প্রভাতী

ভয় কি বা তার

লেখক
বিভাংশু মাইতি

অণুতে অণুতে আছো অণুসূত

তবু পাই না তোমার দেখা,

অন্তরে নেই আছো অন্তরে

চিদাকাশে তুমি রাকা৷

অনলে অনিলে সাগরে সলিলে

আছো তুমি সর্বত্র

আছো ছায়া-সম দিবস রজনী

মনে আছো মনোমিত্র৷

জেনেও জানি না তুমিই আমার

পরম জীবন দেবতা

বুঝেও বুঝি না তোমার মহিমা

নভোনীলে লেখা বারতা৷

বিভূপদে তব করি গো আকুতি

হৃদয়েতে দাও ভকতি

জগৎ মাঝারে যেন যুঝিবারে

পাই গো অপার শকতি৷

ভয় কি বা তার

যে আছে তোমার

অভয় চরণ স্মরণে

সঁপে যে দিয়েছে সকল সত্তা

জীবনে-মরণে-মননে৷

একটি মোমবাতির কথা

লেখক
সাগরিকা বিশ্বাস

জ্বলন্ত একটি মোমবাতি,

প্রদান করে আলোক রাশি রাশি৷

বিসর্জন দিয়ে নিজের জীবনটা,

ভরিয়ে দেয় আলোর রঙিন ছটা,

প্রতি মুহূর্তে তিলে তিলে সে শেষ হয়,

অন্যকে তবু সে আলো দেয়৷

সহ্য করে অশেষ জ্বালা যন্ত্রণা,

তবুও এক ফোঁটা অশ্রু ঝরে না৷

দেখে না উঁচু নীচু ধনী গরীব

জ্বলে সে সবার উৎসবের দিনে,

নিজের প্রাণ দিয়ে ভাগিদার হয় সেই শুভক্ষণের

কাউকে বলতে পারে না তার নিজের দুঃখকষ্ট,

শত বেদনা লুকিয়ে হাসে সর্বত্র৷

ভরিয়ে দেয় আলোর জ্যোৎস্নায়

নিজেকে জ্বালিয়ে দিয়ে,

তবু সে হাসে শান্তির পতাকা উড়িয়ে৷৷

 

‘‘গোলোক বৃন্দাবন’’

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

গ্রামে যাত্রাগান চলছে৷ গীতাভিনয় (সেকালে ভাল ক্ষাঙলায় যাত্রাকে ‘গীতাভিনয়’ বলা হত৷) হচ্ছে জমিদার বাড়ীর সামনেকার প্রকাণ্ড মাঠে৷ যার যা পার্ট সে পার্ট তো সে করছেই উপরন্তু সবাইকার চেষ্টা কোনোক্রমে জমিদারবাবুকে কিছুটা সন্তুষ্ট করে দিয়ে কিছু বখ্শিস আদায় করা৷ এই ধরনের ব্যাপার সেকালকার ক্ষাঙলায় খুব চলত৷ যার এলেম (মূল শব্দটি ‘ইল্ম্’ যার থেকে ‘আলিম্’ শব্দটি এসেছে৷) তেমন নেই সেও জমিদারের খোশামোদ করে দিয়ে বখশিসের ব্যবস্থা করে নিত৷ সেই যে গল্পে আছে না–

জাড়া গ্রামের ভোলা ময়রার সঙ্গে জনৈক জগুঠাকুরের কবির লড়াই হচ্ছে জাড়া গ্রামের জমিদার মধুসূদন বাঁড়ুজ্জের বাড়ীতে৷ জগুঠাকুর দেখলে, ভোলা ময়রার সঙ্গে সে এঁটে উঠবে না৷ তাই সে ঠিক করলে জমিদারবাবুকে খোশামোদ করেই  দু’পয়সার ব্যবস্থা করে নেবে৷ পালার বাইরে গিয়েই ধুন ধরলে–

‘‘এ এক বৃন্দাবন রে ভাই

এ এক বৃন্দাবন৷

হেথায় বাঁশী বাজান

লীলা করেন শ্রীমধুসূদন৷৷’’

ভোলা ময়রার নাকি তা সহ্য হয়নি৷ সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তরে বলেছিল–

