প্রসঙ্গতঃ আর একটি কথা না বলেই নয় , বাঙালী একটা সঙ্কর জনগোষ্ঠী৷ পৃথিবীতে মানবজাতির প্রধান চারটি ধারা (রেস --- আর্য-নিগ্রো-অষ্ট্রিক-মঙ্গোলীয়৷ এই চার রেসের-ই রক্ত বইছে বাঙালীর রক্তে৷ অষ্ট্রিক ও নিগ্রো রক্তের মিশ্রণে উদ্ভব হয়েছে দ্রাবিড় গোষ্ঠীর৷ দ্রাবিড় রক্তও বাঙালী সাদরে আত্মস্থ করেছে৷ এমন সংকরায়ন জগতে বিরল৷ বাঙালী জনগোষ্ঠী মূলতঃ অষ্ট্রিকো-দ্রাবিড়ো-মঙ্গোলয়েড জনগোষ্ঠী , বাইরের ‘ রঙ-ছাপটা ‘ আর্যীয়৷ যদিও বৃহত্তর বঙ্গের পশ্চিমাংশে ( রাঢ় বাঙলায় ) অষ্ট্রিক রক্তের প্রাধান্য , উত্তর-উত্তর পূর্বে মঙ্গোলীয় রক্তের প্রাধান্য , দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে ও মধ্যবঙ্গে দ্রাবিড় রক্তের প্রাধান্য৷ এসব চেহারাতেই বোঝা যায়৷ পৃথক ও করা যায়৷ তথাপি এসবের মধ্যেও একটা একরূপতা বর্তমান৷ সেটাই একটা স্বাতন্ত্র্য গড়ে দিয়েছে৷ কি সেই অভিনবত্ব ? সেটা হচ্ছে -- বাঙালীস্থানের অধিবাসীদের চেহারার মধ্যে একটা প্রকৃতিদত্ত কোমল-পেলব-স্নিগ্দ রূপ বর্তেছে৷ বাঙলার বাইরের মানুষেরা একে বাঙালী-বাঙালী ভাবছাপ বা বাঙালীয়ানা বলে থাকে৷ বাঙলার বাইরে থেকে যে যারাই আসুক না-কেন , দীর্ঘদিন বংশ পরম্পরায় বসবাস করলে বঙ্গ প্রকৃতি তাদের চেহারায় ও মানসিকতায় একটা বাঙালী ছোপ-ছাপ লাগিয়ে দেয়৷ একটা বঙ্গীকরণ ঘটে৷ এটা প্রকৃতির স্নেহের দান৷ বোধহয় এই প্রকৃতিগত কারণেই বাঙালী চিরকালই অতিথি বৎসল, পরকে আপন করে নেয়ার প্রবনতা তার রক্তে৷ বাইরের নামাবলীর মত ধর্মমত কী একে পাল্টাতে পারে ? চাপাদিতেও পারেনা৷ বৃহত্তর বঙ্গের মহাভূমিতে বিভিন্ন রেসের মিলনে বঙ্গপ্রকৃতির ক্রিয়াত্মিকা শক্তির কর্মায়ণে , বাঙ্গালী জীবনের সহজাত অভিপ্রকাশে বিশ্বে বাঙালী একটা স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী ( এথিকগ্রুপ )৷ তাই বাঙালীর ভাল-মন্দ , ভাগ্য-দুর্ভাগ্য , ভূত-ভবীষ্যৎ একই সূত্রে গাঁথা৷ এরই নাম ‘ বাঙালী জাতীয়তাবোধ ৷ অবশ্য বাঙালী জাতীয়তাবোধ উদ্ভব বা সৃষ্টির পিছনে কতগুলো শর্ত কাজ করে৷ যথা-১. সম ভৌগোলিক তথা প্রাকৃতিক পরিবেশ (যা গড়ে ওঠে ভূ-পৃষ্ঠে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অবস্থান , ভূপ্রকৃতি , ভূমির গঠন , ভূমির ঢাল , সূর্যের পতনকোণের বৈশিষ্ট্য, পাহাড়-পর্বত থাকা-নাথাকা --- থাকলে তার অবস্থানের বিশেষত্ব , সমুদ্রের সঙ্গে দূরত্ব , জলবায়ু , স্বাভাবিক উদ্ভিদ , মহাজাগতিক প্রভাব , মাটির নীচের ও ওপরের প্রাকৃতিক সম্পদ , প্রকৃতি জীবের মিথষ্ক্রিয়া)৷ এগুলোকে ভিত্তি করে মানুষের ‘ চরৈবেতি ‘ জীবনের পরিধি বাড়তে বাড়তে গোটা পৃথিবীটাই হয়ে ওঠে মানুষ জাতের আপন দেশ, আঞ্চলিক মানুষ থেকে অখণ্ড-মানবজাতি৷ ফলে এর থেকে মানুষজাতের দুটো পরিচয় প্রকাশ পায়৷ --একটা ভৌমিক বা স্থানিক বা আঞ্চলিক --- এটা বৈষম্য নয় , প্রকৃতিজাত বৈচিত্র্য৷ আর এই সূত্রেই বিশ্বে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উদ্ভব৷ অপরটাস্বভাবগত বা সৃষ্টির উৎসগত ---যা ‘ আব্রহ্মস্তম্ব তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত৷ ২. ভৌগোলিক বা আঞ্চলিক পরিবেশগত বৈবহারিক জীবন ও পারস্পরিক আদান-প্রদান , ভাব বিনিময় সূত্রে উদ্ভূত ভাষা- সংস্কৃতি প্রভাবে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই জেগে ওঠে জাতীয়তাবোধ বা জাতিসত্তা--এথিসিটি৷ উপাদানটা ‘ নরজাতি- রেসিয়াল, , পরিণামটা সংকরণ-এথিক ৩. দীর্ঘকালের একসঙ্গে চলা সামগ্রিক আঞ্চলিক জীবনধারা , বিশেষ করে অর্থনৈতিক জীবনধারা ক্রমে ক্রমে একটা স্বাতন্ত্র্যত্ব , বিশেষত্ব সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপ করে৷ ৪.