুর

ছোট ভাইবোনেরা, বৈচিত্র্যময় এই জগতে আমরা নানান ধরণের বস্তু দেখতে পাই৷ তাদের প্রত্যেকেরই কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা গুণ আছে যা দেখে আমরা সেই বস্তুটিকে চিনতে পারি৷ যেমন আগুনের বৈশিষ্ট্য হ’ল তাপ ও আলো দেওয়া, জলের বৈশিষ্ট্য হ’ল ভেজানো বা নীচের দিকে গড়িয়ে যাওয়া৷ বস্তুর এই বিশেষগুণ বা বৈশিষ্ট্যকেই তার ধর্ম বলে৷

জড় বস্তুর মত প্রতিটি জীবেরও কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা দেখে আমরা তাদের জড়বস্তু থেকে আলাদা করতে পারি৷ যেমন জীব মাত্রেই ক্ষুধা পেলে খেতে চায় ক্লান্ত হলে বিশ্রাম চায়, ঘুমায়, প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকতে চায় আর নিজের বংশ বিস্তার করে যেতে চায়৷ এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা গুণগুলিকেই বলা হয় জৈব  ধর্ম৷ এই জৈব ধর্মে উদ্ভিদ, পশু–পাখী তথা মানুষে কোন প্রভেদ নেই৷ জীব মাত্রেরই এগুলি স্বাভাবিক ধর্ম৷

এই জৈব ধর্ম ছাড়াও প্রতিটি জীবনের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা দেখে তাদের অন্যান্য জীব থেকে আলাদা করা যায়৷ তেমনি মানুষেরও কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা দেখে তাকে পশু থেকে আলাদা করা যায়৷ পশু দেহ প্রধান জীব, তার আছে শুধু দেহের ক্ষুধা৷ কিন্তু মানুষ মন প্রধান জীব, তার দেহের ক্ষুধার সঙ্গে আছে মনের ক্ষুধাও৷ এর ফলেই পশু ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য৷ দেহের ক্ষুধা সীমিত কিন্তু মনের ক্ষুধা অনন্ত৷ সীমিত জড়বস্তুতে দেহের ক্ষুধা মিটলেও মনের অনন্ত ক্ষুধা মেটে না৷ ক্ষুধা পেলে আমরা খাদ্য গ্রহণ করি, খেয়ে সুখ পাই৷ কিন্তু খাদ্য এক সময় শেষ হয়ে যায় বা আমাদের পেট ভরে গেলে আমরা আর খেতে পারি না৷ আর খাওয়া শেষ হবার সাথে সাথে খাওয়ার সুখও শেষ হয়ে যায়৷ মন তখন অন্য কিছু পেতে চায়৷ আমরা যা কিছুই পাই না কেন তার দ্বারা আমরা ক্ষণিকের সুখ পাই৷ মন তাতে কখনও তৃপ্ত হয় না৷ মন এমন কিছু পেতে চায় যা কখনও শেষ হবে না, যা থেকে আমরা সব সময় সুখ পেতেই থাকব৷ যে সুখের কখনও শেষ হবে না৷ এই অনন্ত সুখকেই প্রকৃত আনন্দ বলা হয়৷ ঈশ্বরই একমাত্র অনাদি অনন্ত সত্তা৷ তাই একমাত্র ঈশ্বরকে উপলব্ধির দ্বারাই আনন্দ পাওয়া সম্ভব৷ প্রতিটি মানুষ জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতসারে হোক আনন্দ পেতে চায়, ঈশ্বরকে পেতে চায়৷ এটাই মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা গুণ৷ এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য মানুষকে পশু থেকে আলাদা করেছে, মানুষকে জীব জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছে৷ এই আনন্দ পাবার এষণা অর্থাৎ একান্ত ইচ্ছা বা ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার একান্ত ইচ্ছাই মানুষের যথার্থ পরিচিতি বহন করে৷ এটাই মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, এটাই মানুষের ধর্ম৷ আর মানুষ যখন জেনে, বুঝে এই আনন্দ পাবার জন্যে, ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার জন্যে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে তাকে বলে সাধনা৷ তাই প্রতিটি মানুষেরই সাধনা করা উচিত৷

ছোট্ট বন্ধুরা, এখন তোমরা বুঝতে পেরেছ, আমাদের জীবনের লক্ষ্য হ’ল অনন্ত সুখ বা আনন্দ লাভ করা৷ আর নিয়মিত সাধনার দ্বারা ঈশ্বর উপলব্ধির মাধ্যমেই অনন্ত সুখ  বা আনন্দ পাওয়া যায়৷ তাই আমাদের দু’বেলা নিয়মিত ভাবে সাধনা করতেই হবে৷ এটা আমাদের বিশেষ কর্তব্য৷

‘না তাকাইঁ’