‘‘কেমন করে’ বললি জগা

জাড়া গোলোক বৃন্দাবন৷

হেথা তুলসীমঞ্চ কোথায় পেলি

সবই দেখি বাঁশের বন৷

বংশীধ্বনি শুনলি কোথায়

ওরে মশায় করে ভনভন৷

কবি গা’বি পয়সা পাবি

অত খোশামোদের কী কারণ’’৷৷

দশাননের মুণ্ডুপাত

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

আমি যেখানকার কথা বলছি সেখানে যাত্রাগানের পালা ছিল ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’৷ যাত্রাদলের বিবেকের কাজ হচ্ছে গানের মাধ্যমে যে ঘটনা হচ্ছে বা হতে চলেছে তার একটা আভাস দেওয়া৷ কিন্তু এখানকার বিবেক সে পথ না মাড়িয়ে রাবণের বিরুদ্ধে  জমিদারবাবুকে চটিয়ে দিয়ে বখশিসের ব্যবস্থা করতে চাইল৷

    ‘‘রাবণ আসিল জুদ্দে পইর্যা ক্ষুট জুতা,

    হনুমান মারে তারে লাতি–সর–গুতা৷

    সর কাইয়া রাবণ রাজা জায় গরাগরি,

    হনুমান বলে, ‘‘তোরে মাইরাসি সাপরি৷৷

    সাপর মারিনি তোরে মাইরাসি সাপরি’’৷

    সাপর মারিলে তুই জইতিস জমের বারি’’৷৷

জমিদারবাবু মহা খুশী৷ তিনি সঙ্গে সঙ্গে খাজাঞ্চিকে ডেকে বললেন–‘‘বিবেকডারে দশডা টাহা বক্শিস দাও৷’’ রাবণের ভূমিকায় যে নেক্ষেছে সে নিষ্ঠার সঙ্গে পার্ট করে চলেছে৷ অস্ত্রের ঝনৎকার....পৌরুষের চরম অভিব্যক্তি৷ রাম একেবারে কোণঠাসা৷ ভয়ে ভাবনায় দুশ্চিন্তায় রামের মুখে কথা  সরে না৷ সে এক অসহনীয় পরিস্থিতি জমিদারবাবুর তা সহ্য হ’ল না৷ তিনি বললেন–‘‘রাবণডার এ্যাকডা মুণ্ডু কাইট্যা ফ্যালাইয়া দাও৷ আস্পর্দা কত দশানন দশানন আজ তাইক্যা নয়ানন অইয়া গেল৷’’

তোমরা জানো, নাটকের রাবণের একটা আসল মুণ্ডু থাকে আর বাকী নয়টা নকল মুণ্ডু৷ জমিদারের পাইক–বরকন্দাজরা একটা নকল মুণ্ডুকেটে দিলে৷ রাবণ লক্ষ্মণের ওপর চরম আঘাত হেনেছে...লক্ষ্মণের শক্তিশেল৷

হনুমান ছুটেছে মৃতসঞ্জীবনীর খোঁজে... বিশল্যকরণীর খোঁজে৷ রাক্ষসদের শিবিরে আনন্দের গুঞ্জরণ, রামের শিবিরে শোকের রোল, ক্রন্দনের আর্ত্তনাদ৷ জমিদারবাবু আর সহ্য করতে পারলেন না৷ তিনি বললেন–‘‘হারামজাদাডার অহনও আক্কেল অয় নাই৷ ওর আর্যাকডা মুণ্ডু কাইট্যা লও৷ দশানন দশানন আজ তাইক্যা আটানন অইয়া গেল৷’’

এর পরের দৃশ্য ঃ চাকা ঘুরে গেছে৷ লড়াইয়ে রাবণের হার হয়ে চলেছে৷ রাবণ কাতরভাবে শিবের উদ্দেশ্যে বলছেন–শিব, তুমি আশুতোষ৷ যত পাপই করে থাকি না কেন, আমি তোমার সন্তান৷ তুমি কৃপাদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাও৷ তোমার কৃপা ছাড়া আমার জয়ের তো কোনো পথই নেই, বাঁচবারও কোনো পথ নেই৷

রাবণ কাতরস্বরে বলে চলেছেন আর অঝোরে কেঁদে চলেছেন৷ দৃশ্য দেখে জমিদারবাবুর মনে দয়া হইল৷ তিনি বললেন–‘‘রাবণডার দুঃখু দেইখ্যা মন–প্রাণ বিগলিত অইয়া জায়৷ আহাহা, আহাহা ওর মুণ্ডু দুইডা আবার জোড়া লাগাইয়া দাও৷ আবার ওরে দশানন কইর্যা দাও৷’’