- মানুষ তো সমাজবদ্ধ জীব৷ কিন্তু সমাজবদ্ধতায় উত্তরণ ঘটাতে গেলে প্রাথমিক শর্ত-সূত্রই হচ্ছে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে চলা , পরম , লক্ষ্যের দিকে চলার এষণাও৷ দীর্ঘদিনের একসঙ্গে চলার পথে সংঘর্ষ-সমিতি ( ক্ল্যাশ এণ্ড কোয়েশন ) সমসূত্রে এসে যায় সামাজিক ঐতিহ্য৷ তাত্ত্বিক বিচারে , - ‘ সমসমাজতত্ত্ব ’ থেকে নিজেকে ফিরে পাওয়ার ফিরে দেখার এষণা৷ ৫ . এর থেকে জাতীয়য়তাবোধ এর মধ্যে একটা মর্মচেতনা --- মমত্ববোধ বা আত্মবিম্বন ( ইন্টার্নালফিলিং ) কাজ করে৷ এর থেকে এসে যায় একাত্মবোধ ( ফিলিং অবওয়াননেস)৷ এর পরিধিটা ক্রমবিস্তারশীল --- আঞ্চলিক থেকে বিশ্বৈকিক, খণ্ড থেকে অখণ্ডে , স্থূল থেকে সূক্ষ্মের দিকে , ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের দিকে৷ এর থেকে কতকগুলো সর্বজনীন কল্যাণমুখী ইতিবাচক কিছু তাগিদের উদ্ভব হয়৷ যেমন-- ক) কোন মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে একসঙ্গে চলার শপথ, খ) বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার মাধ্যমে একযোগে কাজ করা, গ) বাঁচো ও বাঁচতে দাও এই মন্ত্রে উদবুদ্ধ হওয়া৷ ঘ) বৃহতের প্রতি একটা আকর্ষণ ঘনীভূত হওয়া , বা বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু দর্শনের প্রবণতা জাগা৷ ঙ ) একটা সমদৃষ্টি চেতনা , নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে ওঠা৷ এই প্রসঙ্গে কিছু প্রাজ্ঞ, মহাজনদের কথা স্মরণ করা যেতে পারে --- ** ‘‘ কোন জনগোষ্ঠী বা গোষ্ঠী ---সমষ্টি একছত্র শাসনে তাদের মধ্যে অভিন্ন ভাষিক , শাস্ত্রিক , আচারিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা-ভিত্তিক জাতিসত্তা বোধ---একক নামে পরিচিতি ঘটে৷ ‘’ ---‘ বাঙলা ও বাঙলা সাহিত্য ‘ ---ড. আহম্মদ শরীফ৷ ‘’ ----- বহুযুগেরবহুকোটি লোকের দেহমন মিলিয়ে মানুষের সত্তা৷ সেই বৃহৎ সত্তার সঙ্গে যে পরিমাণ সামঞ্জস্য ঘটে ব্যক্তিগত মানুষ সেই পরিমাণে যথার্থ মানুষ হয়ে ওঠে, ’’ (মানুষের) এই বৃহৎসত্তার মধ্যে একটা অপেক্ষাকৃত ছোটো বিভাগ আছে৷ তাকে বলাযেতে পারে ‘ জাতিকসত্তা যা স্থান-কাল , জলবায়ু , ভৌগোলিক অবস্থান , পরিবেশ---ধারাবাহিক বহুকোটি পুরুষ পরম্পরায় মিলে এক একটা সীমানায় বাঁধা পড়ে৷ এদের চেহারায় একটা বিশেষত্ব আছে৷ এদের মনের গড়িনটাও কিছু বিশেষ ধরনের৷ এই বিশেষত্ব লক্ষণ অনুসারে আপনাকে সত্য বলে পায়৷ এই আত্মীয়তা সূত্রে গাঁথা বহুদূর ব্যাপী বৃহৎ ঐক্যগুলো৷ মানুষকে মানুষ করে তোলবার ভার এই জাতিকসত্তার ওপরে৷ সেই জন্য মানুষের সবচেয়ে বড় আত্মরক্ষা এই জাতিকসত্তাকে রক্ষা করা৷ এই তাদের বৃহৎ দেহ , তার বৃহৎ আত্মা৷ এই আত্মিক ঐক্যবোধ যাদের দুর্বল , সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠবার শক্তি তাদের ক্ষীণ৷ জাতির নিবিড় সম্মিত শক্তি তাদের তাদের পোষণ করা না , রক্ষা করে না৷ তারা পরস্পর বিশ্লিষ্ট হয়ে থাকে , এই বিশ্লিষ্টতা মানবধর্মের বিরোধী৷ বিশ্লিষ্ট মানুষ পদে পদে পরাভূত হয় , তারা সম্পুর্ণ মানুষ নয়৷ -----‘ বাংলা ভাষা পরিচয় ‘----- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ (চলবে)
- Log in to post comments