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

রাঢ়ের মানুষ একদিকে  যেমন দার্শনিক চিন্তা করেছে, অন্যদিকে তেমনি হালকা মেজাজে হাসি–তামাসা–নৃত্য–গীত উচ্ছল হয়ে উঠেছে৷ রাঢ়ের মানুষ মজলিশী, মিশুক ও খোসমেজাজী৷ দারিদ্র্যভারে জীর্ণ হলেও সে মানুষকে ডেকে খাওয়ায়–খাওয়ায় তা–ই যা সে নিজে খায়–ভাত, কলাইয়ের ডাল (রাঢ়ী বাংলায় ‘বিরি’), বড়ি–পোস্ত আর কুমড়োর তরকারি (রাঢ়ী বাংলায় ‘ডিঙ্লা’)৷ তার আচরণে–ব্যবহারে কোনো দারিদ্র্যগত সংকোচ নেই৷ বিনা কষ্টেই সে স্পষ্ট কথা বলে থাকে৷ রাঢ়ের মানুষের সরলতার একটি নিদর্শন ঃ

জনৈক সরলৰুদ্ধি অশিক্ষিত রাঢ়ী কর্ষককে১ বিচারক নাকি জিজ্ঞাসা করেছিলেন–‘‘হাঁ রে, তু যে বলছিস জমিনটা তুর তা তু বলত্যে পারিস জমিনটাতে ক’টা আল আছে?’’ অশিক্ষিত কর্ষক সে প্রশ্ণের উত্তর দিতে পারলে না৷ সে আকাশ পানে চেয়ে রইল৷ বিচারক শুধোলেন–‘‘কী ভালছিস (দেখছিস) বটেক?’’ কর্ষক তখন শুধোলে–‘‘হাঁ রে সাহেব, তু যে ই ঘরটাতে অনেকদিন ধর্যে ম্যাজিসটারি করছিস তা তু উপরদিকে না তাকাইঁ বল না কেনে ঘরে ক’টা কড়ি–বরগা আছে৷’’ তখন বিচারক শুধোলেন–‘‘তু যে ই কথাগুলান বললি ইটা তুকে কে শিখাইঁ দিইছিল?’’ কর্ষক বললে–‘‘কেউ শিখাইঁ নাই, মু লিজেই বললম, বাকী কথাগুলান উকিলবাবু শিখাইঁ দিইছিল৷ মু ল্যাজ্য কথা বললম, তু ল্যাজ্য বিচার কর্৷’’

রাঢ়ের মানুষ এমনই সহজ সরল৷ তাই রাঢ়ের গ্রাম্যজীবনে যেমন উৎসবের অন্ত নেই, তেমনি আমোদ–প্রমোদের উপকরণেরও অন্ত নেই৷ সস্তা ও সাধারণ বিলাস–ব্যসন রাঢ়ের মজ্জাগত৷ তবে তাকে কিছুতেই রাঢ়ের সহজ সরল জীবনের পরিপন্থী হতে দেওয়া হয়নি৷

১৷ ‘কৃষক’ শব্দটি বৈয়াকরণিক বিচারে অশুদ্ধ৷

২৷ ঘটনাটি সম্ভবতঃ জামতাড়া আদালতে ঘটেছিল৷

আমি কেমন সেয়ানা মেয়ে

প্রাচীনকাল থেকেই ভাশুর শ্বশুরের তুল্য পূজ্য রূপেই গণ্য হয়ে এসেছে৷ তাই ভাশুরের সম্ক্ষোধনসূচক সাম্মানিক শব্দ হচ্ছে ক্ষড় ঠাকুর/বট্ঠাকুর৷ কিন্তু প্রাচীনকালে সামাজিক বিধি ছিল এই যে ভাশুরকে ছোঁয়া চলে না৷ এ সম্পর্কে একটা গল্প আছে৷  ঘটনাটি  ঘটেছিল মানাদে  (মহানাদ)*৷ তাড়াতাড়ি বলছি শোনো৷

বউ–(স্বগত) চোর এসেছে...........বাড়ির চারপাশে সিঁদকাঠি নিয়ে ঘোরাফেরা করছে.......সব ৰুঝছি, মুখটি খুলছি না............আমি কেমন সেয়ানা মেয়ে.........দেখি কী হয়

..........চোর সিঁধ কাটছে.......... শব্দ শুনছি, চোখটি বুজে  পড়ে আছি, মুখটি খুলছি না.......আমি কেমন সেয়ানা মেয়ে.........দেখি কী হয়

..........সিঁধ কেটে চোর ঘরে ঢুকল........পাশ ফিরে শুলুম......... চোখ খুললুম না........... আমি কেমন সেয়ানা মেয়ে.......দেখি কী হয়