 

বাড়তি নম্বর ছিল পকেটে

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রাচীনকালের মানুষ জামার পকেট রাখত সাধারণতঃ দুটি কারণে৷ একটি কারণ ছিল শীতের সময় হাত দু’টোকে পকেটে ভরে এই ব্যথার জগতেও খানিকটা স্বর্গসুখ ভোগ করা আর দ্বিতীয় কারণ ছিল–টাকা–পয়সা বা যেসব নেশার জিনিস আর পাঁচ জনকে দেখানো যায় না সেগুলোকে লুকিয়ে রাখা৷ ইংরেজীতে যাকে ‘পকেট’ বলি ফার্সীতে তাকেই বলি ‘জেব’, ভাল বাংলায় ‘কোষ্ঠক’৷ উত্তর ভারতে এই ফার্সী ‘জেব’ শব্দটি আজও ভাল ভাবেই চলে–উর্দুতে তো চলেই৷ স্থানীয় লোকভাষাগুলিতে যেমন অঙ্গিকা, মৈথিলী, ভোজপুরী, মগহী, অবধী প্রভৃতি ভাষাতেও ‘জেব’ শব্দটি ভালভাবেই চলে৷

আমার ব্যষ্টিগত জীবনেও ‘জেব’ শব্দটি অতীতের এক সোণালী স্মৃতিতে মাখানো রয়ে গেছে৷ সে সময় আমাকে যিনি ফার্সী পড়াতেন তাঁর নাম ছিল মউলবী হিদায়েতুল্লা৷ মানুষটি ছিলেন বড়ই ভাল৷ আমাদের মুঙ্গের জেলা তথা অঙ্গদেশের সাধারণ মানুষ খুব সোজা ক্ষুদ্ধির হয়৷ তিনি তার ব্যতিক্রম ছিলেন না৷ তিনি ইংরেজী জানতেন না কিন্তু উর্দু, আরবী, ফার্সীতে ছিলেন সুপণ্ডিত৷ মাতৃভাষা অঙ্গিকা ছাড়া বাংলাও জানতেন৷ আমি তাঁর ছিলুম অত্যন্ত স্নেহের পাত্র৷ ক্লাসে সবাইকার সামনেই আমাকে ববুয়া (খোকা) বলে ডাকতেন৷ একবার পরীক্ষার পরে দেখা গেল আমি ফার্সীতে একশ’র মধ্যে একশ’ তিন নম্বর পেয়েছি৷ গোটা ইসুক্লে হল্লা...হৈ হৈ ব্যাপার....রৈ রৈ কাণ্ড৷ মওলবী সাহেব একচোখোমি করেছেন৷ একশ’র মধ্যে এক’শ তিন নম্বর দিয়েছেন৷ কেউ কেউ ক্ষললে–জানতুম, মওলবী সাহেব খুবই ভাল–এখন দেখছি একটু আদিখ্যেতাও করেন৷ একশ’ এর মধ্যে একশ’ তিন নম্বর কি দেওয়া যায়?

আমাদের ইংরাজী সাহিত্য ও ফোনেটিক্স পড়াতেন মিঃ বি সি মিটার৷ তিনি মউলবী সাহেবকে শুধোলেন–মওলবী সাব, ইয়ে’ আপনে ক্যা কিয়া? একশো মেঁ একশো তিন নম্বর আপনে কৈসে দিয়া? মিটার সাহেব মওলবী সাহেবকে কথাটা জিজ্ঞেস করেছিলেন স্কুলের মাসড্রিলের সময়ে অর্থাৎ সে সময়ে স্কুলের সমস্ত ছাত্র মাঠে জড় হয়েছিল মিলিত ড্রিল করবার জন্যে৷ মওলবী সাহেব কিছুমাত্র বিস্মিত হলেন না....বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালেন না.....তিলমাত্র হতচকিত হলেন না৷ বরং তিনি জোর গলায় সবাইকে শুণিয়ে শুণিয়ে বললেন–মাটার সা’ব, ম্যাঁ ক্যা কহুঁ৷ বাচ্চা ইতনা উম্দা লিখা হৈ জো মেঁনে আপনে জেব সে তিনি লম্বর দে দিয়া৷

