মানুষ নিছক উদর সর্বস্ব জীব বিশেষ নয়৷ মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম প্রাণী৷ কারণ একমাত্র মানুষই পারে এই বিশ্বের সৃষ্টি রহস্য জানতে৷ তার সূক্ষ্মতম মানসিক বিকাশের মাধ্যমে৷ অন্য কোন প্রাণীর সেই সামর্থ নেই৷ তবে সঞ্চর ও প্রতিসঞ্চর ধারার মাধ্যমে যে সৃষ্টি প্রবাহ চলে তার প্রথম ও শেষ কথা হ’ল--- আমরা যথা হতে আসি তথায় ফিরিয়া যাই৷ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মতম সত্তা থেকে সঞ্চর ধারার স্থূল থেকে স্থূলতম সত্তায় রূপান্তরিত হয়ে সৃষ্টি চলেছে৷ সেই এক কোষি প্রাণী থেকে আরম্ভ করে এর অগ্রগতি, তাই জীবজন্তু, গাছপালা থেকে আরম্ভ করে ধীরে ধীরে এই মানুষের সৃষ্টি৷ মানুষ মন প্রধান জীব হিসেবে নিজেকে জানতে চায়৷ আর সেই জানার আকাঙ্খাতে সেই আত্মিক সাধনার মাধ্যমে নিজের জন্মের রহস্য ও সৃষ্টির রহস্যও জানতে সক্ষম হয়৷ এটাই আত্মসাধনা৷ তারই মধ্য দিয়ে সে নিজেকে জানতে পারে৷ এই কারণে মানুষকে দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক সাধনা করতে হয়৷ এই তিনটি দিকের উন্নয়নে তাই মানুষকে নজর দিতে হয়৷ সুপ্রাচীনকালে এই ভারতবর্ষের মাটিতে যেসব মনীষীগণ জন্মগ্রহণ করেন তারা এই তিনেরই বিকাশের গুরুত্ব দিতেন৷ দেহের মাধ্যমে মানুষ কাজ করবে৷ তাই দেহের ক্ষুধা মেটাতে তাদের কাজ করে যেতে হ’ত৷ খাদ্য সংগ্রহে ও বেঁচে থাকার জন্যে কাজ করতে হ’ত৷ বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে লড়াই করতে হ’ত৷ তাই বলা হয় সংগ্রামই জীবন৷ শুধু বেঁচে থাকাটাই মানুষের জীবন নয়, সেটা হ’ল অনুন্নত প্রাণীদের কাজ৷ মানুষকে মনের ক্ষুধা মেটাতে, আর্থিক ক্ষুধা মেটাতে তার দরকার হ’ত এমন কিছু সূক্ষ্ম বস্তুর যেগুলি খাদ্যদ্রব্য দিয়ে মেটানো যেত না৷ সেগুলি ছিল সঙ্গীত, কাব্য, নাচ, গান, যেগুলি মনের তৃপ্তি দিতে পারে, আর তার চেয়ে সূক্ষ্ম হ’ল আধ্যাত্মিক সাধনা৷ আমি কে? কোথা থেকে এসেছি, সেটা জানা অর্থাৎ আত্মজ্ঞান লাভ৷ এই তিনের ক্ষুধা মেটাতে মানুষকে কাজ করে যেতে হয়৷ তিনটে নিয়ে এগোতে হয়৷ তবেই মানুষ মনুষ্যত্ব লাভ করে৷ আত্মজ্ঞান লাভই আসল জ্ঞান লাভ৷ এই যে তিনের পূর্ত্তির অনুশীলন, এটার উপর প্রাচীন ভারতের মুনীঋষিগণ জোর দিতেন৷ তারা সেই পথের সন্ধান দিয়ে গেছেন৷ এই যে তিনের সাধনা এটা সকলকে অর্থাৎ সকল মানুষকে যারা মানুষের আধার পেয়েছে তাদের করে যেতে হবে৷ সেখানে কোন জাত-পাত, সাদা-কালো, লম্বা-চওড়া কোন ভেদাভেদ নেই৷ উন্নত মেরুদণ্ডী জীব মানুষ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সেই পথ অনুসরণ করে আত্মজ্ঞান লাভ করতে পারে৷ তাই বলা হয় মানব সমাজ এক ও অভিভাজ্য৷ আর এই পথকে লাভ করার অধিকার সকলেরই আছে৷ নারী ও পুরুষের সবাই সেই সুখ ও আনন্দের প্রত্যাশী৷ তিনেরবিকাশেই মানুষ হয়ে ওঠে আদর্শবান মানুষ আর এটাই হ’ল একমাত্র আনন্দ লাভের পথ৷ মানুষ একা বাঁচতে পারে না, তাই সংঘবদ্ধ হয়ে তাকে থাকতে হয়৷ তাই ব্যষ্টি ও সমষ্টি দুইয়েরই অতি প্রয়োজন৷ সমষ্টিবদ্ধ হয়ে চলতে সমাজ গড়তে হয়েছে মানুষকে তাই সমাজকে অস্বীকার করার উপায় নেই৷ মানুষ এই পৃথিবীর গ্রহের অধিবাসী৷ সকলের অধিকার আছে বেঁচে থাকার৷ তাই কেউ যাতে বঞ্চিত না হয় সেটা দেখার ভার সমাজের৷ তাই সমাজের সার্বিক কল্যাণ সমবেতভাবে মানুষকে করতে হবে৷ আজ অত্যাধুনিক যুগে আমরা বাস করছি৷ সকলকে নিয়ে চলতে হবে৷ শোষণ করা