...........চোর জিনিসপত্র সব জড়ো করলে............পুঁটলিতে ৰাঁধল.......পুঁটলিটা প্রকাণ্ড হল............সিঁধের গর্ত্ত দিয়ে তা গলানো যাবে না............আমি কেমন সেয়ানা মেয়ে...........সব দেখে চলেছি, ‘রা’–টি কাড়ছি না

.........কিন্তু এইবার পুঁটলিটা নিয়ে চোর যাবে কোথায় ........ডানে আস্তাকুড়, বাঁয়ে বট্ঠাকুর, দু’য়ের কাউকেই ছুঁতে নেই, ছুঁলেই চান করতে হয়......  .....চোর, যাবি কোথায়....... ডানে আস্তাকুড়, বাঁয়ে বট্ঠাকুর..........এই বার.......৷

*হুগলী জেলার অন্তর্ভুক্ত মহানাদ স্থানটি ক্ষৌদ্ধ যুগে বাঙলার অন্যতম সাংসৃক্তিক কেন্দ্র ছিল৷ স্থানটি অল্প দিনের জন্যে রাঢ়ের রাজধানীও ছিল৷ পরে বন্যার বালিচাপা পড়ে যাওয়ায় রাজধানী পাণ্ডুয়ায় (হুগলী জেলা) স্থানান্তরিত হয়৷ পাঠান যুগের মাঝামাঝি সময়ে পাণ্ডুয়া বিধ্বস্ত হয়৷ পাণ্ডুয়ার মিনারটি (পেঁড়োর পীর) কমবেশী সেই সময়কারই৷

বিনা টিকিটে গঙ্গাস্নান

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রাচীনকালের মানুষ যাঁদের গঙ্গা–যমুনার উপর খুব শ্রদ্ধা–ভক্তি ছিল তাঁরা ভাবতেন ঈশ্বরের করুণাই  অবস্থান্তর প্রাপ্ত হয়ে  গঙ্গাধারার রূপ পরিগ্রহ করে থাকে কারো গঙ্গাস্নানের আকর্ষণ কর্ত্তব্যের প্রেরণায়, কারো বা ধর্মোন্মাদনার প্রেষণায় কেউ বা গঙ্গাস্নান করেন ডগমা বা ভাবজড়তার বশবর্ত্তী হয়ে, আর কেউ বা পুরাণের কাহিনীকে গুরুত্ব দেন ক্ষলে৷ সত্যিই গঙ্গা ‘‘পতিত পাবনী’’ এ কথা ঠিকই যে গঙ্গা সুবিশাল আর্যাবর্ত্তের স্তন্যদাত্রী জননী৷ এও ঠিক যে নদীর বহমান ধারায় স্নান করলে তা শরীর মনকে স্নিগ্ধ করে৷ তবে গঙ্গাস্নানে কোন বিশেষ গুণ আছে কি না তা  পণ্ডিতেরা বিচার করে দেখতে পারেন৷ তবে আপাতঃদৃষ্টিতে তেমন গুণ আছে ক্ষলে মনে হয় না কারণ মীন ও অজস্র জীবজন্তু গঙ্গায় স্নান করে থাকে, তাদের মল–মূত্র নিত্য গঙ্গায় পতিত হয়৷ তারা গঙ্গা স্নান করে কতটা বৈকুণ্ঠের কাছে পৌঁছোয় তা কেউই  হলফ করে ক্ষলতে পারক্ষে না৷ তবে একথা ক্ষলক্ষ যে গঙ্গাস্নান হিসাবে মন্দ নয় যদি সেখানে জলক্ষিদূষণ না হয়ে থেকে থাকে৷ পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী বৈকুণ্ঠে নারায়ণের চরণোদক থেকে গঙ্গার উৎপত্তি৷ ৰাঙলার রাজা ভগীরথ তাঁর তপস্যার ক্ষলে গঙ্গাকে মর্ত্ত্যে আনয়ন করেন৷ আকাশ থেকে নীচে নাক্ষবার সময় গঙ্গার তোড়ে বসুন্ধরা যাতে বিদীর্ণা না হন তাই শিব তাঁকে জটায় আশ্রয় দিয়ে তাঁর গতিবেগ বা তোড় কমিয়ে দেন৷ কাহিনী অনুযায়ী গঙ্গা চতুর্ধারায় বিভক্ত হয়েছিল৷ তার একটি ধারা মর্ত্ত্যে  চলে আসে ঃ

‘‘স্বর্গেতে অলকানন্দা মর্ত্ত্যে ভাগীরথী 

দেক্ষলোকে মন্দাকিনী পাতালে ভোগবতী৷’’

 

সুতরাং গঙ্গাস্নান মানে বিষ্ণুর চরণোদকে স্নান৷ এই ভেবে ভক্ত পুণ্যার্থী গঙ্গাস্নানে আকৃষ্ট হক্ষেন ক্ষৈ কি তাঁরা গঙ্গাকে বিষ্ণুর করুণার বিগলিত রূপ হিসেবে ভাবক্ষেন ক্ষৈ কি