 

তোমায় আমি ভালবাসি

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

আমার গানের সুরে নীল–নীলিমায় দূরে

তোমার গীতির ধারা বয়ে যায়৷

তোমার প্রেমের স্রোতে অনন্ত এই পথে

আমার জীবন যায় ভেসে যায়৷৷

গান শোণাতে বাজাও বাঁশী

মধুর চেয়েও মিষ্টি হাসি

হাসো তুমি কাছে–দূরে বিশ্বভূবন ঘুরে ঘুরে

দোলাও হূদয় মধুর দ্যোতনায়৷৷

তোমায় আমি ভালবাসি

ভালবাসি ভালবাসি

আমার মুখে তোমার ভাষা

আমার বুকে তোমার আশা

আমার আশা যাচি গো তোমায়৷৷

আয় বর্ষা আয় না

লেখক
শিবরাম চক্রবর্তী

আয় বর্ষা আয় না    গরম যে আর সয় না

    কেন ধরিস বায়না?

সময় মত এলে    সবই কাজ ফেলে

    গড়ে দেব গয়না৷

নুপূর পরে পায়    বৃষ্টি মেখে গায়

    ঘুরবি পাড়াময়

দেখবি খোকাখুকি    মেরে উঁকিঝুঁকি

    গাইছে তোর জয়৷

ঘরে হয়ে বন্দি    করে অভিসন্ধি

    যে এড়িয়ে চলবে৷

জানালা খুলে যেই    দেখবে তোমাকেই

    বর্ষারাণী বলবে৷

গরম হবে নরম    মেনে বর্ষার ধরণ

    তবু সে বাঁচতে চায়

ধুকুর ধুকুর বুকে    রান্না ঘরে ঢুকে

    সাঁটে রাঁধুনির গায়৷

 

নোতুন পৃথিবীতে

লেখক
শ্রী রবীন্দ্রনাথ সেন

এসো ভাই, মানবতার গান গাই

এসো ভাই, মানুষের তরে কাজ করে যাই৷

দেখো কত কালে কালে

লোকে চলে দলে দলে

আলো চাই আলো চাই বলে–

কত বাধা ঠেলে, দ্বন্দ্ব হিংসা ভুলে

কামনা কলুষ কালো যবনিকা ফেলে

আলোর আরতি দিতে চলে৷

এসো ভাই, মানবতার গান গাই

এসো ভাই, মানুষের তরে কাজ করে যাই৷

আরো চাই আরো চাই করে

শুধু প্রাণ আছো তুমি ধরে

সুখের স্বপ্ণে ইমারত গড়ে

মানুষের প্রাণ নিয়েছ যে কেড়ে

মানবতার মাঝে দানবতা ভরে

অজ্ঞতার বর্মখানি রয়েছ যে পরে

আর নয় চেয়ে দেখো অরুণোদয়

নব্য মানবতার কথা কারা কয়

নোতুন পৃথিবীর হ’ল যে অভ্যুদয়

যেথা পূর্ণ মানবতা দেবতার প্রতিমূর্তি হয়৷

এসো ভাই, মানবতার গান গাই

হাতে হাত ধরে নোতুন পৃথিবীতে চলো যাই৷

 

ভাঙে তো মচকায় না

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

সেই যে গল্প আছে না, একজন বাঙলাভাষী জমিদারের সখ হয়েছিল ঊর্দুভাষী সাজবার৷ থাকতেন তিনি গ্রামে৷ গ্রামের লোককে তিনি বোঝাবার চেষ্টা করতেন যে তাঁর পূর্বপুরুষেরা আসলে উর্দুভাষী ছিলেন৷ বাঙলায় আসার পরে ভাষাতে কিছুটা বাংলা প্রভাব পড়ে গেছে, আসলে তাঁরা উর্দুভাষীই৷