অপরাধ৷ সবাই জানে, কিন্তু শোষণই বেশী হচ্ছে এই মাটির পৃথিবীতে৷ বঞ্চণার শিকার কোটি কোটি মানুষ,মুষ্টিমেয় ভোগ করছে বেশী করে৷ এরই অবসান ঘটান সৎ নীতিবাদীদের কাজ৷ সংগচ্ছধবং মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে চলতে হবে৷ প্রতিটি অঞ্চলকে শোষণমুক্ত করতে হবে৷ আজকের বৃহৎ পরিবার পৃথিবীকে এক বৃহৎ পরিবারে অর্থাৎ সমাজে পরিণত করাটাই হ’ল মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ মানুষের পবিত্রতম ব্রত ও কর্ম৷ বাঁচো ও অন্যকে বাঁচতে দাও---এটাই হোক পৃথিবীর মানব সমাজের কেমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য৷ এই মানুস সমাজের বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে লড়াই করে আজ এসে পৌঁছেছে বর্তমান অবস্থায়৷ আজও কিন্তু সেই শোষণ চলছে৷ মানুষ মারার জন্যে ভয়ঙ্কর অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলছে এই মাটির বুকে৷ কিন্তু কোটি কোটি মানুষ অসহায় ও অভুক্ত হয়ে আছে৷ প্রতিটি মানুষ জন্মেছে অধ্যাত্ম জীব হিসাবে৷ তাই আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে৷ আর সেই পরিবেশ এসেছিলেন সদাশিব ও শ্রীকৃষ্ণ আরও অনেকে৷ অন্যান্য দেশে অনেকই আসেন মানব সমাজের কল্যাণে৷ বিভিন্ন সময় যারা মানব কল্যাণে আসেন ও কাজ করে যান, তাদের কথা কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী লোভী ব্যাষ্টি অস্বীকার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করেছে পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে গেছে৷ লোভের বশবর্তী হয়ে জীবজন্তু গাছপালা ধবংস করেছে৷ গত শতাব্দীতে এই পৃথিবী দেখেছে পরপর দুটো ভয়ঙ্কর বিশ্বযুদ্ধ৷ তাতে সবাই বুঝেছে যুদ্ধ নয় শান্তি চাই৷ কিন্তু শান্তি কি এসেছে? কেন এর উত্তর খুঁজেপেতে হবে৷ সকলকে, এড়িয়ে গেলে চলবে না৷ এই পৃথিবীকে রক্ষার জন্যে মহাসম্ভূতি পরমারাধ্য বাবা শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী আবির্ভাব ঘটেছে৷ মানবতা রক্ষার জন্যে আর পরমপুরুষের সৃষ্টিকে ধবংসের হাত থেকে রক্ষা করতে তিনি নীরবে কাজ করে গেছেন লোকচক্ষুর আড়ালে৷ তিনি রেখে গেছেন তাঁর মহান দর্শন আনন্দমার্গ, আর্থিক ও সামাজিক তত্ত্ব প্রাউট৷ কিন্তু দর্শন তত্ত্ব যাই হোক তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে চাই সৎ নীতিবাদী মানুষ৷ নইলে তত্ত্ব তত্ত্বই থেকে যাবে৷
আজ বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে অভাব ঘটেছে সৎ নীতিবাদী দেশসেবকদের৷ অত্যধিক লোভের ও ভোগ বিলাসের মাত্রা বেড়েছে একটি বিশেষ স্তরের মানুষের মধ্যে৷ যারা জীবনকে আত্মকেন্দ্রিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে ব্যষ্টিস্বার্থে সব কিছু গ্রাস করতে চাইছে ও সেটা করেও চলছে৷ এই মানসিকতাকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করা জরুরী৷ ‘বাঁচো ও বাঁচতে দাও’ এটাই হোক মানবতাবাদী মানুষের লক্ষ্য৷
এই যে ভয়ঙ্কর মানসিক অধঃপতন সারা পৃথিবীতে, তাকে সংযত করার মহান ব্রত গ্রহণ করেছে৷ আনন্দমার্গ প্রচারক সংঘ৷ তাই আনন্দমার্গের প্রথম লক্ষ্যই সৎনীতিবাদ কিছুই মহান মানুষ তৈরী করা৷ আনন্দমার্গ দর্শনের প্রবক্তা তাদের নাম দিয়েছেন সদ্বিপ্র---দৈহিক মানসিক ও আত্মিক বিকাশে পরিপূর্ণ মানুষ৷ এই মানুষের হাত ধরেই তৈরী হবে আদর্শ সমাজ নোতুন পৃথিবী৷
- Log in to post comments