অন্য কাহিনী অনুযায়ী গঙ্গা শিবের পত্নী৷ শিবজায়া গঙ্গার জলবিধৌত হতে কোন্ শৈব, কোন্ শাক্ত না চাইক্ষেন তাই গঙ্গা যে কেবল বৈকুণ্ঠনিবাসী নারায়ণের পাদোদক তাই নয় শাক্ত শৈবের কাছে গঙ্গা পুণ্যতোয়া৷

                ‘‘হরিপাদপদ্মবিহারিণ্

                গঙ্গে হিমবিধুমুক্তাধবলত্৷

*      *      *

                তব তটনিকটে যস্য নিবাসঃ

                খলু বৈকুণ্ঠে তস্য নিবাসমঃ৷

*      *      *

                ভাগীরথি সুখদায়িনি মাতস্তব

                জলমহিমা নিগমে খ্যাতঃ৷

*      *      *

                ‘‘দেবি সুরেশ্বরি ভগবতি

                গঙ্গে ত্রিভুবনতারিণি তরলতরঙ্গে৷

                শঙ্করমৌলিনিবাসিনি বিমলে,

                মম মতিরাস্তাং তব পদকমলে৷৷’’

*      *      *

                নাহং জানে তব মহিমানং,

                ত্রাহি কৃপাময়ি মামজ্ঞানম্৷’’

*      *      *

সুতরাং সাধারণ মানুষই নয়, জ্ঞানী–গুণীরাও গঙ্গাকে ক্ষিগলিত করুণা হিসেক্ষে দেখেছিলেন৷ তাই গঙ্গা–মহিমাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় না৷ অন্য নদীর সঙ্গে গঙ্গার গুণগত পার্থক্য খুব কম৷ বরং গঙ্গার তীরবর্ত্তী শিল্পকেন্দ্রগুলি যে পরিমাণ আবর্জনা গঙ্গাজলে নিক্ষেপ করে তাতে গঙ্গাস্নানে রোগ ক্ষৃদ্ধিও অক্ষশ্যই ঘটতে পারে৷

‘‘এক ডুক্ষ কাক ডুক্ষ দুই ডুক্ষ ক্ষ্যাঙ

তিন ডুক্ষে শরীর টান চার ডুক্ষে গঙ্গা স্নান৷’’

‘‘জাহ্ণবী–যমুনা বিগলিত করুণা’’

ক্ষর্দ্ধমান জেলার ক্ষেশীর ভাগ অংশই অ–গঙ্গার দেশ, তাই দেখেছি গ্রামাঞ্চলের সাদামাঠা অনেক মানুষই ক্ষলে থাকেন মরণান্তে তাকে যেন তিরপুণী (ক্ষর্দ্ধমানের গ্রাম্য মানুষ ত্রিবেণীকে ‘তিরপুণী’ ক্ষলে৷ ক্ষর্দ্ধমানের গ্রাম্য ছড়ায় আছেঃ

‘‘চালভাজা খেতে খেতে গলা হয় কাঠ

হেথা কোথা জল পাক্ষ সেই তিরপুণির ঘাট

তিরপুণির ঘাটাতে বালি ঝুরঝুর করে

সোনার গায় রোদ লেগেছে ডালিম ফেটে পড়ে৷’’)  ঘাটে দাহ করা হয়, ছাইগুলো যেন গঙ্গাজলেই শেষ আশ্রয় পায়৷

মনে পড়ে গেল আমার ছোট বয়সের পাড়াতুত এক ঠাকুমার কথা৷ ঠাকুমা রোজ ট্রেনে করে ছয় মাইল দূরবর্ত্তী গঙ্গায় ডুক্ষ দিয়ে আসতেন৷ অতি ভোরে বেরুতেন, ফেরবার সময় হাতে ছাপ, কপালে ছাপ, বুকে তিলক, নাকে রসকলি লাগিয়ে ফিরতেন৷ সবই করতেন.... কেবল করতেন না টিকিট৷ ইষ্টিশানে চেকারৰাৰু যখন হাত পেতে শুধোতেন –মা, আপনার টিকিটটা? কোলকুঁজো ঠাকুমা বাঁ হাতটা উপরের দিকে কেৎরে দিয়ে ক্ষলতেন–আ মরণ মিনসের ছেলে পেছনে রয়েছে দেখছ না টিকিটটা তার হাতেই রয়েছে৷

চেকারৰাৰু কোন কোন দিন শুধু হাসতেন, কেবল ক্ষলতেন–মা, রোজই তো ক্ষলেন ছেলে পেছনে আসছে৷ কই, এক দিনও তো আপনার ছেলের টিকি দেখতে পাই না৷