গ্রামের লোকেরা ভয়ে ভক্তিতে সামনে কিছু বলত না৷ আড়ালে বলাবলি করত, এরা চৌদ্দ পুরুষ ধরে তো এখানকারই লোক, বাইরে থেকে আবার এল কবে ভদ্রলোক শেষে হালে পানী না পেয়ে তাঁর ঊর্দু বনেদীপনা দেখাবার জন্যে শহরে একটা বাড়ী কিনলেন৷ শহরের প্রতিবেশীদের বোঝাবার চেষ্টা করলেন তাঁরা পশ্চিমদেশীয় অর্থাৎ উর্দুভাষী, তবে বাংলা ভী থোড়া–বহুৎ জানেন৷ শহরের লোকেরা ভাবলে, হয়তো বা কথাটা সত্যি৷ এমন সময় একদিন জমিদার সাহবের বাড়ীতে একটা শোকাবহ ঘটনা ঘটে যাওয়ায় বাড়ীর মেয়েরা চীৎকার করে মড়াকান্না জুড়ে দিলে৷ জমিদার সাহেবের আশায় গুড়ে বালি পড়ল৷ মেয়েরা কান্না জুড়ে দিয়েছে বাংলা ভাষায়৷

পাড়ার লোকেরা এসে বললে–জমিদার সাহেব, আপনি তো উর্দুভাষী, তবে আপনার বাড়ীর মেয়েরা বাংলা ভাষায় কাঁদছেন কেন?

জমিদার সাহেব বললেন–হ্যাঁ, তারা মন্দ কাঁদছে না গোড়ার দিকে উর্দুতেই কাঁদছিল৷ আমি বললুম তোমরা যদি উর্দুতে কাঁদো বংগাল মুলুকের লোকেরা ভাববে তোমরা উর্দুতে সাদীর গান গাইছো৷ তাই বাংলায় কী করে মড়াকান্না কাঁদতে হয় আমি ওদের শিখিয়ে দিয়ে এলুম৷ তা মন্দ কাঁদছে না, শুণে মনে হবে কোন বংগালীন ঔরৎ কাঁদছে৷ আমার বাড়ীর নোকরানী গফুরের আম্মা যেমন ভাবে কাঁদে, এরাও প্রায় তেমনি ভাবেই কাঁদছে৷

পাড়ার লোক তো শুণে থ’৷ তারা বুঝে নিল জমিদার সাহেব একটি আস্ত মজনতালি সরকার৷ তোমরা মজনতালি সরকারের গল্প জান তো

মজনতালি সরকার ছিল একটি বেড়াল৷ তার সখ গেল, বনেদীয়ানা দেখিয়ে বনের রাজা হবে৷ একদিন রাত্রি তৃতীয় প্রহরে বনের জীবজন্তুরা সবাই বসেছে বন–উন্নয়ন পর্ষদের বিশেষ মীটিংয়ে৷ প্রধান আলোচ্য বিষয়, বনে পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা কীভাবে আরও ভাল করা যায় তাই নিয়ে৷ কুকুর, ছাগল, বাঘ, ভাল্লুক, সবাই আছে৷ সবাই নিজের নিজের বক্তব্য বলে যাচ্ছে৷ সভাপতির চেয়ারটি খালি রয়েছে৷ সিংহ আসতে একটু দেরী করছে কি না৷ এমন সময় মজনতালি সরকার সভাপতির চেয়ারে এসে বসে পড়ল৷ দু’তিন বার ম্যাঁও ম্যাঁও করে শরীর ফুলিয়ে দিলে৷ বন্য জন্তুরা দেখলে, আরে শরীরটাকে বেশ ফোলায় কমায় তো

সবাই বললে–জাহাঁপনা, আপনি কে জাহাঁপনা?

সে বললে–আমি মজনতালি সরকার৷ আমি বনের রাজা৷ এই যে বাঘ দেখছ ও আমার ভাগ্ণে৷ শাস্ত্রে আছে ‘নরাণাং মাতুলক্রমঃ’৷ পুরুষ মানুষকে দেখতে হয় মামার মত, আর মেয়েদের দেখতে হয় পিসির মত৷ তা চেয়ে দেখ না, বাঘের চেহারা কতকটা আমার সঙ্গে মিলেছে কি না? আমি মামা কি না

সবাই দেখলে, সত্যিই তো রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটা দেখতে অনেকটা মজনতালি সরকারের মতন৷ সবাই মজনতালি সরকারকে রাজা বলে মেনে নিলে৷ লেট লতিফ* সিংহকে আর রাজা বলে মানছি না৷