ঠাকুমা একটু ঝাঁঝালো ভাষায় ক্ষলতেন–আমার ছেলে কি ভিনদেশী নাকি যে মাথায় টিকি রাখক্ষে ৰাঙালী পোলা মাথায় টিকি রাখে না মরণ....মিনসের মরণ

একদিন আমি ৰুকে ক্ষল  নিয়ে সাহসে  ভর দিয়ে  শুধোলুম–হ্যাঁ গো ঠাকুমা, তুমি যে   গঙ্গাস্নান করো, কষ্ট করো, তিলক–ছাপ, চন্দন–ছাপ, তিলক–মাটি লাগাও, সেই যে নাকে রসগোল্লা না কী একটা লাগাও এ তো পুণ্যি করা ঠিক, কিন্তু বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণ করায় সব পুণ্যি তো বরবাদ হয়ে যাক্ষে....এ যেন সেই এক ভাঁড় গোদুগ্ধে এক ফোঁটা গোরোচনা৷

ঠাকুমা ক্ষললেন–খোকন, ওইখানেই তো ভুল করলি৷ বিনা টিকিটে ভ্রমণের পাপটার দিকে তাকিয়ে দেখলি কিন্তু গঙ্গাস্নানের পুণ্যিটার দিকে ভাল করে তাকালি না ৷ গঙ্গাস্নানে যে পরিমাণ পুণ্যি হয় বিনা টিকিটে ভ্রমণে সে তুলনায় পাপ একেবারেই অকিঞ্চিৎকর৷ তাই দু’য়ে যে গায়ে গায়ে শোধ হক্ষে তার জো নেই৷

                ‘‘একবার গঙ্গাস্নানে যত পাপ হক্ষে,

                পাপীদের সাধ্য নাই তত পাপ করে৷’’      (শব্দ চয়নিকা)

নব্য–মানবতাবাদ

লেখক
শুভ্র ড্যানিয়েল

তুমি  মানুষের সন্তান

তুমি  বিধাতার সেরা দান৷

                বুদ্ধি–বোধিতে তুমি

                ছঁুয়েছ যে আগ্মান৷

                হূদয়েতে তাঁকে রেখে

                মানুষকে ভালোবাসো

                ভালোবাসো তরুলতা

                পশুপাখি ভালোবাসো৷

                আকাশ বাতাস মাটি

                গিরি নদী ভালোবাসো

                অপ্রাণিন্ যত আছে

                সব কিছু ভালোবাসো৷

 

                তোমার বুদ্ধি–শক্তি

                হূদয়–গভীরে ভক্তি

                মন প্রাণ দিয়ে

                সব প্রাণী নিয়ে

                এক পরিবার গড়ো –

                তাতে আনন্দ ভরো৷

               

                এ এক তত্ত্ব অভিনব

                মানবতাবাদ–নব৷

আমার গর্ব করো খর্ব

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

আমার মাঝে আমায় নিয়ে

করলে আমার শুধুই খোঁজ

তখন দেখি কেবল আমি’-র

ভাবনা নিয়েই করি ভোজ৷

ব্যতিক্রমী হতেও পারি

ভাবি যখন তুমি আমি

শ্বাস প্রশ্বাসের ছন্দের ধারায়

হারিয়ে করি আমায় দামী৷

সেই দামের অমূল্য ধনে

আনন্দের সুর উঠলে ভেসে

সুমুখ পানে তখন দেখি

দাঁড়িয়ে আছ তুমি হেসে৷

তখন আমার আমি’র গর্ব

এক নিমেষে হ’ল শেষ

তখন তোমার চরণ ধরে

আমায় ভাল রাখি বেশ৷

প্রার্থনা

লেখক
অরুণিমা

পরমপুরুষ তোমার কাছে

                প্রার্থনা করি,       

লেখাপড়া শিখে যেন

                ‘মানুষ’ হতে পারি৷

সমাজসেবা করি যেন

                ঢেলে মন-প্রাণ,

উঁচু-নীচু, ছোট-বড়,

                সবার সমান৷

মানুষ পশু-পাখী আর

                তৃণ তরুলতা

সবার সাথে থাকে যেন

                ভাব সমতা৷

বাবার প্রতি শ্রদ্ধা যেন

                থাকে আমার মনে,

মায়ের প্রতি ভক্তি যেন

                থাকে সর্বক্ষণে৷

এই আশিস দাও গো আমায়

                আমার পরম গুরু

(তব) চরণরেণু মাথায় নিয়েই

                কর্মজীবন শুরু৷

 

মণ্ডামোহন

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

যে সকল অন্তর্নিহিত দুর্বলতা মানুষের ক্ষতিসাধন করে সেগুলিকে রিপু বলা হয়৷ আর জীবের এই অন্তর্নিহিত দুর্বলতা বা রিপুর সুযোগ নিয়ে বাইরে থেকে যে বন্ধন এসে জেঁকে বসে’ মানুষকে জড়িয়ে ধরে .....আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে ...জগদ্দল পাথরের মত বুকে চেপে বসে সেগুলিকে বলা হয় পাশ৷ রিপু ছয়টি – কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ, মাৎসর্য্য৷ আর এই রিপুগুলি থাকার ফলে যে পাশগুলি (পাশ মানে বন্ধনরজ্জু) মানুষকে বন্ধন করে তারা হ’ল সংখ্যায় আট৷

                ‘‘ঘৃণা–শঙ্কা–ভয়ং–লজ্

                                জুগুপ্সা চেতি পঞ্চমী

                কুলং–শীলঞ্চ–মানঞ্চ্

                                অষ্টপাশাঃ প্রকীর্ত্তিতাঃ’’৷৷

এই ঘৃণা–শঙ্কা–ভয়–লজ্জ্ (গোপন রাখবার ইচ্ছা বা কপটতা – ড়ম্ভহ্মপ্সন্তুব্জন্ব্দ্ ), কুলাভিমান, মানাভিমান ও গুণাভিমান এই আটটি হচ্ছে পাশ৷ এই ঘৃণা পাশের বীজমন্ত্র হচ্ছে ‘প’৷ একটি পাশ যে কেবল একটি রিপুতেই সন্নিবদ্ধ হয় তা নয়, একটি পাশের পেছনে একাধিক রিপুগত ত্রুটি থাকতে পারে৷ তবে ঘৃণা–ভয় পাশ দু’টি অন্যান্য রিপু–আশ্রিত হলেও এরা মুখ্যতঃ মোহ রিপুর পরিপোষকতা পায়৷ যেমন ধর, কারও মধ্যে পানাসক্তি রয়েছে৷ আকর্ষণ যেখানে জড়াভিমুখী, মনের গতি সেখানে নিম্নঢালুতে৷ গতি যেখানে নিম্নঢালু ক্রিয়া সেখানে ‘পত্ (পততি)৷ আসক্তির ফলে হয় পতন৷ আর গতি যেখানে  ঊর্ধ্বঢালুতে তাকে বলে অনুরক্তি ও অনুরক্তির চরম অবস্থার  নামই ভক্তি৷ এর জন্যে সংসৃক্তে ধাতু হ’ল ‘উর্ধ্ব গম্’ (ঊর্ধ্ব গচ্ছতি)৷ যার মধ্যে পানাসক্তিরূপী মোহগত দুর্বলতা রয়েছে সে সহজেই ঘৃণা ও ভয়ের দ্বারা বদ্ধ হয়৷ কেবল পানাসক্তিই নয়, যে কোন প্রকারের মোহ রিপু মানুষকে অন্যের কাছে ঘৃণিত ও অন্যকে তার কাছে ভয়ের বস্তু করে তোলে৷ সে যুক্তিতর্ক বর্জিতভাবেই মোহ আলেয়ার পেছনে ছুটে যায়৷ এই মোহ বৃত্তি সম্বন্ধে একটি গল্প মনে পড়ল৷

মোমিনপুরে থাকত আমার জানা–চেনা, কী যেন নামটা ... বোধ হয় মণ্ডামোহন মুখুজ্জে৷ মণ্ডামোহনকে কেউ বলত হাড়কেপ্পন, কেউ বলত দৃষ্টিকেপ্পন, কেউ বলত

আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে জল গলে না, কেউ বলত একটা পয়সা খসালেই ওর একটা পাঁজর খসে যায়, কেউ বলত ওয়ান পাইস ফাদার–মাদার, কেউ বলত এক পয়সা প্যাঁজ–ফুলুরী, কেউ বা রসিকতা করে বলত প্যাঁজ–পয়জার৷ আধুনিক ছেলেরা বলত, উপুড়হস্ত নো–নট–নেবার৷ কথাগুলো শুনে ও বেশ তৃপ্তি অনুভব করত৷

সেবার বেগুনের হয়েছিল অতি–উৎপাদন ৷ বিজ্ঞানসম্মত অর্থনৈতিক কাঠামো যে দেশে নেই সেদেশে অতি উৎপাদনকারীদের মাথায় হাত দিয়ে বসতে হয়৷ বেগুনের অতিরিক্ত ফলনে সেবার বাঙলার চাষীদের মাথায় হাত দিয়ে বসতে হয়েছিল৷ নদীয়া জেলার হরিণঘাটা থানায় বেগো গাঁয়ে গিয়ে দেখি চাষীরা কাটারিতে বেগুন টুকরো টুকরো করে গোরুর জাব খাবার ডাবায় নুন মাখিয়ে ঢেলে দিচ্ছে৷ গোরু মুখ দিতে গিয়ে যেই দেখছে বেগুন অমনি নাক সিঁটকে মুখ ঘুরিয়ে বলছে – হুঁ ... বেগুন.... হাম্বা হাম্বা৷ ডাবার আর একটা কোণ ঘেঁসে যেই আবার মুখ রাখতে যাচ্ছে সেখানেও ওই একই কাহিনী৷ আবার সে ভুরু কঁুচকে মুখ বেঁকিয়ে বলছে – উঁ...... আবার বেগুন ...... হাম্বা হাম্বা৷ চাষীরা দেখলে – গোরু জাব খাওয়া ছেড়ে  দিয়েছে, এবার দুধ বন্ধ হয়ে যাবে৷ তাই তারা গোরুকে বেগুন দেওয়া বন্ধ করে দিলে৷