মজনতালি সরকারের সভাপতিত্বে বন উন্নয়ন পর্ষদের মীটিং ভাল ভাবেই হল৷ ঠিক করা হ’ল, দশ কোটি নূতন বৃক্ষ লাগানো হবে৷ আগামী বৎসর ওই দশ কোটির মধ্যে যে ন’ কোটি গাছ মরে যাবে সেই শূন্যতা পূরণের জন্যে যাদের কন্ড্রাক্ট দেওয়া হবে তারাই বিনা মূল্যে পানীয় জল সরবরাহ করবে৷ এরপর মজনতালি সরকার বললে–তোরা দেখছি সবাই ছোট ছোট জানোয়ার৷ আমার চাপরাশি আর্দালীর কাজের জন্যে দু’একটা বড় জানোয়ার দরকার৷

সবাই বললে–আমাদের জঙ্গলে ঐরাবত হচ্ছে সব চেয়ে বড় জানোয়ার৷ দু’চারটা ঐরাবত আপনার কাছে পাঠিয়ে দোব৷

মজনতালি সরকার বললে–দেখব সে কত বড় জানোয়ার৷ বনের জানোয়ারা ক্যানেস্তারা টিন পেটাতে লাগল৷ আওয়াজ শুনে হাতীরা ছুটোছুটি শুরু করে দিলে৷ একটা প্রকাণ্ড ঐরাবতকে ছুটে আসতে দেখে মজনতালি সরকারের আর গাছের ওপর থাকতে ভরসা হল না যদি ঐরাবতের প্রচণ্ড ধাক্কায় গাছটা পড়ে যায় তবে মজনতালি সরকারের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিসমাধি হবে৷ মজনতালি সরকার তখন একটা বট গাছের শিকড়ের তলে আশ্রয় নিলে৷ ঐরাবতের পা বড়বি  তো পড় শিকড়ের ওপর পড়ল৷ হাতীর পায়ের চাপে শিকড়টা মজনতালি সরকারের পেট চেক্টে দিলে৷ মজনতালি সরকারের পেট ফেটে গেল৷ তার তখন শেষ অবস্থা৷

এদিকে বনের জানোয়াররা তাদের রাজাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে৷ কোথায় রাজাবাহাদূর, কোথায় রাজাবাহাদূর শেষ পর্যন্ত তারা রাজা–বাহাদূরকে খুঁজে বের করলে৷ রাজ্য বাহাদূরের তখন অন্তিম দশা৷ তারা কাঁদতে কাঁদতে মজনতালি সরকারকে বললে ‘রাজা–বাহাদূর, আপনার এ দশা কে করলে?’

খাবি খেতে খেতে মজনতালি সরকার বললে– তোদের আমি কী অর্ডার করেছিলুম? আমি বলেছিলুম একটা বড় জানোয়ার আনতে৷ আর তোরা কি না পাঠালি ঐরাবতের মত একটা ছোট্ট জানোয়ারকে৷ প্রথমে তো তাকে দেখে বড় রাগ হ’ল৷ পরে এত হাসি পেল যে হাসতে হাসতে আমার পেট ফেটে গেল৷ মজনতালি সরকার মরে গেল৷

* স্বভাবগত ভাবে যে মানুষ কোথাও পৌঁছুতে বিলম্ব করে ভারতীয় ইংরেজীতে তাকে বলে ‘লেট লতিফ’৷

ফোটো রে মন ফোটো

লেখক
বিভাংশু মাইতি

ফোটো রে মন ফোটো

অনুধ্যানে সেই চরণে

কমল হয়ে ফোটো৷

অনুরাগে সিক্ত কর

শতদলের দলগুলি

কোরকে দাও ঢেলে দাও

ভালবাসার অঞ্জলি৷

গ্রীষ্মের দহন দাহে

সেই চরণ চিতচন্দন

বরষার বজ্রপাতে

সে যে দেয় অভয় শরণ৷

শরতের স্নিগ্দাকাশে

সে যে মোর বিভা বিধুর

হেমন্তে হিমেল রাতে

অনুপম পরাণ বধু৷

শীতেরই তুষার পাতে

পরশ তার মধু-উষ্ণ

বসন্তের বর্ণমেলায়

সে যে মোর রসকৃষ্ণ৷

ফোটো রে মন ফোটো

রাত্রিদিনে সে চরণে

কমল হয়ে ফোটো৷