বীরভূমের রামনগরের চাষীরা বনেদী বেগুনচাষী৷ ওখানে গিয়ে শুনলুম, ওরা গাছ থেকে বেগুন তোলা ছেড়েই দিয়েছে৷ ওরা আমাকে বললে, ‘‘বাবু, বেগুনগুলো গাছেই পচুক৷ ওতে বরং গাছের সার হবে’’৷ পাঁজিপাড়া যাবার সময় পাইনি৷ তাই ওখানকার ডাকসাইটে বেগুনের কী দশা হয়েছিল বলতে পারছি না৷ আমাদের শহরে সে সময় পসুরী হিসেবে পাইকারী বাজারে কেনাবেচা হত৷ ৫ সেরে হত ১ পসুরী, আর ৮ পসুরীতে হত ১ মণ৷ তবে সেরের হিসেব সব জেলায় এক রকম ছিল না৷ প্রমাণ পরিমাপের সের বলতে বোঝাত ৮০ তোলাকে৷ কিন্তু আমাদের মুঙ্গেরে চলত ৮৪ তোলা৷ আবার পাশের জেলা ভাগলপুরে কোথাও কোথাও ১০০, ১০১, ১০৩ তোলা চলত৷ কোথাও বা ১০৫ তোলায় ১ সের৷ ৬০ তোলার সেরকে কাঁচি হিসেব বলা হত৷ তাই সে যাই হোক, সেবার অতি–উৎপাদনের সময় আমাদের শহরে বেগুনের ফ্যালা–ছড়া৷ মণ্ডামোহনের বাড়ীতে তিন মাস ধরে কেবল ভাত আর বেগুন–পোড়া চলত৷ পাড়ার মেয়েরা মণ্ডামোহনের স্ত্রী শ্রীমতী মিথ্যাময়ী দেবীকে জিজ্ঞেস করত ... ‘‘হ্যাঁ গা মর্কটের মা, (মণ্ডামোহনের ছেলেটির নাম ছিল মর্কট মোহন মুখুজ্জে৷ সে লটারির টিকিট বেচত আর টিউশানি করত৷ জলখাবার ছাত্রের বাড়ীতেই পাওয়া যেত – তবে ছুটির দিনে হরিমটর চিবিয়ে থাকাই পছন্দ করত)৷ আজ কী রাঁধলে গা?’ সে বলত, ‘আজ সেই ভোর থেকে দুপুর বারটা অবধি একটানা হেঁসেলে থাকায় ঘাড়–পিঠ টনটন করছে’৷ লোকেরা শুধোলে, ‘তা অতক্ষণ ধরে কী রাঁধলে গা?’ সে বললে, প্রথম পাতের জন্যে রাঁধলুম নিম–বেগুন  তারপর বেগুন বোঁটার চচ্চরি, ... তারপর বেগুনের কোপ্তা .... তারপরে বেগুনের কোর্মা ... তারপরে আদা বাটা দিয়ে বেগুনের ঝাল....সর্ষে বাটা দিয়ে বেগুনের ঝাল আর শেষ পাতে এখো গুড় দিয়ে বেগুন বীচির পায়েস৷ বেগুন–পোস্ত করব ভেবেছিলুম৷ উনুনে আঁচ না থাকায় আর করা গেল না৷ বেগুনপোড়া–টোড়া হেঁসেলের ত্রিসীমানায় ঘেঁসতে দিই না৷ ওইসব গরীবদের জন্যেই থাকুক৷’

যেমন দ্যাবা তেমনি দেবী৷

তা যাই হোক আসল কথায় আসা যাক৷ তখন আমাদের শহরে বেগুনের দর এক পয়সা পসুরী  – দু’আনায় মণ অর্থাৎ এক পয়সায় পাঁচ সের৷ মণ্ডামোহন মুখুজ্জে জনৈক কুজরাকে  ( বিহারের যারা তরকারী বেচে তাদের বলা হয় কুজরা আর যারা তরকারী উৎপাদন করে তাদের বলা হয় কোইরী৷ কোইরীরা ধর্মে হিন্দু আর কুজরারা মুসলমান৷ আমাদের ওখানকার কুজরাদের মাতৃভাষা অঙ্গিকা৷ তাদের নাম হত মহারাজ কুজরা, শনিচারা কুজরা, এতবারী কুজরা ইত্যাদি) এক পয়সার বেগুন দিতে বলল, কুজরা পাঁচ সের বেগুন দিয়ে আট–দশটা বেগুন ফাউ দিয়ে দিল৷ মণ্ডামোহন বললে, – ‘তোর ফাউয়ের বেগুনেই আমার চলবে৷  বেগুন কিনতে আর হবে না৷ আমার পয়সাটা ফেরৎ দে৷’

বলা বাহুল্য মাত্র, মোহগ্রস্ত লোক অন্যের ঘৃণার পাত্র হয়৷ নিজেও অন্যকে ভয় পায়৷ মণ্ডামোহন তাই হয়ে উঠেছিল সবাইকার ঘৃণার পাত্র৷

* *  * *

সেবার পাড়ায় জাঁক–জমক করে কালীপূজো হচ্ছিল৷ পাড়ার ছেলেরা থিয়েটারের রিহারর্স্যাল দিচ্ছে৷ কারও কারও পকেট খরচার পয়সায় টান পড়েছে৷ আগে বাড়ীর বাজার খরচার পয়সা থেকেই কমিশন টানত৷ কিন্তু এখন খরচা বেশী হয়ে যাচ্ছে দেখে বাপ নিজেই বাজার করা শুরু করে দিয়েছে৷ তাই কমিশনের পয়সা কম হয়ে যাওয়ায় কয়েকটি অতি–উৎসাহী ছেলে চাঁদার খাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল৷ সবাই যে যেমন পারল চাঁদা দিলে৷ মণ্ডামোহনের কাছে চাঁদা চাওয়া মাত্রই সে চোখ কপালে তুলে বললে – ‘‘ওরে বাবা কালী সে তো রণবাই চণ্ডী৷ আমরা পরম বৈষ্ণব৷ কালীপূজো আমাদের করতে নেই, পূর্ব–পুরুষের মানা আছে৷’’

ছেলেরা ভাবলে – সত্যিই বুঝি মানা আছে৷ তাই তারা ফিরে গেল৷ পরের দিন পাড়াশুদ্ধ লোককে বসিয়ে ভাল করে কালীর মহাপ্রসাদ দেবার ব্যবস্থা করা হল৷ দেখা গেল প্রথম পঙ্ক্তিতে প্রথম মানুষ যিনি পাত পেতে বসেছেন তিনি শ্রীযুক্ত বাবু মণ্ডামোহন মুখুজ্জে৷ বন্ধুরা বললে – ‘‘হ্যাঁরে মণ্ডামোহন, তুই  যে বললি তোকে কালীপূজো করতে নেই৷’’

মণ্ডামোহন বললে – ‘আমি তো বলেছি পূজো করতে নেই  কিন্তু পেসাদ খেতে নেই এমন কথা তো বলি নি৷ মায়ের পেসাদ না খেয়ে হাতী–ঘোড়া দূরের কথা, কীট–প্রতঙ্গও কি একদিনও বাঁচতে পারে? আমি ও তোমরা সবাই অর্থাৎ আমরা সবাই বেঁচে আছি কি করে দু’বেলা মায়ের পেসাদ পাচ্ছি বলেই না৷ এখন তোমরাই বল আমি এখানে পাত পেতে কী অন্যায়টা করলুম৷ এ যেন সেই ঃ

‘‘আমি বেহায়া পেতেছি পাত৷

কোন্ বেহায়া না দেয় ভাত’’৷৷

ডাকে ওই

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

ওই শোন কে ডাকে মেঘমন্দ্রে দূরগগনে

কার আহ্বান সদা ভাসে মাতাল পবনে৷

বিদ্যুৎ শিখায় কার হাতের লক লকে বেত

অমোঘ পরাক্রমে অন্যায়-অবিচারে টানে ছেদ৷

বঞ্চিতা ধরিত্রীর শূন্য কোল ভরে দিতে

কার আশিস প্রবহমান কল্লোলিনী-স্রোতে

সৃষ্টির ধমনীশিরায় উষ্ণ শোণিত কম্পন

কোন্ যতিহীন সংগীত জাগায় অনুরণন

উদ্বেল বিশ্ববীণার ঝঙ্কৃত প্রতি তারে

ভাঙ্গ্, ভাঙ্গ্ স্বর ওঠে কার ভৈরব হুঙ্কারে

মানুষ হয়ে জন্মেছি সকলে গড়তে সুন্দর মানবসমাজ

জাত-ইজম-বর্ণ ভুলে করব কেবল নোতুন পৃথিবীর কাজ৷